মানুষ যখন সমাজবদ্ধ হয়েছে, তখন থেকেই প্রতিবেশীর পরিচয় পেয়েছে। প্রতিবেশী ভালো হতে পারে, মন্দ প্রতিবেশীরও অভাব নেই সমাজে। তবে মানুষ কামনা করে ভালো প্রতিবেশী। প্রতিবেশীর প্রতি মানুষের কিছু কর্তব্য আছে, সুখে-দুখে প্রতিবেশীর পাশে থাকতে হয়। প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে নিজে পেটপুরে খাওয়া ভালো প্রতিবেশীর লক্ষণ নয়। আর প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া, তার অধিকার হরণ করা গুণাহের কাজ, অপরাধমূলক কাজ। এমন কাজের জন্য তো মানুষ সমাজবদ্ধ হয়নি। অথচ সমাজে এমন কাজের উদাহরণই বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফলে আমাদের সমাজ মানবিক সমাজ হয়ে ওঠেনি। ‘কেয়ারিং সোসাইটি’ তথা দরদী সমাজ থেকে আমরা অনেক দূরে অবস্থান করছি।

মানুষের প্রতিবেশী আছে, প্রতিবেশী আছে রাষ্ট্রেরও। মানুষ উত্ত্যক্ত হলে, ক্ষতিগ্রস্ত হলে স্থান পরিবর্তন করতে পারে, প্রতিবেশীকে বর্জন করতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রের সে সুযোগ নেই। রাষ্ট্রকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পাশেই থাকতে হয়। ফলে প্রতিবেশী রাষ্ট্র মন্দ হলে, আগ্রাসী হলে, দুর্বল রাষ্ট্রকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ব্যক্তির মত রাষ্ট্র প্রতিবেশী পছন্দ বা বর্জন করতে পারে না। তা হলে দুর্বল বা ছোট রাষ্ট্রগুলো কি প্রতিবেশী বড় ও আগ্রাসী রাষ্ট্রের জুলুম, শোষণ ও নিপীড়ন সইতেই থাকবে? নাকি ছোট রাষ্ট্রগুলোরও করার মত বিষয় রয়েছে? ছোট রাষ্ট্রও তো বড় হয়ে উঠতে পারে। আবার অনেকগুলো ছোট রাষ্ট্র এক হয়েও তো বড় হয়ে উঠতে পারে। আসলে মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে হলে করণীয় নির্ধারণ করতে হয়, হতে হয় প্রোডাকটিভ। আফসোস আর হতাশা ব্যক্ত করার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। অপরের দোষ ধরার চাইতে নিজেকে দোষমুক্ত করার কাজটাই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। আগ্রাসী রাষ্ট্র যে শুধু দুর্বল রাষ্ট্রকে ছোট করে তা নয়, এমন রাষ্ট্রের বিকৃতমনা দাম্ভিক শাসকরা নিজ রাষ্ট্রের ভেতরও বিভাজন সৃষ্টি করে, সংখ্যালঘু ও দুর্বলদের হেয় করে, ছোট করে এবং এক ধরনের উগ্রতা ও উত্তেজনা সৃষ্টি করে রাখে। রাষ্ট্রে থাকে না স্বাভাবিক ও সঙ্গত পরিবেশ। আমরা তেমন এক প্রতিবেশী রাষ্ট্র পেয়েছি, যার নাম ভারত।

২৩ ডিসেম্বর ঢাকার একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘ভারতের মুসলমানদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা’। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার সম্প্রতি সরকারি অনুষ্ঠানে মুসলিম নারী চিকিৎসকের হিজাব প্রকাশ্যে টেনে খুলে ফেলে ভারত সরকারের ক্ষমতা কাঠামোর প্রচ- ইসলাম বিদ্বেষী চরিত্রের প্রমাণ দিয়েছেন। হিজাব পরিহিত নবনিযুক্ত ওই চিকিৎসক তার নিয়োগপত্র নিতে এসেছিলেন। মুখ্যমন্ত্রীর আচরণের ভিডিওটি পরে যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। একজন মুখ্যমন্ত্রীর ঘৃণার এমন প্রকাশ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ২০১৫ থেকে ২০২৫-এ এক দশকে ভারতে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ধারাবাহিক ও কাঠামোগত রূপ নিয়েছে। সরকারিভাবে ধর্মীয় কারণে নিহতের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান প্রকাশ না করা হলেও সংবাদমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন ও স্বাধীন ট্র্যাকারগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করলে একটি উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া যায়, আর তা হলো-সহিংসতার ধরন বদলেছে; কিন্তু লক্ষবস্তু হিসেবে মুসলমানরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। ভারতের জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরো (এনসিআরবি) কিংবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের ডেটায় সাম্প্রদায়িক সহিংকতার সামগ্রিক সংখ্যা থাকলেও ধর্মভিত্তিক নিহতের আলাদা হিসাব নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হয় না। এতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতার প্রকৃত মাত্রা সরকারি পরিসংখ্যানে অস্পষ্টই থেকে যায়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে-এটা কি কেবল প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা, নাকি রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব? কারণ, ধর্মভিত্তিক ডেটা প্রকাশ করলে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, কারা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।

