মমতাজ উদ্দিন আহমদ
পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজাভ পাহাড়, একসময় ছিল বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের দুর্গ। আজ সে দুর্গেই নতুন করে বৈষম্যের বীজ বোনা হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম (সিএইচটি) এক ঐতিহাসিক জনপদ, যেখানে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাত শেষে ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি এনেছিল এক নতুন সম্ভাবনা। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সে চুক্তির বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় আইনগুলো এমন এক কাঠামোগত বৈষম্যের জন্ম দিয়েছে, যেখানে এ অঞ্চলের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী-বাঙালিরা-নিজেদের বঞ্চিত ও আত্মপরিচয়হীন মনে করছে। সংবিধানের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যেখানে সকল নাগরিকের সমঅধিকার নিশ্চিত হওয়ার কথা, সেখানে বিশেষ ব্যবস্থার নামে এ সাংবিধানিক নিগ্রহ এক গভীর রাজনৈতিক ও নৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে।
সাংবিধানিক পরিচয়ের হরণ ও আত্মনিগ্রহের রাজনীতি : বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র ও নাগরিকের পরিচয় স্পষ্ট করেছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬(২) অনুযায়ী, “বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলিয়া পরিগণিত হইবেন।” অথচ, পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ও শান্তিচুক্তির মাধ্যমে এ অঞ্চলের বাঙালি জনগোষ্ঠীকে তাদের এ মৌলিক সাংবিধানিক পরিচয় থেকে বিচ্যুত করে ‘অ-উপজাতীয়’ নামক একটি কৃত্রিম পরিচয়ে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
এ প্রক্রিয়াটি কেবল একটি প্রশাসনিক পরিভাষা নয়; এটি এক ধরনের আত্মপরিচয়গত নিগ্রহ। রাষ্ট্রের সংবিধান যেখানে সকল নাগরিককে একই জাতীয়তার ছায়াতলে স্থান দিয়েছে, সেখানে একটি বিশেষ অঞ্চলের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে ‘অন্য’ বলে চিহ্নিত করা, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭ (আইনের দৃষ্টিতে সমতা) এবং অনুচ্ছেদ ৩১ (আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার) এর মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যখন রাষ্ট্র তার অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে একটি নেতিবাচক বা অস্বীকৃত পরিচয়ে আবদ্ধ করে, তখন তাদের বঞ্চনার সূচনা ঘটে সেই পরিচয়ের মূল ভিত্তি থেকেই।
ক্ষমতা কাঠামো থেকে নির্বাসন ও পদ্ধতিগত বঞ্চনা: পার্বত্য চট্টগ্রামের শাসন ও প্রশাসনিক ক্ষমতা কাঠামোতে বাঙালিদের পদ্ধতিগতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে নিবন্ধে জোরালো অভিযোগ তোলা হয়েছে। এ অঞ্চলের উন্নয়নে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, আঞ্চলিক পরিষদ, উন্নয়ন বোর্ড, তিনটি জেলা পরিষদ এবং টাস্কফোর্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হয় পাহাড়ি নেতৃত্ব দ্বারা। এমনকি ভূমি কমিশনও বাঙালিবিহীন।
নিবন্ধের তথ্য অনুযায়ী, পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন এবং শান্তিচুক্তির মাধ্যমে যে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ও কোটা সিস্টেম তৈরি করা হয়েছে, তা উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর জন্য নির্দিষ্ট। ফলে এ অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক (৫০.০৬%) হওয়া সত্ত্বেও বাঙালিরা প্রশাসনিক ক্ষমতা থেকে কার্যত নির্বাসিত। এ কাঠামোটি কেবল রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অভাব সৃষ্টি করেনি, বরং এটি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৯ (সরকারি নিয়োগ লাভে সুযোগের সমতা) এবং স্থানীয় সরকার (অনুচ্ছেদ ৫৯, ৬০) এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের মূলনীতির পরিপন্থী। যখন একটি বিশেষ জনগোষ্ঠী শাসন ও নীতিনির্ধারণের কেন্দ্র থেকে সম্পূর্ণ বাইরে থাকে, তখন তাদের স্বার্থ সংরক্ষিত হয় না।
নিয়োগ, উন্নয়ন ও আর্থিক বরাদ্দে সংখ্যাতাত্ত্বিক বৈষম্য : বাঙালি বঞ্চনার সবচেয়ে স্পষ্ট এবং মর্মান্তিক চিত্রটি উঠে এসেছে নিয়োগ ও উন্নয়ন বরাদ্দের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে। নিবন্ধের তথ্যানুসারে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি (৫০.০৬%) হলেও, নিয়োগ এবং আর্থিক বরাদ্দে তাদের হিস্যা অত্যন্ত নগণ্য।
নিয়োগে বৈষম্য: রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের অধীনে একটি যৌথ প্রকল্পের জনবল নিয়োগে মাত্র ১০ শতাংশ বাঙালি প্রার্থী নিয়োগ দেওয়া হয়, যেখানে ৯০ শতাংশ নিয়োগ পেয়েছে অবাঙালিরা।
আর্থিক বরাদ্দে বৈষম্য: পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ৩ কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকার একটি আপৎকালীন বরাদ্দে চাকমা সম্প্রদায় পায় ২ কোটি ৩২ লাখ ৬০ হাজার টাকা, অথচ মুসলিম বাঙালিরা পেয়েছে মাত্র ৪৭ লাখ ১০ হাজার টাকা। অন্যদিকে, খাদ্যশস্য বরাদ্দেও চাকমাদের অনুকূলে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি বরাদ্দ চলে যাওয়ার উদাহরণ দেওয়া হয়েছে।
এ সংখ্যাগত বৈষম্য (Statistical Disparity) প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় কল্যাণমূলক অর্থ ও সুযোগ-সুবিধার সুষম বণ্টন হচ্ছে না। এটি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২০(১) (শ্রমের অধিকার) এবং অনুচ্ছেদ ১৫(ঘ) (জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় ও কার্যকর উন্নতি) এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের লক্ষ্যের প্রতি এক চরম অবজ্ঞা। একটি বিশেষ জনগোষ্ঠী তাদের শিক্ষা, ক্ষমতা ও আর্থিকভাবে অগ্রসর থাকার সুবিধা ব্যবহার করে এ সকল সুবিধা কুক্ষিগত করছে, এবং দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে প্রকৃত বঞ্চিতদের কাছে সে সুবিধা পৌঁছাচ্ছে না-যা নতুন করে সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টি করছে।
মুক্তি ও সমতার পথে একমাত্র সমাধান : বর্তমান কোটা বা প্রণোদনা ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে কারণ এটি অনগ্রসরতা বা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ভিত্তিক নয়, বরং নির্দিষ্ট এলাকা ও জাতিগোষ্ঠী ভিত্তিক। বাংলাদেশের উচিত তার প্রকৃত অনগ্রসর ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করা, যা কেবল নির্দিষ্ট অঞ্চল বা জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
এ বৈষম্য দূরীকরণে একটি সুনির্দিষ্ট ও আইনসম্মত পদক্ষেপ প্রয়োজন : উচ্চ আদালতের একজন বিচারকের নেতৃত্বাধীন একটি কমিশন গঠন করে সমগ্র দেশব্যাপী (পাহাড় ও সমতল) পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সমীক্ষা ও জরিপ চালানো। এ কমিশনের কাজ হবে:
১. প্রকৃত অনগ্রসরতা শনাক্তকরণ: রাষ্ট্রের কোন অঞ্চলের, কোন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ প্রকৃত অর্থে পিছিয়ে আছে, তা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত মানদণ্ডে নির্ণয় করা।
২. সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা: শনাক্তকৃত অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য সাংবিধানিক সুরক্ষা ও বিশেষ সহায়তা, প্রণোদনা এবং কোটা সুবিধা নিশ্চিত করা।
৩. সুবিধার অপব্যবহার রোধ: যারা ইতিমধ্যেই জাতীয় মানদণ্ডে উন্নত হয়েছে বা এ সুবিধা ব্যবহার করে অগ্রসর হয়েছেন, তাদের এ সুবিধার আওতা থেকে বাইরে রাখা।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি নিগ্রহ ও বঞ্চনার এ পাঠ একটি গভীর সতর্কবার্তা-কেবল আঞ্চলিক শান্তিচুক্তি বা আইন দিয়ে বৈষম্যের অবসান সম্ভব নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সকল নাগরিক, হোক সে পাহাড়ের বাঙালি, মারমা, ত্রিপুরা বা সমতলের ভূমিহীন কৃষক, সংবিধানের চোখে সমতা এবং উন্নয়নের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে না পারে, ততক্ষণ পর্যন্ত ‘মুক্তি’ কেবলই একটি বিভাজনের ফাঁদে পরিণত হবে। সময় এসেছে সে মধ্যসত্ত্বভোগী দুর্নীতিবাজ এলিটদের সরিয়ে দিয়ে, সংবিধানের অঙ্গীকার অনুযায়ী, প্রকৃত বঞ্চিত মানুষের হাতে সরাসরি রাষ্ট্র প্রদত্ত সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার একটি দৃঢ় ও স্বচ্ছ ম্যাকানিজম তৈরি করা। নচেৎ, পাহাড়ে শান্তি আসবে না, কেবলই দীর্ঘায়িত হবে বঞ্চনার ক্লেদাক্ত প্রহর।
লেখক : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক।