আমাদের জাতীয় অর্থনীতি অনেক আগেই ছন্দ হারিয়েছে। স্বৈরাচারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার তা মেরামতের চেষ্টা করলেও তারা পুরোপুরি সফল হতে পারেনি। ইতোমধ্যেই বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠন করেছে। সঙ্গতভাবেই নতুন সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে। তাই নতুন সরকারকে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন ও জাতীয় অর্থনীতিতে ছন্দ ফিরিয়ে আনতে স্বল্প মেয়াদি, মধ্য মেয়াদি ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নতুন সরকারের এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো। কারণ, নির্বাচনোত্তর নানাবিধ কারণেই সরকারের খরচের চাপ ক্রমশ বাড়ছে। এমতাবস্থায় জাতীয় অর্থনীতিকে ছন্দে ফেরাতে হলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে সরকারের আয় বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। একই সাথে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে কৃচ্ছতা সাধনও জরুরি।

বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত আছে। সংস্থাটি ৪৭০ কোটি টাকার ঋণের শর্ত হিসেবে প্রতিবছর জিডিপির আধা শতাংশের বেশি অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের শর্ত দিয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি। অন্যদিকে নতুন সরকারকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জনে পাঁচ মাসে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা আদায় করতে হবে। সংশোধিত বাজেট অনুসারে, চলতি অর্থবছরে এনবিআরকে ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে।

নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হলো আগামী পাঁচ মাসে বিপুল পরিমাণ শুল্ক-কর আদায় করতে হবে। পরিসংখ্যান বলছে, নতুন সরকারকে ফেব্রুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে প্রায় ২ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে। প্রতি মাসে গড়ে ৫৮ হাজার কোটি টাকা বেশি আদায় করা জরুরি। এত বিপুল অর্থ আদায় করা মোটেই সহজসাধ্য নয়। গত জানুয়ারি মাসে সর্বোচ্চ ৩৭ হাজার ৩৩ কোটি টাকা আদায় করেছে এনবিআর। এ বছরের সর্বনিম্ন রাজস্ব আদায় হয়েছে আগস্ট মাসে ২৭ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা। বাকি সব মাসে ২৭ হাজার টাকা থেকে ৩৭ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ঘোরাঘুরি করেছে।

রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্য অর্জনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি স্বাভাবিক করা। কারণ, নির্বাচন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাসহ নানা কারণে চলতি অর্থবছরে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি খুব একটা ইতিবাচক নয়। নতুন বিনিয়োগও তেমন একটা আকৃষ্ট হচ্ছে না। এসব কারণে রাজস্ব আদায় কাক্সিক্ষত হারে হচ্ছে না। তাই নতুন সরকারকে ব্যবসায়ীদের আস্থায় আনতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা রাখার পদক্ষেপ নিতে হবে।

মূলত, বাস্তবতাকে সামনে রেখেই পুরনো রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কারের জন্য ইতিমধ্যে এনবিআর বিলুপ্ত করে নীতি ও আদায় দু’টি আলাদা বিভাগ করার অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার এ অধ্যাদেশ জারি করলেও তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের ওপর এ সংস্কার বাস্তবায়নের দায়িত্ব পড়েছে। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, জুলাই-জানুয়ারি সময়ে আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর ও আয়কর-এ তিন খাতের মধ্যে কোনো খাতেই লক্ষ্য অর্জন হয়নি। গত জুলাই-জানুয়ারি সময়ে এনবিআর সব মিলিয়ে ২ লাখ ২৩ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা আদায় করেছে। লক্ষ্য ছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা। ৭ মাসে ঘাটতি ৬০ হাজার ১১৩ কোটি টাকা। তবে শুল্ক-কর আদায়ে প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৩ শতাংশ।

আলোচ্য সময়ে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি হয়েছে আয়কর খাতে। মাসে ঘাটতি হয় প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। এ খাতে আদায়ের লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। এ সময়ে আদায় হয়েছে ৭৫ হাজার ৫৫ কোটি টাকা। আমদানি খাতে ১৫ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা ঘাটতি হয়। এ সময় এ খাতে ৭৮ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকার লক্ষ্যের বিপরীতে আদায় হয়েছে ৬২ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা। গত জুলাই-ডিসেম্বর মাসে ভ্যাট বা মূসক আদায় হয়েছে ৮৫ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা। এ সময়ে এ খাতের লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ১ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা।

