মো. মোস্তফা মিয়া

এমন জীবন করিও গঠন, মরিলে হাসিবে তুমি, কাঁদিবে ভূবন।

হাদীর জীবনে এই বাক্যটি শতভাগ প্রযোজ্য। তারুণ্যের চেতনায় অনুকরণীয় আদর্শের নাম হচ্ছে হাদী। পাড়া, মহল্লা, গ্রাম, শহর, স্থানীয় থেকে জাতীয় এবং জাতীয় থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গের বিভিন্ন স্থানে এক বিপ্লবী চেতনায় উচ্চারিত হচ্ছে হাদীর নাম। যা আন্তর্জাতিক বিপ্লবী চেতনার ইন্সটিটিউশনে পরিণত হয়েছে। যা হারিয়ে যাবার না, একবিংশ শতাব্দীর বিপ্লবী আদর্শিক চেতনা ইতিহাসে শহীদ হাদীর চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। হাদীর শহীদ হওয়ার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের একবিংশ শতাব্দীর ইতিহাসের পাতায় যুক্ত হলো এক অভূতপূর্ব অধ্যায়। কেবল একটি জানাজা কীভাবে জনসমুদ্রে রূপ নিয়ে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বার্তায় পরিণত হতে পারে, তার সাক্ষী হলো রাজধানী ঢাকা। জুমার রাতে শাহাদাত বরণ করা তরুণ দেশপ্রেমিক শরীফ ওসমান বিন হাদীর শেষ বিদায় অনুষ্ঠান রূপ নিয়েছিল জাতীয় সংহতির এক বিশাল মঞ্চে। দেশের ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙে এক নতুন ইতিহাস গড়লেন ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অকুতোভয় এই শহীদ বীর সৈনিক।

দেশবিরোধী সন্ত্রাসীদের নৃশংস গুলীতে বাংলাদেশের আকাশে এক উজ্জ্বল ধুমকেতুর মতো উদয় হয়ে দেশপ্রেমের স্ফূলিঙ্গ ছড়িয়ে সবাইকে কাঁদিয়ে চির বিদায় নিয়ে চলে গেলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাহসী সংগঠক ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র। শনিবার (২০ ডিসেম্বর, ২০২৫) দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ইতিহাসখ্যাত এক জানাজার মধ্য দিয়ে চিরবিদায় জানানো হয় এই মৃত্যুঞ্জয়ী বীরকে। সংসদ ভবনের আশপাশের এলাকায় মানুষের এতই ভিড় ছিল যে, কয়েক কিলোমিটার জুড়ে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।

ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার সন্তান ওসমান হাদী রাজধানীর বিজয়নগরে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলীতে আহত হয়ে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাহাদাত বরণ করেন। তার জানাযায় খামারবাড়ি থেকে আসাদ গেট পর্যন্ত পুরো এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। মানুষের এই ঢল দেখে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জানাযার পর বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের এত স্বতঃস্ফূর্ত ও ব্যাপক অংশগ্রহণ আর কখনও দেখা যায়নি।

জানাযা শেষে উপস্থিত জনতা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ একবাক্যে ঘোষণা করেছেন, হাদীর অসমাপ্ত বিপ্লব ও আদর্শকে এগিয়ে নেওয়াই হবে ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে শ্রেষ্ঠ প্রতিশোধ। উপস্থিত জনতা আরও স্লোগান দেন-এক হাদীকে স্তব্ধ করে দিলেও লক্ষ হাদী আজ বাংলার ঘরে ঘরে জন্ম নিয়েছে। হাদীর রক্তে ভেজা এই পথ ধরেই বাংলাদেশ একদিন সম্পূর্ণ আধিপত্যমুক্ত ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। এই শহীদ বীর হাদীর বিপ্লবী আদর্শিক চেতনা দ্বারা আন্তর্জাতিক বিশ্ব উজ্জীবিত হবে।

জানাযার আগে যখন হাদীর ভাই বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন উপস্থিত লাখো মানুষের কান্নায় এক হৃদয়বিদারক পরিবেশ তৈরি হয়। যে মানুষটির হৃদয় অনেক কঠিন, তিনিও এসময় অশ্রু ধরে রাখতে পারেননি। কোনো রাজনৈতিক প্রলোভন বা অর্থ ছাড়াই কেবল ভালোবাসার টানে সাধারণ মানুষ ছুটে এসেছিল তাদের প্রিয় ‘ওসমান’কে একনজর দেখতে। উপস্থিত এক বৃদ্ধ আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘‘তুমি বাতাসা খাইয়ে এমপি হতে চেয়েছিলে, আজ তোমার জন্য দোয়া করতে কোটি মানুষের বাতাসাও খরচ করতে হলো না।’’

