আবু রায়হান তানভীর
সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বী বাবু কৃষ্ণ নন্দীকে খুলনা-১ আসন থেকে মনোনয়ন দেওয়ার মধ্য দিয়ে জামায়াতের বিকশিত রাজনীতিতে এক নতুনত্বের প্রকাশ পেল। জামায়াতের আমীর বিভিন্ন সভা-সমাবেশে দল মত নির্বিশেষে ইসলামী আদর্শের একটি কল্যাণ রাষ্ট্র গঠন করার যে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, তার বাস্তব রূপ আমরা দেখতে পাচ্ছি।
আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এক ঐতিহাসিক বাস্তবতার মুখোমুখি। এ দেশের মানুষ একদিকে ‘জাতীয়তাবাদী’ ও আধুনিক প্রগতিশীল আদর্শের নামধারী রাজনীতির গতানুগতিক কর্মসূচিতে হতাশ অন্যদিকে দেখেছে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের নামে গুম, খুন, নির্যাতন, বিরোধি মতের উপর দমন পীড়ন আর হালের ফ্যাসিবাদী রাজনীতি। স্বাধীনতা পরবর্তী সীমাহীন দুর্নীতি, খুন, রাহাজানি, চাঁদাবাজি, নৈতিক অবক্ষয় এবং সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বীদের অধিকার হরণ- আবার অধিকার হরনের নাটক মঞ্চস্থ করার মাধ্যমে বাংলাদেশকে ধর্মীয় উম্মাদনার তথা জঙ্গি রাষ্ট্র বানানোর অপরাজনীতি। এর বিপরীতে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কুরআন-সুন্নাহ-ভিত্তিক আদর্শের যে মানবিক রূপ তুলে ধরেছে, তা এই পুরনো রাজনৈতিক ধারার বিকল্প আশার আলো।
সনাতন ধর্মাবলম্বী বাবু কৃষ্ণ নন্দীকে খুলনা-১ আসন থেকে মনোনয়ন দেওয়া এটি জামায়াতের কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং ইসলামী রাষ্ট্রের চিরায়ত নীতির একটি আধুনিক ও ঐতিহাসিক প্রয়োগ ঘটাতে চাইছে জামায়াতে ইসলামী। ইসলামের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিধি বিধান শুধু কোন নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষের জন্য না সকল ধর্মাবলম্বী মানুষের জন্যই কল্যাণকর। ইসলামের এই সৌন্দর্যকে গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়ে জামায়াত দীর্ঘদিন থেকে অমুসলিম সহযোগী সদস্য গ্রহণ করছে। জামায়াতের গঠনতন্ত্রে অনেক আগে থেকেই অমুসলিম সদস্য/সদস্যাদের জন্য শপথপত্র (পরিশিষ্ট-১১) বিদ্যমান আছে, যা প্রমাণ করে যে, জামায়াত কেবল বর্তমানে নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরেই অমুসলিমদের সঙ্গে কাজ করার এবং তাদেরকে সাংগঠনিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করার নীতিগত অবস্থান বজায় রেখেছে।
ইসলামী আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে হিন্দু ধর্মাবলম্বী কোন ব্যক্তিকে জাতীয় সংসদ পদপ্রার্থী করা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অমুসলিম প্রতিনিধিকে ভোট দেয়া জায়েজ কি-না? এমন একটি প্রশ্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সহ বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশ পেয়েছে।
এটি এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয় লেখাপড়া জানা মানুষ ও এটি নিয়ে বিভ্রান্তির গোলক ধাঁধায় খাবি খেতে পারে। এটির উত্তর ইসলামিক স্কলারগণ এভাবে দিয়েছেন যে-“অমুসলিম প্রতিনিধি যদি ইসলামী দলের লক্ষ্য উদ্দেশ্যে বাঁধা না হন, একত্ববাদ আল্লাহর বিধি-বিধান বাস্তবায়নে বাধা না হন আর তিনি যদি ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের সহযোদ্ধা হন, তার মাধ্যমে যদি উক্ত অঞ্চলের ইসলামী বিধি-বিধান কায়েমে প্রয়োজনীয় সমর্থন পাবার সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে অমুসলিম প্রতিনিধিকে ভোট দেয়া জায়েজ এবং এ ক্ষেত্রে আপনি সঠিক জায়গায় ভোট প্রদান করেছেন। আর পক্ষান্তরে মুসলিম প্রতিনিধি কিন্তু তিনি ইসলামী কালচার কায়েমে বাঁধা হয়ে দাঁড়ান, তাহলে নামধারী মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও তাকে ভোট দেয়া হারাম। যেমন ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, সমাজতন্ত্রী মতবাদ, জাতীয়তাবাদ, ইত্যাদি আদর্শের অনুসারীরা কুরআনের সংবিধান কায়েমের প্রধান শত্রু।
