ড. শহীদুল ইসলাম
বর্তমান যুগে মানুষের খাদ্যাভ্যাস শুধু ক্ষুধা মেটানোর জন্য নয়, বরং সুস্থ জীবনযাপন নিশ্চিত করার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষ এখন এমন খাদ্যের প্রতি বেশি আগ্রহী হচ্ছে যা শরীরকে শুধু পুষ্টিই দেয় না, বরং বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধেও সাহায্য করে। এ প্রেক্ষাপটে নিউট্রাসিউটিক্যালস (Nutraceuticals) খাদ্যবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও দ্রুত বিকাশমান শাখা হিসেবে বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব পাচ্ছে। “নিউট্রাসিউটিক্যাল” শব্দটি মূলত “Nutrition” (পুষ্টি) এবং “Pharmaceutical” (ওষুধ) শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। এর দ্বারা এমন খাদ্য বা খাদ্যজাত উপাদানকে বোঝায় যা সাধারণ পুষ্টি সরবরাহের পাশাপাশি শরীরের সুস্থতা বজায় রাখতে এবং বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। ১৯৮৯ সালে মার্কিন চিকিৎসক Stephen L. DeFelice এ ধারণাটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন এবং নিউট্রাসিউটিক্যালসকে এমন খাদ্যভিত্তিক উপাদান হিসেবে ব্যাখ্যা করেন যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য চিকিৎসাগত উপকারিতা প্রদান করতে পারে।
যদিও নিউট্রাসিউটিক্যালস শব্দটি আধুনিক, কিন্তু এর মূল ধারণা মানবসভ্যতার বহু প্রাচীন ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। প্রাচীন গ্রীক চিকিৎসক Hippocrates বহু আগে বলেছিলেন- “খাদ্যই হোক তোমার ঔষধ এবং ঔষধই হোক তোমার খাদ্য।” প্রাচীন ভারতীয় আয়ুর্বেদ, চীনা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতি এবং বিভিন্ন লোকজ চিকিৎসায় খাদ্য ও ভেষজ উদ্ভিদকে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন- হলুদ প্রদাহ কমাতে, রসুন সংক্রমণ প্রতিরোধে, আদা হজম শক্তি বাড়াতে, মধু ক্ষত নিরাময়ে এবং তুলসি পাতা শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা উপশমে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। একইভাবে আমলকি, কালোজিরা, দারুচিনি ও মেথি বহু সংস্কৃতিতে স্বাস্থ্যরক্ষাকারী খাদ্য হিসেবে পরিচিত। যদিও এসব ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ছিল, তবুও প্রাথমিকভাবে সেগুলোর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ছিল না।
ঊনিশ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানের বিকাশের মাধ্যমে খাদ্য উপাদানের স্বাস্থ্যগত গুরুত্ব সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ধারণা তৈরি হয়। বিজ্ঞানীরা এ সময়ে বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ উপাদান আবিষ্কার করেন এবং দেখতে পান যে এগুলোর ঘাটতির কারণে বিভিন্ন রোগ দেখা দেয়। যেমন- ভিটামিন সি-এর অভাবে স্কার্ভি, ভিটামিন ডি-এর অভাবে রিকেটস এবং ভিটামিন বি১-এর অভাবে বেরিবেরি রোগ। একই সময়ে ফলমূল ও সবজিতে থাকা বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও জৈব সক্রিয় উপাদান নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। উদাহরণস্বরূপ, টমেটোতে থাকা লাইকোপিন, গাজরের বিটা-ক্যারোটিন, সবুজ চায়ের ক্যাটেচিন, আঙুরের রেসভেরাট্রল এবং বেরি ফলের ফ্ল্যাভোনয়েড শরীরকে ক্ষতিকর ফ্রি-র্যাডিক্যাল থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে এবং হৃদরোগ ও ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে খাদ্যবিজ্ঞানে “ফাংশনাল ফুড” বা কার্যকরী খাদ্যের ধারণা বিশ্বব্যাপী গুরুত্ব পেতে শুরু করে। বিশেষ করে Japan সরকার “Foods for Specified Health Use (FOSHU)” নামে একটি বিশেষ খাদ্য শ্রেণি চালু করে, যা নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য উপকারিতা প্রদান করে। এর ফলে এমন অনেক খাদ্য তৈরি হয় যেগুলোর সঙ্গে অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদান বা জৈব সক্রিয় যৌগ যুক্ত করা হয়। উদাহরণ হিসেবে প্রোবায়োটিক দই, ওটস, ভিটামিন সমৃদ্ধ দুধ, আয়রন সমৃদ্ধ সিরিয়াল, ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ কমলার জুস এবং ফাইবার সমৃদ্ধ ব্রেকফাস্ট সিরিয়াল উল্লেখ করা যায়। এসব খাদ্য শুধু পুষ্টিই সরবরাহ করে না, বরং শরীরের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম উন্নত করতে সাহায্য করে।
