সরদার ফরিদ আহমদ

১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন আর পাঁচটা নির্বাচনের মতো নয়। এটি একটি মোড় ঘোরানো নির্বাচন। ক্ষমতার হাতবদল নয় শুধু-রাষ্ট্রের চরিত্র, রাজনীতির ভবিষ্যৎ, এবং গণতন্ত্রের দিকনির্দেশ-সবকিছুর ফয়সালা এখানে। এই নির্বাচনে ছয়টি বিষয় কার্যকরী ও নির্ধারক ভূমিকা রাখবে। এই ছয়টি বিষয়ের ভেতরেই লুকিয়ে আছে জয়-পরাজয়ের হিসাব।

এক. নারী ভোট : নীরব শক্তির জাগরণ

বাংলাদেশের মোট ভোটারের অর্ধেক নারী। এত বড় ভোটব্যাংক আগে কখনো এভাবে আলোচনায় আসেনি। এবার পরিস্থিতি আলাদা। গণঅভ্যুত্থানে নারীরা ছিল সামনে।

রাস্তায়। মিছিলে। পুলিশের মুখোমুখি। এই নারীরা আর আগের মতো ঘরে বসে থাকবেন-এই ধারণা ভুল। ভোট দেওয়া এখন তাদের কাছে রাজনৈতিক অধিকার নয়, নৈতিক দায়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, ‘যখন নারী ভোটাররা সংগঠিতভাবে ভোট দিতে বের হয়, তখন তারা শুধু সরকার বদলায় না-রাজনীতির ভাষাও বদলে দেয়।’ নারীরা এবার প্রশ্ন করবে। নিরাপত্তা কোথায়? সম্মান কোথায়? ন্যায় কোথায়? যে দল এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না, তারা নারী ভোট হারাবে। সংখ্যার হিসেবে নয়। নৈতিক শক্তির হিসেবে।

দুই. তরুণ ভোট : আপসহীন প্রজন্ম

সাড়ে চার কোটি তরুণ ভোটার। মোট ভোটারের প্রায় ৪০ শতাংশ। ১৮ থেকে ৩৮ বছর বয়স। যারা কখনো ভোট দিতে পারেনি। যাদের ভোটাধিকার কাগজে ছিল, বাস্তবে ছিল না। এই প্রজন্ম আন্দোলনে বড় হয়েছে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলন। ক্যাম্পাসের লড়াই। ৬ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান। এরা জেন-জি। আপস করে না। মিথ্যা সহ্য করে না। ভালো না লাগলে সরাসরি ‘না’ বলে দেয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, ‘এই প্রজন্ম দল দেখে না, দেখে অবস্থান। স্লোগান দেখে না, দেখে কর্ম।’

তরুণদের বড় অংশ কোনো দলে বাঁধা নয়। এটাই তাদের শক্তি। এটাই দলগুলোর ভয়। যারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে বুঝতে পারেনি, যারা তখন নীরব ছিল, যারা সুবিধা খুঁজছিল-তাদের এই প্রজন্ম ক্ষমা করবে না। ভোট বাক্সে তার প্রতিফলন হবে। এটা নিশ্চিত।

তিন. জুলাই গণঅভ্যুত্থানের জনআকাক্সক্ষা

জুলাই শুধু একটি তারিখ নয়। এটি একটি রাজনৈতিক রেফারেন্স পয়েন্ট। মানুষ এখন জানে-কারা পক্ষে ছিল। কারা বিপক্ষে ছিল। কারা চুপ ছিল। কারা সুযোগ নিতে চেয়েছিল। সংস্কার বনাম পুরোনো ব্যবস্থা-এই বিভাজন এখন স্পষ্ট। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট ডালের ভাষায়, ‘গণতন্ত্রে ভোটাররা শুধু অতীত বিচার করে না, তারা ভবিষ্যতের রূপরেখাও আঁকে।’

ভোটাররা এবার হিসাব করবে। কে সংস্কারের কথা বলেছে। কে ক্ষমতা বাঁচানোর কথা বলেছে। এই নির্বাচন আসলে একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে-পুরোনো রাজনীতি, না নতুন রাষ্ট্রচিন্তা?

