আবুল খায়ের নাঈমুদ্দীন

সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে সংসদ পর্যন্ত তরুণদের অনেক কিছু শেখার আছে। এ তরুণরা জীবনে প্রথমবার ভোটার হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছে। তাদের অনেকে এর আগে ভোটার হলেও ভোট দিতে পারেনি যেমন সত্য তেমনি এবার ভোট দিয়েও তারা বেকুব বনে গেছে। তারা ফ্যাসিস্ট সরকার দেখেছে তাদের হটিয়ে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছে। নতুন বাংলাদেশের নতুন স্বাধীনতার প্রত্যাশায় তারা উদ্যোমি হয়ে ওঠেছে। তাদের কেউ ছিলো পালাতক, কেউ ছিলো লুকিয়ে, কেউ ছিলো প্রবাসে, কেউ ছিলো আছে বেকার, কেউ বা হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজছে। আবার কেউ আছে জুলাই ২৪ র আহত। তাদের সবার স্বপ্ন ও কল্পনা একটাই রাস্তার গাড়ি থেকে শুরু করে স্কুর কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, অফিস-আদালত, আইন-কানুন, ব্যবসা-বাণিজ্য সব কিছু সঠিক নিয়মে চলবে। এর ব্যতিক্রম হলেই তাদের কাছে অপছন্দ আর বিরক্তিকর মনে হবে। অথচ তারা ইতিমধ্যে বেশ ব্যতিক্রম দেখেও সহ্য করে নিচ্ছে। ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ লালন করছে। কেউ কেউ বলাবলি করছে- আমরা নতুন বাংলাদেশের জন্য ভোট দিয়েছি নতুন বোতলে পুরাতন মদ রাখার জন্য নয়। যে যাই বলুক এই সরকারে পেছনের সব কিছু থেকে কিছুটা হলেও নতুনত্ব আছে।

বর্তমান সরকার ছাত্রজনতার আন্দোলনের ফল। ছাত্র জনতা এক নতুন সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিমুক্ত জনদরদী একটি সরকার চায়। সে টার্গেটে নতুন কিছু কার্যক্রমও করা হয়েছে। তাছাড়া এ সরকারে প্রথমবারের মতো বেশ শিক্ষিত স্মার্ট ও জ্ঞানী অভিজ্ঞ কিছু ব্যক্তি নিয়ে গঠিত। অসংখ্য সংসদ সদস্য আছেন ডক্টরেট করা। অনেকে আছেন মাস্টার্স করা, অনেক আছেন মাওলানা, মোটামুটি এ যাবত কালের সবচেয়ে বেশি শিক্ষিতদের সংসদ এই ত্রয়োদশ সংসদ। এই সংসদ পেতে যেমন সবাইকে কষ্ট করতে হয়েছে তেমনি তেমনি ভোটে জনগণের সাড়াও পাওয়া গেছে। বর্তমানের তরুণরা সরকারী গাড়িকে উল্টা লাইনে যেতে দেয়নি। বিভিন্ন জাযগায় বেশি ভাড়া নেয়ার পথ বন্ধ করেছে। দোকানে দাম বেশি রাখার প্রতিবাদ করেছে।

ফলে পরিস্থিতিতে হোক, নিজ থেকে হোক, বৃটিশের নিয়ম জানার কারণে হোক এবার সরকার নতুন করে সব কিছু আঞ্জাম দিচ্ছে। অফিস সময় নিয় কঠোর হচ্ছে, যাতায়াতের দুর্ভোগ কমাতে নতুন চিন্তা করছে, সবখানে ঘোষণা দিচ্ছে নিয়ম না মানলে কঠোর ব্যবস্থা। কোন কোন এমপি মহোদয় ঘোষণা দিয়েছেন, তাঁর এলাকায় ঘূষ - দুর্নীতি ও কোন ধরনের অনিয়ম করলে সে যেন নিজ থেকে অন্য এলাকায় চলে যায়। তাছাড়া জনপ্রশাসনে নীরবে চলছে শুদ্ধি অভিযান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় ভিসি মহোদয় নিজ থেকে পদত্যাগ করেছেন।

মোটকথা এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক পরিবর্তন, সামাজিক পরিবর্তন হতে বাধ্য। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বিরোধি দলীয় নেতারা জানিয়ে দিচ্ছেন, কোন পরিবারতন্ত্রের রাজনীতি আর সরকারে আসবে না। বাংলাদেশের জন্ম হতে দু’ধরনের সরকার পাল্টাপাল্টি করে সরকার গঠন করে আসছে তৃতীয় কিছু তারা কল্পনাও করতো না। আর অন্য কাউকে সুযোগও দিতো না। তাদের মূল কাজ ছিলো তৃণমূল থেকে চাঁদার ভাগ যেতো, তার রাষ্ট্রের উচ্চ স্তরের লোকদের চেয়ার পর্যন্ত ধারাবাহিকতা বজায় থাকতো। এর প্রমাণ হলো একজন ভিসিও বলেছিলেন তিনি ভিসির পদ ছেড়ে দিবেন যদি একটি... পদ পেয়ে যান। অবাক করা বিষয় কি আছে ঐ পদে? ঢাকা কলেজের সদ্য পাশ করা এক ছাত্র বলেছিলো সরকারি চাকরির চেয়ে এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এবার এমন ভিত ভেঙে তার ব্যতিক্রম কিছু হচ্ছে।

