আসিফ আরসালান
অবশেষে বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রাপ্ত ফলাফল মোতাবেক ২৯৯টি আসনের মধ্যে বিএনপি জোট পেয়েছে ২১২টি আসন, জামায়াতে ইসলামী জোট পেয়েছে ৮১টি আসন, ইসলামী আন্দোলন পেয়েছে ১টি আসন এবং অন্যান্যরা পেয়েছেন ৮টি আসন। গণভোটের ফলাফলে হ্যাঁ ভোট দিয়েছেন ৬৩.৬৪ শতাংশ এবং না ভোট দিয়েছেন ৩৬.৩৬ শতাংশ। এবারের নির্বাচনে গণভোটের গুরুত্ব যে কতো গুরুত্বপূর্ণ ছিলো সেটি সম্ভবত ভোটাররা সম্যক উপলব্ধি করতে পারেননি। পারলে ৩৬.৩৬ শতাংশের মতো বিশাল জনগোষ্ঠী না ভোট দিতে পারতেন না। গণভোটে না ভোট দেওয়ার অর্থ হলো সরকার যে সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছেন, জনগণের ৩৬.৩৬ শতাংশ সেসব সংস্কার প্রস্তাব সমর্থন করেন না। বলা বাহুল্য, জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে জনগণ সংস্কারের জন্য যেসব অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন সেসব অভিপ্রায় অন্তত এ ভোটের ফলাফলের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে, ৩৬.৩৬ শতাংশ জনগণ সেসব অভিপ্রায়ের সাথে একমত নন। স্মরণ করা দরকার যে, ৩৬.৩৬ শতাংশ জনগণ মোট জনগোষ্ঠীর এক তৃতীয়াংশেরও কিছু বেশি।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের যে ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে সে ফলাফলও একেবারে হান্ড্রেড পার্সেন্ট বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। এসম্পর্কে জামায়াতে ইসলামীর একটি প্রতিনিধি দল নির্বাচনের দিনেই নির্বাচন কমিশনে গিয়ে তাদের প্রতিবাদ জানিয়ে এসেছেন। কমিশন থেকে বেরিয়ে জামায়াতের প্রচার সম্পাদক এহসানুল মাহবুব জুবায়ের সাংবাদিকদের কাছে দলীয় মতামত ব্যক্ত করেছেন। আমরা একটু পরেই তার মতামত তুলে ধরবো। এছাড়া আমীরে জামায়াত নির্বাচনে কতগুলো কেন্দ্রের ফলাফল প্রকাশে অত্যধিক বিলম্ব এবং কতগুলি ফলাফল নির্বাচনী ওয়েবসাইটে একবার আপলোড করে কিছুক্ষণ পরেই সেগুলো ভ্যানিশ করে দেয়ার অভিযোগ তুলেছেন।
আমীরে জামায়াত আরো বলেছেন যে, এ নির্বাচনের যেসব ত্রুটি বিচ্যুতি রয়েছে সেগুলো তারা কম্পাইল করা বা সংকলন করছেন। তাদের পর্যবেক্ষণও তারা দেশবাসীর কাছে তুলে ধরবেন। তবে আমীরে জামায়াত বলেছেন যে তারা যে অবজার্ভেশনই দিন না কেনো এবং যেসব ত্রুটি বিচ্যুতিই তুলে ধরুন না কেনো সেগুলো হবে ইতিবাচক। জামায়াত নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই বলে আসছে যে, তারা দেশে একটি ইতিবাচক পলিটিক্যাল কালচার গড়ে তুলতে চান। তারা চান না যে কোনো অবস্থাতেই ফ্যাসিবাদি স্বৈরাচারী কালচার ফিরে আসুক।
জনগণ কিন্তু এবার ড. ইউনূসের ভাষায় উৎসব মুখর পরিবেশেই ভোট দিয়েছেন। ভোটের আগের দু’দিন ঘরে ফেরার জন্য ট্রেন বাস ও স্টীমারে ছিলো উপচে পড়া ভিড়। অনেকে বলেছেন যে, ঈদের সময়েও এত মানুষ দেশে যাননি। চলন্ত ট্রেনের ছাদের ওপর গাদাগাদি করে মানুষ ঘরে ফিরেছেন এবং ঐ চলন্ত অবস্থাতেই ছাদের ওপর স্লোগান দিয়েছেন। তবে ভোটের টার্ন আউট বা উপস্থিতি দেখে কিছুটা খটকা লেগেছে। কারণ ইতোপূর্বে একাধিক নির্বাচনে দেখা গেছে ভোটার উপস্থিতি ৭০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু এবার ভোটার উপস্থিতি ছিলো (শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত পত্র পত্রিকার রিপোর্ট মোতাবেক) ৫৯.৪৪ শতাংশ। অর্থাৎ ৬০ শতাংশেরও কম। এ সংখ্যাকে আমরা অবিশ্বাস করছি না। তবে বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটারের যে বিরাট লাইন দেখা গেছে সে তুলনায় ৫৯.৪৪ শতাংশ উপস্থিতি মেনে নিতে কষ্ট হয়।
