মুসফিকা আন্জুম নাবা
পবিত্র রমযান মাস প্রত্যেক মুমিন হৃদয়ের বসন্তকাল। বসন্ত যেমন প্রকৃতিতে নতুনত্বের সঞ্চার করে তেমনি রমযান মুমিনের ঈমানি শক্তি এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে হৃদয়ের সকল গ্লানি মুছে ফেলে, অন্তরে আরো বেশী সজীবতার সঞ্চার করে। আর এ বরকতের মাসের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হচ্ছে লাইলাতুল কদর। আমাদের দেশে শবে কদর নামেই বহুল পরিচিত।
শবে কদর মূলত ফারসি শব্দ। যার অর্থ ভাগ্য নির্ধারণী রজনী। পবিত্র কুরআনের বহু স্থানে লাইলতুল কদর সম্পর্কে আয়াত রয়েছে, এমনকি কদর নামে কুরআনে একটি স্বতন্ত্র সূরা অবর্তীণ হয়েছে। মহান রাব্বুল আলামিন সূরা দুখানে বলেন, ‘শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের নিশ্চয় আমি এটি নাজিল করেছি বরকতময় রাতে; নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। সে রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয় আমার নির্দেশে। নিশ্চয় আমি রাসূল প্রেরণকারী। তোমার রবের কাছ থেকে রহমত হিসেবে; নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’
ইসলামে শবে কদরকে শ্রেষ্ঠ রাত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ মহামান্বিত রাতেই পবিত্র কুরআন নাজিল হয়। সূরা আল কদরে মহান রাব্বুল আলামিন বর্ণনা বলেছেন ‘নিশ্চয়ই আমি এটি নাজিল করেছি ‘লাইলাতুল কদরে’। তুমি কি জান কদরের রাত কী? কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও অধিক শ্রেষ্ঠ। এ রাতে ফেরেশতারা ও রুহ (জিবরাইল) তাদের রবের অনুমতিক্রমে সব সিদ্ধান্ত নিয়ে অবতরণ করে। (এ রাতে বিরাজ করে) শান্তি আর শান্তি-ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত।’ (সূরা কদর)
শবে কদর উম্মতে মুহাম্মদির জন্য এক বিশেষ নিয়ামত। হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর পূর্ববর্তী নবী-রাসুল এবং তাদের উম্মতগণ দীর্ঘায়ু লাভ করার কারণে বহু বছর আল্লাহর ইবাদাত করার সুযোগ পেতেন। এজন্য তাদের জীবনের দীর্ঘ সময় ইবাদতে কাটিয়ে দিতেন এবং কোনো প্রকার পাপ কাজও করেননি। এর বিপরীতে মুহাম্মদ (সা:)-এর অনুসারীদের গড় আয়ু কম হওয়ায় তাদের পক্ষে এতো ইবাদত করা সম্ভব নয়। এতে করে সাহাবীদের মাঝে আক্ষেপের সৃষ্টি হয়। এরই প্রেক্ষিতে মুমিনদের দুশ্চিন্তা দূর করতে মহান আল্লাহ তায়ালা সূরা কদর নাজিল করেন। এ মুমিনদের সুসংবাদ দেন এই বিশেষ রাতের যা হাজার রাত অপেক্ষা উত্তম। অতীতের গুন্নাহ খাতা মাফ করার বিশেষ রাত। শবে কদরের রাত সম্পর্কে আল্লাহ স্বয়ং ঘোষণা দিয়েছেন। তাই এ রাতের মাহাত্ম অপরিসীম। এ রাতে ইবাদত করা তিরাশি বছর চার মাস ইবাদত করার সমান। এছাড়া রাতে সৎ ও ধর্মপরায়ণ মুসলমানদের ওপর আল্লাহর অশেষ রহমত ও নেয়ামত বর্ষিত হয়। কদরের রাতের ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে রাসুল (সা:) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইমান ও একনিষ্ঠতা নিয়ে এ রাত্রি জাগরণ করবে, তার পূর্বের যাবতীয় পাপ ক্ষমা করে দেয়া হবে’। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা এ রাতকে গোপন করে রাখেন। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী উবাদা ইবনুস সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, একদা নবী (সা:) আমাদেরকে লাইলাতুল কদরের (নির্দিষ্ট তারিখ) অবহিত করার জন্য বের হয়েছিলেন। তখন দু’জন মুসলিম ঝগড়া করছিল। তা দেখে তিনি বললেন আমি তোমাদেরকে লাইলাতুল কদরের সংবাদ দিবার জন্য বের হয়েছিলাম, তখন অমুক অমুক ঝগড়া করছিল, ফলে তার (নির্দিষ্ট তারিখের) পরিচয় হারিয়ে যায়। সম্ভবত এর মধ্যে তোমাদের জন্য কল্যাণ নিহিত রয়েছে। তোমরা নবম, সপ্তম ও পঞ্চম রাতে তা তালাশ কর।
শবে কদরকে গোপন করার পিছনে অনেক মুহাদদিস মনে করেন, এ রাতের পুরুষ্কার লাভের আশায় কে কত বেশি সক্রিয় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এবং কত বেশি সচেষ্ট হয়, আর কে অবহেলায় ও আলসে ঘুমিয়ে রাত কাটায় এটা পরীক্ষা করার জন্যই আল্লাহ তা‘আলা এ রাতকে গোপন ও অস্পষ্ট করে রেখেছেন। এজন্য নবী করীম (সা:) সুনির্দিষ্ট করে বলেননি। আয়েশা (রাযি.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আল্লাহর রাসূল (সা:) রমযানের শেষ দশকে বেজোড় রাতে ইতিকাফ করতেন এবং বলতেন তোমরা রমযানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান কর’। এটি রমযানের বেজোড় রাতে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকায়, তিনি নিজেও রমযান শেষ দশ দিনের বিজোড় রাতগুলোতে ইবাদতে মশগুল থাকতেন। এ সম্পর্কে হাদিস শরীফে এসেছে যখন রমযানের শেষ দশক আসত তখন নবী (সা:) বেশি বেশি ইবাদতের প্রস্তুতি নিতেন এবং রাত্র জেগে থাকতেন ও পরিবার-পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন।
মূলত, কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার কারণেই লাইলাতুল কদর মহিমান্বিত ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয়েছে। এ রাতে পরবর্তী এক বছরের অবধারিত বিধিলিপি ব্যবস্থাপক ও প্রয়োগকারী ফেরেশতাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এতে প্রত্যেক মানুষের রিজিক অর্থাৎ মানুষের বয়স, মৃত্যু সহ জীবনের সকল কিছু পরিমাণ নির্দিষ্ট ফেরেশতাদের লিখে দেওয়া হয়। এ রজনিতে পরবর্তী বছরের ভাগ্য নির্ধারণ করা হয়। হাদিসে কদরের রাতের বিশেষ বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন, রাতটি গভীর অন্ধকারে ছেয়ে যাবে না। গরম বা শীতের তীব্রতা থাকবে না। মৃদুমন্দ বাতাস প্রবাহিত হতে থাকবে। সে রাতে ইবাদত করে, মানুষ অপেক্ষাকৃত অধিক তৃপ্তিবোধ করবে। কোন ঈমানদার ব্যক্তিকে আল্লাহ স্বপ্নে হয়তো তো জানিয়েও দিতে পারেন কিংবা ঐ রাতে বৃষ্টি বর্ষণ হতে পারে। সকালে হালকা আলোকরশ্নিরসহ সূর্যোদয় হবে যা হবে পূর্ণিমার চাঁদের মত। শুধু তাই নয়, এ রাতে পৃথিবীতে অসংখ্য ফেরেশতা নেমে আসে এবং তারা তখন দুনিয়ার কল্যাণ, বরকত ও রহমত কামনা করতে থাকে। অনেক রেওয়াতে এটা শান্তি বর্ষণের রাত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। একই সঙ্গে যে এ রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো, তাকে দুর্ভাগা আখ্যা দেওয়া হয়েছে। কদরের রাতে ইবাদত গুজার বান্দাদেরকে ফেরেশতারা জাহান্নামের আযাব থেকে মুক্তির বাণী শুনায়। হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) বর্ণনা করেন, ‘রমযান মাস এলে রাসুল (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশে বলতেন, তোমাদের কাছে এই মাস সমাগত হয়েছে, তাতে এমন একটি রাত রয়েছে, যা এক হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যে ব্যক্তি এ রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো, সে প্রকৃতপক্ষে সব কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত। একমাত্র (সর্বহারা) দুর্ভাগাই এ রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়।’
রাসুল (সা:) রমযানের শেষাংশে শবে কদর তালাশের জন্য রাতের পুরো অংশটাই ইবাদতে কাটিয়ে দিতেন। অন্যান্য সময় বিশ্রামের পাশাপাশি ইবাদত করতেন। কিন্তু এ সময় তিনি কুরআন তেলাওয়াত, নামাজ, যিকির, দোয়া ও তওবা মাধ্যমে রাত্রিযাপন করতে। মহানবী (সা:) দান-সাদকার বিষয়েও অধিক গুরুত্বারোপ করতেন।
কদরের রাত যেন কোনোভাবে হাতছাড়া না হয়, সেজন্য রসূল (সা:) ইতেকাফে থাকতেন। রাসুল (সা:) বলেন ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াব লাভের আশায় কদরের রাতে নফল সালাত আদায় ও রাত জেগে ইবাদত করবে আল্লাহ তার ইতোপূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেবেন।’
প্রত্যকে মুসলমানের উচিত শবে কদর তালাশ করা এবং রাসুল (সা:) এ সুন্নত অনুযায়ী আমল করা । জীবনের গুন্নাহগুলো মাফ করে নেওয়া এক সুবর্ণ সুযোগ আসে এই রজনীতে। নিজেদের জীবনের দু:খ, দুদর্শা থেকে পরিত্রাণ পেতে। আল্লাহর রহমতের আশা ও গজবের ভয়ভীতি নিয়ে খুশুখুজু ও বিনম্রচিত্তে ইবাদতে থাকা এ রাতের কর্তব্য। এ রাতে নিজে ইবাদতের পাশাপাশি পরিবার-পরিজনকে ইবাদতে উৎসাহিত করা উচিত।যেমনটি আমাদের প্রিয় নবী করিম (সা:) করেছেন। শবে কদরের দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ রাত। আর আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল। সূরা কাসাসে বলা হয়েছে ‘হে আমার প্রতিপালক! আমি নিজের আত্মার উপর জুলুম করেছি, অতএব আমাকে ক্ষমা কর। অত:পর আল্লাহ তাকে ক্ষমা করলেন, অবশ্যই তিনি ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু। আল্লাহর কাছে তওবা, ইস্তেগফার, যিকরের মাধ্যমে দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ রজনী শবে কদর।
লেখক : শিক্ষার্থী, জয়পুরহাট সরকারি মহিলা কলেজ, জয়পুরহাট।