মুহাম্মদ আবুল হুসাইন

বাজারে ঢুকলেই এখন আর শুধু পণ্য কেনা হয় না; কিনতে হয় অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ আর এক ধরনের অদৃশ্য ভয়ের অনুভূতি। প্রতিদিনের জীবনযাত্রা যেন ধীরে ধীরে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে বন্দি হয়ে পড়ছে-যার নাম সিন্ডিকেট। চাল, ডাল, তেল, সবজি থেকে শুরু করে পোশাক-সবখানেই কৃত্রিম সংকট আর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ছাপ স্পষ্ট। সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে, আর মধ্যবিত্তের হিসাব-নিকাশ ভেঙে পড়েছে। এমন বাস্তবতার মধ্যেই সামনে এলো রাজধানীর মগবাজারের ‘নবীন ফ্যাশন’কে ঘিরে আলোচিত ঘটনা। এতদিন সিন্ডিকেটের কথা শোনা যেত নিত্যপণ্যের বাজারে। কিন্তু এবার দেখা গেল, উৎসবের পোশাকও সেই একই নিয়ন্ত্রণের শিকার।

কম দামে বিক্রি-অপরাধের নতুন সংজ্ঞা : ‘নবীন ফ্যাশন’ আলোচনায় আসে একটি সরল কারণে- তারা তুলনামূলক কম এবং ন্যায্য মূল্যে পাঞ্জাবি ও অন্যান্য পোশাক বিক্রি করছিল। যেখানে একটি পাঞ্জাবির দাম সিন্ডিকেট নির্ধারণ করেছে কয়েক হাজার টাকা, সেখানে কম দামে বিক্রি করায় তাদের ওপর নেমে আসে চাপ। অভিযোগ আছে, আশপাশের ব্যবসায়ীরা সংঘবদ্ধভাবে দোকান বন্ধ করে দেয়। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতেও এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে শোনা যায়। একপর্যায়ে ব্যবসায়ী এনামুল হাসান নবীন নিজের নিরাপত্তাহীনতায় দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়- এখন শুধু পণ্য নয়, ‘ন্যায্যতা’ও নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। আপনি যদি কম দামে পণ্য বিক্রি করে মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান, তবুও আপনাকে বাধার মুখে পড়তে হবে, যদি না আপনি সেই অদৃশ্য চক্রের নিয়ম মেনে চলেন।

রাষ্ট্র কোথায় দাঁড়িয়ে?

প্রশ্নটি সহজ, কিন্তু উত্তর জটিল। রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলো বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা এবং অসাধু শক্তিকে দমন করা। কথায় আছে- রাষ্ট্রের কাজ সিষ্টের লালন ও দুষ্টের দমন। কিন্তু বাস্তবতা যেন তার উল্টো প্রতিচ্ছবি। প্রশাসনের একটি অংশ নীরব, আরেক অংশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আছে। ফলে যারা নিয়ম মেনে ব্যবসা করতে চান, তারা ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন; আর যারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, তারা আরও শক্তিশালী হচ্ছে।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে মুক্তবাজারের নামে এমন অরাজকতা চলতে পারে না। যখন কোনো ব্যবসায়ী নিরাপত্তাহীনতায় দেশ ছাড়েন, তখন তা কেবল একটি ব্যক্তিগত ঘটনা নয়; এটি আইনের শাসনের দুর্বলতার ইঙ্গিত। বাজার মনিটরিং বা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রেই লোকদেখানো হয়ে পড়েছে। সামান্য জরিমানায় বড় ধরনের অনিয়ম বন্ধ হয় না- এটি এখন প্রমাণিত সত্য।

দ্রব্যমূল্যের আগুন ও অদৃশ্য হাত : নিত্যপণ্যের বাজারে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ভোজ্যতেল, চিনি, ডিম বা মুরগি সবকিছুর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও তার সুফল ভোক্তার কাছে পৌঁছায় না। কিন্তু সামান্য বাড়লেই দেশীয় বাজারে তার বহুগুণ প্রভাব পড়ে।

এর পেছনে কয়েকটি সুস্পষ্ট কারণ কাজ করছে- কৃত্রিম সংকট তৈরি করা, যেখানে গুদামে পণ্য মজুদ রেখেও বাজারে সংকট দেখানো হয়; মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য, যেখানে উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত দামের ব্যবধান অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়; এবং প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা, যা এসব অনিয়মকে কার্যত উৎসাহিত করে।

নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রের দায় : এ পরিস্থিতি কেবল অর্থনীতির সংকট নয়; এটি নাগরিক অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন। ন্যায্যমূল্যে পণ্য পাওয়া একজন মানুষের মৌলিক অধিকার। যখন একটি পরিবার প্রতিদিন হিসাব কষে খাবার কিনতে বাধ্য হয়, যখন আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের কোনো সমন্বয় থাকে না- তখন সেটি ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা। সিন্ডিকেট শুধু দাম বাড়ায় না, এটি বৈষম্যও বাড়ায়। সমাজে আস্থাহীনতা তৈরি করে, রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক দুর্বল করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

উত্তরণের পথ : এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর পদক্ষেপ। বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে, অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, এবং সর্বোপরি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু অভিযান নয়, কাঠামোগত সংস্কারই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।

রাষ্ট্র যদি সত্যিই ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে তাকে নিরপেক্ষ হতে হবে। কোনো গোষ্ঠীর প্রতি তোষণ নয়, বরং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই হতে হবে মূল লক্ষ্য।

প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত একটিই- রাষ্ট্র কার জন্য? যদি উত্তর হয় জনগণের জন্য, তবে সে জনগণের অধিকার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। অন্যথায় আমরা এমন এক বাস্তবতার দিকে এগোবো, যেখানে বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে কিছু গোষ্ঠী, আর সাধারণ মানুষ থাকবে তাদের করুণার ওপর নির্ভরশীল। নবীন ফ্যাশনের ঘটনাটি একটি সতর্কবার্তা। এখনই ব্যবস্থা না নিলে, সামনে হয়তো এমন এক সময় আসবে- যেখানে দুবেলা খাবার জোগাড় করা যেমন কঠিন হবে, তেমনি একটি সাধারণ উৎসবের পোশাক কেনাও বিলাসিতা হয়ে উঠবে।