মুন্সী আবু আহনাফ
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ঐতিহাসিক বিজয় শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়নি, এটি বাংলাদেশের জন্যও গভীর ভূ-রাজনৈতিক প্রশ্ন তুলে ধরেছে। ২৯৪ আসনের মধ্যে ২০৭টি আসন জয় করে বিজেপি ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। এই জয় পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলের ক্ষমতায় আসার ঘটনা। প্রশ্ন উঠছে; পশ্চিমবঙ্গের ২৭ শতাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভাগ্যে কী আছে? তিস্তার পানি কি আর কোনো দিন পাবে বাংলাদেশ? সীমান্তে হত্যা কি বন্ধ হবে? মাদক ও চোরাচালান কি নিয়ন্ত্রণে আসবে? আর দুই দেশের সম্পর্ক কোন দিকে যাবে?
এক. গত ২৩ ও ২৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে দুই দফায় অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৯৩ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়েছে। ৪ মে ফলাফল প্রকাশিত হয়। ভোটের হিসেবে বিজেপি পেয়েছে ৪৫.৮৪ শতাংশ ভোট, আর তৃণমূল পেয়েছে ৪০.৮০ শতাংশ। ফলাফলটিকে “ঐতিহাসিক” বলে অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, “জনতার শক্তি জয়ী হয়েছে এবং সুশাসনের রাজনীতি বিজয়ী হয়েছে।” তবে এই বিজয় নিয়ে বিতর্কও কম নয়। নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯০ লাখ নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল “বিশেষ নিবিড় সংশোধনী” বা এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। সমালোচকরা বলছেন, বাদ পড়া ভোটারদের একটি বড় অংশ মুসলমান ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। ফরেন পলিসি সাময়িকীতে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হুভার ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো অধ্যাপক সুমিত গাঙ্গুলি এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক শিবাশিস চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, “মুসলমানদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার থেকে শুরু করে ভোটার তালিকায় কারসাজি; এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ ভারতের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য একটি ভয়াবহ পূর্বলক্ষণ।” (Foreign Policy,, ১৪ মে ২০২৬)।
দুই. এখন প্রশ্ন পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের কী হবে? তারা কি সাম্প্রদায়িকতার শিকার আবারও হবে? পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি; রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ২৭ শতাংশ। ২৯৪টি আসনের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশিতে মুসলমান ভোটারদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। কিন্তু এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে সামনে রেখে বিজেপির নির্বাচনি প্রচারণা ছিল মূলত “হিন্দু ভোট সংহতকরণ”-এর উপর নির্ভরশীল। দ্য ওয়্যারের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মুর্শিদাবাদ, উত্তর ২৪ পরগনা, হাওড়াসহ একাধিক জেলায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ঘটনাগুলো বিজেপির পক্ষে ভোট আনতে কাজে লেগেছে। দলটি “হিন্দু অনিরাপত্তা” ও “তৃণমূলের তোষণনীতি”র বয়ান তৈরি করে ভোটারদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিল। ফলাফল প্রকাশের পরই রাজ্যজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন, মসজিদ ভাঙচুর, মুসলিম মালিকানাধীন দোকানে হামলা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি প্রদর্শনের খবর পাওয়া গেছে। বারাসাতের মোয়না এলাকায় “মসজিদ বাড়ি রোড” সাইনবোর্ড ভেঙে “নেতাজী পল্লী রোড” লাগানোর ঘটনা ঘটেছে। নিউ মার্কেট এলাকায় বুলডোজার দিয়ে মাংসের দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়ার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের ( (ICG)) বিশ্লেষক হাসান কিয়ান বলেছেন, “বিজেপি যেভাবে জয় পেয়েছে, তাতে মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ আরও বাড়বে কি না; এটা পর্যবেক্ষণে রাখা দরকার।” (The Diplomat, এপ্রিল ২০২৬)। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ও জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিজেপি নির্বাচনে গেছে। এই দুটি আইনের মূল চরিত্রই হলো মুসলমানবিরোধী; মুসলমানদের নাগরিকত্ব প্রমাণের বোঝা নিতে হবে, অথচ অন্য ধর্মাবলম্বীরা ছাড় পাবেন। ইতিহাসের দর্পণে দেখলে এটা নতুন কিছু নয়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা একটা দীর্ঘ প্রান্তিকতার মধ্যে বাস করছেন। বাম আমলের ৩৪ বছরে (১৯৭৭-২০১১) তাঁরা উপেক্ষিত ছিলেন। তৃণমূলের আমলে (২০১১-২০২৬) কিছুটা রাজনৈতিক স্বীকৃতি মিললেও সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নে তাঁরা পিছিয়েই রয়েছেন। এখন বিজেপির ক্ষমতায় আসা মানে, সেই প্রান্তিকতা আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা।
তিন. তিস্তা চুক্তি নতুন সম্ভাবনা না কি পুরনো ফাঁদ এই প্রশ্ন এখন ভূরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের? তিস্তা নদী হিমালয় থেকে সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কোটি কোটি কৃষকের জীবন-জীবিকা এই নদীর উপর নির্ভরশীল। ২০১১ সালে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ঢাকা সফরের সময় চুক্তি স্বাক্ষরের দ্বারপ্রান্তে এসেছিল। কিন্তু তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শেষ মুহূর্তে আপত্তি তুলে চুক্তি আটকে দেন। সেই থেকে তিস্তা বাংলাদেশ-ভারত কূটনীতিতে একটি অসমাপ্ত অধ্যায় হয়ে আছে। ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, “বিজেপির বিজয়ের ফলে দিল্লী ও কলকাতায় একই দলের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি প্রশাসনিক সমন্বয় বাড়াবে, এবং তিস্তা নিয়ে আলোচনার পথ খুলে দিতে পারে।” (The Daily Star, মে ২০২৬)। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডেও লেখা হয়েছে, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদায় তিস্তা চুক্তির পথের একটি বাধা সরিয়ে দিতে পারে।” তবে দ্য ডিপ্লোম্যাট-এ হাসান কিয়ান সতর্ক করে বলেছেন, “তিস্তা চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে দিলীø ও ঢাকার সম্পর্কের উপর, কে কলকাতায় ক্ষমতায় আছে তার উপর নয়।” তিনি আরও যোগ করেছেন, “২০১১ সালে দিলীø আসলেই চুক্তি করতে চেয়েছিল কি না; এটা স্পষ্ট নয়।” (The Diplomat,, এপ্রিল ২০২৬)। বাস্তবতা হলো, পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলে, যেখান দিয়ে তিস্তা বয়ে যায়, সেখানকার কৃষকদের সেচের পানির চাহিদা প্রচণ্ড। বিজেপির রাজ্য সরকারও স্থানীয় নির্বাচনি চাপ উপেক্ষা করে চুক্তিতে ন্যায্য হিস্যা দিতে পারবে কি না, সেটা বড় প্রশ্ন। একই সঙ্গে ডিসেম্বর ২০২৬-এ গঙ্গার পানি চুক্তিও মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য দুটো চুক্তিই এখন জরুরি।
চার. বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের গুলীতে বাংলাদেশী নাগরিক হত্যার ঘটনা দীর্ঘদিনের একটি কষ্টের ইতিহাস। মানবাধিকার সংগঠন “অধিকার”-এর তথ্য মতে, ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত হাজারের বেশি বাংলাদেশী সীমান্তে নিহত হয়েছেন। বিজেপি তাদের নির্বাচনি প্রচারণায় “অনুপ্রবেশ” বা “ইনফিলট্রেশন” ইস্যুকে কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছে। দলটির নেতারা প্রায়ই “অবৈধ বাংলাদেশী”দের বিষয়টিকে বেকারত্ব, অপরাধ ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন। এই ডিসকোর্স যদি শাসনে প্রতিফলিত হয়, তাহলে সীমান্তে বিএসএফের আরও কড়াকড়ি ও সহিংসতার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, “বিজেপির সীমান্ত নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি এবং ‘অনুপ্রবেশ’ ঠেকানোর বয়ান যদি নীতিতে পরিণত হয়, তাহলে সীমান্তে চাপ ও পুশ-ইন বাড়তে পারে।” বাংলাদেশের মানুষ চায় সীমান্তে শূন্য হত্যা। এটি কোনো অযৌক্তিক দাবি নয়। ১৯৭৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে স্বাক্ষরিত মৈত্রী চুক্তিতে দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা বলা হয়েছিল। সেই চেতনার সঙ্গে সীমান্তে গুলী মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
পাঁচ. বাংলাদেশে ইয়াবা ও অন্যান্য মাদকের সবচেয়ে বড় উৎস মিয়ানমার হলেও ভারত হয়ে আসা মাদকও কম নয়। বিশেষত ফেনসিডিল ও হেরোইনের বড় অংশ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে আসে। মাদক ও চোরাচালান রোধে দুই দেশের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। বিজেপির ক্ষমতায় আসা এক্ষেত্রে দুটো সম্ভাবনা রাখে। একদিকে, রাজ্য ও কেন্দ্র একই দলের হওয়ায় সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও কঠোর হতে পারে; যা মাদক ঠেকাতে সাহায্য করবে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কারণে কিছু চোরাচালান চক্র টিকে থাকার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আন্তরিক দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার বিকল্প নেই।
ছয়. এখন স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কোন দিকে? ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট ও গণহত্যাকারী শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একটি টানটান উত্তেজনার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ভিসা সেবা স্থগিত, বাণিজ্য বিধিনিষেধ, কূটনৈতিক টানাপোড়েন; এসব কিছু দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করেছে। তবে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বে নতুন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। বিখ্যাত সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাটের মতে, “পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে সীমান্ত নিরাপত্তা ও অভিবাসন বিষয়ক বয়ানে। বিজেপি ‘অনুপ্রবেশ’ ঠেকানোকে তার নির্বাচনি ম্যান্ডেটের কেন্দ্রে রেখেছে, যেটি পূর্ব সীমান্তের সঙ্গে বাংলাদেশের নাম জুড়ে দিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে।” বিবিএস নিউজের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নতুন ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগকে বাংলাদেশ ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছে। ত্রিবেদী বাংলার রাজনীতি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে পরিচিত, যা কূটনৈতিক যোগাযোগ সহজ করতে পারে। বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ বিজয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, চীনের প্রভাব মোকাবেলা করতে ভারত বাংলাদেশকে কাছে রাখতে চাইবে। দ্য ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, “তিস্তা নিয়ে কিছুটা অগ্রগতি দেখানো ভারতের কৌশলগত স্বার্থের জন্যও দরকার, যাতে বাংলাদেশ চীনের আরও কাছে না চলে যায়।”
সাত. ইসলামি মূল্যবোধ ও মুসলমানদের অধিকারে ভারত কোনো সময় দৃষ্টি দেয়নি বরং অধিকার ক্ষুন্ন করেছে। একটি নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে ভারত মুসলমানদেরকে তাদের নাগরিক হিসেবে মানতে চাইছে না বরং বলছে অবৈধ অনুপ্রেবেশকারী। যদিও ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে, একটি রাষ্ট্রের সংখ্যালঘু নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করা শাসকের নৈতিক দায়িত্ব। হযরত উমর (রা.)-এর বিখ্যাত উক্তি; “যে ব্যক্তি কোনো অমুসলিম নাগরিককে কষ্ট দেবে, আমি তার বিরুদ্ধে কিয়ামতের দিন বাদী হবো”; রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সর্বজনীন মানদণ্ড স্মরণ করিয়ে দেয়। ঠিক একইভাবে, ভারতের মুসলমানরাও সেদেশের নাগরিক এবং তাদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষিত হওয়া উচিত। আন্তর্জাতিক মুসলিম স্কলার শায়খ ড. ইউসুফ আল-কারযাভী (রহ.) তাঁর রচিত “ফিকহ আল-আকাল্লিয়্যাত আল-মুসলিমা” (মুসলিম সংখ্যালঘু ফিকহ) গ্রন্থে বলেছেন, “সংখ্যালঘু মুসলমানরা যেখানেই থাকুক, তাদের অধিকার আদায়ের জন্য শান্তিপূর্ণ পথে লড়তে হবে, এবং বৃহত্তর মুসলিম সমাজকে তাদের কথা বলতে বাধ্য।” (ফিকহ আল-আকাল্লিয়্যাত, পৃষ্ঠা ৪৭-৫২, দার আল-শুরুক, কায়রো, ২০০১)। বাংলাদেশ হিসেবে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব আছে ভারতের মুসলমানদের বিষয়ে সোচ্চার থাকার; তবে সেটা হতে হবে কূটনৈতিক ও শালীন পথে।
আট. বাংলাদেশের করণীয় হলো পরিস্থিতি যাই হোক, বাংলাদেশকে কিছু সুনির্দিষ্ট কৌশল নিতে হবে। প্রথমত, তিস্তাসহ অমীমাংসিত নদী সমস্যা সমাধানে নতুন উদ্যমে কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করতে হবে। মনে রাখতে হবে, গঙ্গার পানি চুক্তিও ডিসেম্বর ২০২৬-এ মেয়াদ শেষ হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, সীমান্ত হত্যার বিষয়টি দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় কেন্দ্রীয় স্থান দিতে হবে। “শূন্য হত্যা” লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ভারতকে জবাবদিহিতার মধ্যে রাখতে হবে। তৃতীয়ত, মাদক ও চোরাচালান রোধে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে কার্যকর তথ্য বিনিময় ও সমন্বয় জোরদার করতে হবে। চতুর্থত, ভারতের মুসলমানদের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে হবে, কিন্তু সেটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর ভঙ্গিতে নয়, বরং মানবাধিকারের সর্বজনীন মানদণ্ডের ভিত্তিতে। পঞ্চমত, কূটনৈতিক সম্পর্ককে শুধু দিলীø-কেন্দ্রিক না রেখে, নতুন কলকাতা সরকারের সঙ্গেও সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে হবে।
পরিশেষে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় বাংলাদেশের জন্য একটি জটিল বাস্তবতা তৈরি করেছে। একদিকে সুযোগ; তিস্তা আলোচনার নতুন দরজা খোলার সম্ভাবনা। অন্যদিকে ঝুঁকি; মুসলিম বিদ্বেষ, সীমান্তে বাড়তি চাপ ও “অনুপ্রবেশ” বিরোধী কড়াকড়ির আশঙ্কা। বাংলাদেশের সরকারকে এই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে ঠান্ডা মাথায় মোকাবেলা করতে হবে। ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি, স্পষ্ট জাতীয় স্বার্থের ভাষ্য এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ রক্ষা; এই তিনটি মিলিয়েই বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, দুর্বল প্রতিবেশীর কথা শক্তিশালী প্রতিবেশী ততক্ষণই শোনে, যতক্ষণ সে যুক্তি, কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন নিয়ে কথা বলে। বাংলাদেশকে সেই পথেই হাঁটতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক।