মুসফিকা আন্জুম নাবা
সুজলা, সুফলা আমাদের এ প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ নানাদিক থেকে বৈচিত্র্যপূর্ণ। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিশ্ব দরবারে আমাদেরকে এক অনন্য সাধারণ মর্যাদা দিয়েছে। কবির ভাষায়, এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্ম ভূমি’। মূলত, বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ, যেখানে বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্র যেমন উপকূলীয়, মিঠাপানি, স্থলভাগ, পাহাড়ি এবং কৃষি-নির্ভর পরিবেশে বিপুল সংখ্যক উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে। এখানে প্রায় ৯৮২ প্রজাতির বন্যপ্রাণী রয়েছে, যার মধ্যে স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ, পাখি এবং উভচর প্রাণী অন্তর্ভুক্ত। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বনভূমি ধ্বংস এবং পরিবেশ দূষণের মতো কারণে এসব জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। তারপরও বিদেশী পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশের আবেদন এখন পর্যন্ত অটুটই রয়ে গেছে। আমাদের পর্যটন শিল্প এখন এক অতি সম্ভবনাময় শিল্প।
বিদেশী পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশ যেমন পছন্দের, ঠিক তেমনিভাবে অতিথি পাখিদের কাছেও আকর্ষণীয়। মূলত, আমাদের দেশের জীববৈচিত্র্যের অন্যতম অংশীদার হচ্ছে অতিথি পাখি; যা আমাদের জীববৈচিত্র্যকে অনেকটাই সমৃদ্ধি দিয়েছে; করে তুলেছে আকর্ষণীয়। বছরের নির্দিষ্ট একটি সময়ে এসব অতিথির উপস্থিতিতে মুখরিত হয়ে ওঠে আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ। মূলত, শীতের শুরুতে এসব পাখিরা আসে দল বেধে; ঝাঁকে ঝাঁকে। আসে সুদূর উত্তর গোলার্ধ সহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। তারপর শীতের শেষে ওরা আবার এ অঞ্চল ছেড়ে ডানা মেলে দেয় উত্তরের দিকে বা নিজেদের কাক্সিক্ষত গন্তব্যে। এদেরকে কেউ বলে পরিযায়ী পাখি, কেউ বলে যাযাবর পাখি; কেউবা বলে অতিথি পাখি। মূলত, এসব পাখিকে পর্যটক পাখি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়।
আমাদের দেশে অতিথি পাখিরা আসে প্রধানত সাইবেরিয়া, উত্তর ইউরোপ, হিমালয় পর্বত ও তিব্বত অঞ্চল থেকে। শীতকালে আমাদের দেশে আসা অতিথি পাখিদের মধ্যে রয়েছে বুনো হাঁস, খঞ্জনা, ওয়ার্বলার, হাড়গিলা, স্নাইপ বা কাদাখোঁচা, বক, সারস, কোকিল প্রভৃতি। এরা আমাদের দেশের ঝোপ-জঙ্গল, মাঠ-ঘাট এবং জলাশয়ে বিচরণ করে। অতিথি পাখিরা অনুকূল পরিবেশের সন্ধানে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়। এমনকি হাজার হাজার মাইল দূরে উড়ে চলে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য। সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার, এরা নির্ভুলভাবে দিক নির্ণয় করতে পারে। সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে একটুও ভুল হয় না। যা মিরাকল হিসাবেই বিবেচনা করা হয়।
অতিথি পাখিরা কখনো ধনুকের মতো, কখনো ইংরেজি ‘ভি’ অক্ষরের মতো ত্রিকোণাকারে, কখনো একগাছি ফুলের মালার মতো উড়ে চলে দূর থেকে দূরে, বহুদূরে। এসব পাখি নিজেদের খেয়াল-খুশিমতো বিভিন্ন দেশে অবস্থান করে; ভ্রমণ করে বিশ্বের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। এ দূরত্ব কয়েক শ’ মাইল থেকে শুরু করে কয়েক হাজার মাইল পর্যন্ত হতে পারে। উড়ে চলার সময় বিভিন্ন ভূমিচিহ্ন যেমন নদীনালা, পাহাড়, জঙ্গল প্রভৃতি মনে রাখে। পাখিবিদদের মতে, এ বিশাল দূরত্ব পাড়ি দিতে পাখিরা তিনটি ক্ষমতা ব্যবহার করে। সেগুলো হচ্ছে সূর্য কম্পাস, নক্ষত্র কম্পাস এবং অভ্যন্তরীণ ঘড়ি। দেহের ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে পাখিরা সহজেই বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার তারতম্য অনুভব করতে পারে এবং সে অনুযায়ী সেখানে অবস্থান করে।
