শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্র একে অপরের পরিপূরক। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি টিকে থাকতে পারে না। শিক্ষা মানুষকে স্বপ্ন দেখায়- বড় হওয়ার, নিজেকে বদলে দেয়ার, পৃথিবীকে বদলে দেয়ার। আর সেই স্বপ্নগুলো সম্ভাবনার আলো জাগায়। কিন্তু বাস্তবের মাটিতে পা না রাখলে সে স্বপ্ন আর বাস্তবায়িত হয় না। বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন হয় কর্মক্ষেত্রের, যেখানে শিক্ষার বীজ অঙ্কুরিত হয়, যেখানে জ্ঞান দক্ষতায় রূপ নেয়। তাই শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্র যেন একই নদীর দুই তীর-দু’পাশেই জীবন আছে, আছে সম্ভাবনার কোলাহল। অথচ দুঃখজনক সত্য হলো, এ দুইয়ের মাঝখানে নেই কোনো দৃঢ় সেতু। নেই এমন কোনো ব্যবস্থা, যা শিক্ষাকে সরাসরি কর্মের সঙ্গে যুক্ত করে দিতে পারে। এই দুইয়ের মধ্যে সংযোগ ভেঙে পড়ে, তখন শিক্ষা আর মুক্তির পথ থাকে না; তা পরিণত হয় দেয়ালে টাঙিয়ে রাখা একখানা সনদে। কাগজে ছাপা সেই সনদ তখন আর জীবনের লড়াইয়ে শক্তি জোগায় না। ফলে শিক্ষিত হয়েও মানুষ অসহায় হয়ে পড়ে। তার স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে বকুলের মতো ঝড়ে পড়ে, তখন সমাজ হারায় তার মূল্যবোধ সম্পদ-তারুণ্যের বিশ্বাস। এই বেদনাদায়ক সত্য আজ আর কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি আমাদের ঘর, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সবখানেই চোখে পড়ে। অসংখ্য শিক্ষিত তরুণের মুখে হতাশার হাতছানি। এই সংকটের কারণ ও পরিণতি অন্বেষণ করাই আলোচ্য নিবন্ধের উদ্দেশ্য।
একটি দেশ কতটা সভ্য, কতটা মানবিক ও কতটা আত্মনির্ভরশীল তা দেশটির শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালেই বুঝা যায়। যে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা যত শক্তিশালী ও যুগোপযোগী সে দেশ তত বেশি উন্নত ও সমৃদ্ধ। শিক্ষা ব্যতিত কোন জাতি সত্যিকার অর্থে সমৃদ্ধ হতে পারে না। শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন কোনো বিলাসিতা নয়; এটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার হাতিয়ার। একটি জাতি তার শিক্ষিত প্রজন্মকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে। বাবা-মা সন্তানের বইয়ের ব্যাগে ভর করে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনে, রাষ্ট্র শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ করে, ভবিষ্যত সুনাগরিক গড়ে তোলার প্রত্যাশায়। কিন্তু সেই স্বপ্নও আজ বাস্তবায়িত হচ্ছে না। কারণ শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের সমন্বয়ের বড়ই অভাব। একজন শিক্ষার্থী যখন ডিগ্রি হাতে নিয়ে চাকুরির প্রত্যাশায় দরজায় দরজায় ঘুরে বেড়ায় তখন মনের ভেতর প্রশ্ন জাগে-এই শিক্ষা তবে কিসের জন্য। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা মুখস্থনির্ভর ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক হওয়ায় সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে পরীক্ষার ফলাফলকে প্রাধান্য দেয়া হয়। যে যত বেশি মুখস্ত করতে পারে- সে তত বেশি মেধাবী- এই ভ্রান্ত ধারণা আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে লালিত হচ্ছে। ফলে আমরা সার্টিফিকেটধারী শিক্ষার্থী পাচ্ছি। কিন্তু কর্মক্ষেত্রের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ, সৃজনশীল সক্ষম মানুষ পাচ্ছি না। কর্মক্ষেত্রের জন্য শুধু ভালো ফলাফল নয়; প্রয়োজন দক্ষতা ও সক্ষমতা সম্পন্ন মানুষ।
শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড বলা হয়। কারণ একটি জাতির ভাগ্যকে উন্নয়নের উচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতে শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মেরুদণ্ড যেমন আমাদের শরীরকে সোজা ও স্থিতিশীল রাখে, তেমনিভাবে শিক্ষাও একটি জাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে ধাবিত করে। শিক্ষা মানে কেবল চাকরি নয়; শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো মানবিকতা ও নৈতিকতার বিকাশ ঘটিয়ে উন্নত সুনাগরিক তৈরি করা। শিক্ষা তখনই অর্থবহ হয় ওঠে যখন তা জীবনের সঙ্গে মিশে যায়, শ্রমের মর্যাদা শেখায় এবং কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতার সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর শক্তি জোগায়। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো- আমাদের দেশে শিক্ষা ও কর্মজগতের মাঝে একটি অদৃশ্য দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। এর ফলে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ শিক্ষাজীবন শেষ করেও কাক্সিক্ষত মানের কর্মসংস্থান পাচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ হাতে নিয়ে তারা যখন বাস্তব জীবনে প্রবেশ করে তখন তাদের শুনতে হয়-আপনার ডিগ্রি আছে, কিন্তু কাজ জানেন না। এ কথা শুনার পর একজন চাকুরি প্রত্যাশীর হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান দূরত্বের জন্য দায়ী কে? শিক্ষার্থী নাকি রাষ্ট্র? এ বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার। আমাদের দেশে বেকারের সংখ্যা বাড়ার পেছনে যতগুলো কারণ নিহীত আছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের দূরত্ব। প্রতিনিয়ত বেকারের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ সালে দেশে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৫ লাখ ৫০ হাজার যা ২০২৪ সালে বেড়ে প্রায় ২৭ লাখে দাঁড়িয়েছে। লন্ডনভিত্তিক ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) এর ভাষ্যমতে, বাংলাদেশে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের মধ্যে বেকারের হার প্রায় ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জন গ্র্যাজুয়েটের মধ্যে ৪৭ জনই বেকার। আবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী দেশের মোট বেকারের প্রায় ১২ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, দেশে প্রতিবছর কমপক্ষে ২০ লাখ মানুষ নতুন করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করে। তাঁদের মধ্যে ১৩-১৪ লাখের দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থান হয়, বাকিরা জীবিকার সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমান। ফলে গত দুই দশক ধরে দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৪ থেকে ২৮ লাখের মধ্যেই ঘোরাফেরা করছে। তবে এটাও লক্ষণীয় যে, দেশের অভ্যন্তরে তীব্র প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে যাঁরা চাকরি পাচ্ছেন, তাঁদের বড় একটি অংশই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা গ্র্যাজুয়েট।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা সনদ নির্ভর। আমরা সনদ অর্জন করি, কিন্তু অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারি না। অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণেই শিল্প কারখানা ও কর্পোরেট হাউসগুলো আস্থা রাখতে পারে না। ফলে তারা গুরুত্বপূর্ণ পদে বিদেশী কর্মীদের নিয়োগ দেয়। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার বিদেশী কর্মীরা নিয়ে যাচ্ছে। এটি আমার কথা নয়। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) এর প্রতিবেদনে এমনটিই উঠে এসেছে। আমাদের শিল্প কারখানার কর্ণধারা ব্যবসার স্বার্থে বিদেশী কর্মী নিয়োগ দিয়ে লাভবান হচ্ছে। এটা অপরাধ না। কিন্তু নৈতিকতার দৃষ্টিতে তা সমীচিন নয়। আমাদের সমস্যা পাঠ্যক্রম ও সিলেবাসে। সময়ের তুলনায় আমাদের পাঠ্যসূচি যুগোপযোগী নয়। বাপ-দাদার আমলের শিক্ষা পদ্ধতিই বহাল আছে। অথচ যুগোপযোগী শিক্ষা ছাড়া কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকা কঠিন। পৃথিবী যখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে প্রবেশ করেছে তখনও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ২০ বছর আগের সিলেবাস পড়ানো হচ্ছে। অর্থাৎ পড়ার সাথে কর্মক্ষেত্রের কাজের কোন মিল নেই। কর্মক্ষেত্রের বিষয়গুলো যদি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়ানো হতো তাহলে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের মাঝে দূরত বিরাজ করতো না।
সরকার যায় সরকার আসে। কিন্তু শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়ন হয় না; বিগত আওয়ামী সরকারের শাসনামলে আমরা অটো পাশের মহাউৎসব দেখেছি। তাছাড়া আমাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া শতভাগ স্বচ্ছ তা হলফ করে বলা যায় না। মেধা ও দক্ষতার চেয়ে পরিচয়, সুপারিশ কিংবা আনুগত্য বেশি মূল্য পায়। ফলে হাজারো শিক্ষার্থী দক্ষতা অর্জন করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যারা নিয়োজিত হন তারা সত্যিকার অর্থে শিক্ষার উন্নয়নের চাইতে স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোগত উন্নয়নে বেশি মনোযোগী হন। ফলে ক্ষমতাসীন শাসকরা বাজারের চাহিদা না বুঝেই ঢালাওভাবে পাশের হার কিভাবে বাড়ানো যায় সে চিন্তায় মগ্ন থাকে। দেশে প্রতিবছর কতজন স্নাতক, কতজন স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছে তার সঠিক কোন পরিসংখ্যান নেই। কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা আছে। কিন্তু সে পরিকল্পনা মোতাবেক কতজনকে কাজে নিযুক্ত করা যাবে সে পরিসংখ্যান নেই। চাহিদা এবং যোগানের সমন্বয় নেই। সরকার ইচ্ছে করলে প্রতি দুই বছর পর পর এ ব্যাপারে একটা জরিপ চালাতে পারে- দেশের প্রতিটি সেক্টরে আগামী ৫ বছরে কতজন লোকের কর্মসংস্থান করা যাবে, কী কী দক্ষতা লাগবে। সে অনুযায়ী স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচী নিরূপন করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আসনসংখ্যা নির্ধারণ করা যেতে পারে। এটা করতে পারলে অন্ধের মতো গ্র্যাজুয়েট তৈরি হওয়া বন্ধ হবে, বেকারত্বের অভিশাপ থেকে জাতি মুক্তি পাবে। এই সংকটের সমাধান কোনো একক উদ্যোগে কিংবা এক রাতের সিদ্ধান্তে করা সম্ভব নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যা, যার জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত আন্তরিক উদ্যোগ। সর্বপ্রথম দরকার যুগোপযোগী ও বাস্তবমুখী পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করা। যেখানে বাজারের চাহিদা, প্রযুক্তির পরিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের বাস্তবতা প্রতিফলিত হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার। শুধু নীতিপত্রে বা কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; এই সংস্কারের বাস্তব প্রয়োগ চোখে পড়তে হবে শ্রেণিকক্ষ থেকে কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত। যদি এই সংস্কার পরিকল্পিত ও আন্তরিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে আমাদের শিক্ষার্থীরা শুধু সনদের বোঝা বয়ে বেড়াবে না। তারা গড়ে উঠবে দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী ও কর্মক্ষম মানবসম্পদ হিসেবে।