ড. বি এম শহীদুল ইসলাম
মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা সম্প্রতি বলেছেন, “নির্বাচন যেন আর কখনো ডাকাতি না হয়” সংগ্রাম [১৩/০১/২৬]। একথা খুবই প্রশংসার দাবি রাখে। এ ধরনের বক্তব্য রাখার জন্য তাকে অভিনন্দন। কিন্তু বাস্তবতা অন্য রকম। জনগণ তাদের ধারণা ও অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বলছেন, “নির্বাচন তো ডাকাতি নয়, ইঞ্জিনিয়ারিং হতে যাচ্ছে”। নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে বিশেষ পদ্ধতিতে নির্বাচনের সঠিক ফলাফল পাল্টে অন্য দলকে বিজয়ী ঘোষণা করার “ম্যাকানিজম”। যা পূর্বেই ঠিক করে রাখা। দীর্ঘ ১৬ বছর ফ্যাসিবাদের শাসন চলার কারণে দেশবাসী নির্বাচনে তাদের মতামত ব্যক্ত করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। ৫ আগষ্ট ২০২৪ সালে বিপ্লবের পরে জাতি মনে করেছিল হয়তো রাষ্ট্র পুনর্গঠনে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি নতুন সূর্যের আগমন ঘটবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা ও একটি রাজনৈতিক দলের সাথে পার্শ্ববর্তী একটি দেশের কূটনীতিক চালে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিং করে একটি দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের গভীর ষড়যন্ত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমরা জানি ফ্যাসিবাদের পতনের পর প্রথম বারের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কিন্তু এ নির্বাচন কতটুকু সুষ্ঠু নিরপেক্ষ অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক হবে তা নিয়ে জনমনে যথেষ্ট শঙ্কা রয়ে গেছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তা সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও অবাধ হওয়ার পরিবর্তে ব্যাপকভাবে ইঞ্জিনিয়ারিং হতে যাচ্ছে বলে অনেকেই মনে করছেন। ইতোমধ্যে তার কিছু নমুনাও প্রকাশিত হতে শুরু হয়েছে। তবে সত্যিই যদি নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিং হয়, তাহলে বাংলাদেশ নতুন করে গভীর সংকটে পতিত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে একটি জরিপে দেখা গেছে এবার প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতের জনসমর্থন একেবারেই নিকটতম। ফলে সামান্য ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কারণে আসন সংখ্যায় ব্যাপক পরিবর্তন হতে পারে। অধিকাংশ আসনে পাঁচ-দশ শতাংশ ভোটের ব্যবধান থাকে। ফলে দেখা যাবে, ফলাফল ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ সালের নির্বাচনের মতো হয়ে গেছে। এ ধরনের ফলাফল দেশে বা বিদেশে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না। যে কারণে নির্বাচনের পরবর্তী পরিণতি খুব খারাপ হতে পারে। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ তাদের আশ্রয়দাতা দেশ ভারত এবং অন্যান্য বিভিন্ন শক্তি প্রাণপণ চেষ্টা করবে এ নির্বাচনকে বাঞ্চাল অথবা অগ্রহণযোগ্য করে নিষিদ্ধ দলটির ফিরে আসার পথ সুগম করতে। এক্ষেত্রে যে দলটি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নিজেদেরকে নিশ্চিত মনে করছেন তাদের সহযোগিতায় পতিত ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এটিকে উড়িয়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ কারণে সম্ভাব্য সুবিধাভোগী দলসহ সবার উচিত ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সম্ভাব্য কৌশল সম্পর্কে সতর্ক থাকা এবং সচেতনভাবে এটিকে প্রতিহত করা। দেশবাসীকে মনে রাখতে হবে যে, ২০০৬ সালে বিএনপির ক্ষমতা ত্যাগের পরবর্তী নির্বাচনকে বিচারপতিদের বয়স বৃদ্ধির মাধ্যমে ইঞ্জিনিয়ারিং করা যেমন চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছিল, এবার তার চেয়েও ব্যাপক আকারের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ মনে করছেন। ইতোমধ্যে এবারের নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিং হওয়ার লক্ষণগুলো অনেকটা পরিষ্কার হয়ে গেছে। কোনো কোনো নেতার “মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে নির্বাচনে আমরা জিতে গেছি, ১২ ফেব্রুয়ারি শুধু আনুষ্ঠানিককতা”। আবার কোনো কোনো দলের নেতারা বক্তব্য দিচ্ছেন, ‘অমুক মার্কা ছাড়া অন্য কোনো মার্কায় ভোট দিলে তাদেরকে দেশ ছাড়া করা হবে”। এতে করে পরিষ্কার উপলব্ধি করা যায় আশপাশের ইঙ্গিতেই কোনো একটি দলের পক্ষে নির্বাচনকে ইঞ্জিনিয়ারিং করার যাবতীয় প্রস্তুতি ফাইনাল। এখন শুধু অপেক্ষার পালা। এ বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক উপস্থাপন করা হলো।
১. নির্বাচনের পূর্বে গ্রেফতার আতঙ্ক: নির্বাচনের দু-এক দিন আগে অপছন্দের দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করা বা গ্রেফতারের আতঙ্ক ছড়ানো খুবই কার্যকর এবং বহুল ব্যবহৃত একটি কৌশল। তাই পলিসিটা গ্রহণ করা হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞগণের ধারণা। ফলে যে দলকে ঠকানোর জন্য ইঞ্জিনিয়ারিং করা হবে ওই দলের নেতা-কর্মীরা ঘরছাড়া হয়ে যাবে এবং তাদের নির্বাচনী ব্যবস্থা ভন্ডুল হয়ে যাবে। যে কারণে দলটির মাঝে সব জায়গায় ভীতি ছড়িয়ে পড়বে। তারা কোনো কেন্দ্রে এজেন্ট দিতে পারবে না এবং তাদের কর্মী সমর্থকরা এবং সাধারণ অনেক ভোটারও ভোট দিতে যাবে না। এ ঘটনাটি এত দ্রুত এবং সম্মিলিত ও সমন্বিতভাবে করা হবে যে, সবাই ভীতসন্ত্রস্ত ও হতভম্ব হয়ে পড়বে। এ পদ্ধতিতে ইঞ্জিনিয়ারিং করলে অনেক ক্ষেত্রেই তার কোনো প্রমাণ থাকে না। তাই এ নির্বাচন সুষ্ঠু নির্বাচন হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যাবে। নির্বাচন কমিশন জোরগলায় বলবে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচন এমন পদ্ধতির ইঞ্জিনিয়ারিং এল মাধ্যমে হয়েছিল-বিধায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনে ক্ষমতায় যেতে পেরেছিল। সে সময় এ পদ্ধতির ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ব্যাপক প্রয়োগের ফলে ফ্যাসিবাদ ক্ষমতায় আসার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
২. ভোটারদের হুমকি-ধমকিতে রাখা: নির্বাচনকে ইঞ্জিনিয়ারিং করতে নির্বাচনের আগের দিন অথবা দুই-তিন দিন আগে প্রত্যেক বাড়িতে, বাজারে, চায়ের দোকানে, মসজিদে মসজিদে গিয়ে জনগণকে হুমকি-ধমকি দেয়া হতে পারে। তাদেরকে বলা হতে পারে, “ ভোট কেন্দ্রে যাবেন না, গেলে অসুবিধা হবে”। এসব হুমকি-ধামকির ভয়ে জনগণের উল্লেখযোগ্য অংশ বাড়ি থেকে বের হবে না। ফলে অশুভ দলটি কেন্দ্রে প্রশাসনের সহযোগিতায় ভোট জালিয়াতির অবাধ সুযোগ গ্রহণ করবে এবং ইচ্ছামত ব্যালটে সিল মেরে তাদের বিজয় নিশ্চিত করবে। এ ধরনের ইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতি অতীতে এরশাদ ও শেখ হাসিনার আমলে ঢের সংঘটিত হয়েছে।
৩. নির্বাচনের দিন কেন্দ্র দখল ও ফলাফল পরিবর্তন: বিশেষ কোনো দলের সমর্থক ও সংখ্যালঘু ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে না দেয়া, কেন্দ্র থেকে এজেন্ট বের করে দেয়া, কেন্দ্র দখল করে পরিকল্পিত উপায়ে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করা হতে পারে। এছাড়া নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিং করে ভোট গণনার সময় ফলাফল পালটে দেওয়াও একটি প্রচলিত ইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতি। ভোট গণনার সময় অন্য দলের পোলিং এজেন্টদের জোরপূর্বক সরিয়ে দিয়ে এ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। পোলিং এজেন্টদের সরানোর জন্য গুজবপূর্ণ আতঙ্ক ছড়ানো হয়ে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে বল প্রয়োগ করে জোরপূর্বক বের করে দেয়া হতে পারে। তারপর প্রেজাইডিং অফিসারের সাথে যোগসাজশ অথবা হুমকি-ধমকি দিয়ে ফলাফল শিটে ভোটের সংখ্যা পরিবর্তন দেখানো হতে পারে।
