মো: আল আমিন হোসাইন
গণতন্ত্রকে বলা হয় জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য। এ শাসনব্যবস্থার প্রাণভোমরা হলো নির্বাচন। একটি রাষ্ট্রে যদি সুষ্ঠু অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তবে সেখানে গণতন্ত্র শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু যদি নির্বাচন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে যদি ভোটাররা আস্থা হারিয়ে ভোটকেন্দ্রে না যায়, যদি রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ না থাকে-তাহলে সে রাষ্ট্রের গণতন্ত্র ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। আজকের বিশ্বে বহু দেশেই গণতন্ত্র নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, আর বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়।
বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুধু ভূখণ্ড স্বাধীন করার সংগ্রাম ছিল না, ছিল মানুষের ভোটাধিকার ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। স্বাধীনতার পর সংবিধানে জনগণের সার্বভৌমত্ব ও ভোটাধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়। ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় নির্বাচন হয়, যেখানে জনগণের বিপুল অংশগ্রহণ দেখা যায়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে দেখা যায়-গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। সামরিক শাসন, রাজনৈতিক সংকট, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। নব্বইয়ের দশকের গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সামরিক শাসনের পতন হয় এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা ঘটে। তবে এরপরও প্রতিটি নির্বাচনের আগে ও পরে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, সহিংসতা, পক্ষপাতিত্ব ও ভোট কারচুপির অভিযোগ উঠেছে। ফলে জনগণের আস্থা অনেকাংশে নষ্ট হয়েছে।
এ নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রধান চ্যালেঞ্জর মধ্যে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, নির্বাচন কমিশনকে অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। কমিশনের স্বাধীনতা, নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয় প্রায় প্রতিটি নির্বাচনের সময়।
দ্বিতীয়ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে সহনশীলতার ঘাটতি রয়েছে। শাসকদল ও বিরোধী দলের মধ্যে আস্থা নেই। ক্ষমতায় থাকা দল নির্বাচনকে ক্ষমতা ধরে রাখার মাধ্যম হিসেবে দেখে, আর বিরোধীদল নির্বাচনকে ক্ষমতা দখলের একমাত্র পথ বলে মনে করে। আলোচনার বদলে সংঘাতই যেন রাজনীতির নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তৃতীয়ত কয়েকটি নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ব্যাপকভাবে কমেছে। অনেক মানুষ মনে করে-ভোট দিলেও ফল আগেই ঠিক হয়ে আছে। এ অনাস্থা গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক সংকেত। যদি জনগণই ভোটকেন্দ্র এড়িয়ে চলে, তবে নির্বাচনের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং বাংলাদেশের নির্বাচনে অর্থের প্রভাব স্পষ্ট। ধনী প্রার্থীরা কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ভোট কেনার চেষ্টা করে। পাশাপাশি পেশিশক্তি ব্যবহার করে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভয় দেখানো, কেন্দ্র দখল করা বা জাল ভোট দেওয়া-এসব অভিযোগ বারবার ওঠে। এতে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীরা সুযোগ পান না। এছাড়া একটি নির্বাচনের সুষ্ঠুতা অনেকাংশে নির্ভর করে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর। কিন্তু যদি তারা নিরপেক্ষ না থেকে কোনো পক্ষকে সুবিধা দেয়, তাহলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হয়।
বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে নির্বাচন সাধারণ একটি প্রক্রিয়া। সেখানে জনগণ স্বাভাবিকভাবেই ভোটকেন্দ্রে যায় এবং তাদের ভোট গণনা স্বচ্ছভাবে হয়। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় নির্বাচন প্রায়শই সংঘাত, সহিংসতা এবং প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়।
বাংলাদেশের নির্বাচনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর সবসময় থাকে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ বা যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আগ্রহী। তাদের রিপোর্টে প্রায়শই নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আবার সরকার এসবকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখে। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গণতন্ত্রের মান নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
তাই গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে। নির্বাচন যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে প্রকৃত অর্থে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন হয়-সে ব্যবস্থা করতে হবে। গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার একমাত্র পথ হলো অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন। নির্বাচন মানে কেবল ভোটের দিন নয় নির্বাচন মানে একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় যদি সব পক্ষ আস্থা রাখতে পারে, তবে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে। অন্যথায় নির্বাচন ও গণতন্ত্র দুটোই জনগণের আস্থা হারাবে। গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হলে সরকার, বিরোধী দল, নির্বাচন কমিশন, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ-সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।