শহীদ শরিফ ওসমান হাদী (রাহি.) একটি নাম ও একটি ইতিহাস; এক ক্ষণজন্মা কালজয়ী ব্যক্তিত্ব। তিনি দেশ, জাতি, মূল্যবোধ ও ইনসাফের জন্য যা করে গেছেন তা ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ওসমান হাদী শাহাদাতের নজরানা পেশের মাধ্যমে প্রমাণ করে গেছেন সত্য কখনো মুছে যায় না; মৃত্যু নেই বিপ্লবীরও। তিনি ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে যে দ্রোহের স্ফূলিংগ জালিয়ে গেছেন, তা কখনো কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার নয়। এ কালজয়ী জাতীয় বীরের আগমন ঘটেছিলো ঠিক ধুমকেতুর মতই, আবার অন্তর্ধানও ছিলো বেশ কাকতালীয়ভাবে একই কায়দায়। তিনি হাসিমুখে শাহাদাতকে বরণ করে নিয়েছেন, আর কেঁদেছে মানবতা। কিন্তু অতিঅল্প সময়ের মধ্যে তিনি আমাদের জন্য যে আলোর মশাল জালিয়ে গেছেন, তা কখনো নির্বাপিত হবার নয় বা হবেও না। মূলত, তিনি ঘুমন্ত ও আত্মভোলা জাতিকে জাগ্রত করার জন্য নকীবের ভূমিকা পালন করে গেছেন। কবির ভাষায়, ‘এমন জীবন তুমি করিবে গঠন, মরণে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভূবন’। কবির এ কাব্যিক দ্যোতনার বাস্তব রূপ দিতে পুরোপুরি সক্ষম হয়েছেন নতুন প্রজন্মের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ শরীফ ওসমান হাদী।
ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদ বিরোধী শহীদ ওসমান হাদী ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায় এক সম্ভ্রান্ত মুসিলম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন ১৯৯৩ সালে। শহীদের পিতা মাওলানা শরীফ আব্দুল হাদী। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন, মাদরাসা শিক্ষক ও স্থানীয় ইমাম। ৩ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে হাদী সর্বকনিষ্ঠ। হাদীর বড় ভাই ড. মাওলানা আবু বকর সিদ্দিক ও মেজো ভাই নাম মাওলানা ওমর ফারুক। হাদী তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু করেন নলছিটি ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসা থেকে। সেখান থেকে তিনি তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। চতুর্থ শ্রেণিতে তিনি ঝালকাঠি এন এস কামিল মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে তিনি আলিম সম্পন্ন করে পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হোন। সেখান থেকে তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। হাদী ইংরেজি শেখার প্রতিষ্ঠান সাইফুর্সের শিক্ষক ছিলেন এবং ইউনিভার্সিটি অব স্কলার্স নামক একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকতা করেন। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তিনি রামপুরা এলাকার সমন্বয়ক ছিলেন। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে হওয়া আন্দোলনে হাদীকে অন্যতম তরুণ নেতৃত্বদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার অভিজ্ঞতা ও দাবির ভিত্তিতে গঠিত সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ইনকিলাব মঞ্চ শরিফ ওসমান হাদীর হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়। সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য হলো সকল সম্প্রসারণ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষা এবং ‘ইনসাফভিত্তিক’ একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠন; যেখানে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ও ন্যায়বিচার প্রধান মূল্যবোধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে। এসবই ছিল শহীদ হাদীর আমৃত্যু লালিত স্বপ্ন। কিন্তু তিনি লক্ষ্যে আপসহীন থাকলেও সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে যেতে পারেন নি।
