আগামী ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে। এদিনই সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হবে। দীর্ঘ সতের বছর পর একটি প্রাণবন্ত সংসদের প্রত্যাশা জনগণের। সংসদ হয়ে উঠবে জনগণের আশা আকাক্সক্ষা পূরণের কেন্দ্রবিন্দু। অতীতের মতো অযথা কথা বলে সময় নষ্ট না করে জনগণের সমস্যা সমাধানের জন্য এখানে আলোচনা তুলে ধরবে সংসদ সদস্যগণ। বিরোধী দল সত্যিকার অর্থে জনগণের স্বার্থে বিরোধীতা করবে। সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে। সরকার জনস্বার্থের বিরুদ্ধে কোন প্রকার পদক্ষেপ নিলে বিরোধী দল সংসদে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তুলবে। বির্তক করবে, প্রয়োজনে ওয়াক আউট করবে। এভাবেই সত্যিকার গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হবে। সংসদীয় সুস্থ্য রাজনীতির চর্চা ফিরে আসবে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভ করার পর সরকার গঠন করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। নির্বাচনের পরদিন গত ১৩ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নামে গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সংসদ সদস্যদের শপথের মধ্য দিয়ে কার্যকর হয়েছে জাতীয় সংসদ। আগামী ১২ মার্চ সংসদের অধিবেশন ডেকেছেন রাষ্ট্রপতি। তবে আগের সংসদের স্পিকার পদত্যাগ করেছেন এবং ডেপুটি স্পিকার কারাগারে থাকায় প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব কে করবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পরই তারেক রহমানকে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করেছে বিএনপি জোট। অন্যদিকে, সংসদীয় টিমের বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমানকে বিরোধীদলীয় নেতা আর এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নির্বাচিত করেছেন।

এদিকে সরকারি দলের জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম মনি। এ ছাড়া আরও ছয়জন সংসদ সদস্যকে হুইপ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগ পাওয়া হুইপরা হলেনÑহবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য জি কে গউছ, খুলনা-৩ আসনের রকিবুল ইসলাম বকুল, শরীয়তপুর-৩ আসনের মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, নাটোর-২ আসনের রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, দিনাজপুর-৪ আসনের আখতারুজ্জামান মিয়া এবং লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আশরাফ উদ্দিন নিজান।

সংবিধান অনুযায়ী, সরকারি ফলাফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ অধিবেশন আহ্বানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আর সংসদের শুরুর দিনই স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবে। ওই অধিবেশনেই ভাষণ দিবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সংবিধান ও জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী, পূর্ববর্তী সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার কথা। গত সংসদদের স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের অবর্তমানে সংসদ অধিবেশন কিভাবে শুরু হবে বা প্রথম অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন, সেটি নিয়েও নানা আলোচনা দেখা যাচ্ছে। তবে যে কোন একজন সংসদ সদস্যের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু করা যাবে। তবে কোন সংসদ সদস্য প্রথম দিনের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন তা এখনো ঘোষণা করা হয়নি। এদিকে ডেপুটি স্পীকার হিসেবে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতের পক্ষ থেকে নির্বাচিত করার জন্য সরকারি দলের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

সংসদের প্রথম অধিবেশন যেভাবে শুরু হবে : সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন সম্পর্কে বলা আছে, ‘কোনো সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকে সংসদ-সদস্যদের মধ্য হইতে সংসদ একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করিবেন, এবং এই দুই পদের যে কোনটি শূন্য হইলে সাত দিনের মধ্যে কিংবা ওই সময়ে সংসদ বৈঠকরত না থাকিলে পরবর্তী প্রথম বৈঠকে তাহা পূর্ণ করিবার জন্য সংসদ-সদস্যদের মধ্য হইতে একজনকে নির্বাচিত করিবেন।’ সংবিধানে আরো বলা আছে, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের পদ শূন্য হলে বা কোনো কারণে তারা দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য এই দায়িত্ব পালন করবেন। তবে, জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী প্রথম অধিবেশন পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রপতি কাউকে মনোনীত করতে পারেন।

