ওম্মে হাবিবা তৃষা

মাগরিবের আযান ভেসে আসে চারদিকে। একই সূর্যাস্ত, একই চাঁদের মাস, একই রমযান কিন্তু একই সমাজে দু’পরিবারের জীবনে ফুটে ওঠে ভিন্ন চিত্র। আযানের ধ্বনি যেমন সবার কানে পৌঁছে যায়, তেমনি রোজার বিধানও সবার জন্য সমান। তবু বাস্তবতা সমান নয়। কারও ইফতারের টেবিলে প্রাচুর্যের বাহার, কারও থালায় সামান্য আহার।

শহরের এক অভিজাত এলাকায় একটি পরিবার রমযানকে ঘিরে বিশেষ প্রস্তুতি নেয়। রমযান শুরু হওয়ার আগেই বাজারের তালিকা তৈরি হয়। প্রতিদিনের ইফতারের জন্য আলাদা মেনু ঠিক করা হয়। বিকেল হতেই রান্নাঘরে ব্যস্ততা বেড়ে যায়। খেজুর, ফল, শরবত, পিয়াজু, বেগুনি, কাবাব, হালিম, বিরিয়ানি- নানা পদের আয়োজন। টেবিল যেন এক রঙিন উৎসব। পরিবারের সদস্যরা ইফতারের আগে ছবি তোলে, সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করে। খাবারের পরিমাণ এত বেশি যে অনেক সময় কিছু অবশিষ্ট থাকে। রোজা যেন এখানে শুধু ক্ষুধা দমনের অনুশীলন নয়, বরং আয়োজনের প্রতিযোগিতাও।

অন্যদিকে, শহরেরই অন্য প্রান্তে কিংবা গ্রামের কোনো ছোট ঘরে আরেকটি পরিবার রমযান কাটায় ভিন্ন বাস্তবতায়। দিনমজুর বাবা সারাদিন কাজের খোঁজে ঘুরে বেড়ান। কাজ না পেলে আয় নেই। মা ঘরে বসে হিসাব মেলান-আজকের ইফতারে কী থাকবে? অনেক সময় টেবিলে থাকে শুধু ভাত আর লবণ, অথবা সামান্য ডাল। কখনও দু’একটি খেজুর পেলে সেটাই বড় প্রাপ্তি। শিশুরা চুপচাপ বসে থাকে। তাদের চোখে হয়তো কৌতূহল-পাশের বাড়িতে এত কিছু রান্না হচ্ছে, আমাদের ঘরে কেন নয়? তবু তারা অভিযোগ করে না। কারণ অভাব তাদের শেখায় ধৈর্য।

একই আযান, কিন্তু অনুভূতি আলাদা। এক পরিবার ইফতারের পরও খাবার বেছে খায়; অন্য পরিবার অল্প খাবারটুকু সমান ভাগে ভাগ করে। ধনী পরিবারের শিশু হয়তো বলে, “আজ এটা ভালো লাগছে না।” গরিব পরিবারের শিশু ছোট্ট একটি ফল পেয়ে আনন্দে ঝলমল করে ওঠে। এই বৈষম্য শুধু অর্থের নয়; এটি জীবনের সুযোগ ও নিরাপত্তার বৈষম্য।

রমযান আমাদের শেখায় সংযম। কিন্তু প্রশ্ন হলো- যেখানে কেউ প্রতিদিনই অভাবে থাকে, তার জন্য সংযমের শিক্ষা নতুন কী? যে পরিবার বছরের বারো মাসই অল্পে চলে, তাদের কাছে রোজা মানে হয়তো আলাদা কষ্ট নয়, বরং একই সংগ্রামের ধারাবাহিকতা। আর যে পরিবার প্রাচুর্যে অভ্যস্ত, তাদের জন্য রোজা সাময়িক অভিজ্ঞতা-সূর্যাস্তের সঙ্গে যার সমাপ্তি।

এমন চিত্র আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। রমযানের মূল শিক্ষা কি কেবল নিজে ক্ষুধার্ত থাকা? নাকি অন্যের ক্ষুধা অনুভব করে তার পাশে দাঁড়ানো? যদি ইফতারের টেবিলে অতিরিক্ত খাবার থাকে, তবে কি তা অভাবী পরিবারের সঙ্গে ভাগ করা যায় না? যদি নতুন পোশাক কেনার সামর্থ্য থাকে, তবে কি আরেকজনের জন্য একটি সাধারণ পোশাক কেনা অসম্ভব?

সমাজে বৈষম্য থাকবেই, কিন্তু মানবতা থাকলে সেই বৈষম্য কিছুটা হলেও কমানো যায়। রমযান সে সুযোগ এনে দেয়। যাকাত, ফিতরা ও সদকার মাধ্যমে সম্পদের একটি অংশ অভাবীদের জন্য নির্ধারিত। এটি দয়া নয়, এটি তাদের অধিকার। যখন প্রাচুর্যের পরিবার বুঝতে শেখে যে তাদের অতিরিক্ত অংশটুকু অন্যের প্রয়োজন মেটাতে পারে, তখনই রমযানের চেতনা পূর্ণতা পায়।

রমযানের আযান আমাদের সবাইকে একই সারিতে দাঁড়াতে ডাকে। মসজিদে ধনী-গরিব একসঙ্গে নামাজ পড়ে। সেখানে কোনো আলাদা আসন নেই। এ সাম্যবোধ যদি আমাদের ঘরেও প্রতিফলিত হতো, তবে সমাজ আরও সুন্দর হতো। প্রাচুর্যের প্লেট আর প্রয়োজনের প্লেটের ব্যবধান কিছুটা হলেও কমত।

শেষ পর্যন্ত রমযান আমাদের সামনে একটি আয়না ধরিয়ে দেয়। আমরা কোন পরিবারের প্রতিনিধিত্ব করছি সেটি নয়, বরং আমরা অন্য পরিবারের জন্য কী করছি-সেটিই আসল প্রশ্ন। একই আযান যেন কেবল উপবাস ভাঙার সংকেত না হয়ে ওঠে; বরং তা হয়ে উঠুক ভাগাভাগি ও সহমর্মিতার ডাক।

একই আযান, ভিন্ন থালা-এই বাস্তবতা বদলাতে না পারলেও আমরা অন্তত চেষ্টা করতে পারি যেন কারও থালা একেবারে খালি না থাকে। তাহলেই রমযানের শিক্ষা সত্যিকার অর্থে আমাদের জীবনে প্রতিফলিত হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।