এ সব তথাকথিত আধুনিক দর্শনধারী জাহিলি মতাদর্শের ধ্বজাধারীদের ভোট প্রদানে একজন প্রাকটিসিং মুসলিমের জন্য নাজায়েজ।”
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর যুগে নাজরানে অমুসলিম দুইজন উচ্চপদস্থ প্রসাশনিক কর্মকর্তা ছিল যাদের টাইটেল ছিল যথাক্রমে আকিব ও সায়্যেদ, একজনের নাম ছিল আব্দুল মসীহ ও আরেকজনের নাম আল-হারিস। তারা উভয়েই ইসলামী সংস্কৃতি রক্ষায় বাঁধা ছিল না বলেই, রাসুল (সা.) তাদেরকে স্বপদে বহাল রাখেন। এর আলোকে বলা যায়, জামায়াতে ইসলামী কোন অমুসলিম প্রতিনিধিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য মনোনীত করে তাহলে এটি ইসলামী আদর্শের সাথে কোনভাবেই সাংঘর্ষিক নয়।
বিগত ৫৪বছর ধরে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে থাকা দলগুলো ‘অসাম্প্রদায়িকতা’র রাজনৈতিক মুখোশ পরে ছিল, কিন্তু এর ফল ছিল সংখ্যালঘুদের প্রতি চরম অবিচার। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তথাকথিত ‘অসাম্প্রদায়িক’ নামীয় শক্তিগুলো দেশ শাসন করলেও, দেশের সংখ্যালঘুরা-হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান-তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ও নির্যাতিত হয়েছে।
‘অসাম্প্রদায়িকতা’র ব্যানার ঝুলিয়ে দলগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় ভূমিদস্যুরা সংখ্যালঘুদের জমি জোরপূর্বক দখল করেছে। সংখ্যালঘুদেরকে কখনোই মানবিক নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হয়নি; বরং তাদেরকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আওয়ামী ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবে মনে করা হতো। ধর্মীয় উৎসবের সময় সামান্য অনুদান বা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের সমর্থন আদায় করা হলেও, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি এবং আইনি অবিচারের শিকার হওয়ার সময় এই দলগুলো নীরব থেকেছে। ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশ ছিল মূলত ‘এলিট ক্যাপচার’ (Elite Capture)-এর একটি কৌশল। ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা সুবিধাভোগী এলিটরা মুখে অসাম্প্রদায়িকতার বুলি আওড়েছে, কিন্তু বাস্তবে তারা দুর্নীতির মাধ্যমে দেশকে শোষণ করেছে এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার হরণ করেছে।
ইতিহাস সাক্ষী, নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মদিনা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে খোলাফায়ে রাশেদীনের কাল পর্যন্ত অন্য ধর্মাবলম্বীরা ছিল সবচাইতে বেশি শান্তিতে ও সুখে। তাদের প্রতি নির্যাতনের কোনো দৃষ্টান্ত কেউ দিতে পারেনি। ভারত উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের সময় অমুসলিম ও হিন্দুরা মুসলিম শাসকের হাতে নিরাপদে ও সুখে ছিল। ইসলাম অন্য ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। জামায়াতের গঠনতন্ত্রে অমুসলিম সদস্য/ সদস্যাদের শপথপত্র থাকা প্রমাণ করে যে, এই দলটি কেবল বর্তমানে নয়, দীর্ঘদিন ধরেই অমুসলিমদেরকে সংগঠনের কাঠামোর মধ্যে রেখে কাজ করে আসছে। এই শপথনামা অনুযায়ী, অমুসলিম সদস্যগণ জামায়াতের নিয়ম-শৃঙ্খলা ও সিদ্ধান্ত মানিয়া চলিবেন এবং উপাজর্নে অবৈধ পন্থা অবলম্বন করিবেন না। ইসলামী আইনশাস্ত্রে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে যেকোনো পদে নিয়োগ দেওয়া হয়; ধর্ম এক্ষেত্রে কোনো বাধা নয়।