চার. ফ্যাসিস্ট পুনর্বাসন ও ভারতীয় আধিপত্যের প্রশ্ন

এটি সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়। এবং সবচেয়ে ভয়ংকর। কিছু রাজনৈতিক শক্তি আজ ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে একটি শব্দও বলছে না। বরং পুনর্বাসনের ভাষা তৈরি করছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি পুরোনো ছায়া-ভারতীয় আধিপত্যবাদ। যারা ফ্যাসিস্ট প্রশ্নে নীরব, তারা ভারত প্রশ্নেও নীরব। এটি কাকতাল নয়। এটি রাজনৈতিক কৌশল।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, ‘বিদেশি আধিপত্য কখনো সরাসরি আসে না। আসে স্থানীয় দালালদের কাঁধে ভর করে।’ মানুষ এখন বিষয়টি বুঝে গেছে। কে কার পক্ষে কাজ করছে-তা আর গোপন নেই। এই নির্বাচন শুধু দল বাছাই নয়। এটি স্বাধীনতা বনাম পরাধীনতার ভোট।

পাঁচ. সোশ্যাল মিডিয়া : নতুন যুদ্ধক্ষেত্র

এই নির্বাচনে মিটিং-মিছিল একমাত্র মাধ্যম নয়। প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র-সোশ্যাল মিডিয়া। ফেসবুক। ইউটিউব। টিকটক। এক্স। মানুষ দেখছে। শুনছে। তুলনা করছে। এখানে টাকা নয়, দক্ষতা কাজ করে। স্লোগান নয়, কনটেন্ট কাজ করে। যারা তরুণদের ভাষা বোঝে, যারা প্রশ্নের উত্তর দেয়, যারা লাইভে এসে কথা বলতে পারছে-তারা এগিয়ে। যারা শুধু পোস্টার আর পুরোনো বক্তব্যে আটকে আছে-তারা পিছিয়ে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একে বলেন, ‘ডিজিটাল পলিটিক্যাল সোশ্যালাইজেশন।’ এই সোশ্যাল মিডিয়াই এবার ভোটের ফল পাল্টে দিতে পারে।

ছয়. ১৮ মাসের আমলনামার হিসাব

জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশ একটি পরীক্ষার সময় পার করেছে। এই সময়টা ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি খোলা খাতা। একটি আমলনামা। এই আমলনামাই ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখবে। হয়তো সবচেয়ে অস্বস্তিকর ভূমিকা।

আমরা সবাই জানি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছিল ফ্যাসিস্টবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সমঝোতায়। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জুলাই বিপ্লবের নেতৃত্বদানকারী তরুণদের সম্মতিতে। মানুষ প্রত্যাশা করেছিল-এবার রাজনীতি বদলাবে। এবার ক্ষমতার ব্যবহার হবে সংযত। এবার মাঠ থাকবে দখলমুক্ত। কিন্তু বাস্তবতা অনেক জায়গায় সেই প্রত্যাশা পূরণ করেনি। কোনো রাজনৈতিক দল এই প্রত্যাশাকে আতঙ্ক বানিয়েছে। কারা বানিয়েছে সেটি কারো অজানা নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সময় হলো রাজনৈতিক দলের চরিত্র বোঝার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সময়। তখন কোনো দলই বিরোধী থাকার অজুহাত দিতে পারে না।’

এই সময়টায় কে কী করেছে-ভোটাররা তা দেখেছে। নোট করেছে। ভুলে যায়নি। জুলাই বিপ্লবের মূল দাবি ছিল-ভয়ের রাজনীতির অবসান। কিন্তু অনেক এলাকায় মানুষ দেখেছে পুরোনো রোগ আবার মাথা তুলছে। চাঁদাবাজি। জমি দখল। দোকান দখল। প্রভাব খাটানো। নাম বদলেছে। পোস্টার বদলেছে। কিন্তু আচরণ বদলায়নি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি প্রচলিত কথা আছে, ‘ক্ষমতা বদলালেও যদি আচরণ না বদলায়, তবে রাষ্ট্র বদলায় না।’

