ইয়াসিন মাহমুদ
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান আপামর ছাত্র-জনতার মাঝে সীসাঢালা দেশপ্রেম উপহার দিয়েছে। ঐক্যের শিকড়কে করেছে মজবুত। জুলাই আমাদেরকে বেশকিছু দেশপ্রেমিক সাহসী যোদ্ধা দিয়েছে। ওসমান হাদী সে সাহসী বীরদের অন্যতম। ওসমান হাদীদের কণ্ঠে তাইতো সর্বদা উচ্চারিত হতোÑ ‘জান দিবো জুলাই দিবো না।’ নিগুঢ় দেশপ্রেম ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে শক্তিমান অবস্থান ও ফ্যাসিবাদ মুর্দাবাদ এর ব্যাপারে তাঁর দৃঢ়তা ও বলিষ্ঠ ভূমিকা কাল হয়ে দাঁড়ালো।
৫ আগস্টের জুলাই বিপ্লবের পর আওয়ামী লীগ ও তাঁর দোসররা বর্তমান সরকারকে উৎখাত ও অকার্যকর করতে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় বারবার। প্রতিবিপ্লবের নীল নকশা আঁকতে থাকে প্রতিনিয়ত। হিন্দু কার্ডকে প্রথমে ব্যবহার করার চেষ্টা করে। দেশে হিন্দুদের নিরাপত্তা সংকটসহ নানাবিধ অজুহাতে শাহবাগে বিভিন্ন ব্যানারে আন্দোলনের অপতৎপরতা করতে থাকে। আপামর ছাত্র-জনতা ও জুলাইয়ের ঐক্যবদ্ধ শক্তি তা প্রতিহত করে। ৫ আগস্টের পরে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ইনকিলাব মঞ্চ ও ওসমান হাদীর ভূমিকা ঐতিহাসিক।
বিভিন্ন মিডিয়াতে দেয়া সাক্ষাৎকারে ওসমান হাদীর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক দর্শন ও ইনকিলাব মঞ্চের কর্মসূচি স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। প্রথাগত রাজনীতির বাইরে এসে একটি ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন-আকাক্সক্ষা ছিল তাঁর বুকজুড়ে। দেশ ও দেশের মানুষের অস্তিত্ব রক্ষা, ভারতীয় আধিপত্যবাদকে রুখে দেয়াই ছিল তাঁর অন্যতম ইশতেহার। শহীদ ওসমান হাদী বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের চরিত্র বদলানোর কথা বলার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি ফ্যাসিস্ট কায়দায় ক্ষমতা দখল ও মানুষের প্রতি তোষণের রাজনীতিকে গুডবাই জানানোর আহ্বান করেছেন অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে।
৫ আগস্টের পর জুলাইয়ের ঐক্যকে নানাভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে দেশবিরোধী শক্তি। জুলাই ঐক্যে ফাটল কিংবা বিভক্তির রেখা টানার অপচেষ্টা কম হয়নি। অনেকে সেই ফাঁদে পা দিলেও ওসমান হাদী একটু ভড়কে যায়নি। নিজেকে অল্পতে বিক্রি করে দেননি। সব ধরনের অফারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন বরং তিনি ভারতীয় আধিপত্যের আগ্রাসন থেকে দেশকে মুক্তকরণ ও একটি ইনসাফের রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনায় নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।
পুরো সমাজব্যবস্থা আজ নানা ধরনের সংক্রামকে আক্রান্ত। যার সারা শরীরে ক্ষতের চিহৃ। এমন একটি সন্ধিক্ষণে ওসমান হাদীর মতো তরুণেরা যে ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার মেনুফেস্ট ঘোষণা করে এগিয়ে যাচ্ছিলেন নিশ্চয় এটা ছিল বেশ আশা জাগানিয়া। এমন জনবান্ধব ও দেশপ্রেমিক নেতা আমাদের খুব প্রয়োজন ছিল। তিনি ঢাকাÑ৮ এ নির্বাচন করার জন্যে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছিলেন। কতিপয় সিনিয়র রাজনীতিবিদ তাঁকে নানাভাবে হেনস্তা করাসহ তাঁকে থামানোর অপকৌশলে অংশ নেন। মূলত তিনি একটি নতুন ধারার রাজনীতি উপহার দিতে চেয়েছিলেন। একটি কথা না বললেই নয়Ñজুলাই বিপ্লব এদেশের তরুণ, বৃদ্ধÑবণিতা সবার