শুরুতেই স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন : স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুসরণ করে সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করান। বিএনপি-জামায়াত-এনসিপিসহ অন্যান্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ বাক্য পাঠ করেন। ওইদিন বিকেলে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ হয়। গত সংসদের স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তির সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হবে। তারপর ওই অধিবেশনেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে।’

নিয়ম অনুযায়ী কোনো একজন সংসদ সদস্য স্পিকার হিসাবে কারো নাম প্রস্তাব করে সংসদ সচিবালয়ের সচিবকে নোটিশ করবেন। অন্য একজন সংসদ সদস্যকে সেই প্রস্তাবে সমর্থন জানাতে হবে। যার নাম প্রস্তাব করা হবে, তিনি স্পিকার হিসাবে দায়িত্ব পালনে সম্মত আছেন, এমন বিবৃতিও নোটিশের সাথে দিতে হবে। এরপর এটি সংসদ সদস্যদের মধ্যে ভোটাভুটিতে যাবে। যদি স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে একাধিক প্রার্থী যদি না থাকে তাহলে কণ্ঠভোটের মাধ্যমেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন। সাধারণত স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর তার সভাপতিত্বে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়ে থাকে।

নিয়ম অনুযায়ী, এই নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর অধিবেশন মুলতবী ঘোষণা করা হবে। সেই সময়ে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পাঠ করাবেন রাষ্ট্রপতি। তারা শপথ নেওয়ার পরই তাদের সভাপতিত্বে শুরু হবে পরবর্তী সংসদের কার্যক্রম। প্রথম দিন সংসদ মুলতবী করারপর স্পীকার ও ডেপুটি স্পীকারের শপথ গ্রহণ করার পর ওইদিনই আবার অধিবেশনের বৈঠক শুরু হতে পারে।

সংসদীয় রীতি অনুযায়ী, নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরুতে রাষ্ট্রপতি সংসদে ভাষণ দেন। এই ভাষণে সাধারণত সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, লক্ষ্য এবং দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির একটি রূপরেখা তুলে ধরা হয়। ইতোমধ্যে রাষ্ট্রপতির ভাষণ সংসদে না দেয়ার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে দাবি করা হচ্ছে। কেননা এ সংসদটি অতীতের সংসদের মতো গতানুগতিক নয়। এ ছাড়াও শোক প্রস্তাব ও প্যানেল চেয়ারম্যান মনোনয়ন করা হয়। শোক প্রস্তাবে সংসদের গত মেয়াদের পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত কোনো বর্তমান বা প্রাক্তন সদস্য মারা গিয়ে থাকলে অথবা বিশিষ্ট ব্যক্তি যারা মারা গেছেন তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। আর প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে সংসদ পরিচালনার জন্য কয়েকজনকে প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত করা হয়। প্রথম অধিবেশনের শুরুতেই কার্যউপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয়। সংসদ অধিবেশন কতদিন চলবে এবং কী কী কাজ হবে তা নির্ধারণ করার জন্য একটি শক্তিশালী 'কার্যউপদেষ্টা কমিটি' গঠন করা হয়।