এই জানাযা কেবল একটি ধর্মীয় আচার ছিল না, বরং এটি ছিল এক জোরালো আদর্শিক রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক জাতীয় চেতার প্রতিবাদ। বিশিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেছেন, ওসমান হাদীর জানাযায় যে জনস্রোত, তা প্রমাণ করে এদেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং ফালতু ফ্রেমিংয়ের কবর রচিত হয়েছে। তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিরা বলছেন, হাদী তার জীবনের বিনিময়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ দেখিয়ে গেছেন। যারা তথাকথিত ‘সংস্কৃতি’ আর ‘পুরানো তথা দিলীøর বয়ান’ দিয়ে বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল, এই জনসমুদ্র তাদের জন্য এক চরম বার্তা। মানুষ এখন আর ইনিয়ে বিনিয়ে বলা থিসিস চায় না, বরং উন্নত শির এক আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ চায়। যার মাধ্যমে আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরে ধ্বনিত হবে।

নেটাগরিকরা বলছেন, হাদীর এই ‘রাজকীয় বিদায়’ বিপ্লবীদের মনে নতুন করে সাহস জুগিয়েছে। প্রতিটি বিপ্লবী এখন হাদীর মতো দেশপ্রেমে বলীয়ান হয়ে লড়াই করতে প্রস্তুত। দেশপ্রেমিক জনতা তাই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যারা হাদীর খুনি কিংবা নেপথ্য কুশলী, তারা গর্তে লুকিয়ে থাকলেও ছাড় পাবে না। হাদীর হত্যার বিচার ও ইনসাফ কায়েমের মাধ্যমে দেশ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ছাত্রনেতারা হাদীকে তুলনা করেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাথে। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা যেমন ব্রিটিশ রাজ কাঁপিয়ে দিয়েছিল, হাদীর কণ্ঠে সেই কবিতার আবৃত্তি তেমনি ভারতীয় আধিপত্য বাদ ও আওয়ামী ফ্যাসিবাদের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উঠে আসা এই তরুণ নেতা জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ছিলেন সম্মুখসারির যোদ্ধা। ইনকিলাব মঞ্চের মাধ্যমে তিনি দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি এবং বিদেশী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যে লড়াই শুরু করেছিলেন, তা আজ কোটি তরুণের অনুপ্রেরণা। যা আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একবিংশ শতাব্দীর ‘বিদ্রোহী’ হয়ে অমর হয়ে থাকবে।

ওসমান হাদীর এই প্রস্থানকে অনেকে ‘ঈর্ষণীয় মৃত্যু’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। জুমার দিনে গুলীবিদ্ধ হয়ে জুমার রাতেই না ফেরার দেশে চলে যাওয়া এবং দেশের প্রতিটি মসজিদের কোটি কোটি মানুষের দোয়া পাওয়া-এমন সৌভাগ্য খুব কম মানুষের কপালে জোটে। যার মাধ্যমে এক সার্থক জীবনের সমাপ্তি ঘটে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশপন্থার রাজনীতি যে এদেশের মানুষের মজ্জাগত, ওসমান হাদীর জানাযা তা আবারও প্রমাণ করল। এক হাদীকে সরিয়ে দিয়ে যারা দমাতে চেয়েছিল, তারা আসলে লাখো হাদীর জন্মের পথ প্রশস্ত করে দিল। বাংলাদেশ আজ হাদীকে বিদায় জানায়নি, বরং তার আদর্শকে বরণ করে নিয়েছে ইনসাফের দেশ গড়ার শপথ নিয়ে। ইতিমধ্যে যার ফলাফল জাতীয় থেকে আন্তর্জাতিক বিশ্বে সফলভাবে প্রকাশ পাচ্ছে।

জানাযায় উপস্থিত হয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘‘হাদী, তুমি আমাদের বুকের মধ্যে আছো। আমরা তোমাকে বিদায় দিতে এখানে আসিনি। বাংলাদেশ যতদিন টিকে থাকবে, তুমি আমাদের মাঝে থাকবে। হাদী যা বলে গেছেন, সেই স্বপ্ন ও ওয়াদা পূরণ করাই হবে বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য।’’

