দুই সরকারের দুটি সিদ্ধান্ত; বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও জীবন-জীবিকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম সিদ্ধান্তটি হচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেয়া। দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটি নবগঠিত বিএনপি সরকার গৃহীত। প্রথম সিদ্ধান্তে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল বিশেষ করে বরেন্দ্র এলাকার তিনটি জেলা রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ২৫টি উপজেলার ৪৯১১টি গ্রামকে আগামী দশ বছরের জন্য পানি বিপন্ন (Water Stressed) এলাকা ঘোষণা করেছেন। ঘোষণা অনুযায়ী বর্ণিত সময়ে সংশ্লিষ্ট এলাকায় গৃহস্থালী কাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজে (যেমন সেচ ও শিল্পকারখানা পরিচালনা) ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা যাবে না, এ উত্তোলন নিষিদ্ধ থাকবে। এ ঘোষণায় সমস্যা সমাধানের বিকল্প হিসেবে ভূ-উপরিস্থ পানির সরবরাহ বৃদ্ধি, বরেন্দ্র এলাকার নদীনালাসমূহে পদ্মা নদী থেকে পানি সরবরাহ, বৃষ্টির পানি জমা করে রাখা, সেচ কাজে পানির কম ব্যবহার এবং যে সমস্ত শস্য চাষে পানির প্রয়োজন হয় না সে সমস্ত শস্য চাষে চাষিদের উদ্বুদ্ধ করা প্রভৃতি। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, সরকারের এ ঘোষণাটি প্রকাশিত হবার পর বাংলাদেশের কোনো মহলের তরফ থেকেই এর ওপর কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি। গোদাগাড়ি উপজেলার একজন সাওতাল কৃষকই শুধু একজন প্রত্যক্ষদর্শীকে ফেটে চৌচির হওয়া তার শুকনো ধান ক্ষেত দেখিয়ে বলেছিলেন যে, এর ফলে আমার জীবন-জীবিকা দুটিই অনিশ্চিত হয়ে গেলো।

বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের জেলাগুলো প্রধানত রাজশাহী, বগুড়া, দিনাজপুর, নওগাঁ, নাটোর, জয়পুরহাটও চাঁপাইনবাবগঞ্জের উঁচু চত্বরযুক্ত লালমাটির ভূখণ্ডযুক্ত এলাকা নিয়ে বরেন্দ্র অঞ্চল গঠিত। এটি মূলত প্লাইস্টোসিন (Pleistocene Terrace) যুগের লালচে মাটি ও ঘন শিলা দ্বারা গঠিত এবং পদ্মা, মহানন্দা ও করতোয়া নদী দ্বারা বেষ্টিত। এলাকাটি বাংলাদেমের অন্যতম প্রধান শস্য ভাণ্ডার, তবে খরাপ্রবণ, এটা শুষ্ক অঞ্চল এবং ভারত কর্তৃক নির্মিত ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে উপরোক্ত তিনটি নদীতে ভূউপরিস্থ পানি সরবরাহের পরিমাণ হ্রাস পাওয়ায় গত শতাব্দীর আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে তৎকালীন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে পঁচিশটি গভীর নলকূপ খননের মাধ্যমে সেচ কাজ শুরু হয় এবং পরবর্তীকালে তার সাফল্যের ভিত্তিতে ১৯৯২ সালে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃৃপক্ষ গঠিত হয় এবং তার মাধ্যমে বরেন্দ্র এলাকা প্রায় ১৫০০০ গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়। প্রাথমিকভাবে গ্রামভিত্তিক কৃষক সমবায় সমিতিসমূহের অধীনে ন্যূনতম ৬০ একর জমিতে চাষাবাদকারী ক্ষুদ্র কৃষক ও বর্গাচাষিদের নিয়ে গঠিত সেচ স্কীমে বোরো শস্যের চাষ দিয়ে এর প্রত্যেকটি গভীর নলকূপের ব্যবহার শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে এগুলো আমন ও খরিপ ধানের অতিরিক্ত সেচ, রবি ফসল চাষ এবং আম বাগানে সেচের পানি সরবরাহ ও খাবার পানির প্রধান উৎসে পরিণ হয়।