অধ্যাদেশ উপস্থাপন: নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ হলো সংসদ বিরতিকালে জারি করা অধ্যাদেশগুলো সংসদে উপস্থাপন করা। সংসদ যখন অধিবেশনে থাকে না, তখন জরুরি প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ধারা মোতাবেক যে আইনগুলো জারি করেন, সেগুলোই হলো অধ্যাদেশ। বিগত সরকার ১৩৩টির মতো অধ্যাদেশ ও একটি আদেশ জারি করেছে। এ সবগুলোই অধিবেশনে উঠবে এবং প্রথম অধিবেশন শুরুর ত্রিশ কার্যদিবসের মধ্যে তা পাস হতে হবে। এ বিষয়ে সংবিধানে ‘অধ্যাদেশ প্রণয়ন-ক্ষমতা’ সর্ম্পকে অনুচ্ছেদ ৯৩। (১) ১[সংসদ ভাঙ্গিয়া যাওয়া অবস্থায় অথবা উহার অধিবেশনকাল ব্যতীত] কোন সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট আশু ব্যবস্থাগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান রহিয়াছে বলিয়া সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে তিনি উক্ত পরিস্থিতিতে যেরূপ প্রয়োজনীয় বলিয়া মনে করিবেন, সেইরূপ অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করিতে পারিবেন এবং জারি হইবার সময় হইতে অনুরূপভাবে প্রণীত অধ্যাদেশ সংসদের আইনের ন্যায় ক্ষমতাসম্পন্ন হইবে: (২) এই অনুচ্ছেদের (১) দফার অধীন প্রণীত কোন অধ্যাদেশ জারি হইবার পর অনুষ্ঠিত সংসদের প্রথম বৈঠকে তাহা উপস্থাপিত হইবে এবং ইতঃপূর্বে বাতিল না হইয়া থাকিলে অধ্যাদেশটি অনুরূপভাবে উপস্থাপনের পর ত্রিশ দিন অতিবাহিত হইলে কিংবা অনুরূপ মেয়াদ উত্তীর্ণ হইবার পূর্বে তাহা অননুমোদন করিয়া সংসদে প্রস্তাব গৃহীত হইলে অধ্যাদেশটির কার্যকরিতা লোপ পাইবে।

সংসদের প্রথম অধিবেশনেই অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলো পাস করতে হবে।

সরকার ও বিরোধী দলীয় হুইপদের কাজ : জাতীয় সংসদে স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার পদের পর গুরুত্বপূর্ণ দুইটি পদ সরকারি ও বিরোধী দলের চিফ হুইপ বা হুইপ পদ। চিফ হুইপ হলেন সংসদে সরকারি দলের মুখপাত্র। চিফ হুইপের সঙ্গে কয়েকজন হুইপও থাকেন। তাদের সবাই সংসদ সদস্যের মধ্য থেকে নির্বাচিত হয়ে থাকেন। চিফ হুইপ ও হুইপের প্রধান কাজ সংসদে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা করা। হুইপের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে, নিজ দলের সদস্যদের পার্লামেন্ট বা আইনসভায় নিয়মিত হাজির করার ব্যবস্থা করা, সংসদে কোনো বিল উত্থাপিত হলে দলীয় সব সদস্য যেন দলের পক্ষে ভোট দেন তা নিশ্চিত করা কিংবা সদস্যরা কোন বিষয়ের ওপর কতক্ষণ বক্তব্য দেবে তার সময় সীমা নির্ধারণ করা। আইন অনুযায়ী- চিফ হুইপ ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার পদটি একজন পূর্ণ মন্ত্রীর পদমর্যাদার। এতে বিরোধীদলীয় নেতা একজন পূর্ণ মন্ত্রীর সমান সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন।

অসংখ্য মানুষের রক্ত ও জীবনের বিনিময়ে আজ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয়েছে। মানুষ ভোট দিয়ে সংসদ প্রতিষ্ঠা করেছে। সেই সাথে নতুন বাংলাদেশ যাতে পথ না হারায় এ জন্য সকল রাজনৈতিক দলের ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে প্রণয়ন করা হয়েছে জুলাই সনদ। এটি আবার গণভোটে পাস হয়েছে। নতুন সংসদের যাত্রার ১৮০ দিনের মধ্যে এ সনদ বাস্তবায়ন করতেই হবে। এ সংসদকেই হতে হবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ জনগণের সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু। জনগণের স্বার্থে সংসদে আলোচনায় অংশ নিতে হবে আবার জনস্বার্থেই ওয়াক আউট করতে হবে। এটিই সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি ও সৌন্দর্য। সংসদ যত শক্তিশালী থাকবে গণতন্ত্র ও সরকারের জবাবদিহিতা ততটাই স্বচ্ছ ও সুন্দর থাকবে। মানুষের রক্তেও উপর দাঁড়িয়ে ত্রয়োদশ সংসদ মানুষের জন্যই কথা বলবে। দেশ, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় সকল আইনের পক্ষে থাকবে সংসদ। নতুন সংসদের প্রতি সাধারণ মানুষের এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: সদস্য সচিব, জার্নালিস্ট কমিউনিটি অব বাংলাদেশ।