হাদীর বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিকের ইমামতিতে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযার আগে তিনি বলেন, খুনীরা এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আমি এই বাংলার জমিনেই আমার ভাই হত্যার বিচার দেখতে চাই।’’ হাদীর মাত্র আট মাস বয়সী সন্তানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, হাদী সব সময় শাহাদাতের তামান্না করত, আল্লাহ তাকে সেই মর্যাদা দান করেছেন।

জনপ্রিয় ইসলামী আলোচক মিজানুর রহমান আজহারি বলেছেন, দ্রোহের প্রতীক- শহীদ ওসমান হাদীর রাজকীয় বিদায়। ধূমকেতুর মতো এলেন। ন্যায় ও ইনসাফের বলিষ্ঠ কণ্ঠ হিসেবে গোটা জনপদে বিপ্লবের দাবানল ছড়িয়ে হঠাৎ রবের সান্নিধ্যে চলে গেলেন। নিশ্চয়ই আসমানে আমার ভাইকে এর চাইতেও বড় রাজকীয় অভ্যর্থনা জানানোর আয়োজন চলছে।

শনিবার (২০ ডিসেম্বর, ২০২৫) দুপুরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে এক পোস্টে তিনি এ কথা বলেন। পোস্টে আজহারি লিখেন, জুমার নামাজের পরপরই গুলী বিদ্ধ, আবার পরের জুমার রাতেই শাহাদাত বরণ! পেয়েছেন কোটি মানুষের কান্না মিশ্রিত দুআ। সুবহানাল্লাহ! এ এক পরম সৌভাগ্য!

হাদীর মতো এমন দেশপ্রেমিক, আধিপত্যবাদ-বিরোধী ও ধর্মীয় মূল্যবোধ সম্পন্ন তরুণরা-ই আগামীর বাংলাদেশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, শহীদের রক্ত কখনো বৃথা যায় না। ইনশাআল্লাহ ওসমান হাদী বেঁচে থাকবেন সহস্র মুক্তিকামী মানুষের ভালোবাসায়। অনুপ্রেরণা জোগাবেন প্রজন্ম হতে প্রজন্ম। সাহসের বাতিঘর হয়ে থাকবেন অগণন মানুষের হৃদয়ে।

ওসমান হাদীর রাজকীয় বিদায় ছিল একটি সম্মানজনক এবং ঐতিহাসিক ঘটনা, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। শরীফ ওসমান হাদী ছিলেন একজন ক্ষণজন্মা তরুণ তুর্কি, যিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গণে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন একজন বিপ্লবী, দেশপ্রেমিক এবং দূরদর্শী নেতা, যিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন এবং মানুষের অধিকারের জন্য লড়াই করেছেন। জাতির নিজস্ব সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের পক্ষে তাঁর দৃঢ় অবস্থান ছিল।

ওসমান হাদী নলছিটি ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসা থেকে শিক্ষা জীবন শুরু করেন। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ছিলেন এক সন্তানের জনক এবং বিবাহিত।

ওসমান হাদী শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। তিনি একটি স্বনামধন্য কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতা করেন এবং পরে ইউনিভার্সিটি অব স্কলারস নামে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছিলেন। তিনি ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শহীদ হাদী একটি নাম, একটি ইতিহাস, একটি ইনস্টিটিউশন, তিনি একবিংশ শতাব্দীর বিপ্লবী চেতনার ইতিহাসে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশ্বে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

স্পষ্টভাষী শহীদ হাদীর স্বপ্ন ও প্রত্যাশা

“হাদী সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ্জা-মান” কে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলেছিল: সাহস থাকলে কু করে দেখান। জনগণ গিয়ে ইট খুলে আনবে ক্যান্টনমেন্ট থেকে। এটা কোনো হুমকি ছিল না-এটা ছিল জনতার শক্তির ঘোষণা।

“হাদী প্রধান উপদেষ্টার” চোখে চোখ রেখে বলেছিল: আমি বিশ্বাস করি, আপনি পালাতে আসেননি। তাই ভয় পাবেন না। নামগুলো বলেন-কারা আপনাকে কাজ করতে দিচ্ছে না। এই কথার ভেতর ছিল না ভদ্রতার মুখোশ, ছিল সত্য বলার সাহস।

“ইন্টেরিমের উপদেষ্টাদের” উদ্দেশে হাদী বলেছিল: একজন রিকশাওয়ালাও জানে-আপনাদের কেউ ভালো না। আপনারা জুলাইকে বেচে দিয়েছেন। এক পা বিদেশে, আরেক পা ক্ষমতার টেবিলে। শহীদদের রক্তের সঙ্গে আপনারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।