শহীদ হাদীর নেতৃত্বে ইনকিলাব মঞ্চ গঠনের পর জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি রক্ষা, অপরাধীদের বিচার, আহত-নিহত ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং জুলাই চার্টার ঘোষণার দাবি তুলেন হাদী। যা তাকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। শরিফ ওসমান হাদী ছিলেন একজন সাহসী জুলাই যোদ্ধা ও সাচ্চা দেশপ্রেমিক; ফ্যাসিবাদ, মাফিয়াতন্ত্র ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার কন্ঠ। তিনি অন্যায়ের কাছে কখনো মাথা নত করেননি। তার কণ্ঠ ছিল সকল সম্প্রসারণবাদী শক্তি ও অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে অবিচল। সর্বোপরি তিনি ছিলেন আপসহীন এক যোদ্ধা। দুনিয়ার কোনো লোভ-লালসা তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। শহীদ ওসমান হাদী গত ডিসেম্বর রাজধানীতে নির্বাচনী প্রচারণাকালে আততায়ীর হাতে গুলীবিদ্ধ হন এবং সিংগাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাতে শাহাদাত বরণ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
মূলত, শহীদ ওসমান হাদী মানবিক নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখতেন। ন্যায়, সত্য ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যা তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তার শাহাদাতের মধ্য দিয়ে দেশ ও জাতি একজন নির্ভীক, দেশপ্রেমী, আদর্শবাদী আপসহীন যোদ্ধাকে হারিয়েছে। হাদীর শাহাদাতে জাতীয় জীবনে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে তা সহজেই পুরণীয় নয়। তাই দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই তার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর, আদর্শ, চেতনা ও মূল্যবোধ নতুন প্রজন্মকে ধারণ করতে হবে এবং দলমত নির্বিশেষে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় আমাদের স্বাধীনতা-স্বার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা নির্বিঘ্ন হবে না। নতুন করে হাদীদেরও জন্ম হবে না।
দেশ, জাতি ও ইনসাফের জন্য অবদান শহীদ শরিফ ওসমান হাদীকে জাতীয় বীরের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। তিনি বিপ্লবী রক্তে উজ্জীবিত প্রতিবাদের এক আইকন ছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন অন্তবর্তী সরকারর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। যা একজন সরকার প্রধানের পক্ষ থেকে শহীদের জন্য এক বিরল সম্মান। প্রধান উপদেষ্টার ভাষায়, কর্মের মধ্য দিয়ে শুধু প্রতিবাদ নয়, দেশপ্রেম, ধৈর্য ও দৃঢ়তার অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন হাদী। তিনি জাতির উদ্দেশ্যে তার ভাষণে বলেন, ‘প্রিয় দেশবাসী। আমি আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক একটি সংবাদ নিয়ে। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখভাগের অকুতোভয় যোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদী আর আমাদের মাঝে নেই। ওসমান হাদীর অকাল মৃত্যুতে আমি গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করছি। তার প্রয়াণ দেশের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক পরিসরে এক অপূরণীয় ক্ষতি। আমি তার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত স্ত্রী, পরিবারের সদস্য, স্বজন ও সহকর্মীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। শহিদ ওসমান হাদীর স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানের দায়িত্ব সরকার গ্রহণ করবে’।