৪. রিটার্নিং অফিসারের নিকট তথ্য বিভ্রাট: রিটার্নিং অফিসারের কাছে পাঠানোর সময় গোটা কেন্দ্রের ফলাফল পরিবর্তন করে দেওয়া হতে পারে। প্রতিটি আসনে প্রায় ১৫০টি থেকে ২৫০টির মতো ভোটকেন্দ্র থাকে। কেন্দ্র থেকে ফলাফল তৈরি করার পর রিটার্নিং অফিসারের কাছে ফলাফল পৌঁছাতে অনেক রাত হয়ে যায়। সারাদিন কাজ করার পর এজেন্টগণ তখন খুব পরিশ্রান্ত ও ক্লান্ত থাকেন এবং পরস্পরের মধ্যে সমন্বয় সাধন অনেকটা ছেদ ঘটে। সুতরাং এতোগুলো কেন্দ্রের মধ্যে কিছু কেন্দ্রের ফলাফল পাল্টে দিলে অনেক সময় তা ধরা বা বুঝা যায় না। এভাবে তথ্য বিভ্রাটের মাধ্যমে নির্বাচন ম্যাকানিজম হতে পারে।
৫. অল্প ভোটের পার্থক্য: অল্প ভোটের পার্থক্য হলে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে রিটার্নিং অফিসার সুকৌশলে ভোটের যোগফলে পরিবর্তন করে পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত ঘোষণা করতে পারেন। এক্ষেত্রে বুঝার কোনো উপায় থাকে না। এমন ঘটনা অতীতে ঘটেছে। একবারও এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। এছাড়া রিটার্নিং অফিসারদের কাছ থেকে ফলাফল সংগ্রহের জন্য নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে একজন উপ-সচিবকে দায়িত্ব দেয়া হয়। তারা টেলিফোনে ফল সংগ্রহ করেন। রিটার্নিং অফিসারের সঙ্গে যোগসাজশে তারা ফল পরিবর্তন করে ফেললে কিছুই করার থাকে না।
৬. শক্তিশালী ইঞ্জিনিয়ারিং: নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সবচেয়ে শক্তিশালী ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয় নির্বাচনের মাস খানেক আগে থেকে। সরকার ও প্রশাসনের আচরণ, গতিবিধি, বিশেষ দলের নেতাকে বেশি বেশি হাইলাইট করা, নিরাপত্তা জোরদার করা, সুযোগ-সুবিধা বেশি দেয়া, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের লোকেরা তাদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাতের নামে মিটিং করা, ব্যবসায়ীরা ও মিডিয়ার লোকেরা ঐ দলের নেতাদের সাথে বেশি বেশি সাক্ষাৎ করা ও তৈল মর্দন করা, বিশেষ মিডিয়া ও আন্তর্জাতিক মহলের গতিবিধি মিলিয়ে এমন পরিবেশ তৈরি করা হয়, যাতে জনগণ ভাবে- ‘অমুক দল জিতবে।’ এর ফলে ব্যবসায়ী, প্রশাসন এবং অন্যান্য গোষ্ঠী, যাদের সরকারের সঙ্গে কাজ করতে হয়, তারা সেই দলের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। এমনকি বিদেশি কূটনীতিকদের ঐ দলের সাথে ঘনঘন যোগাযোগের হিড়িক পড়ে যায়। এভাবে নির্বাচনকে ইঞ্জিনিয়ারিং করে ফলাফল ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়। আসন্ন নির্বাচনেও সেটি ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। একটি বিশেষ দলের নেতাদের সাথে ব্যবসায়ীরা, গণমাধ্যম, সরকারি কর্তা ব্যক্তিরা ইতোমধ্যে যোগাযোগ করছেন। এ অবস্থায় দোদুল্যমান ভোটারদের একটি বড় অংশ তখন সেই দলের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না বলে বিশ্লেষকগণ মনে করছেন। নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিং হওয়ার এ আশঙ্কা জনগণের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
মোটকথা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করে সরাসরি রাষ্ট্রযন্ত্র। এবারও রাষ্ট্রের লক্ষণে এটি পরিষ্কার যে, তারা এ ভূমিকা পালনে খুবই তৎপর। এ অবস্থায় নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিং করে দেশকে নতুন করে ফ্যাসিবাদের হাতে তুলে দেয়া অথবা পতিত ফ্যাসিবাদকে পুনর্বাসন করা হলে দেশ এবং জনগণ গভীর সংকটে পড়ে যাবে। সুতরাং কোনোভাবেই কোনো অপশক্তি যাতে এবারের নির্বাচনকে ইঞ্জিনিয়ারিং করতে না পারে সে জন্য জাতিকে সর্বদা সতর্ক অবস্থায় থাকা খুবই জরুরি।