প্রায় ১৬ বছরের আওয়ামী অপশাসন-দুঃশাসনে রাষ্ট্রীয় কাঠামোগুলো পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছে। তখন দেশে আইনের শাসন বলতে কিছু ছিলো না বরং সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয়েছে এক ব্যক্তির হাতে। তিনি যা বলতেন সেটাকেই আইন বলে ধরে নিয়ে তা কার্যকর করা হতো। পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয় দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দলীয়করণ করা হয় রাষ্ট্রের সকল অঙ্গসংগঠনকে। বিশেষ করে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। উন্নয়নের নানা গালগল্প শোনানো হলেও এর মধ্যে রয়েছে বড় ধরনের শুভঙ্করের ফাঁকি। মূলত, আওয়ামী আমলের কথিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ছিলো ১৮ লাখ কোটি টাকা ঋণের বোঝা জাতির ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে উন্নয়নের বায়বীয় গল্প এবং লাগামহীন পুঁজি লুণ্ঠন ও বিদেশে অর্থ পাচারের এক কালো অধ্যায়।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের তথ্যমতে, (৭ আগস্ট ২০২৪, দৈনিক বণিক বার্তা) ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক মোট ঋণের স্থিতি ছিলো ১৮ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। অথচ ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি শেখ হাসিনা ক্ষমতা গ্রহণের দিনে সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল মাত্র ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। ফলে দু’ঋণের স্থিতির অঙ্কের পার্থক্য দাঁড়ায় ১৫ লাখ ৫৮ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। গত ৫ আগস্ট পালিয়ে যাওয়ার আগে শেখ হাসিনা এ বিশাল ১৮ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার ঋণের বোঝা দেশের মানুষের ওপর চাপিয়ে প্রতিবছর মাথাপিছু জিডিপির উচ্চ প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছিলেন। ফলে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রতিজন বাংলাদেশির মাথার ওপর এক লাখ টাকার বেশি ঋণ নিজেদের অজান্তেই চেপে বসেছে। তাই কমপক্ষে আগামী এক দশক ধরে দেশের অর্থনীতি বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে ডুবে থাকবে এ বিশাল অঙ্কের ঋণের সুদাসলে কিস্তি পরিশোধের দায় মেটানোর কারণে। এমতাবস্থায় সহসাই জাতীয় অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানো কল্পনা বিলাস বৈ কিছু নয়।
একথা কারো অজানা নয়, পতিত আওয়ামী স্বৈরাচারী সরকার বিগত প্রায় ১৬ বছরে দেশকে দুর্নীতি ও লুটপাটের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছিলো। দেশ থেকে বিদেশে পাচার করা হয়েছিলো লাখ লাখ কোটি টাকা। কানাডায় বেগম পাড়া সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবৈধ সম্পদের পাহাড় জমানো হয়। এসব লুটেরাদের সিংহভাগই ছিলো সরকার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী এবং রাজনীতিবিদ ও দুর্নীতিবাজ আমলা। শেখ হাসিনার পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং আওয়ামী ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরাই শুধু নয়, আওয়ামী লীগের প্রায় সব মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, উচ্চস্তরের নেতা-কর্মী এমনকি স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মীরাও আওয়ামী লীগের সাড়ে পনেরো বছরে কোনো না কোনোভাবে দুর্নীতি, পুঁজি লুণ্ঠন ও পুঁজি পাচারে জড়িয়ে গিয়েছিল। এক নম্বর সমস্যায় পরিণত হয়েছিল পুঁজি পাচার। তারপরও বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিলো জিডিপি হার। আন্তর্জাতিক একটি গবেষণা সংস্থা তদানীন্তন সরকারের দাবির বিপরীতে তথ্য দিয়ে বলেছে, প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের মোট জিডিপি বর্তমানে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের আশপাশে অবস্থান করছে। নিক লিয়া নামের এক গবেষক দাবি করেছেন, বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু জিডিপি প্রকৃতপক্ষে ১৭৯৪ ডলার। যা ভয়াবহ অর্থনৈতিক অনিয়মের কথায় স্মরণ করিয়ে দেয়।
গত বছরের নভেম্বরে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান দাবি করেছিলেন যে, গত দশ বছরের প্রত্যেক বছর বিভিন্ন পন্থায় দেশ থেকে বিদেশে ১২ বিলিয়ন ডলার থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়ে গেছে। এসব পাচারের সাথে সরকার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও সরকারি দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরাই জড়িত। শ্বেতপত্র কমিটির গবেষণায় উঠে এসেছে, সাবেক স্বৈরশাসক হাসিনার সাড়ে পনেরো বছরের লুটপাটতন্ত্রের মাধ্যমে প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার হিসেবে মোট ২৩৪ বিলিয়ন ডলার লুণ্ঠিত হয়ে দেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি লুণ্ঠনের শিকার হয়েছে ব্যাংকিং ও ফিন্যান্সিয়াল খাত। তারপর জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত, তারপর ভৌত অবকাঠামো খাত এবং এরপর তথ্যপ্রযুক্তি খাত। শ্বেতপত্রে খাতওয়ারি লুণ্ঠনের তথ্য-উপাত্ত উদ্ঘাটন করে লুণ্ঠিত অর্থের প্রাক্কলন প্রকাশ করা হয়েছে। শ্বেতপত্রে ২৮টি দুর্নীতির পদ্ধতির মাধ্যমে লুণ্ঠনপ্রক্রিয়াকে বিশ্লেষণে নিয়ে আসা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং, ভারত এবং কয়েকটি ‘ট্যাক্স হেভেন’ সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচারের সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