এ সংকট থেকে ব্যাংকিং সেক্টর মোটেই আলাদা ছিলো না। এর কারণ হলো অভ্যন্তরীণ যোগসাজস-পরিচালক, বড় শেয়ারহোল্ডার বা তাদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সুবিধাজনক ঋণ। এ ‘ইনসাইডার লেন্ডিং’ই বহু ব্যাংকের ব্যালান্সশিট ধ্বংস করেছে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৫ সালের ৮ মে জারি করা ‘ব্যাংক-সম্পর্কিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাথে লেনদেন’ সার্কুলারের মাধ্যমে কঠোর সীমা আরোপ করেছে।

পরিস্থিতি মোকাবেলায় নতুন কাঠামোতে পরিচালক/ম্যানেজমেন্ট/ইউবিও-কে ঋণ দেয়ায় কড়া শর্ত; পুঁজি অনুপাত ও প্রভিশনিং পূরণ না করলে ডিভিডেন্ড নিষিদ্ধ; প্রকৃত মুনাফা না থাকলে স্টাফ বোনাস নিষিদ্ধ করা হয়েছে-অর্থাৎ ‘কাগুজে লাভ’ দেখিয়ে পুরস্কার নয়-নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এটি মূলত একটি আচরণগত সংস্কার-ব্যাংক ব্যবস্থাপনাকে শৃঙ্খলায় আনার কৌশল। সংস্কারের ফলে যখন প্রকৃত খেলাপি ঋণ প্রকাশ পাচ্ছে, তখন আমানতকারীর ভয়; শেয়ারবাজারে চাপ এবং ব্যাংকের ইমেজ ক্ষতিতে স্বল্পমেয়াদে আস্থাহীনতা বাড়তে পারে। কিভাবে ‘স্বচ্ছতা’ বজায় রেখে ‘প্যানিক’ এড়ানো যাবে-এটি এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশ্বব্যাংক সমর্থিত অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ (একিউআর)-এর পর পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করে নতুন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ মডেলের বৈশিষ্ট্য : দুর্বল ব্যাংক আলাদা রেখে টেনে নেয়া নয়; এক ছাতার নিচে এনে পুনর্গঠন এবং তিন থেকে পাঁচ বছরে কৌশলগত বেসরকারি বিনিয়োগকারীর কাছে শেয়ার হস্তান্তর করা। এটি কার্যত একটি ‘ব্রিজ ব্যাংক’ বা ‘খারাপ ব্যাংক’ স্টাইলের সমাধান।

পাশাপাশি আরো তিনটি প্রচলিত ব্যাংকের দ্বিতীয় দফা একিউআর চলছে। এসবের আইনি ভিত্তি হিসেবে আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫; ব্যাংক রেজুলিউশন অধ্যাদেশ ২০২৫; ব্যাংক পুনর্গঠন ও রেজুলিউশন তহবিল (বিআরআরএফ) জারি হয়েছে। এসব পদক্ষেপ দেখাচ্ছে-বাংলাদেশ এখন প্রথমবারের মতো একটি আনুষ্ঠানিক ব্যাংক ব্যর্থতার কাঠামো তৈরি করছে। আগে ব্যাংক ডুবলেও ‘বাঁচানো’ হতো; এখন ‘রিজলভ’ করা হবে। এ ক্ষেত্রে বাস্তব ঝুঁকি হলো-শরিয়াহভিত্তিক দুর্বল ব্যাংকগুলো একীভূত করে নতুন ব্যাংক তৈরির পরিকল্পনা হয়েছে। কিন্তু খারাপ সম্পদ এক জায়গায় জমা; ব্যবস্থাপনা দক্ষতার ঘাটতি; সরকারি মালিকানার দায় আর ভবিষ্যৎ বেসরকারি বিনিয়োগকারীর অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। এটি সফল না হলে একটি মেগা প্রবলেম ব্যাংক সৃষ্টি হতে পারে।

অবশ্য ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে নজর রাখা এবং তদারকির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক আরবিএস ব্যবস্থা চালু করেছে। প্রচলিত তদারকি ছিল নিয়মভিত্তিক-কাগজপত্র ঠিক আছে কি না দেখা। নতুন আরবিএস পদ্ধতিতে-ঝুঁকি কোথায় তৈরি হচ্ছে; ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কতটা সক্ষম এবং ভবিষ্যতে সমস্যা কোথায় আসতে পারে-এসব মূল্যায়ন করা হবে। অর্থাৎ প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা থেকে সক্রিয় ব্যবস্থা।