প্রতিটি হত্যার ঘটনায় মানুষের জীবন, পরিবার, স্বপ্ন ও নির্যাতনের প্রহর লুকিয়ে থাকে। দাদরিতে মোহাম্মদ আখলাক, আলওয়ারে পেহলু খান, ঝাড়খ-ে তাবরেজ আনসারি-তারা কেবল নাম নন; তারা এমন উদাহরণ, যাদের পিটিয়ে মেরে ফেলা যায় এবং পরে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কলকাঠিতে আর বিচার হয় না। ভারতে মোদির শাসনামলে গত এক দশকে মুসলমান সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতার যে ধারা লক্ষ্য করা গেছে, তাকে আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। গত এক দশকের বিশ্লেষণে দেখা যায়, মুসলমানদের ওপর সহিংসতার কিছু সুনির্দিষ্ট প্যাটার্ন রয়েছে।

হামলার প্রধান কারণগুলো সাধারণত গরু জবাই বা গরুর গোসত পরিবহনের অভিযোগ, বিতর্কিত ‘লাভ জিহাদ’, ধর্ম অবমাননা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো অপতথ্য। এছাড়া ধর্মীয় শোভাযাত্রার রুট বা সময় নিয়ে উত্তেজনা, মুসলিম ব্যবসায়ীদের বয়কট, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিবিদদের উসকানিমূলক বক্তব্য ও সামাজিক মাধ্যমে বিদ্বেষমূলক মন্তব্য ভারতীয় সমাজে সহিংসতাকে উসকে দেয়। কিছু ক্ষেত্রে মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে আইনের অপপ্রয়োগের অভিযোগও উঠেছে। এখন প্রশ্ন জাগে, বিদ্বেষ ও উগ্রতার এমন চাষাবাস ভারতের সমাজে কেমন বৃক্ষ উৎপাদন করছে? এসব বিষবৃক্ষের বিষফল কি ভারতকে এগিয়ে নিতে কোনো সাহায্য করবে? এর মন্দ প্রভাব শুধু ভারতে নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ সাম্প্রদায়িক হিংসা-বিদ্বেষ ও উগ্রতা থেকে মুক্ত। তাদের ধর্মে এসব বিষয় নিষিদ্ধ। তারা বিশ^াস করেন, মানুষ তার নিজ নিজ ধর্ম পালনে স্বাধীন; এ ক্ষেত্রে জবরদস্তি চলে না। তবে কিছু ষড়যন্ত্রকারী ও অপরাধী মানুষ তো সমাজে থাকে। তারা কখনো কখনো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টা করে থাকে। তবে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের অবস্থান এর বিপরীতে। ফলে অপরাধীদের হাত গুটিয়ে নিতে হয়। ভারতের সরকার ও সরকারি দিলের ভূমিকা কিন্তু ভিন্ন। ফলে দেশটিতে সাম্প্রদায়িক হিংসা-বিদ্বেষ ও হামলার ঘটনা বেড়েই চলেছে। এখন খৃস্টানদের ওপরও হামলা চলছে।

সারাবিশে^ যখন খ্রীস্টানরা আনন্দ আয়োজনে ব্যস্ত, তখন এবার ভারতে বড়দিনের আনন্দে নেমে এসেছে কালো মেঘের ছায়া। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে উগ্র হিন্দুরা হামলা চালালো খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের ওপর। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, বড়দিন উপলক্ষে গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দিল্লির এক গির্জায় গিয়ে প্রার্থনা করলেন। অথচ তাঁর দল ও সরকারের সমর্থক উগ্র হিন্দুত্ববাদীগোষ্ঠীর সদস্যরা দেশের বিভিন্ন রাজ্যে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের ওপর আক্রমণ করলো, ধর্ম পালনে বাধা দিলো। এমন দ্বিচারিতা কেন? আগে ভারতে মুসলমানদের ওপর উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের সাম্প্রদায়িক হামলা, জুলুম-নির্যাতনের ব্যাপকতা লক্ষ্য করা গেছে; এখন তা শুরু হলো খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের ওপরও। এমন আচরণের মাধ্যমে উগ্র হিন্দুত্ববাদী আরএসএস এবং শাসকদল বিজেপি কী এমন বার্তাই দিতে চাচ্ছে যে, ভারতে অন্য ধর্মাবলম্বীদের মানবাধিকার বলতে কিছু থাকবে না। এমন বাস্তবতায় ভারত নিজেদের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলে দাবি করবে কোন বিবেচনায়? মোদি সরকারের আমলে ভারতের সমাজে ও রাজনৈতিক অঙ্গনে যে উগ্র কর্মকা- চলছে, তাতো ভারতের সাংবিধানিক বয়ানের সাথে সাংঘর্ষিক, তারপরও ওসব কর্মকা- কেমন করে চলছে? মোদি সরকার কি অর্পিত সাংবিধানিক কর্তব্য পালনে আগ্রহী নয়? আর ‘বৈচিত্র্যের ঐক্য’ দর্শনের কথাও কি ভুলে গেছে নরেন্দ্র মোদির সরকার?