ড. ইউনুস একজন নায়ক। নায়কের মতোই অলৌকিক ফু দিয়ে সব ঠিকঠাক করে মেহমানের মতো চলেও গেলেন। তিনি একজন শান্তিতে নোবেল প্রাপ্ত ব্যক্তিই নন, তিনি অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদও বটে। তাঁকে ফ্যাসিস্ট সরকার ঝুলিয়ে ফেলেছিলো। তিনি লুকিয়ে থাকেননি, তিনি এসেছেন লিফ্ট ব্যতিত পায়ে হেঁটে বহুতল ভবনে আসামী হিসেবে উঠেছেন। লিফ্ট বন্ধ ছিলো। সে ঘাম ঝরানো ব্যক্তি একটি হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার ভূমিকা রাখলেন। আর সে বাঁশির সুরে তরুণ, কিশোর, যুবক বৃদ্ধ, নারী পুরুষ মিলে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং নতুন বাংলাদেশ আবিষ্কার করলেন। যেখানে সবাই নিশ্চিন্তে কাঁধে হাত রেখে চলাফেরা করেছে। জঙ্গি টেক লাগানো লোকগুলোও স্বাধীনভাবে সম্মান নিয়ে চলাফেরা করেছে। সব দল থেকে ইউনূস স্যার ফুলের গালিচা পেয়েছেন। লন্ডনে গিয়ে যেমন দেখা করেছেন তেমনি দেশের সবার সাথে কানে কানে নরম সুরে কথা বলেছেন। তারপর তাঁর মামলা থেকে সম্মানজনক অব্যাহতি নিয়ে তিনি রাষ্ট্র প্রধানের দায়িত্ব পালন করে কিভাবে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে হয়, কিভাবে উচিত শিক্ষা দিতে হয়, সবাইকে সেই শিক্ষা দিয়ে নিজে হাসতে হাসতে বিদায় নিয়ে গেলেন।

কী অবাক করা বিষয়, যে দলকে ৫ দিন আগে ফাইনাল বাদ দিয়ে দিলো দেশের রাজনীতি থেকে। সে দলই সবার আগে সব অনুষ্ঠানের দাওয়াত পায়। আবার যারা নিষিদ্ধ করেছিলো তারাই নিষিদ্ধ হয়ে যায়। আরো অবাক করা বিষয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হয়েও সবাই সবাইকে ফুল দিয়ে বরণ করে। কী মন্ত্র তিনি ছাড়লেন সবাই মিলে সংঘাতহীন, সংঘর্ষহীন একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো। তরুণরা শিখতেই হবে, জানতেই হবে এই মন্ত্রটি কি। এবারের সংসদে যারা গেলেন তাদের মধ্যে বিচিত্র যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার লোক রয়েছেন। শিক্ষিত মার্জিত, বীর, যোদ্ধা ও আছেন। হুমদি ধমকি ছাড়াও যে নরম সুর দিয়ে মানুষকে বশ করা যায় তা দেখিয়ে দিলো নব্য নেতারা।

সর্বনিম্ন ২৬ বছর বয়সের তরুণ সাংসদও আছেন। সে তরুণরা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে শুরু করেছেন। স্থানীয়ভাবে সব তরুণ সচেতন হয়ে ওঠেছে। কিছুদিন আগেও ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রের হাতে ছিলো সিগারেট আর মোটর সাইকেল। তারা গ্রামে মুরুব্বীদের সামনে পায়ের উপর পা রেখে বসতো, মুরুব্বীদেরকে তুই বলে সম্বোধন করতো। আর এখন তরুণ শিক্ষামন্ত্রী বলছেন, আমি প্রত্যেক বাড়ি থেকে সন্ধ্যার পরে আগের মতোই বই পড়ার আওয়াজ শুনতে চাই। কি চমক! তরুণদের জন্য। আরো কিছু চমক জাতির জন্য অপেক্ষা করছে আশা করি।

সবচেয়ে মজার ও শেখার বিষয় হলো- জুলাই সনদ। কেউ কেউ বলছেন- জুলাই সনদ কী? কেউ বলছেন সাঈদ হাদি মুগ্ধ এরা আবার কারা? এ প্রশ্ন যারা করছেন তারা এ সংসদেও আছেন। খুব সহজ হিসাব যারা জুলাই ২৪ মানেন না তারা অবশ্যই আগের পরিস্থিতি মানেন। তাহলে যে যেই গর্তে যেভাবে ছিলো সে সেভাবে সে জায়গায় চলে যাবে। হাসিনা বুবু আসবেন এবং তার গদিতে ২০৪০ এর মিশন নিয়ে বসবেন। আর তারেক সাহেবকে বলবেন, তুমি বলেছিলে দেশে আসবে না রাজনীতিতে নাক গলাবে না। তুমি সেখানে বসে বসে আমাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনা করে এসে প্রধানমন্ত্রী হয়েছো, কথা রাখোনি। তুমি ভবিষ্যতেও আমার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র করতে পারো সুতরাং তোমার বিষয়ে স্থায়ী চিন্তা করতে হবে... গুপ্তরা গুপ্ততে চলে যেতেও পারে নাও যেতে পারে। কিন্তু হয়তো বা হতে পারে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মহোদয়কে রাজনীতি থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবার ব্যবস্থা করে হাসিনা বুবু ভারতের স্বপ্ন ও কল্পনা বাস্তবায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। তখন তরুণরা এই দেশের রাজনীতি থেকে যা শেখার তা শেখে নেবে।

লেখক : সাবেক অধ্যাপক ও প্রবন্ধকার।