দৃষ্টিভঙ্গিকে নতুন করে ঝালিয়ে দিয়েছে। এখন আগের সে পুরাতন রাজনীতির কৌশল আর কাজে আসবে না তা অনেকখানি অনুমেয়। ওসমান সত্যিকারার্থে একটি পরিচ্ছন্ন রাজনীতির পরিবেশ তৈরি করতে চেয়েছিলেন। তিনি তাঁর এক বক্তৃতায় বলেছিলেনÑ ঢাকাÑ৮ এর সকল সংসদ সদস্য প্রার্থীরা মিলে একটি জনতার মঞ্চ তৈরি করিÑজনতার মুখোমুখি হই আমরা সকলে। জনগণের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নিয়ে আমরা কথা বলি। কতটা প্রশস্ত হৃদয়, উদারতা ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারবোধ থাকলে এমনটি উচ্চারণ করতে পারেন। এ আসনে আরো অনেক ঝানু রাজনীতিবিদরা এমন কথা অকপটে বলার দুঃসাহস দেখাননি। তিনি জনগণের পালস বুঝতেন বলেই জনগণের রাজনীতি করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন।
ওসমান হাদী ছিলেন এক আপসহীন সংগ্রামী নেতা। দেশের প্রচলিত নোংরা রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে কল্যাণমুখী রাজনীতির পক্ষে অবস্থান নেয়া ও ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার কারণে তিনি হত্যার শিকার হন। গুলীবিদ্ধ হবার পূর্বে তাঁকে নানাভাবে নানাজন হত্যার হুমকি দিচ্ছিলেন। সেসব বিষয়ে তিনি প্রশাসনকে অবহিত করেন ও নিরাপত্তা কামনা করেন। কিন্তু সরকার তাঁকে নাগরিক নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য ওসমান হত্যার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর হত্যার মাস্টারমাইন্ডরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। এটি একটি রাষ্ট্রের জন্য বড়ই লজ্জাজনক।
এদেশে নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো লোকের সংখ্যা নেহায়েত খুবই কম। তেমনি দেশে অবস্থান করে বিদেশের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার লোকের সংখ্যা ঢের। একটি গোষ্ঠী দীর্ঘকালব্যাপী আমাদের সমাজ, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতিকে ভারতীয় আধিপত্য থেকে মুক্ত হতে দেয়নি। ভারতীয় আগ্রাসনের করাল থাবা থেকে দেশকে মুক্ত করতে আজাদীর ডাক দিয়েছিলেন শহীদ ওসমান হাদী। তিনি তাঁর বক্তব্যে বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেনÑবাংলাদেশের ইতিহাসকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ আমাদের রয়েছে একটি সোনালী ইতিহাস। আমাদেরকে শুধু ব্যর্থতার গল্প শোনানো হয়। অথচ আমাদের ইতিহাস বিজয়ের। আমাদের রয়েছে সফলতার গল্প। ওসমান হাদী আমাদের ইতিহাসের শিকড়ে হাত দিয়েছিলেন।
শরীফ ওসমান হাদীকে হত্যার মাধ্যমে যেমন তাঁকে থামিয়ে দেয়া, ইনকিলাব মঞ্চকে স্তিমিত করা এবং ভারতীয় আগ্রাসনবিরোধী এই আন্দোলনকে নসাৎ করাই ছিল তাঁর হত্যাকারীদের অন্যতম মিশন। কিন্তু শহীদের রক্ত কখনো বৃথা যায় না। শহীদেরা সাথীরা শোকে যেমন মুহ্যমান তেমনি দ্রোহের আগুনে জ¦লে উঠেছে। সুতরাং কাকে থামাতে চেয়েছে খুনিরা? আজ লক্ষ হাদী ঘরে ঘরে। সময়ই লক্ষ্য হাদীকে তুলে আনবে প্রয়োজনে। হাদীর ইনসাফের বাংলাদেশে গড়ার কাজে প্রতিনিধিত্ব করবে কেউ না কেউ। বুক চিতিয়ে বলবেÑ আমাকে গুলী করো, আমি শহীদ হবো কিন্তু জুলাই দিবো না। ইনকিলাব জিন্দাবাদ বলে বজ্রধ্বনি হাঁকবে। সে সময় বুঝি বেশি দূরে নয়। শহীদ ওসমান হাদীর শাহাদাতের পর সে পরিবেশ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাঁর জানাযায় সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করেন এবং তারা শ্লোগান তোলেনÑ ‘আমরা সবাই হাদী হবো/যুগে যুগে লড়ে যাবো’। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এ চেতনাকে ধারণ করবে আমি বিশ্বাস করি।