বগুড়াস্থ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির উদ্যোগে তার আশপাশের উপজেলাসমূহে Rural Water Supply শীর্ষ একটি প্রকল্পও বাস্তবাতি হয়। মোদ্দাকথা বরেন্দ্র এলাকাভুক্ত উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ১৬টি জেলা বাংলাদেশের শস্য ভাণ্ডারে পরিণত হবার পেছনে গভীর নলকূপভিত্তিক ভূগর্ভস্থ পানির ভূমিকা ব্যাখ্যাতীত। বরেন্দ্র এলাকার বাইরেও বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় (উপকূলীয় এলাকা ও সিলেট জেলা ছাড়া) আরো ৩২০০০ গভীর নলকূপ বিএডিসি-বিআরডিবির সোনালী ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে স্থাপন করা হয়েছে এবং এগুলো সেচের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখন সরকার তিনটি জেলার ২৫টি উপজেলার ৪৯১১টি গ্রামকে বিপন্ন ঘোষণা করে আগামী ১০ বছরের জন্য গভীর নলকূপের মাধ্যমে খাবার পানি ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে পানি উত্তোলন নিষিদ্ধ ঘোষণার অর্থ অত্যন্ত মারাত্মক’। এর ফলে গ্রামীণ জনপদ তাদের জীবন-জীবিকা উভয়ই হারাবে। বিকল্প হিসেবে সরকার কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করেছে। এগুলো হচ্ছে : (১) ভূউপরিস্থ পানি সরবরাহের পরিমাণ বৃদ্ধি, ২) বরেন্দ্র এলাকায় পদ্মা নদী থেকে পানি আনয়ন, ৩) বৃষ্টির পানি ধরে রাখা, ৪) সেচের কাজে পানির ব্যবহার হ্রাস এবং ৫) যেসব ফসল চাষে পানির চাহিদা কম সেসব ফসল চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা।

যারা এ সুপারিশগুলো প্রণয়ন করেছেন তাদের বুদ্ধির প্রশংসা না করে পারা যায় না। প্রথম সুপারিশটি সম্পূর্ণ অস্পষ্ট, পরবর্তী সুপারিশসমূহের সারাংশ মাত্র ও দায়সারা গোছের। পদ্মা নদী থেকে বরেন্দ্র এলাকায় পানি আনার সমস্যা কি আমরা জানি না? ফারাক্কা পয়েন্টে ভারত সরকার গঙ্গা নদীর উপর বাঁধ দিয়ে খাল কেটে নদীটির পানি প্রবাহ হুগলী দিয়ে কোলকাতা বন্দরের দিকে সরিয়ে নেয়ার ফলে বাংলাদেশ তার জন্মলগ্ন থেকে তার পানির ন্যায্য হিসসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বর্ষাকালে আমাদের পানির কোনও প্রয়োজন নেই। আমাদের পানির প্রয়োজন শুকনো মওসুম তথা শীতকালে। এ সময়ে আমাদের প্রয়োজন কমপক্ষে ৬০ হাজার কিউসেক পানি। গত দু’দশক ধরে আমরা পানি পাচ্ছি গড়ে ১৫-১৭ হাজার কিউসেক। গত স্বৈরাচারী আমলে শেখ হাসিনার সরকার শুধু ভারতকে দিয়েই গেছে; ভারত থেকে বাংলাদেশের স্বার্থের এক বিন্দুও আদায় করতে পারেনি। ভারত অবৈধভাবে অভিন্ন আন্তর্জাতিক নদীসমূহের পানি প্রত্যাহার ও বাংলাদেশকে বঞ্চিত করার ধারা অব্যাহত রেখেছে। দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলী পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে যৌথ নদী কমিশন গঠিত হলেও এ সময়ে কমিশনের কোনও কাজ লক্ষ্য করা যায়নি। বরাক উপত্যকার নদীসমূহেরও অবস্থা আমাদের জন্য সুখকর নয়। অর্থাৎ সবদিক থেকেই ভারত আমাদের জিম্মী করে রেখেছে। আমরা তাদের পানি আগ্রাসনের শিকার। ফল : আমাদের ভূউপরিস্থ পানির সংকট, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস, ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততার প্রভাব বৃদ্ধি ও মাটি ও পানিতে পুষ্টি উপাদান Plant nutrient হ্রাসের ফলে দেশের এক তৃতীয়াংশ অঞ্চলে মরুয়ায়ণ প্রক্রিয়া শুরু। পদ্মা, তিস্তাসহ অন্যান্য নদীগুলোর পানি প্রবাহ হ্রাসই এর প্রধান কারণ। আবার নদী উপনদী ও খালসমূহের তলদেশ পলি পড়ে উঁচু হয়ে গেছে। ফলে তাদের পানি ধারণ ক্ষমতাও কমে গেছে। বৃষ্টির পানি ধরে রাখার এগুলো ছিল অন্যতম প্রধান আধার। এগুলোর খনন নেই। পুকুর ও দিঘী খনন করে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার মতো খাস জমির অভাব প্রকট। অবশিষ্ট থাকে Cropting nattern পরিবর্তন। বহু বছরের পরীক্ষা নিরীক্ষার পর এ কাজটিও আমার অনেক আগে সম্পন্ন করেছি। আমার দৃষ্টিতে এখন যেটা দরকার সেটা হচ্ছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতের সাথে দরকষাকষি করে বাংলাদেশের জন্য অভিন্ন আন্তর্জাতিক নদীসমূহের পানির ন্যায্য হিস্সা নিশ্চিত করা।

এ ব্যাপারে অলঙ্ঘনীয় যেসব আন্তর্জাতিক সমঝোতা ও চুক্তি বাংলাদেশের জন্য রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করতে পারে সেগুলো হচ্ছে :

  1. Declaration of Madrid 20 April, 1911 : International Regulation Regarding the use of international water Courses for Purposes other than Navigation.
  2. Helsinki Rules on the uses of the waters of International Rivers, 1966.
  3. Convention on the law of the Non-Navigational uses of International water Courses (Adopted by the General Assembly of the United Nations on May 21, 1997).
  4. WTO Regulations on International Resoures against Production Activities (Former GATT regultions)

আমি উপরোক্ত দলিল/চুক্তিসমূহের শর্তাবলীর অনুসরণকে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। এর মধ্যে আমার যতদূর মনে পড়ে দুই ও তিন নম্বর চুক্তি বাংলাদেশকে জধঃরভু করে নিতে হবে এবং ১৮ কোটি জনগণের স্বার্থে হেগের আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হতে হবে। উজানের বড় কোনও দেশ ভাটির ছোট কোনও দেশকে তার পানির ন্যায্য হিস্সা থেকে বঞ্চিত করতে পারে না। সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিদ্যমান সংকটের আলোকে জেলাকে পানি বিপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছেন। বর্তমান অবস্থা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে অবশিষ্ট জেলাগুলো নিরাপদ থাকতে পারবে না বলে আমি মনে করি।

বাংলাদেশে একটি নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। জাতির অভিন্ন স্বার্থে সরকারি ও বিরোধী উভয় দল যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কামনা করার চেষ্টা করেন তাহলে শীঘ্রই আমাদের পানি সমস্যার সমাধান হতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। এ ব্যাপারে সরকারের দায়িত্বই মূখ্য।

কৃষিঋণ মওকুফের উপর আগামী সপ্তাহে বিস্তারিত আলোচনার আশা রাখি।