১৯৯০-এর দশকে নিউট্রাসিউটিক্যালস একটি বড় শিল্পখাতে পরিণত হয়। বিভিন্ন খাদ্য উপাদান থেকে সক্রিয় যৌগ পৃথক করে সেগুলো ক্যাপসুল, ট্যাবলেট বা পাউডার আকারে বাজারজাত করা শুরু হয়। যেমন- মাছের তেল থেকে প্রাপ্ত ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা হৃদস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী; রসুনের নির্যাস, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে; গ্রিন টি এক্সট্রাক্ট, যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে; প্রোবায়োটিক ক্যাপসুল, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নত করে; এবং জিনসেং বা হলুদের নির্যাস, যা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। এ সময়ে বিভিন্ন দেশে খাদ্য সম্পূরক পণ্যের নিয়ন্ত্রণের জন্য আইনগত কাঠামো তৈরি হয়, যেমন- Dietary Supplement Health and Education Act of 1994, যা যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্য সম্পূরক পণ্যের বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করে।
নিউট্রাসিউটিক্যালসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত আরেকটি ধারণা হলো ফুড সাপ্লিমেন্ট বা খাদ্য সম্পূরক। যদিও অনেক সময় এ দুটি শব্দ একই অর্থে ব্যবহার করা হয়, তবে বাস্তবে তাদের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। নিউট্রাসিউটিক্যালস মূলত এমন খাদ্য বা খাদ্য উপাদান যা স্বাভাবিক খাদ্যের অংশ হিসেবেই স্বাস্থ্য উপকারিতা প্রদান করে এবং অনেক ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। অন্যদিকে খাদ্য সম্পূরক হলো এমন পণ্য যা সাধারণ খাদ্যের ঘাটতি পূরণ করার জন্য অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদান হিসেবে গ্রহণ করা হয়। উদাহরণ হিসেবে ভিটামিন সি ট্যাবলেট, ক্যালসিয়াম ক্যাপসুল, আয়রন সাপ্লিমেন্ট, মাল্টিভিটামিন ট্যাবলেট, জিঙ্ক ট্যাবলেট এবং প্রোটিন পাউডার উল্লেখ করা যায়। এসব সাধারণত ট্যাবলেট, ক্যাপসুল বা পাউডার আকারে গ্রহণ করা হয় এবং মূল উদ্দেশ্য হলো শরীরে নির্দিষ্ট পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করা। অন্যদিকে ওটস, প্রোবায়োটিক দই, টমেটো, হলুদ, গ্রিন টি বা বাদামÑএসব খাদ্য স্বাভাবিকভাবেই নিউট্রাসিউটিক্যালস হিসেবে কাজ করতে পারে।
একবিংশ শতাব্দীতে নিউট্রাসিউটিক্যাল গবেষণা আরও উন্নত বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে নিউট্রিজেনোমিক্স, মাইক্রোবায়োম গবেষণা, খাদ্য বায়োটেকনোলজি এবং আধুনিক বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করে নতুন নতুন নিউট্রাসিউটিক্যাল উপাদান আবিষ্কার করা হচ্ছে। যেমন- প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক খাদ্য অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি করে, ডার্ক চকলেটের ফ্ল্যাভোনয়েড হৃদস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, বাদাম ও আখরোটে থাকা স্বাস্থ্যকর ফ্যাট মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা উন্নত করতে সহায়তা করে এবং সয়াবিনের আইসোফ্ল্যাভোন হরমোনজনিত ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, নিউট্রাসিউটিক্যালস খাদ্যবিজ্ঞানের এমন একটি ক্ষেত্র যা পুষ্টি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন তৈরি করেছে। মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষা, রোগ প্রতিরোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি সুস্থ জীবনযাপন নিশ্চিত করতে এ শাখার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং খাদ্য প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে নিউট্রাসিউটিক্যালস মানবস্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
লেখক: পুষ্টিবিদ ও প্রাবন্ধিক।