মূলত, শীতের শুরুতে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে, বিশেষ করে সাইবেরিয়া থেকে বাংলাদেশের ছোট-বড় বিভিন্ন জলাশয়ে আসতে থাকে অতিথি পাখি। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, এসব অতিথিদের প্রতি আমরা সদয় আচরণ বা আপ্যায়ন করার পরিবর্তে তাদের সাথে বৈরি আচরণই করে থাকি। এসব পাখিরা পর্যটনে এসে নানাবিধ প্রতিকূলতার শিকার হোন। এমনকি বন্দী হয়ে বা জীবন দিয়ে এদেরকে প্রায়াশ্চিত্যও করতে হয়। মূলত, কথিত শৌখিন ও পেশাদার পাখি শিকারিরা বন্দুক, বিষটোপ, জাল ও বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ পেতে এসব পাখি নিধন করে। অতিথি তথা জীবের প্রতি এমন নির্মম ও নিষ্ঠুর আচরণ কোনভাবেই কাক্সিক্ষত নয়।
আমাদের দেশে অতিথি পাখি শিকার বিষয়ে নানাবিধ আলোচনা-সমালোচনা দীর্ঘদিনের। পরিবেশবিদরা এ বিষয়ে সব সময় সোচ্চার ভূমিকা পালন করে এসেছেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একটি আদেশ ও নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। কিন্তু সে নির্দেশনা বরবরই উপেক্ষিত হয়ে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা দেশের সর্বোচ্চ আদালতের এ আদেশকে যথাযথভাবে সম্মান প্রদর্শন করেন নি। মূলত, প্রয়োজনীয় গণসচেতনতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লিপ্ততা এবং উদাসীনতার কারণেই আমরা অতিথি পাখিদের প্রতি সঠিক আচরণ করতে পারছি না। এবার শীতের শুরুতে এর কোন অন্যথা হচ্ছে না। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হাওড় হাকালুকিতে প্রতিবারের মতো এবারও বিপুল পরিমাণে অতিথি পাখির সমাগম ঘটেছে। হাওড়ের ছোট-বড় ২৩৮টি বিলেই অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে। অতিথি পাখির মধ্যে বালিহাঁস, চখাচখি, বাটুল, শামখুল, পানকৌড়ি, শামুকভাঙ্গা, সরাল, লেহেঞ্জা, গিরিয়া হাঁস, টিকি হাঁস, খুনতে হাঁস, গাংচিল, বক প্রভৃতি পাখি বিভিন্ন দেশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে আসতে শুরু করেছে। ২০০৪ সাল থেকে হাকালুকি হাওড়ে মাছ ও পাখির অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার কারণে অতীতের তুলনায় হাওড়ে অতিথি পাখির আগমন বাড়ছে। পাখিবিশেষজ্ঞ ড. ইনাম আল হক পাখিশুমারি করে হাকালুকি হাওড়ে ৬১ প্রজাতির অতিথি পাখি, এ হাওড়ে আসছে বলে নিশ্চিত করেন। অতিথি পাখি আমাদের দেশের অনেক বড় একটি সম্পদ, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, শিকারিদের ভয়াবহ ছোবল থেকে মুক্ত হতে পারছে না পাখিগুলো। এসব পাখি নিধনের কারণে একদিকে জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ফসলি জমিতে ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ বাড়ছে। পাখিরা শুধু প্রকৃতির শোভা বর্ধন করে না, ভারসাম্যও রক্ষা করে। পোকামাকড় খেয়ে এরা কৃষকের যথেষ্ট উপকারও করে থাকে। পরোক্ষভাবে এরা উৎপাদন বাড়াচ্ছে বলা যায়। কিন্তু একশ্রেণির দায়িত্বহীন ও কথিত সৌখিন শিকারী এসব পাখিদের সাথে বৈরি আচরণ করার কারণে একদিকে যেমন প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে; অন্যদিকে হুমকীর মুখে পড়ছে জীববৈচিত্র্য। যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণী রক্ষা আইন ও ২০১২ সালের বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে দণ্ডের বিধান রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পাখি