ভোটাররা এবার এই আচরণের হিসাব করবে। কে প্রকাশ্যে জড়িত। কে নীরবে প্রশ্রয় দিয়েছে। কে চোখ বন্ধ রেখেছে। এই হিসাব সহজ নয়। কিন্তু অবহেলারও নয়। সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা-ভয়। অনেক সাধারণ মানুষ এখন বলছে, ‘আবার কি সেই আগের দিন?’ এই ভয় শুধু স্মৃতি থেকে আসেনি। এটি এসেছে সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে। ভোগান্তি থেকে। কিছু রাজনৈতিক দলের কর্মীদের আচরণ মানুষকে আতঙ্কিত করেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা সতর্ক করেন, ‘ভয় যখন রাজনীতির ভাষা হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্র পেছনে হাঁটে।’ মানুষ আর ভয় দেখতে চায় না। হুমকি চায় না। মাস্তানি চায় না। এই মনোভাব ভোটে প্রতিফলিত হবে। হয়তো নীরবে। কিন্তু গভীরভাবে। কার্যকরভাবে।

এবারের নির্বাচন প্রতিশ্রুতির নয়। এটি পারফরম্যান্সের নির্বাচন। নীতির নির্বাচন। ভোটাররা প্রশ্ন করছে- তোমরা সুযোগ পেয়েছিলে, ক্ষমতার কাছাকাছি ছিলে, তখন কী করেছ? রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটনের ভাষায়, গণতন্ত্রে মানুষ শুধু ভবিষ্যতের স্বপ্নে নয়, অতীতের আচরণে ভোট দেয়।’ এই বাস্তবতা কোনো কোনো দলের জন্য অস্বস্তিকর। অনেকে হয়তো ভাবেননি-এই সময়টাও একদিন ভোটের ইস্যু হবে। কিন্তু হচ্ছে।

এই কারণেই এবারের নির্বাচনের ফল-অনেককে আশাহত করতে পারে। যারা ভাবছেন, ‘এবার সব ভোট আমাদের’-তারা ভুল করছেন। দিবাস্বপ্নে আছেন। ভোট বিপ্লবের স্মৃতিতে নয়, ভোট বিপ্লব-পরবর্তী আচরণে। যে দল মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়েছে, যে দল নিয়ন্ত্রণ দেখাতে চেয়েছে, যে দল ক্ষমতার স্বাদে সংযম হারিয়েছে, বেপরোয়া হয়েছে, তারা ধাক্কা খেতে পারে। ফলাফল পুরো উল্টে যেতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটি হবে শান্ত কিন্তু গভীর শক।

বাংলাদেশের ভোটার বদলেছে। বিশেষ করে তরুণ ও মধ্যবয়সী ভোটার। তারা আর অন্ধ বিশ্বাস করে না। স্লোগানে ভাসে না। ভয়েও চুপ থাকে না। জুলাই বিপ্লব মানুষকে শিখিয়েছে-প্রশ্ন করতে। হিসাব চাইতে। ভয়কে অতিক্রম করতে। এই নির্বাচনে মানুষ ভয়ের রাজনীতিকে না বলবে। কারণ তারা জানে-ভয় মানে পিছিয়ে যাওয়া। আর তারা আর পেছনে ফিরতে চায় না। ১২ ফেব্রুয়ারি শুধু ভোট নয়। এটি একটি রায়। একটি সতর্কবার্তা। রাজনীতির জন্য। রাষ্ট্রের জন্য।

ভোট শুধু ব্যালট নয়, বার্তা

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু কে জিতবে, কে হারবে-তার হিসাব নয়। এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা। রাষ্ট্র কোন পথে যাবে-তার নির্দেশনা। নারী ভোট বলবে নিরাপত্তা চাই। তরুণ ভোটাররা বলবে-আপস নয়। জুলাই বলবে-সংস্কার চাই। প্রশ্ন উঠবে-ফ্যাসিস্ট পুনর্বাসন নয়। সোশ্যাল মিডিয়া বলবে-পুরোনো ভাষা চলবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর গত ১৮ মাসের আমলনামার হিসাব দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন ভোটাররা।

এই ছয়টি শক্তি একসাথে কাজ করলে রাজনীতির মানচিত্র বদলে যাবে। কাজ করবেও। ভোটাররা প্রস্তুত। প্রশ্ন একটাই- রাজনৈতিক দলগুলো কি প্রস্তুত? উত্তর দেবে ১২ ফেব্রুয়ারি।

লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন।