মো: শাহীন আলম

ফিলিস্তিন-একটা নাম, একটা ভূখণ্ড, একটা রক্তে রঞ্জিত ইতিহাস। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ ভূমি ছিল শান্তি, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্র। কিন্তু বিগত আট দশক ধরে এ ভূমি যেন হয়ে উঠেছে শুধুই রক্তপাত, নির্যাতন আর শাহাদাতের মঞ্চ, যেখানে নিরপরাধ মানুষের রক্ত মিশে গেছে মাটির সাথে। শিশু, নারী, বৃদ্ধ-কেউই বাদ নেই এমন নির্মমতার ছোবল থেকে। ফিলিস্তিনের প্রতিটি রক্তবিন্দু সাক্ষ্য দিচ্ছে এক অব্যাহত অন্যায় ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রামের।

ইসরাইল রাষ্ট্রের উৎপত্তি এবং ফিলিস্তিনীদের উপর এর প্রভাব: ১৯১৭ সালে ব্রিটেনের ঘোষণা করা ব্যালফোর ঘোষণা ছিল ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর। যেখানে বলা হয়Ñ“ইহুদিদের জন্য একটি জাতীয় আবাসভূমি ফিলিস্তিনে গড়ে তোলা হবে।” ১৯১৯ থেকে ১৯২৬ সালের মধ্যে, ইউক্রেনের গণহত্যার মতো ইহুদি-বিদ্বেষমূলক প্রকাশের কারণে ৯০,০০০ অভিবাসী ফিলিস্তিনে আসেন। ধীরে ধীরে ইউরোপজুড়ে ইহুদি-বিদ্বেষ, বিশেষ করে নাৎসি শাসন ও হলোকাস্টের ভয়াবহতা বিশ্বব্যাপী ইহুদিদের জন্য একটি নিরাপদ আবাসের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করে তোলে। ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনে ইহুদি-আরব উত্তেজনা বাড়তে থাকে, আরব বিদ্রোহ ও দাঙ্গা চলতে থাকে এবং ব্রিটিশরা অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কোটার ব্যবস্থা নেয়। এরপর ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে একটি ইহুদি ও একটি আরব রাষ্ট্রে বিভাজনের প্রস্তাব দেয়। এ প্রস্তাবে ইহুদি রাষ্ট্রের জন্য বরাদ্দ ছিল প্রায় ৫,৭০০ বর্গমাইল, আরব রাষ্ট্রের জন্য ৪,৩০০ বর্গমাইল। আরব দেশসমূহ সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। ১৪ মে ১৯৪৮ সালে ডেভিড বেন-গুরিয়ন ইসরাইল রাষ্ট্র ঘোষণা দেয়। এর পরপরই আরব দেশগুলো ইসরাইলের সাথে যুদ্ধ শুরু করে। কিন্তু ইসরাইল যুদ্ধ জয় করে এবং প্রস্তাবিত সীমার বাইরের এলাকা দখল করে। জর্ডান পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম, মিশর গাজা উপত্যকা দখল করে। এ যুদ্ধেই প্রায় ৭ লাখ ফিলিস্তিনী শরণার্থী হন। এরপর আবার ১৯৬৭ সালে মিশর, জর্ডান ও সিরিয়ার ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। কিন্তু ইসরাইল মাত্র ছয় দিনে মিশর, জর্ডান ও সিরিয়ার বিরুদ্ধে জয় পায়। পশ্চিম তীর, গাজা, সিনাই ও গোলান হাইটস ইসরাইল অধিকারে আসে। এর ফলে সংঘাত আরও ঘনীভূত হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে ফিলিস্তিনী জনগণ প্রথমবার সংগঠিতভাবে প্রতিরোধ শুরু করে, যা পরিচিত ‘প্রথম ইন্তিফাদা’ নামে। ইসরাইলী সেনাবাহিনী দমন অভিযান চালায়, বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। ১৯৯৩ সালে অসলো চুক্তির মাধ্যমে ইসরাইল ও পিএলও পরস্পরকে স্বীকৃতি দেয় এবং শান্তি প্রক্রিয়ার সূচনা হয়। শান্তি প্রক্রিয়ার ব্যর্থতা ও উস্কানির পর ২০০০ সালে দ্বিতীয় ইন্তিফাদা শুরু হয়। এ আন্দোলন ছিল আরও সহিংস ও রক্তক্ষয়ী। আত্মঘাতী হামলা, ইসরাইলী বিমান হামলা ও নিরাপত্তা দেয়াল নির্মাণÑ সব মিলিয়ে শান্তির স্বপ্ন আবারও ভেঙে পড়ে। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে হামাস গাজা দখল করে নেয়। এরপর থেকে হামাস ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে ২০০৮, ২০১৪, ২০২৩-২৪ সালে এবং বর্তমানে অনেক ভয়াবহ সংঘর্ষ বাধে যার মধ্যে হাজার হাজার ফিলিস্তিনী প্রাণ হারায়।

ফিলিস্তিনী জনগণের আত্মত্যাগ : ইসরাইল রাষ্ট্রের উৎপত্তি থেকেই ফিলিস্তিনী জনগণের উপর নেমে আসে ভয়াবহ এক দুর্যোগ যা আজ পর্যন্ত ফিলিস্তিনী জনগণ বহন করে নিচ্ছে। তাদের স্বাধীনতার জন্য বিলিয়ে দিতে হয়েছে হাজার হাজার প্রাণ। ১৯৬৭ সালের “ছয় দিনের যুদ্ধ” বা “সিক্স ডে ওয়ার”-এ, প্রায় ২০,০০০ ফিলিস্তিনী নিহত এবং অনেক বেশি আহত হয়। ২০০৮ সালে (অপারেশন কাস্ট লিড) এ নিহত হয়েছে ১৪শত এর বেশি ফিলিস্তিনী যেখানে শিশুর সংখ্যা ছিল ৩শত এবং নারীর সংখ্যা ছিল ২শত এর বেশি। এরপর ২০১৪ সালের “অপারেশন প্রটেকটিভ এজ”-এ প্রাণ হারিয়েছিল ২,২৫০০ এরও বেশি ফিলিস্তিনী। যার মধ্যে শিশুর সংখ্যা ছিল ৫শত এর অধিক এবং নারীর সংখ্যা ছিল ৩শত এরও বেশি। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ সালের যুদ্ধ এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভয়াবহ আগ্রাসন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং ফিলিস্তিন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় (PMH)-এর তথ্যমতে, কয়েক মাসের মধ্যে শহীদের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ৩০,০০০-এরও বেশি। যার মাঝে প্রায় ১২,০০০ শিশু ও ৮,০০০ নারী। আহত হয়েছে প্রায় ৭৫,০০০। বাস্তুচ্যুত হয়েছে ২০ লক্ষের অধিক লোক। বোমার আঘাতে ধ্বংস হয়েছে হাসপাতাল, স্কুল, মসজিদ এমনকি আশ্রয়কেন্দ্রও। তাছাড়া বিগত বছরগুলোতে ছোট ছোট হামলায় প্রায় ১০২০০ জন ফিলিস্তিনী প্রাণ হারিয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি হামলায় প্রাণ হারিয়েছে ৭১০ এরও বেশি নাগরিক। এই মৃত্যু যেন শুধুই সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়Ñপ্রতিটি প্রাণের পেছনে ছিল একটা স্বপ্ন, একটা জীবন, একটা পরিবার। প্রতিটি শহীদ যেন আরও একবার প্রমাণ করে দিচ্ছে, ফিলিস্তিন শুধু এক ভূখণ্ড নয় এটা একটি প্রতিরোধের নাম, আত্মত্যাগের প্রতীক।

সমাধানের পথ কী? এ সংকটের সমাধান শুধু যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে নয়, একটি ন্যায্য ও টেকসই রাজনৈতিক সমাধানেই সম্ভব। এ রক্তপাতের অবসানকল্পে কিছু স্থায়ী ও ন্যায়সঙ্গত পদক্ষেপ ছাড়া শান্তির স্বপ্ন শুধুই অলীক। এজন্য নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে।

১। দখলদারিত্বের অবসান : ইসরাইলকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্তে ফিরে যেতে হবে। তারা যে সকল জায়গা অন্যায়ভাবে দখল করেছে তা ছেড়ে দিতে হবে।

২। আন্তর্জাতিক চাপ : এ সমস্যা সমাধান কল্পে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন: জাতিসংঘ, EU, OIC সহ মুসলিম বিশ্বকে আরও সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। ইসরাইলকে চাপ প্রয়োগ করতে হবে তাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য। প্রয়োজনে তাদেরকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বয়কট করতে হবে।

স্বীকৃতি :

৩। ফিলিস্তিনের স্বীকৃতি : ফিলিস্তিনীদের জন্য একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের পথ সুগম করে ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

৪। মানবিক সহায়তা ও পুনর্গঠন : যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। যে অঞ্চলগুলোতে ত্রাণের সংকট রয়েছে সেখানে ত্রানের ব্যবস্থা করতে হবে। যেই সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ধ্বংস হয়েগেছে তা পুনর্নির্মাণ করতে হবে। আর এজন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা খুবই দরকার।

৫। জনমত ও গণচেতনা : বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদই হতে পারে বড় চাপের উৎস। মানুষ জেগে উঠলেই নীতি নির্ধারকরা বাধ্য হয় পদক্ষেপ নিতে। এজন্য প্রত্যেকে নিজ নিজ জায়গা থেকে প্রতিবাদ করতে হবে।

৬। মুসলিম বিশ্বের ঐক্য : ফিলিস্তিনী সমস্যা সমাধান কল্পে সবচেয়ে বেশি জরুরি মুসলিম বিশ্বের ঐক্য। মুসলিম বিশ্বকে একসাথে এর প্রতিবাদ করতে হবে। ইসরাইলের আগ্রাসন মনোভাবের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনী জনগণকে সকল ধরনের সাহায্য।