আবুল খায়ের নাঈমুদ্দীন

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কখনোই উন্নত মানের শিক্ষা ব্যবস্থার আওতায় পড়ে না। না ঠিক মতো কোনো অভিভাবক ছিলো, না সরকার পরিবর্তনেও শিক্ষার দিকে কারো সুনজর ছিলো। কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে ব্যবসার জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। খুব ভালো ব্যবসাও হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের জ্ঞান কতটুকু বাড়লো বা কমলো তা নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যথা নেই। খুব ভালো রেজাল্ট দেখে দেখে ভর্তি করানো হয় আর অভিভাবকদের চেষ্টায় ভালো রেজাল্ট হয় স্কুল বা কলেজ সুনাম অর্জন করে। এমন অনেক কেজি স্কুল আছে তারা অভিভাবকদের সন্তুষ্টির জন্য শিশুদেরকে নাম্বার বাড়িয়ে দিয়ে স্কুলে ধরে রাখেন। কোন কারণে অন্য স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দিলে বা কোনো প্রতিযোগিতায় গেলে এসব শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়ে। এমন ধরনের স্কুলগুলো অনেকাংশে অতি দায়িত্বশীল দেখাতে গিয়ে শুক্রবারও বিভিন্ন উসিলায় শিক্ষকও শিক্ষার্থীদেরকে স্কুলে নিয়ে আসেন। অথচ মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে দেখেছি স্কুল খোলার দিন তারা বাচ্চাদের ইউনিফর্মসহ পার্কে ঘুরাতে নিয়ে এসেছে। অর্থাৎ এটাও পড়ালেখার একটা অংশ। তাহলে শুক্রবার কেন বাচ্চারা স্কুলে আসবে? আমি এমন স্কুল কলেজ চাই না। তাই কিছু পরামর্শ রাখবো। আমার মতে এই ধারা থেকে বেরিয়ে আসার দুটো মাধ্যম রয়েছে।

এক. সরকার কর্তৃক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ।

দুই. শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ও কাজ ।

সরকার কর্তৃক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের কাজ সমূহ :

১. উন্নত মানের সিলেবাস প্রবর্তন। এমন সিলেবাস প্রবর্তন করতে হবে যেন জাতি কিছু ফলাফল দেখতে পায়। আগেকার সময়ে সহজ এবং সুন্দর সুন্দর সমাজ উন্নয়নমূলক কবিতা প্রবন্ধ পাঠ্য করা হতো তা সবাই মুখে মুখে বলতে পারতো। সেসব পড়ায় সমাজও উন্নত হতো। যেমন কবি নজরুলের সংকল্প কবিতা, আমি হবো সকাল বেলার পাখি,, বা

পল্লী কবি জসিম উদ্দিনের সবার সুখে হাসবো আমি কাঁদবো সবার দুঃখে,, সিলেবাস প্রণয়নে খেয়াল রাখতে হবে আমাদের দেশীয় লেখকগণ যেন প্রধান্য পায়। তাদের আদর্শিক লেখা জাতি পড়বে এবং তাদেরকে চিনবে। ভিনদেশি লেখকদের লেখা দিয়ে সিলেবাস পূর্ণ করার কোনো যৌক্তিকতা নেই বলে মনে করি। শুনেছি বাম রাজনীতিবিদদের লোকেরা আজীবন সেখানে বসে আছেন তাদের পছন্দের সিলেবাস করতে। সম্পূর্ণ নতুন ভাবে ভাবতে হবে। নতুন শতাব্দীর লেখদেরকে এগিয়ে আনতে হবে।

২. যথা সময়ে পরীক্ষা গ্রহণ। যথা সময়ে পরীক্ষা গ্রহণ করে শিক্ষার্থীদেরকে মুক্তি দিতে হবে। যেমন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নব্বইয়ের দশকে যেমন ৫ বছর সেশনজটে ছিলো এখনো তাই। এটাকে কি উন্নয়ন ধরতে পারি? বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণকে যথা সময়ে ক্লাস ও পরীক্ষা নিতে হবে। ছুটি নিয়ে বিদেশ গমন থেকে দূরে রাখতে হবে। এসএসসির কেন্দ্রীয় পরীক্ষা জানুয়ারীতেই করতে পারলে ভালো হবে। এইচএসসিকে ফেব্রুয়ারীতে শেষ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা আরো এগিয়ে আনতে হবে। কোনো সেশনজট থাকতে পারবে না।