জনগণ উৎসব মুখর পরিবেশে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু যে ফলাফল গণনা করা হয়েছে সে ফলাফলে কি প্রদত্ত ভোটের সঠিক প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হয়েছে? এটি নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। কোনটা সঠিক, আর কোনটি বেঠিক সেটি যথাসময়ে ধরা পড়বে। সংগ্রাম যেহেতু বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করে তাই আমরা জামায়াতের দুটি মতামত নিম্নে তুলে ধরছি।
জুলাই বিপ্লব সংঘঠিত হয়েছে ফ্যাসিবাদকে উৎখাত করে সাচ্চা গণতন্ত্র কায়েমের জন্য। আর সাচ্চা গণতন্ত্রের পূর্ব শর্ত হলো অবাধ তথ্য প্রবাহ। জামায়াত এবারের নির্বাচনে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। সুতরাং তার খবরাখবর সমস্ত পত্র-পত্রিকায় আসা উচিত ছিলো। নির্বাচনী ফলাফল সম্পর্কে জামায়াতের প্রচার সম্পাদক মাহবুব জুবায়ের এবং আমীরে জামায়াত যে বক্তব্য দিয়েছেন সেগুলোও সব গণমাধ্যমে আসা উচিত ছিলো। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে সেটি হয়নি।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের অভিযোগ করেছেন, “ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অস্বাভাবিক বিলম্ব করছেন। একাধিক আসনে ফলাফল পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে।” গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ভোর ৪টার দিকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি। এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, “ভোট গণনার কাজে নির্বাচন কমিশনের যারা জড়িত ছিলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তা, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং ইসির সদস্যরা, তারা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ক্ষেত্রে অস্বাভাবিকভাবে বিলম্ব করছেন। ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের আসন গুলোতে দায়িত্বরত এজেন্টদের কাছ থেকে পাওয়া শিট অনুযায়ী রাত ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে ফলাফল ঘোষণা করার কথা ছিল, কিন্তু তা হয়নি।”
তিনি দাবি করেন, কিছু আসনে প্রথমে যে শিটে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বাক্ষর করেছেন কিছু সময় পর সেটি পরিবর্তন করা হয়েছে। তার অভিযোগ, ঢাকা-১৭ আসনে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে এবং কমপক্ষে ৮টি আসনে একইভাবে পরিবর্তন আনা হয়েছে। জামায়াতের এ শীর্ষ নেতা বলেন, “কর্মকর্তারা ভুলের কথা বলে ফলাফল চেঞ্জ করেছেন এবং এসব আসনে কাটাকাটি করে পাঁচ হাজার ভোট কমানো হয়েছে একটি বিশেষ দলের প্রধানকে সুবিধা দেয়ার জন্য।” তিনি আরো অভিযোগ করেন, কেন্দ্রগুলোতে তাদের এজেন্টদের কথা বলতে দেয়া হয়নি। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে তারা প্রেস কনফারেন্স করেছেন এবং পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ঢাকার প্রায় সব আসনেই ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের ফলাফল ঘোষণায় গড়িমসি করা হয়েছে, বিশেষ করে ঢাকা-১৫ আসনের এমন প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “সেখানে জামায়াতের আমীর নির্বাচন করেছেন। ওই আসনে তিন লাখের কিছু বেশি ভোটার এবং ১১৯টি কেন্দ্র রয়েছে।” তার দাবি, বড় বড় আসনে দ্রুত ফলাফল ঘোষণা করা হলেও ওই আসনে এখনও ফলাফল দেয়া হয়নি। অথচ, এক প্রার্থী পাস করার দাবি করলেও তাদের হিসাবে ২০ হাজার ভোটে এগিয়ে আছেন জামায়াতের আমীর। তিনি অভিযোগ করেন, “একটি বিশেষ দলকে সুবিধা দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্টরা ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত। সারাদেশের আসন নিয়ে পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনায় একই ধরনের চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।”
এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এ বলে তার বক্তব্য শেষ করেন, “ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি, রক্ত দিয়েছি। ১৪০০ শহীদ হয়েছেন, এ ধরনের আরেকটি নতুন ফ্যাসিবাদ কায়েমের জন্য নয়। আমরা আগেও বলেছি ষড়যন্ত্রের কাছে মাথা নত করবো না। দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে এ চক্রান্তের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলবো। প্রয়োজনে এই ষড়যন্ত্রকারীদের মোকাবিলা করা হবে।”
আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক স্ট্যাটাস দিয়েছেন। ইংরেজিতে লিখিত স্ট্যাটাসটি নিম্নরূপ :
Dear fellow citizens, We express our sincere gratitude to you for casting your votes in large numbers throughout the day in such a positive and peaceful atmosphere.
However, we are not satisfied with the process surrounding theelection results. From
candidates of the 11-party alliance narrowly and suspiciously losing in various
constituencies, to repeated inconsistencies and fabrications in unofficial result announcements, the Election Commission’s reluctance to publish voter turnout percentages, and indications that a section of the administration leaned towards a major partyall of this undoubtedly raises serious questions about the integrity of the results process.
Therefore, we urge everyone to remain patient and await the official programme of the 11 party alliance. Our struggle for justice in pursuit of a humane Bangladesh will continue, Insha’Allah. evsjv Abyev`
বাংলা অনুবাদ
প্রিয় দেশবাসী,
গতকাল সারাদিন শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দেয়ার জন্য আপনাদের সবাইকে জানাই আমাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ।
তবে নির্বাচনের ফলাফল তৈরি ও ঘোষণার ধরন আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়। অনেক জায়গায় আমাদের প্রার্থীরা অল্প ভোটে রহস্যজনকভাবে হেরে গেছেন। ফলাফলে বারবার গরমিল ও সাজানো দেখা যাচ্ছে এবং প্রশাসনও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেনি বলে মনে হচ্ছে। এসব কারণে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
আমরা সবাইকে ধৈর্যধরার অনুরোধ করছি। আমাদের জোটের পরবর্তী ঘোষণা না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে আমাদের ন্যায়ের লড়াই চলবেই, ইনশাআল্লাহ।
নির্বাচন ও নির্বাচনী ফলাফল সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন থাকলেও একটি অমোঘ সত্য হলো, দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে নির্বাচনের নামে শেখ মুজিব এবং শেখ হাসিনা যে প্রহসন করেছিলেন সে প্রহসনের পুনরাবৃত্তি থেকে দেশ এবার বেঁচে গেছে। এবারের নির্বাচনে যাদেরই হার জিত হোক না কেনো , একটি কথা সকলেই স্বীকার করবেন যে, যদি জুলাই বিপ্লব না হতো, যদি ঐ ৩৬ দিনে ১৪শ’ ছাত্র জনতা শহীদ না হতেন, যদি ২৬ হাজার মানুষ বন্দুকের গুলিতে আহত হয়ে কেউ চক্ষু আর কেউ পা না হারাতেন তাহলে দেশ আজও হাসিনার নাৎসী শাসনের শৃঙ্খলে বন্দী থাকতেন। সুতরাং দৈনন্দিন জীবনে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে মতভিন্নতা থাকবেই। কিন্তু সে মত ভিন্নতা ছাপিয়ে জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে প্রকাশিত জনগণের অভিপ্রায় বাস্তবায়নে সরকারি এবং বিরোধী উভয় দলই সম্মিলিত ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা চালাবে সেটাই ১৮ কোটি জনগণের প্রত্যাশা।