সর্বোপরি সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী মুস্তফা কামালের নির্দেশে ২০১৪ সাল থেকে ‘ডেটা ডক্টরিং’ এর কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর জিডিপি বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। একই সাথে মাথাপিছু জিডিপি বাড়িয়ে দেখানোর জন্য দেশের মোট জনসংখ্যাকে কমিয়ে দেখানো হয়েছে। দেশের রপ্তানি আয়কে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। মূল্যস্ফীতির হারকে সব সময় কম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারী জনসংখ্যাকে কম দেখানো হয়েছে, যাতে দারিদ্র্য নিরসনে সরকারের সাফল্যকে বাড়িয়ে দেখানো যায়। দেশের জনগণের জন্মহার ও মৃত্যুহার সম্পর্কে ভিত্তিহীন তথ্য দেয়া হয়েছে, যাতে জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধির হারকে কৃত্রিমভাবে কমিয়ে দেখানো যায়। একই সাথে দেশের ‘টোটাল ফার্টিলিটি রেটকে’ কম দেখানো হয়েছে, যাতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সরকার সফল হচ্ছে প্রচার করা যায়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি আয় আগের বছরে সাবেক সরকার যতখানি দেখিয়েছিল তার চাইতে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার কমে গেছে। দেশের জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির হার ১.৩ শতাংশে নেমে গেছে বলে সাবেক সরকার দাবি করলেও তা প্রকৃতপক্ষে আরও বেশি। দারিদ্র্যসীমার নিচে জনসংখ্যার হার ১৮ শতাংশে নেমে গেছে বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে এই হার অনেক বেশি।
শেখ হাসিনা জাতীয় অর্থনীতিকে যেভাবে ধ্বংস করে দিয়ে গেছেন তাতে জনগণের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের বিপর্যয় যাতে নেমে না আসে তা নিশ্চিত করার প্রাণপণ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু যে ২৩৪ কোটি ডলার লুণ্ঠিত হয়ে বিদেশে পাচার হয়ে গেছে বলা হচ্ছে, তার ক্ষুদ্রাংশও আর দেশে ফেরত আনা যাবে না বলেই সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে অনেকগুলো সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু কাক্সিক্ষত সাফল্যের গতি এখনো অধরায় রয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী দু’তিন মাসে হয়তো মূল্যস্ফীতিকেও অনেকটা সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা যাবে। কিন্তু জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বর্তমান অর্থবছরে ৪ শতাংশেও উন্নীত করা যাবে কি না তা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে একথা ঠিক যে, অন্তর্বর্তী সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় এক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে। পতনের আগে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার দাবি করেছিলো যে, বাংলাদেশের মোট জিডিপি ৪৫০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। ইতিমধ্যেই বিদেশি একটি গবেষণা সংস্থা এ দাবির বিপরীতে বক্তব্য রেখেছে যে, প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের মোট জিডিপি বর্তমানে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের আশপাশে অবস্থান করছে। নিক লিয়া নামের এক গবেষক দাবি করেছেন, বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু জিডিপি প্রকৃতপক্ষে ১৭৯৪ ডলার।
এখানেই শেষ নয় বরং শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে ব্যাংক খাতে নজিরবিহীণ ঋণ কেলেঙ্কারি, লুটপাট ও টাকা পাচারের ঘটনা ঘটেছে। যা জাতীয় অর্থনীতিকে একেবারে প্রান্তিকতায় নেমে দিয়েছে। সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতে এর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ব্যাংকগুলো সম্মুখীন হয়েছে তীব্র চাপে। তারল্য সংকটে পড়েছে অনেক ব্যাংক। চাহিদা অনুযায়ী আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না এবং ঋণ পাচ্ছেন না উদ্যোক্তারা। যা পুরো ব্যাংক খাতকেই নৈরাজ্যের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