আমরা এখন গণতান্ত্রিক উত্তরণের চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়েছি উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, ‘শহিদ হাদী ছিলেন এ প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার একান্ত ইচ্ছা ছিল আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের পরবর্তী ধাপে সক্রিয় ভূমিকা রাখা। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, তার এ মহতী ইচ্ছা অপূর্ণ রয়ে গেল। তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায় আজ সমগ্র জাতির কাঁধে ন্যস্ত। আগামী দিনগুলোতে আমাদের সবাইকে ধৈর্য, সংযম, সাহস ও দূরদর্শিতার সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে, যাতে নির্বাচন ও গণতন্ত্রের শত্রু ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসী অপশক্তিকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করা যায়’।
মূলত, ওসমান হাদী একটি স্বপ্ন ও আদর্শের নাম। আসলে স্বপ্নের কোন মৃত্যু নেই। আর বিপ্লবীদের কখনো মৃত্যু হয় না। কারণ, বিপ্লবীরা স্বপ্নদ্রষ্টা। আর্ত-মানবতার উজ্জ্বল জীবনের স্বপ্ন বাস্তব করে তুলতে তারা জীবন উৎসর্গ করেন। স্বপ্নদ্রষ্টা ওসমান হাদীর শাহাদাত শুধু শারীরিক প্রস্থান মাত্র। তার কর্ম, স্বদেশ চিন্তা এবং মূল্যবোধ অম্লান হয়ে থাকবে চিরদিনের জন্য।
বস্তুত, শহীদ ওসমান হাদী ছিলেন সদ্য প্রষ্ফুটিত এক গোলাপ; টগবগে যুবক; লক্ষ্যে অবিচল এক আত্মপ্রত্যয়ী তরুণ। তিনি সব সময় তারুণ্যের জয়গান করে গেছেন। মূলত, যুব সমাজই হচ্ছে জাতির গৌরব ও ভবিষ্যৎ আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক। কারণ, পৃথিবীতে বড় বড় অর্জন এসেছে যুব সমাজের হাত ধরেই। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ, ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ জুলাই বিপ্লবও হয়েছে যুব সমাজের নেতৃত্বেই। আর তরুণ প্রজন্মই হচ্ছে প্রত্যেক জাতির উন্নতি ও অগ্রগতির সোপান, জাতির মূল্যবান সম্পদ এবং দেশ গড়ার শ্রেষ্ঠ অবলম্বন। ইসলাম এ সম্পদের যথাযথ সংরক্ষণে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। যুবকদের নৈতিকতার উন্নয়ন, স্বাস্থ্য সংরক্ষণ, পরিশীলিত মনন ও বলিষ্ঠ চিন্তাধারায় সমৃদ্ধকরণে ইসলামের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে, সে আলোকে কাজ করে গেছেন মহানবী (সা.)। আদর্শ সংগঠন প্রতিষ্ঠায় মহানবী (সা.)-এর সফল ভূমিকা ও সুনিপুণ কর্মধারা যুবকল্যাণ প্রত্যাশীদের অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন যুব সমাজ গঠনে রাষ্ট্র বা সমাজের কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেই। তাই তরুণদের মধ্য থেকে আমরা যোগ্য ও মূল্যবোধ সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব খুব একটা পাচ্ছি না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে শহীদ ওসমান হাদী একটি অসাধারণ ব্যতিক্রমী চরিত্র। তিনি শ্রোতের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে রাষ্ট্রের যে বৈপ্লবিক পরির্বতন ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেকে যেভাবে বিলিয়ে দিয়েছেন, তা সাম্প্রতিক ইতিহাসের পাতায় কালেভদ্রেও দেখা যায় না।
মূলত, ইতিহাসে যুবকরাই সর্বোত্তম ও অতুলনীয় যুবসমাজ উপহার দিতে সক্ষম হয়েছেন। আর এ জন্য তাদেরকে অনেক ত্যাগ ও কুরবানীর নজরানা পেশ করতে হয়েছে। সে বীরত্বের প্রতীক আম্মার ইবনে ইয়াসার, হিজরত ও দাওয়াতের আদর্শ মাসআব ইবনে উমাইর, নেতৃত্ব ও পরিচালনার বিস্ময়কর উদাহরণ উসামা ইবনে যায়েদ এবং ইলম ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)। এসব নিষ্ঠাবান তারুণ্যের তেজে পাল্টে গেছে ইতিহাসের গতিধারা, ধূলোয় মিশে গেছে বাতিলের রাজমুকুট, জুলুম ও অত্যাচারের আঁধার দূরীভূত হয়ে পৃথিবীব্যাপী বয়ে গেছে ইনসাফ ও ন্যায়ের ফল্গুধারা এবং উন্মোচিত হয়েছে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের নবদিগন্ত। শহীদ ওসমান হাদী ছিলেন তাদেরই যোগ্য উত্তরসূরি।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় যুবসমাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছে। পৃথিবীতে মানুষের স্বাভাবিক জীবন প্রবাহের ধারাকে মোটামুটি তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়। শৈশব, যৌবন ও বার্ধক্য। এ তিনকালের মধ্যে সকল বিবেচনায় যৌবনকাল হলো শ্রেষ্ঠ। শৈশবে মানুষ থাকে অসহায় ও পরনির্ভর। পিতা-মাতা ও অন্যের সহযোগিতা ব্যতীত সে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না এবং এ সময় তার কোনো চিন্তার সুষ্ঠু বিকাশ ঘটে না। অনুরূপভাবে বার্ধক্যেও সে অসহায় দুর্বল ও পরনির্ভর হয়ে পড়ে। মনের ইচ্ছা থাকলেও সে সবকাজ সঠিকভাবে সম্পাদন করতে পারে না। এমনকি চিন্তাশক্তির বিলোপ পর্যন্ত ঘটে থাকে। কিন্তু যৌবনকাল এ দু’য়ের ব্যতিক্রম। যৌবনকালে মানুষ অসাধ্য সাধনে আত্মনিয়োগ করতে পারে। অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিতে পারে। এটাই যৌবনের ধর্ম।
রাসূলুল্লাহ (সা.) যৌবনকালকে গণিমতের মাল তথা মূল্যবান সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করে তা মূল্যায়ন করার তাগিদ দিয়েছেন। কারণ, এ সময় সম্পর্কে পরকালে জবাবদিহি করতে হবে। এ প্রসঙ্গে হাদীসে রাসূল (সা.)-এ বলা হয়েছে, আমর ইবনু মায়মুন আল আওদি (রা.) বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) জনৈক ব্যক্তিকে উপদেশস্বরূপ বলেন, পাঁচটি বস্তুর পূর্বে পাঁচটি বস্তুকে গণিমত মনে করো। যথা-১. তোমার বার্ধক্য আসার পূর্বে যৌবনকে, ২. পীড়িত হওয়ার পূর্বে সুস্বাস্থ্যকে, ৩. দারিদ্র্যতার পূর্বে সচ্ছলতাকে, ৪. ব্যস্ততার পূর্বে অবসরকে ও ৫. মৃত্যুর পূর্বে জীবনকে। (তিরমিজি)
বর্তমান সমাজের বাস্তবতা হলো, আমরা আমাদের যুব-তরুণদের দ্বীন ও ইসলামের বিভিন্ন বিষয় থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সুকৌশলে যুবকদের ইসলাম সংক্রান্ত বিষয় থেকে দূরে রাখা হয়। এ ক্ষেত্রে তরুণ-যুবকদের সামনে তুলে ধরা হয়, যৌবনকাল হচ্ছে এনজয় করার সময়। আর যদি কোনো যুবক ইসলাম নিয়ে অধ্যয়ন করতে চায়, ইসলাম সম্পর্কে মানুষকে দাওয়াত দিতে চায় তাহলে তাকে উৎসাহদানকারীর চেয়ে নিরুৎসাহিতকারীর সংখ্যাই সমাজে বেশি দেখা যায়। তাকে বলা হয় আরে রাখো, ধর্মকর্ম তো বার্ধক্যের জন্য। আগে কিছুদিন আনন্দ-ফুর্তি করো। নিজের ক্যারিয়ার গড়ো। আর এসব ভ্রান্তচিন্তা আসার ও ভিত্তিহীন প্রমাণ করে গেলেন শহীদ ওসমান হাদী।
মূলত, ইসলাম মানবজীবনের সবচেয়ে বেশি মূল্যবান সময় নির্ধারণ করেছে যৌবনকালকে। প্রতিটি মানুষের যৌবনকাল হচ্ছে ইসলামের দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। হাদীসে রাসূল (সা.)-এ বর্ণিত হয়েছে, ‘কিয়ামতের দিন কোনো বনি আদমই পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে এক কদম আগে বা পিছে নড়ার অনুমতি পাবে না। এর মধ্যে প্রথম প্রশ্ন হবে তার জীবন সম্পর্কে, কোথায় সে এটি ব্যয় করেছে। দ্বিতীয় প্রশ্ন করা হবে তার যৌবনকাল সম্পর্কে, কী কাজে সে যৌবনকাল ব্যয় করেছে। তৃতীয় প্রশ্ন-সম্পদ কীভাবে উপার্জন করা হয়েছে। চতুর্থ প্রশ্ন-উপার্জিত সম্পদ কোন কাজে এবং কোথায় ব্যয় করেছে। পঞ্চম ও শেষ প্রশ্ন- যেসব বিষয়ে সে জ্ঞানার্জন করেছিল তার কতটুকু আমল করেছে।’ (সহিহ বোখারি)।
ইতিহাস সাক্ষী, তাকওয়াবান যুবকদের দ্বারা পৃথিবী উপকৃত হয়েছে এবং পৃথিবীতে উত্তম আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আবার পথভ্রষ্ট যুবকদের দ্বারা পৃথিবীর বহু সভ্যতা ধ্বংস হয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাকওয়াবান যুবকদের নিয়ে বদর, ওহুদ, খন্দক ও তাবুকসহ অন্যান্য যুদ্ধে বিজয়লাভ করেছেন। চীন বিপ্লব, ফরাসি বিপ্লব এবং বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতার যুদ্ধে লাখ লাখ যুবকের আত্মত্যাগ ও ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে আছে।
বস্তুত, যৌবনকাল মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এ সময়ের ইবাদতের মর্যাদাও বেশি। মহান আল্লাহ মানুষকে তাঁর এ বিশেষ নিয়ামত দিয়ে পরীক্ষা করেন। যাঁরা তাতে উত্তীর্ণ হন, তাঁরাই হোন সফলকাম। আর যাঁরা তা অবহেলা করবেন, তাঁরা ব্যর্থ। যে ব্যক্তি তাঁর যৌবনকে আল্লাহর ইবাদতে ব্যয় করবেন, কঠিন কিয়ামতের দিন তিনি মহান আল্লাহর আরশের ছায়াতলে আশ্রয় পাবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ সাত ব্যক্তিকে তাঁর (আরশের) ছায়ায় স্থান দেবেন; যেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না। তাদের মধ্যে ওই যুবক, যাঁর যৌবন অতিবাহিত হয় আল্লাহর ইবাদতে। (বুখারি: ৬৬০; মুসলিম: ১০৩১)
যৌবনের উদ্যম ও শক্তিকে সঠিক পন্থায়, সঠিক কাজে ব্যয় করা হলে সুষ্ঠু ও সুন্দর সমাজ গড়ে ওঠে। যুব সমাজ সুসংহত হলে গোটা জাতি সুসংহত হয়, তাঁরা পথ হারালে গোটা জাতিই পথ হারায়। আর সে কথা সার্থকভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন শহীদ ওসমান হাদী সহ জুলাই যোদ্ধারা। তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়েই আমরা নতুন এক বাংলাদেশ পেয়েছি। এখন আমরা ন্যায়-ইনসাফের সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখি। আর শহীদ হাদী ছিলেন সে স্বপ্নের সার্থক রূপকার।
শহীদ ওসমান হাদী ছিলেন একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম বিপ্লবী এবং নতুন প্রজন্মের বীর শ্রেষ্ঠ। তিনি সরাসরি ইসলামের কথা না বললেও তার সকল কথার মধ্যেই ছিলো ইসলামী আদর্শের ছাপ। তিনি ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সব সময় ছিলেন আপসহীন। শহীদ হাদী দেশের স্বাধীনতা-স্বার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমাদেরকে লড়াই করার তালিম দিয়েছেন। সর্বোপরি তিনি ছিলেন ন্যায়-ইনসাফের প্রবক্তা। তিনি সব সময় শাহাদাতের চেতনায় উজ্জীবিত ছিলেন। আর এসব ছিলো ইসলামী আদর্শ ও চেতনার অংশ। তাই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার শাহাদাত কবুল করে নিয়েছেন। তিনি যেমন আল্লাহর প্রতি সন্তষ্ট ছিলেন, ঠিক তেমনিভাবে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাকে শাহাদাতের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন। পবিত্র কালামে হাকীমের মহাঘোষণা, ‘হে প্রশান্ত আত্মা! ফিরে এসো তোমার প্রভূর কাছে সন্তষ্ট চিত্তে এবং তাঁর সন্তোষভাজক হয়ে, আর প্রবেশ করো আমার অনুগত বান্দাদের মধ্যে এবং প্রবেশ করো আমার জান্নাতে’। (সূরা-৮৯, ফজর, আয়াত-২৭-৩০)
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন শহীদ ওসমান হাদীকে প্রশান্ত আত্মা হিসাবে কবুল করুন-আমীন। | www.syedmasud.com