এই অভিযোগ কোনো গুজব না-এটা রাজপথের রায়।

হাদী বিএনপি”-কে বলেছিল: শহীদ জিয়ার দলকে ভারতের দাস বানাতে দেবো না। কারণ স্বাধীনতার নামে দাসত্ব মানে শহীদদের অপমান।

“হাদী জামায়াতে ইসলামী”-কে বলেছিল: নিজামী, সাঈদীর জামায়াতকেও ভারতের দাস হতে দেবো না। কারণ আদর্শের কথা বলে পরাধীনতা মেনে নেওয়া সবচেয়ে বড় ভণ্ডামি।

“হাদী এনসিপি”-কে সোজাসাপটা বলেছিল: তোমরা জুলাইকে নিজেদের সম্পত্তি বানিয়েছ। মনে রেখো-জুলাই কোনো দলের না, জুলাই পুরো দেশের। এই কথায় কেঁপে উঠেছিল অনেকের সাজানো বয়ান।

“হাদী এমনকি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী-লীগের” ক্ষেত্রেও বলেছিল: যারা গণহত্যায় জড়িত না, তাদের সাথেও ইনসাফ করতে চাই। কারণ হাদীর রাজনীতি ছিল প্রতিশোধের না। ন্যায়ের।

ঢাকা-৮ আসনে হাদী নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী মির্জা আব্বাস আর হেলাল উদ্দীনকে “ভাই” বলে দোয়া চেয়েছিল: কারণ সে শিখিয়েছিল, রাজনীতি মানেই শত্রুতা না, রাজনীতি মানেই মানবতা।

হাদী “হেভিওয়েট রাজনীতি”র মিথ ভাঙতে চেয়েছিল: ক্ষমতা আর টাকার কাছে মাথা নত না করে সবার জন্য সমান মাঠ গড়তে চেয়েছিল।

হাদী প্রমাণ করতে চেয়েছিল: সততা, ভালোবাসা, ত্যাগ আর জনগণের ভাষা বুঝতে পারলে, কোটি টাকার প্রার্থীকেও হারানো যায়।

“হাদী চেয়েছিল” হিন্দুদের জন্য আলাদা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম: যাতে কোনো দল আর কোনো সময় তাদের ভোটব্যাংক বানিয়ে ব্যবহার করতে না পারে।

হাদী স্বপ্ন দেখেছিল: ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এই দেশের মানুষকে এক কাতারে দাঁড় করানোর। হাদী কালচারাল ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে যোগ্য, দক্ষ সাহসী মানুষ তৈরি করতে চেয়েছিল।

হাদী চেয়েছিল: জুলাইয়ের শহীদদের খুনীদের বিচার। “৫৭ বিডিআর” হত্যার বিচার। শাপলা গণহত্যার বিচার। গুম-খুনে জড়িত ডিজিএফআইয়ের নরপশুদের বিচার।

হাদী দেখাতে চেয়েছিল: বিক্রি না হয়েও রাজনীতি করা যায়। মুড়ি আর বাতাসা দিয়েও জনসংযোগ হয়।

কোটি টাকা ছাড়াও নির্বাচন করা যায়- যদি জনগণ পাশে থাকে। আমি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে ইন্টেরিম সরকার ও বাংলাদেশের জনগণের কাছে জানতে চাই? এই চাওয়াগুলো কি এতটাই অপরাধ ছিল? তাই কি হাদীকে বাঁচতে দেওয়া হলো না?

তাহলে আজ প্রশ্ন একটাই?

* এই দেশে কি সততা নিয়ে রাজনীতি করা নিষিদ্ধ?

* ইনসাফের কথা বললেই কি মৃত্যু অনিবার্য?

* জনগণের পক্ষে দাঁড়ালেই কি গুলী বরাদ্দ?

যদি, হাদীর স্বপ্ন অপরাধ হয়: তাহলে এই রাষ্ট্র নিজেই অপরাধী।

আর যদি হাদীর চাওয়াগুলো সত্য হয়: তাহলে হাদী মরেনি, হাদী আজও প্রশ্ন হয়ে এই জাতির বুকের ভেতর আগুন জ্বালিয়ে যাচ্ছে। এক বিপ্লবী হাদির পরিবর্তে লক্ষ বিপ্লবী হাদির উদয় হয়েছে এবং তাঁরা হাদির স্বপ্নের আলো উজ্জীবিত করতে ঐক্যবদ্ধ।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও এনজিও ব্যক্তিত্ব।