একথা বলতে দ্বিধা নেই যে, জালিয়াতি ও উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা কমায় ঋণ আদায় কমেছে। রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন ঘাটতি। সুদ থেকে ব্যাংকগুলোর নিট আয় কমেছে। ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে চাহিদা অনুযায়ী মূলধনের জোগান দিতে না পারায় ঘাটতি বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণে। এতে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ বেড়েছে। কমেছে মোট সম্পদ। সবমিলিয়ে ব্যাংক খাতে মূলধন সংরক্ষণের হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। যা ব্যাংক খাতের অচলাবস্থাকে রীতিমত স্পষ্ট করে তুলেছে-এমন ভয়াবহ তথ্যই প্রদান করা হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বার্ষিক ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন ২০২৪’-এ।
অতিসম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে দেশের সার্বিক অর্থনীতি, ব্যাংক খাত, ফাইন্যান্স কোম্পানিসহ অন্যান্য আর্থিক খাতের ঝুঁকির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৪ সালের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। ওই সময়ের তথ্যের আলোকে নানা খাতের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মন্তব্য করেছে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লুটপাটের চিত্র ইতোমধ্যে বেশ কিছু প্রকাশিত হয়েছে; যা অব্যাহত আছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ২০২৪ সালের তুলনায় পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হয়নি বরং কোনো কোনো খাতে অবনতি ঘটেছে। লুটপাটের ঋণ এখন খেলাপি হওয়ায় খেলাপি ঋণ পাগলা ঘোড়ার গতিতে বাড়ছে। কিন্তু এর বিপরীতে ব্যাংকগুলোর আয় বাড়ছে না। কারণ জালিয়াতির ঋণের টাকা ফেরত আসছে না। সেগুলোর বড় অংশই পাচার হয়ে গেছে। এগুলো এখন খেলাপি হচ্ছে। ফলে ব্যাংকগুলোর আয় কমেছে। একই সাথে বেড়েছে ব্যয়। ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের পরিমাণ কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে আয় বাড়ানোর পদক্ষেপও নিতে পারছে না। তবে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংক খাত সংস্কারের একগুচ্ছ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তিনটি টাস্কফোর্স কাজ করছে। তাদের নেওয়া নানা পদক্ষেপের ফলে সুশাসন ফিরতে শুরু করেছে। তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।
সরকারের আন্তরিকতায় বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বেড়েছে। টাকা পাচার ও লুটপাট বন্ধ হওয়ায় ব্যাংকগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছে। তবে তা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালে ব্যাংকিং খাত তীব্র চাপের সম্মুখীন হয়েছিল। বিশেষ করে খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি, প্রভিশন ঘাটতি ও মূলধন সংরক্ষণের দিক থেকে এই চাপ তৈরি হয়েছিল। এতে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে মূলধন পর্যাপ্ততার ক্ষেত্রে বা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে মূলধন রাখার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় পৌঁছে। খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি, খরচ বাড়া ও আয় কমায় ব্যাংকগুলোর মূলধন সংরক্ষণের হার স্মরণকালের মধ্যে সর্বনিম্ন পৌঁছে। গত বছরের ডিসেম্বরে ব্যাংক খাতে মূলধন সংরক্ষণের হার ছিল মাত্র ৩ দশমিক ০৮ শতাংশ। যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ব্যাংকগুলোকে কমপক্ষে ১০ শতাংশ মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। ঝুঁকিমুক্ত থাকতে কমপক্ষে ১২ শতাংশ মূলধন রাখতে হয়। সেখানে বর্তমানে ব্যাংকগুলোর মূলধন রয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ০৮ শতাংশ। যা ন্যূনতম প্রয়োজনের তুলনায় ৬ দশমিক ৯২ শতাংশই কম।
মূলত, ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বাড়লে, আয় কমে গেলে, প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে গেলে বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ কমে যায়। ফলে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। এতে আগামীতে আয় কমার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। ব্যাংকের সম্পদ কমতে থাকে। সম্পদের মানও কমে যেতে থাকে। তখন মূলধন ঘাটতি বেড়ে যেতে থাকে। এমন অবস্থা সৃষ্টি হলেই ভঙ্গুরতা হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। দেশের ব্যাংক খাতে এর চেয়ে খারাপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। যে কারণে এখনকার সূচকগুলোকে বিশ্লেষণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পদ্ধতিগত ভঙ্গুরতার সঙ্গে তুলনা করেছে ব্যাংক খাতকে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সরকারি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক এবং ইসলামিক ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর দুর্বল মূলধনের কারণে তাদের ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ বেড়ে গেছে। এ কারণে বেড়েছে ঝুঁকির মাত্রাও। বাংলাদেশে ২০২০ সালে ব্যাংকগুলোর মূলধন সংরক্ষণের হার ছিল ১১ দশমিক ৬০ শতাংশ, করোনার নেতিবাচক প্রভাবে ২০২১ সালে তা সামান্য কমে মূলধন সংরক্ষণের হার দাঁড়ায় ১১ দশমিক ০৮ শতাংশ। ২০২২ সালে করোনার ধাক্কা কিছুটা কাটিয়ে ওঠলে ব্যাংকগুলোর মূলধন রাখার হার কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশে। বৈশ্বিক মন্দার ধাক্কায় এ হার আবার কিছুটা কমে ২০২৩ সালে দাঁড়ায় ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ওই সময়ে ব্যাংক খাতের প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করা হতো না বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ব্যাংক খাতে লুটপাটের প্রকৃত তথ্য বের হয়ে আসতে থাকে। এতে খেলাপি ঋণ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। সঙ্গে প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতিও বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর মূলধন রাখার হার বেড়ে যায়। কিন্তু অর্থ সংকটে ব্যাংকগুলো চাহিদা অনুযায়ী মূলধন রাখতে পারেনি। ফলে এ হার কমে স্মরণকালের সর্বনিম্ন অবস্থান করে অর্থাৎ ৩ দশমিক ০৮ শতাংশ। এ হার চাহিদার তুলনায় যেমন অনেক কম, তেমনি দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায়ও বেশ কম।
২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার মূলধন রাখার হার বেড়েছে। শ্রীলংকা অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হলেও, ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ বেড়ে দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষে ওঠলেও তাদের মূলধন রাখার হার ১৭ শতাংশ থেকে কমে ১৬ শতাংশে নেমেছিল। ২০২৩ সালেই দেশটি আবার ঘুরে দাঁড়ায়। যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে কমপক্ষে ১০ শতাংশ মূলধন রাখতে হয়, সেখানে বর্তমানে শ্রীলংকার মূলধন রয়েছে ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ। তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে থেকেও পাকিস্তানের ব্যাংক খাতে মূলধন সংরক্ষণের হার ২০ দশমিক ৬০ শতাংশ। ভারতে এ হার ১৬ দশমিক ৭০ শতাংশ।
পতিত সরকারের আমলে সরকারি খাতের দু’টি ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংকগুলো বিশেষভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে এসব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বেড়ে ৪ দশমিক ৯৫ শতাংশে নেমে এসেছে। খেলাপি ঋণ ২৩ দশমিক ১৮ শতাংশে ওঠেছে। এখন এটি আরও বেড়েছে। ফলে ব্যাংকগুলো বাধ্য হয়ে চড়া সুদে আমানত নিয়েছে। ফলে এদের তহবিল ব্যয় বেড়েছে। এতে আয় কমেছে। ফলে সম্পদ বা ঋণ বা বিনিয়োগ থেকে আয় কমে গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে ব্যাংকগুলোর ঋণ ঝুঁকির মাত্রাও বেড়েছে। ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা জামানতের মান হ্রাস পেয়েছে। ব্যাংকগুলোর করপোরেট খাতেই বেশি ঋণ বিতরণ করেছে। এ খাতে বিতরণ করা ঋণের ৬৮ দশমিক ২২ শতাংশই ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে পরিণত হয়েছে। যা ব্যাংকগুলোর জন্য ঝুঁকির মাত্রা বৃদ্ধি করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বার্ষিক ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বেশি মাত্রায় বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ ব্যাংকগুলোকে আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। শীর্ষ দু’টি বড় অঙ্কের ঋণগ্রহীতা খেলাপি হলে মূলধন পর্যাপ্ততার জন্য সবচেয়ে গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করবে। তারপরে জামানতের মান কমে গেলে ঝুঁকির মাত্রা আরও বেড়ে যাবে। যা নতুন করে বিপর্যস্ত করে তুলবে দেশের অর্থনৈতিক খাতকে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার পতিত স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া একটি বিপর্যস্ত অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। পতিত সরকারের আমলে আমাদের জাতীয় অর্থনীতি নিয়ে যে রূপকথার গল্প শোনানো হতো, তার সাথে বাস্তবতার কোন মিল নেই বরং উন্নয়নের কাসুন্দী শুনিয়ে ১৮ লাখ কোটি টাকার বৈদেশিক ঋণের বোঝা জাতির ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে পতিতরা এখন রীতিমত দেশান্তরী। উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালালেও দেশের অর্থনৈতিক সেক্টরে এখন পর্যন্ত শৃঙ্খলা ফিরে আনা সম্ভব হয়নি। এমতাবস্থায় দেশের বিপর্যস্ত অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে সরকারকে আরো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অপরাধীদের বিষয়ে দেখাতে হবে শূন্য সহনশীলতা। অন্যথায় জাতীয় অর্থনীতিকে ছন্দে ফেরানো সম্ভব হবে না।