৩. নকলমুক্ত শিক্ষার পরিবেশ গ্রহণ করা। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে একটা চমক দিয়েছিলেন শিক্ষা ব্যবস্থাতে। মনে আছে তিনি হেলিকপ্টারে করে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে মোটামুটি পরীক্ষাকে নকলমুক্ত করতে চেষ্টা করেছিলেন, সেই ধারাবাহিকতা পরে আর থাকেনি। আমাদের জাতি গঠনে নকলমুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা না হলে জাতি কিছুই পাবে না। আগেকার সময়ে এক গ্রামে একজন পাশ করতো তাকে সবাই দেখতে যেতো। সে সব বিষয়ে জ্ঞানী হতো, সব পরীক্ষায় পাশ করতো। এবং সে সময়ে একটি শিক্ষার্থী পাশ করা মানে দেশ একটি সম্পদ পাওয়া। এখন পাশ করে বোঝা হচ্ছে। না ক্ষেত খামারে কাজ করতে পারছে না বিদেশ গিয়ে লেবারী করতে পারছে। এমন শিক্ষার প্রয়োজন নেই। এমন শিক্ষা মা বাবারা চায় না। যারা পাশ করবে তারা যেন চাকুরীতে ইন্টারভিউ দিলে পাশ করে এবং তাদের যেন চাকুরী হয়। যারা পাশ করার উপযুক্ত নয় তারা যেন আগেভাগে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে অন্যান্য কর্মের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ব্যাংক ডাকাতি শিখতে না হয়। নার্সিং বা ডাক্তারির মতো কেউ যেন বেকার না থাকে। প্রয়োজনে এল এম এফ কোর্সটিও সিলেবাসে সংযুক্ত করা যেতে পারে।

৪. শিক্ষকগণের বদলি ব্যবস্থা থাকতেই হবে। শিক্ষকগণের বদলির ব্যবস্থা না থাকায় তারা চাকুরিতে যাতায়াতে এবং আবাসিকে থাকতে বেশ সমস্যায় পড়তে হয়। আমার মতে প্রত্যেক শিক্ষককে ব্যাংকের মত বদলী করা আবশ্যক। এখনো এমন শিক্ষকরা আছেন যারা তাদের নিজস্ব এলাকায় থাকার কারণে বিভিন্ন রকমের ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে জড়িত হয়ে পড়েছেন। একজন শিক্ষক বহুদিকে লক্ষ্য রাখলে তিনি সাধারণত ভালো শিক্ষা দিতে পারবেন না, তাই তাদেরকে দূরে বদলির ব্যবস্থা করা হোক যারা বিভিন্ন জেলায় আছেন নিজ জেলা থেকে অনেক দূরে থেকে কাজ করেন তাদেরকে নিজ জেলায় চাকরি করার সুযোগ দেওয়া হোক। তবে বিভিন্ন থানায় বদলি যোগ্য।

৫. যথাযথ ছুটির ব্যবস্থা করা। ব্যাংকগুলিতে যে রকম ছুটির ব্যবস্থা রয়েছে সপ্তাহে দুই দিন আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় সে রকম হলে ভালো। দুই দিন রাখা হোক শিক্ষক এবং ছাত্র ও শিক্ষার্থী তাদের মন মানসিকতা ভালো থাকবে। পড়াশোনা ভালো হবে তাদেরকে ছুটি দিয়ে পড়াশোনা উন্নত করা হোক।

৬. উচ্চ বেতন প্রদান করা যাতে কোনো শিক্ষক অন্য কোন লাইনে আয়ের পথ খুঁজতে না হয়। শিক্ষকদের বেতন কাঠামো সব সময় উন্নত থাকা উচিত। বিভিন্ন দেশে এই অবস্থাটি বিরাজমান। শিক্ষকদের সম্মান সর্বোচ্চ। শিক্ষকরা যদি বেতনের জন্য টাকার জন্য বিভিন্ন রকমের কাজ করতে হয় তাহলে তারা কিভাবে শিক্ষার উন্নয়নে চিন্তা করবেন? একজন শিক্ষক বাড়িতে পড়াশুনা করবেন নাকি অর্থ উপার্জনের জন্য অন্য কাজে চিন্তা করবেন তাই সম্মান জনক বেতন থাকা উচিত।

শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজ সমূহ :

১. শিক্ষকগণ বাড়ি থেকে পড়া রেডি করে আসবেন। শিক্ষকগণ বাড়ি থেকে পড়া রেডি করে না আসলে টেবিলে বসে বই দেখে দেখে পড়ালে সেই পড়ায় কখনো উন্নতি হবে না। যারা ভালো শিক্ষক তারা বাসায় বা বাড়িতে নিজেরাই স্টাডি করেন তখন ভালো পড়াতে পারেন। তাই শিক্ষকদেরকে বাড়িতে পড়ে আসার জন্য ব্যবস্থা করতে হবে।

২. ক্লাসের পড়া ক্লাসেই মুখস্ত করাতে হবে। শিক্ষার্থীদেরকে পড়ার ক্লাসেই মুখস্ত করার জন্য শিক্ষকের ভূমিকা অন্যতম। শিক্ষকগণ যদি নিজে পড়া মুখস্ত করে আসেন এবং মুখস্ত ক্লাস দেন তাহলে শিক্ষার্থীরা যেমন উৎসাহিত হবে তেমনি পড়ার সারমর্মটা তাদের মাথায় সহজেই ক্লাসেই ঢুকে যাবে। এজন্য একজন শিক্ষককে বিচক্ষণ দৃষ্টি রাখতে হবে। যেন অবশ্যই শিক্ষার্থীরা ক্লাসে পড়া বুঝে নেয়, তাহলে তো বাড়িতে গিয়ে পড়ার জন্য তেমন কষ্ট করতে হবে না। একটাবার পড়া দেখলেই পেরে যাবে। বিশেষ করে ওই শিক্ষার্থীরাই বইকে ভয় পায়, যারা ক্লাসে পড়া বুঝে না সুতরাং শিক্ষকের কাজ পড়াকে সহজ করে বুঝিয়ে দেওয়া।

৩. নিয়মিত টিউটরিয়ালের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষার দিকে আটকে রাখা। নিয়মিত বিভিন্ন কাজ দিয়ে শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাজে লাগিয়ে রাখা যেন তারা নানা বাড়িতে বেড়ানো থেকেও শিক্ষা ব্যবস্থাকে আনন্দদায়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।

৪. তাদের সার্বিক নিরাপত্তা দেয়া। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সুবিধা ও অসুবিধায় পড়লে শিক্ষকগণ তাদেরকে নিরাপত্তা ও দিক নির্দেশনা দিবেন। বিশেষ করে মেয়েদের স্কুল কলেজে আসা-যাওয়া এবং বখাটে ছেলেদের থেকে দূরে রাখা এটি যেন নিশ্চিত হয় তাহলে মেয়েরা উৎসাহিত হবে। শিক্ষার্থীরা যেন শিক্ষকদেরকে মা বাবার মতো নিরাপদ শ্রদ্ধা ও আন্তরিক মনে করে।

৫. নিয়মিত শিক্ষামূলক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান জারি রাখা। যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা হয় যেমন গান গজল পাঠ প্রতিযোগিতা বিতর্ক প্রতিযোগিতা ইত্যাদি চলে সেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা চৌকস হয় এবং তারা বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার যোগ্য হয়ে ওঠে। এসব প্রতিযোগিতা আরো একটি বিষয়ে স্পষ্ট হয় সেটি হল একজনের জ্ঞান সবার মাঝে বিতরণ করার সুযোগ হয় কত রকম প্রতিভা একটি শিক্ষার্থীর মধ্যে থাকতে পারে তা সকল শিক্ষার্থী জানতে পারে যেমন স্কুল লেভেলে ইংরেজি বিতর্ক প্রতিযোগিতা মাদ্রাসাগুলিতে আরবি বিতর্ক প্রতিযোগিতা তাতে করে কোন শিক্ষার্থী দেশি বিদেশি কোথাও কারো সাথে কথাবার্তা বলতে কোন কর্মে গেলে বিপাকে পড়তে হবে না শিক্ষার সাথে সাথে বাহ্যিক জ্ঞান প্রদান আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান সময়ের অন্যতম দাবি।

এবার আসি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার বিষয়ে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে অঘোষিত কোটা থাকে যা তাদের পছন্দ মতো ভর্তি করানো হয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক কোটা। এটা যেন না থাকে। আমার মতে পোষ্য কোটাও বাতিল হওয়া উচিত।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখা প্রয়োজন। সেটা হলো আমার শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন অফিসিয়ালী জটিলতায় উচ্চ শিক্ষায় বিদেশ যেতে পারে না। এই পথটি ড্রাইভিং শেখানোর মতো সহজ হোক। যেন সব শিক্ষার্থীর যোগ্যতা ও সামর্থ থাকলেই উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশ যেতে পারে। আমাদের অনেক শিক্ষার্থী নিয়ম ও ওয়েব এড্রেসই খুঁজে পায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতারিত হয়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এর শাখা খুলে তাদের মাধ্যমে সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দেয়া উচিত।

শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় মালয়েশিয়া থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। আশা করি তিনি মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে নৈতিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করবেন এবং জাতিকে আরো ভালো কিছু উপহার দিবেন।

লেখক : সাবেক অধ্যাপক ও প্রবন্ধকার।