নিধনের সর্বোচ্চ শাস্তি এক বছরের জেল, এক লাখ টাকা দণ্ড বা উভয় দণ্ড। একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি হলে অপরাধীর দু’বছরের জেল, দু’লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব আইনের প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না। অতিথি পাখি আমাদের জলাশয়গুলোর সৌন্দর্য যেমন বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে, পাশাপাশি এটি প্রকৃতির মূল্যবান সম্পদও বটে। ফলে আইনের ভঙ্গুর প্রয়োগ, অপপ্রয়োগ ও উদাসীনতার কারণে হুমকীর মুখে পড়ছে আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।
অতিথি পাখি শুধু আমাদের সম্পদ নয় বরং বৈশ্বিক সম্পদ। তাই এসব অতিথির অবাধ বিচরণ ও অভয়ারণ্য নিশ্চিত করা প্রত্যেক সচেতন মানুষের কর্তব্য। কিন্তু আমরা সে দায়িত্ব পালনের বরাবরই ব্যর্থ হয়েছি। তাই অতিথি পাখি নিধন বন্ধ করতে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। এ বিষয়ে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রচারণা বাড়ানো দরকার। পাখি নিধনের মূল হোতাদের পাকড়াও করতে প্রশাসনের সজাগ দৃষ্টিও থাকা জরুরি। অন্যথায় বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য হুমকীতে পড়বে।
সার্বিক দিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, আমাদের দেশে শীত মৌসুম শুরু হলে শীতপ্রধান দেশগুলো থেকে অতিথি পাখিরা এসে আশ্রয় নেয় বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায়। বাংলাদেশ উষ্ণতম জলবায়ু অধ্যুষিত এলাকা। তাই অতিথি পাখিরা বেঁচে থাকার একটি নিরাপদ পরিবেশ হিসেবে হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এখানে ছুটে আসে। কিন্তু এ দেশেও তারা নিরাপদে থাকতে পারছে না। কিছু অসাধু ব্যক্তি নির্বিচারে হত্যা করছে তাদের। বিষটোপ ও ফাঁদ পেতে শিকার করা হচ্ছে এসব পাখি। অতিথি পাখি নিধনের ফলে হুমকিতে পড়েছে জীববৈচিত্র্য। পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্যও।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায়ও এবার এসেছে অসংখ্য অতিথি পাখি। অতিথি পাখি শিকার, বেচাকেনা আইনত নিষিদ্ধ। কিন্তু সে আইন মানছে না কসবা উপজেলার অসাধু পাখি শিকারীরা। সেখানে বিষটোপ দিয়ে অতিথি পাখি মারা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, পাখি নিধন বন্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু পাখি নিধন মোটেই বন্ধ হয়নি বরং এর উৎসবই চলছে এখন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে টেকসই সুফল পাওয়া যাবে না। এর জন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগ দরকার। প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ন করাও জরুরি। আর অপরাধী পাকড়াও করতে অভিযান চালাতে হবে নিয়মিতভাবে। অতিথি পাখি শিকার বন্ধ করতে মানুষের মধ্যে সচেতনতাও তৈরি করতে হবে।
যারা প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা প্রাণিকুল ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করা দরকার। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলছেন, অতিথি পাখিরা শুধু পরিবেশের ভারসাম্যই রক্ষা করে না, এরা বীজের বিস্তরণ ও পরাগায়ন ঘটিয়ে ফসল উৎপাদনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। কিন্তু এসব বিষয়ে অবগত নয় মানুষ। কেউ আইন অমান্য করে পাখি শিকার করলে তার জেল-জরিমানা হতে পারে। আইনটি সম্পর্কে মানুষকে জানাতে হবে। আইন অমান্য করলে যে শাস্তি পেতে হবে সেটা প্রচার করতে হবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, জয়পুরহাট সরকারি মহিলা কলেজ, জয়পুরহাট।