বড়দিনে ভারতে বড় আক্রমণ চালানো হয়েছে বিজেপি শাসিত উত্তর প্রদেশ, রাজস্থান, আসাম ও হরিয়ানায়। অবাক ব্যাপার হলো, এ ধরনের ন্যক্কারজনক হামলার ব্যাপারে সাধারণ প্রতিবাদটুকু পর্যন্ত করেনি বিজেপি। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো নিন্দা জানানো হয়নি। বিবৃতি দেয়ার সৌজন্যও প্রকাশ করা হয়নি। হামলাকারী কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, বরং দিল্লির আম আদমি পার্টির (এএপি) নেতাদের বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশ এফআইআর দাখিল করেছে। অভিযোগ, দিল্লির সাবেক শাসক দলের (এএপি) নেতারা খ্রীস্টানদের ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করেছেন। ভারতে বিজেপির রাজনীতিতে এখন এ ধরনের চাতুর্যই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, নরেন্দ্র মোদির আমলে ভারতে খ্রীস্টানদের ওপর হামলা বেড়েছে। এমন হামলায় বিভিন্ন সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আসাম রাজ্যের নলবাড়িতে একটি খ্রীস্টান মিশনারি স্কুলে বড়দিনে তা-ব চালায় হিন্দুত্ববাদী বজরং দল। এ দল ও বিশ^ হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) বিভিন্ন রাজ্যে বড়দিন উদযাপনের বিরুদ্ধে উগ্র অবস্থান নেয়। একই ধরনের ঘটনা ঘটে ’২৪ ও ২৫ ডিসেম্বর দেশের বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে। তারা বিপণি বিতান, স্কুল, দোকান, এমনকি উৎসবমুখর মানুষদের ওপরও হামলা চালায়।

খ্রীস্টানদের ওপর হামলার ঘটনায় ক্ষুব্ধ সংসদ সদস্য শশী থারুর বলেছেন, খ্রীস্টানদের পাশে প্রত্যেকের দাঁড়ানো উচিত। তিনি বলেন, ‘ঐতিহ্যের ওপর যখন আক্রমণ নেমে আসে, তখন শুধু খ্রীস্টানরাই নয়, আক্রান্ত হই আমরা সবাই।’ শশী থারুর আরও বলেন, কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন নেতৃত্বের উচিত এ ধরনের আক্রমণের বিরুদ্ধে সরব হওয়া। শশী থারুর তো আহ্বান জানালেন, কিন্তু সেই আহ্বানে সাড়া নেই। বরং বিজেপি শাসিত উত্তরাখ-ের হরিদ্বারে গঙ্গার ধারে রাজ্য পর্যটন দফতর পরিচালিত এক হোটেলে বড়দিনের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। নরেন্দ্র মোদির আমলে ভারতে খ্রীস্টানদের ওপর আক্রমণের ঘটনা বেড়ে গেছে। ইভানজেলিক্যাল ফেলোশিপ অব ইন্ডিয়ার (ইএফআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে খ্রীস্টানদের ওপর নির্যাতন ও আক্রমণের ১৭৭টি ঘটনা ঘটেছিল। ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয় ৩০০টি।

অলইন্ডিয়া খ্রীস্টান কাউন্সিল জানিয়েছে, ২০১৬ সাল থেকে ভারতে প্রতি ৪০ ঘণ্টায় একটি করে আক্রমণের ঘটনা ঘটছে খ্রীস্টানদের ওপর। পারসিকিউশন রিলিফ নামের একটি ভারতীয় সংস্থার হিসেবে, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত খ্রীস্টানদের ওপর আক্রমণের হার বেড়েছে ৬০ শতাংশ। ২০২২ সালের প্রথম সাত মাসে ভারতে মোট ৩০০টি ঘটনায় খ্রীস্টানরা আক্রান্ত হয়েছেন। পরিসংখ্যান আরো আছে। মুসলমানদের ওপরও আক্রমণের মাত্রা বেড়েই চলেছে। প্রশ্ন হলো, সংখ্যালঘুদের ওপর হিন্দুত্ববাদীদের উগ্র আচরণ ও আক্রমণ কি ভারতের জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে? মোদি মহোদয় কি বিষয়টি বুঝতে অক্ষম?