ভারত উপমহাদেশের মুসলিম শাসক আওরঙ্গজেব ও হারুনুর রশীদের আমলসহ আব্বাসীয় খিলাফত ও মুঘল সাম্রাজ্যে অমুসলিমরা অত্যন্ত উচ্চ প্রশাসনিক, আর্থিক ও সামরিক পদে (যেমন সেনাপতি) দায়িত্ব পালন করেছেন। ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্রে অমুসলিমদের ব্যক্তিগত ও দেওয়ানি বিষয়ে নিজস্ব আইন অনুযায়ী বিচার পাওয়ার অধিকার থাকে। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে, যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ ইসলামের একটি চিরায়ত নীতি।
অনেকেই বলছেন, জামায়াত এবার ঢাবি ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মডেল গ্রহণ করবে। জামায়াত বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে সংঘটিত সফল নির্বাচনের মতো করে ঐক্যবদ্ধ, সম্মিলিত, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে যোগ্যতার ভিত্তিতে সংসদীয় প্যানেল ঘোষণা করতে পারে। এই মডেলটি স্বজনপ্রীতি ও Dynastic Rule-এর বিপরীতে মেধা, নৈতিকতা ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করবে।
বাবু কৃষ্ণ নন্দীর মনোনয়ন প্রতীকীভাবে এই বার্তা দেয় যে, জামায়াত যোগ্যতা এবং আদর্শিক সংহতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। বাবু কৃষ্ণ নন্দী ব্যক্তিগতভাবে তার ধর্মীয় বিশ্বাস ধরে রাখলেও, রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক নীতিতে তিনি কুরআন ও সুন্নাহর বিধান মোতাবেক সকল মানুষের জন্য কল্যাণকর নিয়ম-নীতির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। এই সম্মিলিত নেতৃত্ব গঠনের প্রচেষ্টা প্রমাণ করে যে, জামায়াত কেবল মুসলিম ভোট চাইছে না, বরং তারা ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের ভোট কালেকশন করার চেষ্টা করছে এবং সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পথে হাঁটছে। এতদিন যারা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটকে নিশ্চিত ধরে নিত, তারা এখন দেখছে সেই ‘ভোট ব্যাংক’ তাদের হাতছাড়া হওয়ার পথে। জামায়াতের এই পদক্ষেপে দেশের অন্যান্য প্রতিদ্বন্দি রাজনৈতিক দলগুলোর ‘গায়ে জ্বালা’ ধরার মূল কারণ আদর্শিক নয়, বরং রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাত।
দেশের মানুষ আজ চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, দুঃশাসন এবং স্বজনপ্রীতিমুক্ত একটি নৈতিক সরকার দেখতে চায়। সকল বর্ণ, ধর্ম ও সম্প্রদায়কে নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী একটি আদর্শ সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করুক-এটাই দেশের মানুষের সর্বোচ্চ প্রত্যাশা। ভারত উপমহাদেশের দেশসমূহের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী বাংলাদেশের সকল ধর্মের মানুষের সহাবস্থান ধরে রাখতে জামায়াতের আদর্শিক কর্মী বাহিনী অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই দলের নেতৃত্বে সম্মিলিত ও ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব যদি সত্যিই যোগ্যতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তবে এটি বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে, যা বাংলাদেশে গত ৫৪ বছরের আদর্শহীন দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক প্রতারণার বিপরীতে শান্তির এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক।