মনসুর আহমদ

মানুষের এক বিচিত্র স্বভাব-যখন কোন কিছু তার পক্ষে যায় তখন তার প্রশংসায় মেতে ওঠে,আর যখন বিপক্ষে যায় তখন তার কুৎসা রটনা করে। মানব রচিত ইতিহাস এই ত্রুটি থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। মোগল ইতিহাসে সম্রাট আকবর ইসলাম থেকে দূরে সরে গিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন দীনে ইলাহী , হেরেমে প্রতিষ্ঠা করেন হিন্দু সংস্কৃতি। তার এ ভ্রান্ত কর্মে আনন্দিত হয়ে অমুসলিম ঐতিহাসিকরা উচ্চারণ করলেন Akbr Padshah was one of the greatest and noblest kings that ever lived,,” তাকে অভিহিত করেন Akbar The Great” নামে।

সম্রাট আকবর ও জাহাঙ্গীরের ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপ ও ইসলাম বিরোধী চরিত্র এবং তাদের সৃষ্ট আচার সংস্কৃতি ভারতীয় মুসলমানদেরকে একদিকে চরম বিভ্রান্তির দিকে নিয়ে গিয়েছিল, অপর দিকে তাদের অনুগ্রহে হিন্দু সম্প্রদায় তাদের চিন্তা সংস্কৃতি ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে যায়। তারা রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও অনেক দুঃসাহসী হয়ে ওঠে।

সতের শতকের শেষার্ধে বাদশাহ আওরঙ্গজেব যখন মুসলিম শিক্ষা সংস্কৃতিকে পুনরুদ্ধার চেষ্টায় লিপ্ত হলেন, তখন তারা আওরঙ্গজেব বিদ্বেষী হয়ে উঠল এবং পরবর্তীতে হিন্দু ঐতিহাসিকরা Who had served Akbar so loyally and well, began to grow lukewarm towards Aurung Zeb ”তাকে চিত্রিত করলেন হিন্দু বিদ্বেষী রূপে। হিন্দু ঐতিহাসিকরা আওরঙ্গজেব সম্পর্কে লিখলেন The emperor Aurung Zeb was strong minded ruler and a sincere in his faith that he could not belive in the righteousness of any other faith, and he wanted the whole India to fall in with his views. He lacked indeed the broad spirit of toleration that led the Great Akber to see that was good in all religious and people… After AurungZeb had rulled for a little, he began to take steps against the Hindu religion.” (Stories from Indian History)

সম্রাট আওরঙ্গজেব সম্পর্কে হিন্দু বিদ্বেষের যে তথ্য যোগ করা হয়েছে তা আদৌ সত্য নয়। প্রকৃত পক্ষে তিনি চেয়ে ছিলেন মুসলমানদের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে হিন্দু প্রভাব দূর করতে, হিন্দুদের অত্যাচার থেকে মুসলমানদেরকে রক্ষা করতে। এ কারণে হিন্দু ঐতিহাসিকরা আওরঙ্গজেব সম্পর্কে অসত্য প্রচার করেছে।

সম্রাট আওরঙ্গজেব মুসলিম সমাজকে রক্ষার জন্য প্রচুর সংস্কারমূলক কাজ করেছেন। তার মধ্যে কিছু সংস্কার কাজ হিন্দুদের জন্য বেশ মনঃপীড়ার কারণ হয়েছে। সেগুলি হল :

ক) আকবর থেকে শাহজাহান পর্যন্ত রাজদরবারে মুসলিম প্রথা বিবর্জিত হয়ে হিন্দুয়ানী প্রথা চালু ছিল। রাজ দরবারের পোষাক পরিচ্ছদ ছিল হিন্দু আদর্শের। আকবর সংখ্যাগুরু হিন্দুদের বন্ধুত্ব কামনা করতেন। উদ্দেশ্যের সততা প্রমাণ করার জন্য নিজে ইসলামের বহু কিছু অমান্য করতেন। রাজ দরবারে প্রচলন করলেন সালামের পরিবর্তে সিজদা বা ভূমি চুম¦নের প্রথা। দরবারীগণ হিন্দুয়ানী পাগড়ি ও হিন্দু রাজাদের ন্যায় অলংকার পরিধান করতেন। কিন্তু আওরঙ্গজেব শাসন ভার গ্রহণ করে এগুলি পরিবর্তন করেন এবং ইসলামী রসম-রেওয়াজ ও আইন কানুন প্রবর্তন করেন।

খ) আওরঙ্গজেব রাজদরবারের সমস্ত জৌলুস বন্ধ করে দেন । শাহী দরবারে গান বাজনা একান্ত করণীয় কর্তব্যের মধ্য পরিগণিত হয়ে ছিল। আওরঙ্গজেব শরিয়ত বিরোধী সমস্ত প্রথা বন্ধ করে দেন।

গ) আওরঙ্গজেবের সব চাইতে বড় অবদান ছিল মুসলমান সম্প্রদায়কে হিন্দুদের শিক্ষা Ñসংস্কৃতির থাবা থেকে রক্ষা করা। বাদশাহ শাহজাহানের আমলে হিন্দুরা মুসলমানদের উপরে অত্যাচার আরম্ভ করে। শাহজাহানের রাজত্বের শেষের দিকে শাহজাদা দারাশিকোহ’র পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দুরা মুসলমান সন্তানদেরকে হিন্দুদের ধর্মপুস্তক পড়াতে শুরু করে। মুসলমান সন্তানদেরকে হিন্দু ধর্ম শিক্ষা গ্রহণের জন্য তারা নানা ভাবে উৎসাহ প্রদান করে চলে। মুসলমান ছেলেরা বহু দুরে আসত হিন্দু ধর্ম শিক্ষা গ্রহণের জন্য। এ ভাবে হিন্দুদের কবলে পতিত হয়ে মুসলমান শিশুরা নিজেদের ধর্ম তাজজীবÑতমদ্দুন হারাতে বসেছিল। শাহজাহানের পর বাদশাহ আওরঙ্গজেব তাঁর শাসনামলে এ সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেন। তিনি চালু করলেন ইসলামী শিক্ষা । তাঁর শাসনামলে ইসলামী শিক্ষার যে উন্নতি হয়েছিল ভারতবর্ষে তা আর কোন কালে হয়নি।

ঘ) আওরঙ্গজেবের আমলে বাংলার মুসলমানগণ সম্ভবত প্রথমবার যথার্থ ইসলামী শাসনের সাথে পরিচিতি লাভ করে এবং ইসলামী শাসনের সুফল ভোগ করে। বাংলার শাসন কর্তাদের মধ্যে একমাত্র তার আমলে মুসলমানরা ইসলামী শাসন এবং ইসলামী চরিত্রের সাথে কিছুটা পরিচিত হতে পেরেছিল। এটা সম্ভব হয়েছিল আওরঙ্গজেবের তীক্ষè দৃষ্টি ও কঠোর পরিচর্যার কারণে।

আওরঙ্গজেবকে হিন্দু বিদ্বেষী অভিহিত করার কারণ জিযিয়ার পুনঃপ্রবর্তন। তারা মনে করতো জিযিয়া হিন্দুদের প্রতি অত্যাচারের হাতিয়ার। এ কারণে তারা আওরঙ্গজেব সম্পর্কে বলেন, After AurungZeb had rulled for a little, he began to take steps against the Hindu religion, He revived the Jaziya tax which the Pathan kings used to levy on Hindus” (Stories from Indian History)

জিযিয়া আরোপ অমুসলমানদের প্রতি কোন অত্যাচার নয়, বরং তাদের প্রতি ইহসান। শত্রুর আক্রমণ থেকে অমুসলিমদের জান মাল রক্ষা করা ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব । একটি দেশের নাগরিক হিসেবে সকল নাগরিককে দেশ রক্ষার ব্যাপারে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করা কর্তব্য। কিন্তু অমুসলমানগণ ইসলামী আদর্শে বিশ্বাসী নয় বলে ইসলামের আদর্শ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জিহাদে জীবনের ঝুঁকি নিতে বাধ্য করা অনৈতিক। কিন্তু নাগরিক হিসেবে তাদের নিকট থেকে শুধু দেশ রক্ষার কাজে আর্থিক সাহায্য গ্রহণ করা অযৌক্তিক ও অন্যায় নয়। এই জিযিয়া ব্যবস্থা পাঠান আমলে চালু ছিল। আকবরের আমলে এ প্রথা রহিত হয়েছিল। কিন্তু আওরঙ্গজেব তাঁর শাসন প্রণালীকে ইসলামী ছাঁচে গড়তে চেষ্টা করে ছিলেন। তারই একটি অংশ হিসেবে তিনি জিযিয়া প্রবর্তন করেন। তাঁর এই সংস্কার কর্ম হিন্দুদের মনঃপুত হয়নি। সে কারণে এত দিনে Who had served Akbar so loyally and well, began to grow lukewarm towards Aurung Zeb”

সম্রাট আওরঙ্গজেবের এ সব কর্ম পদ্ধতি ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে অবাঞ্ছনীয়। আর সে কারণে স্বাভাবিক ভাবে তাদের দৃষ্টিতে আওরঙ্গজেবেকে অনুদার মনে হয়েছিল। আওরঙ্গজেব সাধারণ ভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর কোন আদর্শ চাপিয়ে ছিলেন এমন তথ্য ইতিহাসে বিরল। কিন্তু এর পরেও তার উপরে অসত্য ইতিহাস মন্তব্য সত্যের অপলাপ ব্যতিত কিছু নয়। আমরা দেখতে পাই আওরঙ্গজেবের আমলে বাংলাদেশের দেওয়ান ও পরবর্তী কালে সুবাদার মুর্শিদকুলী খাঁ রাজ্য শাসনে সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদের উর্ধ্বে উঠে লোক নিয়োগ করতেন।

ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার বলেছেন, “মুর্শিদকুলী খাঁ গুণের আদর করিতেন, এবং তাঁর আমলে ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য প্রভৃতি শ্রেণীর হিন্দুগণ উত্তমরূপে ফার্সী ভাষা অর্জন করিয়া কর্ম কুশলতার ফলে বহু উচ্চপদ অধিকার করিতে লাগিলেন। এই ভাবে মুসলমান যুগে সর্বপ্রথম হিন্দুদের মধ্যে এক সম্ভ্রান্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব হইল। ইহাদের কেহ কেহ নবাবের অনুগ্রহে জমিদারী লাভ করিয়া অথবা কার্যে বিশেষ ক্ষমতা দেখাইয়া ধন অর্জন করিয়া রাজা মহারাজা খেতাব পাইলেন।”

বাদশাহ আওরঙ্গজেবের মধ্যে আল্লাহর নিকট জবাবদিহির চেতনা ছিল প্রবল। সে কারণে তিনি বিশাল মোগল সম্রাজ্যের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত শাসক সমাজের যাবতীয় কার্যকলাপের উপর তীক্ষè দৃষ্টি রাখতেন। মুর্শিদকুলীখানের হিন্দুদের প্রতি সদয় ও ইনসাফ আচরণ আওরঙ্গজেবের অগোচরে সংঘটিত হয়নি। তিনি হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে জনগণের ইজ্জত আব্রু ও তাদের ধন সম্পদের উপর অন্যায় হস্তক্ষেপ না হয় সে দিকে তীক্ষè দৃষ্টি রাখতেন।

আকবর ও জাহাঙ্গীরের আমলে রাষ্ট্রীয় সাহায্য ও মেরামতের অভাবে বহু মসজিদ ভেঙ্গে ধ্বংস স্তুপে পরিণত হয়। অনেক মসজিদ হিন্দুরা ধ্বংস করে দেয়। অথবা মন্দির ও নাট্যশালায় রূপান্তরিত হয়। বিজয়পুরের মসজিদগুলি সম্পর্কে ঐতিহাসিক ফিরিশতা লেখেন, “হিন্দুরা মসজিদে প্রবেশ করে সেখানে মূর্তিপূজা করতো এবং বাদ্য যন্ত্র সহকারে দেব দেবীর বন্দনা গীত গাইত। সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময় সমস্ত মসজিদ তার হেফাজতে চলে আসে। সমস্ত রাজ্যে যত গুলি মসজিদ ছিল সব গুলোতে ইমাম মুয়াজ্জিন ও খতীব বা বক্তা নিযুক্ত করে ছিলেন। রাজকোষ থেকে তাদেরকে বেতন দেয়া হতো।”

অপ্রিয় সত্য কথা এই যে, মুসলমানরা এদেশে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সব প্রচেষ্টা চালিয়ে ছিলেন কিন্তু সামাজিক, ধর্মীয় সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মুসলমানদেরকে সঠিক নেতৃত্বদানের যোগ্য করে গড়ে তোলার কোন প্রচেষ্টা তারা চালাননি। বিশেষ করে সম্রাট আকবরের আমলে তার প্রতিষ্ঠিত দীন-ই ইলাহীর প্রভাব ইসলাম বিরোধী চিন্তার অনিষ্টকর প্রভাব সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। সম্রাট আওরঙ্গজেব ঐ সব ইসলাম বিরোধী চিন্তা সংস্কারের সাথে সাথে মুসলমানদের মাঝে ঐক্য প্রচেষ্টা ও এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি মুসলমানদের মধ্যে ইসলামী ফিকাহ্ বা মুসলিম জীবন বিধানের ব্যাপারে যে সমস্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মতানৈক্য ছিল সে গুলির মীমাংসা করেছেন। তিনি বিভিন্ন দেশের তৎকালীন বড় বড় আলেম ফকীহ সমন্বয়ে সর্বসাধারণের বোধগম্য একটি ফতোয়ার কিতাব রচনার জন্য বোর্ড গঠন করেন। উক্ত বোর্ড ক্রমাগত কয়েক বছর প্রচেষ্টা চালিয়ে রচনা করলেন ফতোয়ায়ে আলমগীরী। হিন্দুস্তানের তৎকালীন কাজীগণের আদালতে এটাই ছিল প্রধান আইন গ্রন্থ।

রাজ্যের সর্বত্র ইসলামী বিধান জারীর প্রচেষ্টা চালিয়ে ছিলেন সম্রাট আওরঙ্গজেব। তার নিযুক্ত শাসন কর্তাগণ যাতে কোন প্রকার ইসলাম বিরোধী কাজ এবং এমন কোন কাজে অংশ গ্রহণ করতে না পারে, যাতে মুসলমানদের ইসলামী জীবন যাপনের ক্ষেত্রে কোন প্রকার বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে পারে, সে দিকে তিনি তীক্ষè দৃষ্টি রাখতেন।

আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর তার অযোগ্য উত্তরাধিকারীদের হাতে মোগল সাম্রাজ্য ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়, সাথে সাথে তার সংস্কারধর্মী কর্মকাণ্ডও স্তব্ধ হয়ে যায়।