ওসমান হাদী তাঁর জীবনদর্শন নিয়ে একদম সোজাসাপ্টা বলে গেছেন। মৃত্যু নিয়ে কোন ধরনের দ্বিচারিতাÑভণিতা করেননি। মৃত্যু নিয়ে কোন ধরনের দ্বিধান্বিত ছিলেন না। ছিলেন না হতাশাগ্রস্ত। তিনি বলতেনÑ ‘মৃত্যুকে ভয় পাই না, ভয় পাই যদি বেঁচে থেকেও চুপ থাকতে হয়।’ তিনি একবার বলেছিলেনÑ ‘মৃত্যুর ফয়সালা জমিনে না, আসমানে হয়। আমি চলে গেলে আমার সন্তান লড়বে। তাঁর সন্তান লড়বে। যুগÑযুগান্তরে আজাদের সন্তানেরা স্বাধীনতার পতাকা সমুন্নত রাখবেই। মৃত্যুকে ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। আমরা তো শাহাদাতের জন্যেই মায়ের উদর থেকে পৃথিবীতে পা রেখেছি।’
শহীদের খুনরাঙা রাজপথ দিন দিন ঊর্বর হয়। খুনিদের সকল ষড়যন্ত্র ভূলণ্ঠিত হয়। শহীদ ওসমান হাদীর রক্ত কখনো বৃথা যেতে পারে না। খুনিরা হেরে গেছে আর জিতে গেছে শহীদ ওসমান হাদী। একদিন ওসমান হাদীর রক্ত কথা বলবে। শহীদের সাথীরা আরো বহুগুণে ওসমান হাদীর স্বপ্নের ইনসাফের বাংলাদেশকে এগিয়ে নিবে। ওসমান হাদী যে আকাক্সক্ষা লালন করতেন সে স্বপ্নপূরণের পথে তিনি চলে গেছেন। তিনি চলে গেছেন তাঁর রবের সান্নিধ্যে। তিনি তাঁর এক সাক্ষাৎকারে কতইনা ঈমানী চেতনা নিয়ে বললেনÑ ‘আমি তো ভীষণভাবে প্রত্যাশা করি, কোন একটা বিপ্লবে কোন একটা মিছিলে আমি সামনে আছি, একটা বুলেট এসে বিদ্ধ হয়ে গেছে আমার মাথায়, আমি হাসতে হাসতে শহীদ হয়ে যাচ্ছি।’ তিনি বলেনÑ সবাই যখন মৃত্যুটাকে ভীষণ ভয় পায়, আমি তখন হাসতে হাসতে আল্লাহর কাছে ভীষণ সন্তুষ্টি নিয়ে পৌঁছাতে চাই, যে আমি সে ন্যূনতম জীবনটা লিড করতে পারলাম। আমি ইনসাফের একটি হাসি নিয়ে আমার আল্লাহর কাছে পৌঁছাতে চাই।’ তাঁর মনেপ্রাণে শাহাদাতের যে তামান্না ছিল সেটা তাঁর কথা-কাজে প্রতিফলিত হতে দেখা গেছে।
তিনি ক্ষমতার অপব্যহার করে দাপুটে নেতা বনে যেতে চাননি। তিনি গণমানুষের নেতা হতে চেয়েছিলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর সে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন। ওসমান হাদী বলেছিলেনÑআগামী ৫০ বছর বাঁচলাম কোন প্রভাব তৈরি হলো না আমাকে দিয়ে। দেশের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য, উম্মাহর জন্য। কিন্তু ধরেন আমি পাঁচ বছর বাঁচলাম সেটার মধ্য দিয়ে যদি আগামী ৫০ বছরের প্রভাব তৈরি হয়, তাহলে অনেকদিন বেঁচে থাকায় কী সাফল্য বলেন?
ওসমান হাদী সত্যিই এক ক্ষণজন্মা বিপ্লবী ব্যক্তিত্ব। ইনসাফের বাংলাদেশের জন্য তিনি যে লড়ে গেছেন, অকাতরে জীবন বিলিয়ে গেছেন তা অবিস্মরণীয়। কালের খেয়ায় তিনি যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকবেন মানুষের অন্তরে। কোন রক্তচক্ষু বিক্ষুব্ধ ছাত্রÑজনতার এই টলোমলো জোয়ার রুখতে পারবে না।
সর্বশেষ বলবো, শেখ হাসিনা যে ভয়ের সংস্কৃতি, গুমের সংস্কৃতি, বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু করেছিল সে অপকর্মই তাঁকে আজ আসামীর কাঠগোড়ায় দাঁড় করিয়েছে। ইন্টিরিম যদি ওসমান হাদী হত্যার সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক দোষীদের দৃষ্ঠান্তমূলক শাস্তি দিতে ব্যর্থ হয় তাহলে এ ধরনের অপকর্ম আরো সংগঠিত হবে। আমাদের নাগরিক নিরাপত্তা ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়বে। রাষ্ট্র ও সরকার এ দায় এড়াতে পারবে না।
লেখক: কবি ও গবেষক