নতুন উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে : তত্ত্বাবধান ম্যানুয়াল; একক-পয়েন্ট ডেটা প্ল্যাটফর্ম; তত্ত্বাবধান হস্তক্ষেপ নির্দেশিকা ও ফরেনসিক অডিট ইউনিট। এগুলো আন্তর্জাতিক মানের তদারকির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি বাস্তবায়ন (আরবিএস) কাগজে ভালো, কিন্তু প্রয়োগে কঠিন। কারণ-দক্ষ সুপারভাইজার কম; ফরেনসিক অডিট সক্ষমতা সীমিত; ডেটা অটোমেশন দুর্বল আর রয়েছে ব্যাংকের তথ্য গোপন প্রবণতা। এ ব্যবস্থায় কেবল নিয়ম দেখা নয়-ঝুঁকি বিচার করতে হয়। এর জন্য উচ্চমানের বিশ্লেষক দরকার হয়।

এ ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হলো-মানবসম্পদ ও প্রযুক্তি ছাড়া আরবিএস শুধু ‘সার্কুলার’ হয়েই থাকবে। আর সংস্কারের ফলে ব্যাংকগুলো এখন ঝুঁকি নিতে ভয় পাচ্ছে। এর ফল হচ্ছে: এসএমই ঋণ কম; শিল্প বিনিয়োগ স্থবির; কর্মসংস্থান কমছে আর প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ ক্লিন আপ করতে গিয়ে অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো: সংস্কার ও প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য কিভাবে রাখা যাবে? অতিরিক্ত কড়াকড়ি থেকে মন্দা আর অতিরিক্ত শিথিলতা থেকে আবার সঙ্কট সৃষ্টির ডায়লেমা।

বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির বড় অংশ সরবরাহ দিক থেকে উদ্ভূত। চাল/ডিম/তেল আমদানি বিলম্ব; বাজার সিন্ডিকেট; লজিস্টিক সমস্যা অথবা মৌসুমি বন্যা থেকে এটি আসে। এতে যদি পণ্যই না থাকে তা হলে সুদের হার বাড়িয়ে ‘দাম’ কমানো যায় না । এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট- তারা ‘অর্থের মূল্য’ নিয়ন্ত্রণ করে, খাদ্য সরবরাহ নয়। এতে চ্যালেঞ্জ হলো: মুদ্রানীতি ও বাণিজ্য/প্রশাসনিক নীতি সমন্বয়হীনতা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংস্কারের আরেকটি দিক-ব্যাংকিংকে শহুরে বড় গ্রাহকের বাইরে নেয়া। উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে: শিশুদের জন্য কমিক বুকভিত্তিক ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি; স্কুল ব্যাংকিং; নারী উদ্যোক্তা-কেন্দ্রিক এজেন্ট ব্যাংকিং; ডিজিটাল ন্যানো লোন স্কিম। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ- বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক ইনস্ট্যান্ট ক্রেডিটিং। এর ফলে দোকানদাররা তাৎক্ষণিক টাকা পাবে আর নগদ নির্ভরতা কমবে। কক্সবাজারে পর্যটন এলাকায় সম্পূর্ণ ক্যাশলেস জোনের পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলা কিউআর, ইন্সস্টেন্ট পেমেন্ট সিস্টেম, ন্যানো লোন-সবই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তবতা হলো-গ্রামাঞ্চলে ডিজিটাল দক্ষতা কম; নগদ অর্থের প্রতি আস্থা বেশি; সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি; ছোট ব্যবসায়ীর ট্যাক্স-ভীতি- এর ফলে ডিজিটাল গ্রহণযোগ্যতা ধীর হতে পারে। এতে বড় চ্যালেঞ্জ হলো-প্রযুক্তি তৈরি করা সহজ, ব্যবহারকারীর আচরণ বদলানো কঠিন।

মূলত, বাংলাদেশ এখনো ব্যাংক-নির্ভর অর্থনীতি। বন্ড বাজারে- করপোরেট ইস্যু কম; বিনিয়োগকারী সীমিত; সেকেন্ডারি মার্কেট দুর্বল এবং রেটিং সংস্কৃতি নেই। এ অবস্থায় বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সাথে সমন্বয় না হলে অগ্রগতি হবে ধীর। এতে চ্যালেঞ্জ হলো-ব্যাংকের বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সময় লাগবে।

বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে: ডলারের শক্তি; তেলের দাম; বৈশ্বিক মন্দা এবং রেমিট্যান্স ঝুঁকি। বাইরের এক ধাক্কাই সব সংস্কারকে দুর্বল করতে পারে। এমনকি তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার অশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হলো-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে সংস্কার চালু রাখা। সবশেষে সবচেয়ে বড় বিষয়-আস্থা। ব্যাংকিং খাত মূলত আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে। যদি মানুষ ভাবে- ‘ব্যাংক নিরাপদ’ তবে টাকা রাখবে তাতে ঋণ বাড়বে আর অর্থনীতির বিকাশ ঘটবে। ‘ব্যাংক ঝুঁকিপূর্ণ’ মনে হলে গ্রাহক টাকা তুলে নেবে আর তাতে সঙ্কট বাড়বে। যা কারো কাম্য নয়।

ব্যাংক খাতের বড় ক্ষত ছিল অর্থপাচার ও ঋণ কেলেঙ্কারি। এ প্রেক্ষাপটে চুরিকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধারের উপর আন্তঃ-এজেন্সি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে, যা বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট সমন্বয় করছে। এর আওতায় নেয়া পদক্ষেপ এর মধ্যে রয়েছে : ১১টি অগ্রাধিকার মামলায় তদন্ত; যৌথ তদন্ত দল (জেআইটি); আমরা দেশের সম্পদ ট্রেস ও জব্দ করি; পারস্পরিক আইনি সহায়তার অনুরোধ (এমএলএআরএস) ; আন্তর্জাতিক আইন সংস্থার সহায়তা গ্রহণ হচ্ছে। প্রতিরোধমূলক বার্তা হিসাবে নেয়া হয়। বাস্তবে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে এ ক্ষেত্রে তেমন অগ্রগতি দেখা যায়নি। সামনে সম্ভাবনা আরো কম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংস্কারকে এক বাক্যে বলা যায়-বিলম্বিত কিন্তু অনিবার্য সংশোধন। এখন তিনটি ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে : শৃঙ্খলা বনাম প্রবৃদ্ধি; স্বচ্ছতা বনাম আস্থা; কড়াকড়ি বনাম তারল্য- যদি এ তিনটি ঠিক রাখা যায়, তবে ব্যাংকিং খাত ধীরে ধীরে সুস্থ হবে। সংস্কার মাঝপথে থেমে গেলে আগের চেয়ে বড় সঙ্কটও তৈরি হতে পারে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে-সংস্কারের সবচেয়ে বড় শত্রু অর্থনৈতিক নয়-রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। আর সবচেয়ে বড় সম্পদ-জনআস্থা। এ দু’টির ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ভবিষ্যৎ। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো সরকার বাংলাদেশ ব্যাংককে কতটা স্বাধীনভাবে চলতে দেবে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আন্তর্র্বতী সময়ের গভর্নর বিদায় নিয়েছেন। নতুন যিনি গভর্নর হয়েছেন তিনি বিজিএমইএ’র স্ট্যান্ডিং কমিটির প্রধান। ব্যক্তিগতভাবে কস্ট অ্যাকাউন্টেন্ট। এখন তিনি জাতীয় অর্থনীতিতে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন তা-ই এখন দেখার বিষয়।

মূলত, নানাবিধ সমস্যা ও সঙ্কটের মধ্যেই চলছে আমাদের জাতীয় অর্থনীতি। সদ্য বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত একটি ভঙ্গুর অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার করার জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করেছে। এক্ষেত্রে সরকারের কিছু অর্জন থাকলে তা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। এবার সদ্য গঠিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের ওপর এসে পড়েছে। জাতীয় অর্থনীতিকে ছন্দে ফেরানোর জন্য রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যাংক সহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর ও ফলপ্রসূ সংস্কার আনতে হবে। রাজনৈতিক সঙ্কীর্ণতার অশুভ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে খেলাপি ঋণ আদায়ে গ্রহণ করতে হবে কঠোর পদক্ষেপ। রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রে কৃচ্ছতা সাধণ সহ দুর্নীতি প্রতিরোধে নিতে হবে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। অন্যথায় জাতীয় অর্থনতিকে ছন্দে ফেরানো কোন ভাবেই সম্ভব হবে না।

www.syedmasud.com