বর্তমান মুহূর্তে বিশ্ব রাজনীতিতে ব্যাপকভাবে আলোচনার জন্ম দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সঙ্গে সৃষ্ট যুদ্ধ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিমান বাহিনী যৌথভাবে ইরানের রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক হামলা শুরু করে। বেশ কিছুদিন ধরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরান আক্রমণের হুমকি দিয়ে আসছিল। তবে সে হুমকি যে সত্যি সত্যি বাস্তবে পরিণত করা হবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকগণ তা অনুমান করতে পারেননি। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ বাহিনীর ইরান আক্রমণ বিশ্ববাসিকে বিস্মিত এবং হতভম্ভ করেছে। প্রথম দিনের ইসরাইল ও আমেরিকার যৌথ বিমান আক্রমণে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য নিহত হয়েছেন। একই হামলায় ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন রাজনীতিবিদ ও সামরিক কর্মকর্তাও নিহত হয়েছেন। যুদ্ধ কখনোই শান্তির বিকল্প হতে পারে না। আর যুদ্ধের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করাও সম্ভব নয়। একমাত্র স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করা গৌরবজনক। অন্য সব যুদ্ধ সতর্কতার সঙ্গে পরিত্যাজ্য। যুদ্ধ ক্ষেত্র নয়,আলোচনার টেবিলেই শাস্তি স্থাপতি হতে পারে। যুদ্ধ শুধু ধ্বংসই ডেকে আনে।
ইরাক যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এটাই সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান। ৮ মাস আগে ইরান-ইসরাইল ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরান আবারো ইসরাইল ও মার্কিন বাহিনীর যৌথ আক্রমণের শিকার হলো। আগের বার ইরান এবং ইসরাইল সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে সমর্থন ও সামরিক সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে প্রক্সিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। ইরান আক্রমণের শিকার হয়ে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে সরাসরি ইসরাইলের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষতি করে। ইসরাইল সে সময় ভাবতেই পারেনি তারা বাইরের কোন রাষ্ট্র কর্তৃক সরাসরি আক্রমণের শিকার হতে পারে। একজন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরাকে বলেছেন, ইসরাইলের সঙ্গে একটি যৌথ সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে ইরানে আক্রমণ চালানো হয়েছে। তাদের কিছু নির্দিষ্ট লক্ষ্য রয়েছে, এগুলো অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চলতে থাকবে। তাদের লক্ষ্যগুলো কি তা স্পষ্ট করে বলা হয়নি। সাধারণভাবে মনে করা হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হচ্ছে ইসরাইলের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। ইরান সব সময়ই বলে আসছে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির উদ্দেশ্য শান্তিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন সময় প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করা সত্ত্বেও ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন থেকে সরে আসতে সম্মত হয়নি।
ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প নিয়ে জেনেভায় আলোচনা চলছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সম্মিলিতভাবে ইরানে আক্রমণ পরিচালনা করে। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র মিলিতভাবে ইরানে যে হামলা পরিচালনা করছে তা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাদের এ সামরিক পদক্ষেপ সারা বিশ্বকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। করোনা উত্তর বিশ্ব অর্থনীতির উত্তরণ পর্বে শুরু হওয়া ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। তার রেশ কাটতে না কাটতেই আবারো বিশ্ব এক নতুন সঙ্কটে পতিত হয়েছে। ইসরাইল ও মার্কিন নৌ ও বিমান বাহিনী ইরানে হামলা চালানোর ফলে বিশ্ব অর্থনীতি মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পতিত হয়েছে। নিশ্চয়ই মনে থাকার কথা রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার ফলে বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। রাশিয়া জ¦ালানি তেল সরবরাহ বন্ধ অথবা কমিয়ে দিয়েছিল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ¦ালানি তেলের মূল্য রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছিল। এক পর্যায়ে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ¦ালানি তেলের মূল্য ১৩৫ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। এর আগে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ¦ালানি তেল ৬০ মার্কিন ডলারে বিক্রি হচ্ছিল। ইরান আক্রান্ত হবার আগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ¦ালানি তেল ৬৫ মার্কিন ডলারে বিক্রি হচ্ছি। কয়েকদিনের মধ্যেই তা ৮০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ¦ালানি তেলবাজারে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ইরান মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস’র(আইআরজিসি) প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইব্রাহিম জাবারি বলেছেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কোন জাহাজ এ প্রণালী অতিক্রম করার চেষ্টা করলে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হবে। মার্কিন বাহিনী ইরানে হামলা চালানোর কারণ হরমুজ প্রণালীর দুই পাশে ৭ শতাধিক ওয়েল ট্যাঙ্কার আটকা পড়ে আছে। এতে নাবিকসহ মোট ২০ হাজার জন আটকে আছে। হরমুজ প্রণালী হচ্ছে পারস্য উপসাগরের একটি সরু প্রবেশ পথ,যার দৈর্ঘ ১৬৭ কিলোমিটার। এর মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ¦ালানি তেল সরবরাহ করা হয়। ইরান এ প্রণালীর উত্তর দিকে অবস্থিত। কৌশলগত কারণে ইরান হরমুজ প্রণালীর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে থাকে। সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, কাতার বাহরাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত এই পথ দিয়েই তাদের জ¦ালানি তেলে বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে থাকে। একটি সূত্র মতে, চলামান ইরান সঙ্কট যদি একমাস স্থায়ী হয় তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ¦ালানি তেলের মূল্য ট্রিপল ডিজিটে উন্নীত হতে পারে। আর যুদ্ধ যদি ৬মাস স্থানীয় হয় তাহলে জ¦ালানি তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ১৪০ মার্কিন ডলারে পৌঁছে যেতে পারে।
বাংলাদেশ জ¦ালানি সঙ্কটে থাকা একটি দেশ। আমাদের নিজস্ব জ¦ালানি সম্পদ বলতে একমাত্র প্রাকৃতিক গ্যাসকেই বুঝায়। কিন্তু সেখানেও স্বল্পতা সঙ্কট রয়েছে। প্রতিদিন ৪০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে মাত্র ২৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। এর মধ্যে আমদানিকৃত এলএনজি ২৬০ কোটি ঘনফুট। বাংলাদেশ বছরে ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টন জ¦ালানি তেল আমদানি করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। বর্তমানে বাংলাদেশে অপরিশোধিত জ¦ালানি তেল ও এলএনজি’র যে মজুত আছে তা দিয়ে কয়েক সপ্তাহের চাহিদা মেটানো সম্ভব হতে পারে। এরপরই শুরু সঙ্কট। সম্বাব্য পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে সরকার সবাইকে জ¦ালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী হবার পর পরামর্শ দিয়েছেন। এ মুহূতে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের জ¦ালানি তেল ও অন্যান্য জ¦ালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাশ্রয়ী হতে হবে। পাশাপাশি বিকল্প সূত্র থেকে জ¦ালানি তেল আমদানির উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। চীন এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সহায়তা করতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র দেশ কর্তৃক ইরানের জ¦ালানি তেল আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর চীন তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে ইরান থেকে বিপুল পরিমাণ জ¦ালানি তেল আমদানি করে তাদের রিজার্ভ পূর্ণ করেছে। বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে চীনের চমৎকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তাই উদ্যোগ নিলে চীন থেকে তুলনামূলক কম মূল্যে জ¦ালানি তেল আমদানির মাধ্যমে সঙ্কট নিরসনের চেষ্টা চালানো যেতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জনশক্তি রপ্তানি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রেরিত রেমিট্যান্স আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার দ্বিতীয় উৎস। বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি আমদানির ক্ষেত্রে সবার শীর্ষে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ৬টি মুসলিম দেশ। ইরান সঙ্কটের কারণে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি খাত মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে চলেছে। ৭০ লাখ বাংলাদেশীর কর্মসংস্থান অনিশ্চত হয়ে পড়েছে। গত অর্থবছরে(২০২৪-২০২৫) বাংলাদেশ মোট ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স অর্জন করেছে,যা এযাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আয়। চলতি অর্থবছরে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু ইরান সঙ্কটের কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যেতে পারে। পণ্য রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি গত ছয় মাস ধরেই নিম্নমুখি রয়েছে। ইরান সঙ্কটের কারণে আমাদের রপ্তানি আয় ব্যাপকভাবে কমে যাবার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশী পণ্যের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। যুদ্ধের কারণে নিশ্চিতভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী পণ্য রপ্তানি কমে যাবে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও বাংলাদেশী পণ্য রপ্তানি কমে যাবে। এখনো পণ্য রপ্তানি খাত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে শীর্ষে অবস্থান করছে। কিন্তু এক অর্থে জনশক্তি রপ্তানি খাত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। কারণ পণ্য রপ্তানি খাতে যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয় তার অন্তত ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য এবং ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানিতে পুরনায় বিদেশে চলে যায়। ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে এ খাতের মূল্য সংযোজনের হার তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু জনশক্তি রপ্তানি খাতে যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয় তার প্রায় পুরোটাই জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করে। কারণ এ খাতের জন্য কোন কাঁচামাল আমদানি করতে হয় না। উপরন্ত প্রায় দেড় কোটি বাংলাদেশী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থান করছে। এতে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বেকার সমস্যার উপর চাপ কমছে।
বর্তমানে ইরান-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে সঙ্কট চলছে তার প্রেক্ষিতে আমাদের জ¦ালানি তেল আমদানি এবং পণ্য ও জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে বিকল্প চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। পণ্য ও জনশক্তি রপ্তানির জন্য নতুন নতুন গন্তব্য খুঁজে বের করতে হবে।
এতদিন ডোনাল্ড ট্রাম্প বলতেন,আমেরিকা ফার্স্ট। আর এখন বলছেন, ইসরাইল ফার্স্ট হলে আমেরিকা ফার্স্ট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইসরাইলের স্বার্থ রক্ষার জন্যই এমন একটি অনাকাক্সিক্ষত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। আর যুদ্ধে জড়িয়ে তারা বিশ্বকে ভয়াবহ বিপদের মুখোমুখি করেছে। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এ যুদ্ধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ১১/১২ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছিল, জুন মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতির হার ৭ শতাংশে নেমে আসবে। তাদের সে প্রত্যাশা দূরাশায় পরিণত হতে চলেছে।
এ অনাকাক্সিক্ষত যুদ্ধ যাতে অচিরেই বন্ধ করা হয় তার উদ্যোগ নিতে হবে। বিশ্ববাসীকে এ ব্যাপারে সোচ্চার হতে হবে।
লেখক : সাবেক ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক।