মানুষ অপরাধী হয়ে জন্মায় না, পাপ নিয়েও তার আগমন ঘটে না। আরশের মালিকের সৃষ্টি প্রতিটি মানুষই জন্ম নেয় নিষ্পাপ, শিশিরভেজা ফুলের মতো। কারও কপালে লেখা থাকে না অপরাধের দাগ,কারও শরীরে আঁকা থাকে না পাপের চিহ্ন। কিন্তু নিষ্ঠুর এক বাস্তবতা ধীরে ধীরে মানুষকে গ্রাস করে। সময়ের স্রোত, সমাজের ভাঙাচোরা কাঠামো আর পরিবেশের নিষ্ঠুরতা নিষ্পাপ আত্মাকে বদলে দেয়। মূল্যবোধের জায়গায় জন্ম নেয় আপস, নীতির জায়গায় আসে স্বার্থ, আর বিবেকের কন্ঠস্বর চাপা পড়ে যায় কোলাহলের ভিড়ে। ফলে একসময় মানুষ নিজেও টের পায় না- কখন সে নৈতিকতার পথ ছেড়ে অনৈকিতার অন্ধকারে পা বাড়িয়েছে। এভাবেই সমাজ গড়ে তোলে অপরাধী, জন্ম দেয় পাপকে, আর হারিয়ে ফেলে নিজের মানবিক সত্ত্বাকে। পৃথিবী এখন আমাদের হাতের মুঠোয়। মুহূর্তে আমরা পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের খবর পাই। অথচ নিজেদের ঘরের খবর রাখি না। নিজেদের ভেতরের মানুষের খবর রাখি না।
চোখের সামনে নৈতিকতার অঃপতন ভয়ংকর রূপে সমাজ ও রাষ্ট্রকে গ্রাস করছে। অথচ আমাদের সমাজটা এরকম ছিল না। আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নৈতিকতার বিশেষ কদর ছিল। সমাজে যারা অনৈতিক কাজে জড়িত থাকতেন, তাদেরকে সবাই এড়িয়ে চলত। যারা ঘুষের চাকরি করতেন, তাদের কেউ সালাম পর্যন্ত দিত না; এমনকি তাদের সঙ্গে কেউ আত্মীয়তাও করত না। এককথায় তারা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকতেন। সমাজের অন্য দশজন যেভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলত, তারা সেভাবে চলতে পারতো না। অনেক ক্ষেত্রে অন্যায়কারী নিজেও লজ্জায় মুখ লুকিয়ে চলত। বিয়ে-শাদির ক্ষেত্রেও এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হতো। এখন আর তেমনটি দেখা যায় না।
একটি সমাজ সুস্থ না অসুস্থ তা বোঝার বহু মানদণ্ড থাকতে পারে! কিন্তু নৈতিকতার বিচারে নেলসন ম্যান্ডেলার একটি কথাই যথেষ্ট- কোনো সমাজের প্রকৃত চেহারা ধরা পড়ে তার কারাগারে। আজ আমাদের দেশের কারাগারগুলো ধারণক্ষমতার বাইরে বন্দিতে ঠাসা। এ দৃশ্য শুধু অপরাধের নয়, বরং নৈতিক ব্যর্থতারই প্রতিচ্ছবি। কারাগারগুলো এখন আর অপরাধীর আবাস নয়; এগুলো পরিবার, শিক্ষা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ পরাজয়ের নীরব দলিল। কারণ ধর্ম কখনো মানুষকে অপরাধ শেখায় না-শেখায় আত্মসংযম, ন্যায়বোধ ও দায়িত্বশীলতা। অথচ সমাজ থেকে এই শিক্ষা আজ নির্বাসিত। নৈতিকতা ও ঈমান যখন দুর্বল হয়ে পড়ে তখন সেখানে অশ্লীলতা আর পরকীয়া স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। কুরআন ও সুন্নাহের যেসব কাজ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, সেগুলোই আজ প্রকাশ্যে সংঘটিত হচ্ছে- নীরব সমাজের চোখের সামনে। এর ফল ভয়াবহ- পরকীয়ার জেরে নৃশংস হত্যা, পরিবার ধ্বংস, সন্তান এতিম হওয়ার ঘটনা প্রায়ঃশ ঘটছে।
তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে খুনোখুনি এখন সংবাদের শিরোনাম। বাবা খুন হচ্ছে সন্তানের হাতে, সন্তান খুন হচ্ছে মায়ের হাতে, বাসার গৃহকত্রী খুন হচ্ছে কাজের মেয়ের হাতে, ভাতিজা খুন হচ্ছে চাচার হাতে-মানবিকতা যেন নিজ ঘরেই লাশ হয়ে পড়ে আছে। ধর্ষণ ও ইভটিজিং সমাজের গভীর অসুখের স্পষ্ট লক্ষণ। ইসলাম নারীকে দিয়েছে মর্যাদা ও নিরাপত্তা। অথচ আজ সেই নারীই সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ। এ অন্ধকার থেকে মুক্তির পথ একটাই-রাসুলুল্লাহ (সা.) এর দেখানো পাথে ফিরে যাওয়া। তিনি একটি অধঃপতিত সমাজকে ন্যায় ও ইনসাফের আদর্শে রূপান্তর করেছিলেন। তিনি ছিলেন জীবন্ত এক নৈতিক আদর্শ। তাঁর চরম শত্রুরাও তাঁকে আল-আমিন বিশ্বাসযোগ্য-সত্যবাদিতা, আমানতদারি ও ন্যায়পরায়ণতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। কুরআনুল কারিমে তাঁর চরিত্র সম্পর্কে বলা হয়েছে- নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী। (সূরা আল-কলম: ৪) নৈতিকতার সংকট দূর করতেই রাসুল সা. একদল সোনার মানুষ গড়ে তুলেছিলেন। তারা প্রত্যেকেই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে স্বীকৃত।
আমরা প্রযুক্তিতে এগিয়েছি, কিন্তু নৈতিকতায় পিছিয়ে পড়েছি। উন্নয়ন চোখ ধাঁধানো, অথচ মানবিকতা ও মূল্যবোধ প্রায় অদৃশ্য। চারদিকে অরাজকতা, সহিংসতা আর নিষ্ঠুরতার ছাপে বিবেক অবশ হয়ে যাচ্ছে। অথচ আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ ছিল খুবই চমৎকার। গ্রীষ্মের দিনে গরমের যন্ত্রণায় গ্রামের মানুষ ঘরের বাইয়ে রাত্রি যাপন করতো। কোন ভয় তাড়িয়ে বেড়াত না। এখন এমন দৃশ্য আর কোথাও দেখা যায় না। পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক বেশ মজবুত ছিল। ঘরে ঘরে মাতব্বর ছিল না। একেক গোষ্ঠীর একেকজন মাতব্বর ছিলেন। তিনি যা বলতেন সবাই তা মান্য করতো। পড়ালেখার কোন চাপ ছিল না। স্কুল শিক্ষার চাইতে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি বেশ তাগিদ ছিল। প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় মক্তব শিক্ষা চালু ছিল। আমাদের মায়েরা ফজরের নামাযের পর সন্তানদের মক্তবে পাঠাতেন। স্কুলে না গেলেও ধর্মীয় শিক্ষার ওপর জোর দিতেন। ফলে পরিবার, স্কুল ও সমাজ মিলেই নৈতিক মানুষ তৈরি হতো। মা-বাবা সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা দিতেন, শিক্ষকরা চরিত্র গঠনের পাঠ পড়াতেন। ধর্মীয় মূল্যবোধ জীবনের অংশ ছিল। অসৎ উপায়ে পরীক্ষায় পাস কিংবা অর্থ উপার্জনকে নিরুৎসাহিত করা হতো। কিন্তু ইদানীং কিছু অভিবাবক তাঁর সন্তানকে যেনতেন উপায়ে হলেও জিপিএ ফাইভ পাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহী ভূমিকা পালন করেন। জিপিএ ফাইভ যেন জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। অথচ একজন অভিভাবকের উচিত ছিল তাঁর সন্তানকে ভালো মানুষ হওয়ার তাগিদ দেয়া। কিন্তু অধিকাংশ অভিভাবক এখন অর্থ-বিত্তের পেছনে ছুটছেন। কীভাবে দ্রুত বাড়ি-গাড়ির মালিক হওয়া যায় সেই চিন্তাই জীবনের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে শ্রদ্ধা, মায়া-মমতা, স্নেহ ও ভালোবাসা ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে, বাড়ছে অসহিষুতা, মিথ্যা, প্রতারণা ও দুর্নীতি। আমাদের পারিবারিক, সামাজিক ও ব্যক্তিজীবনে অনৈতিকতার বিস্তার স্পষ্ট। অন্যের সফলতা সহ্য করতে না পারা, সুযোগ পেলেই কাউকে বিপদে ফেলা, অন্যায় দেখেও প্রতিবাদ না করা-এগুলো এখন নিত্যদিনের চিত্র। চোখের সামনে মানুষ পিটিয়ে হত্যা করা হলেও আমরা দাঁড়িয়ে ভিডিও করি, কিন্তু বিবেক জাগ্রত হয় না। কারণ নৈতিকতার শিকড়ে পচন ধরছে।
প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে একের পর এক শিউরে ওঠা শিরোনাম-বিয়ের দাবিতে অনশন, স্বামীর দাবিতে ছেলের বাড়িতে ওঠা, প্রেমের নামে প্রতারণা। যার শেষ পরিণতি রক্তাক্ত লাশ। প্রশ্ন জাগে- আমরা কি সত্যিই একটি সভ্য সমাজে বাস করছি নাকি নৈতিকতার লাশ কাঁধে নিয়ে অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি? একটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশে এমন ঘটনাগুলো এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়; বরং তা পরিণত হয়েছে সামাজিক ব্যাধিতে। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো- এসবের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ চোখে পড়ে না। ফলে প্রতারণা, অবৈধ সম্পর্ক আর দায়িত্বহীনতার শেষ পরিণতি হিসেবে জন্ম নিচ্ছে নৃশংস হত্যাকাণ্ড। ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় ঈদগাহ ময়দানের সামনে ২৬ টুকরা লাশ উদ্ধারের ঘটনা আমাদের বিবেককে কাঁপিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু এ ঘটনা আমাদের সমাজকে নাড়া দেয়নি; বরং আমরা এটাকে আরও দশটা সংবাদের ভিড়ে হারিয়ে ফেলেছি।
তদন্তে প্রকাশ- এর পেছনেও ছিল পরকীয়া সম্পর্ক। ‘‘স্বামীর দাবিতে বাড়িতে উঠতে গিয়ে মারধর’’- এ শিরোনাম কোনো উপন্যাসের নয়, দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকার। সিরাজগঞ্জের সলঙ্গায় এক নারী তার স্বামীর বাড়িতে উঠতে গিয়ে মারধরের শিকার হয়ে ঘরছাড়া হন। প্রবাসে পরিচয়, বিয়ে, একসঙ্গে সংসার-সবকিছু থাকা সত্ত্বেও তাকে অস্বীকার করা হয়। যশোরে শিশু সন্তান কোলে নিয়ে এক নারী অনশনে বসেন স্বামীর বাড়ির সামনে। বাড়ির দরজা বন্ধ করে পালিয়ে যান শাশুড়ি। সমাজ তখন নীরব দর্শক। পরে কিছু আশ্বাস দিয়ে তাকে বাড়ি ফেরানো হয়। এরকম বহু ঘটনা আছে যা লিখলে সমাপ্তি টানা যাবে না। কুষ্টিয়ার রবিজুল ইসলামের নৈতিক অধঃপতনের ঘটনাটি বেশ আলোচিত হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। তিনি একটি নয়, পরপর সাতটি বিয়ে করে নিজেকে গর্বিত মনে করেছেন। সমাজও তাকে অভিনন্দন জানিয়েছে। অথচ ইসলামে যেখানে কঠোর শর্তসাপেক্ষে সর্বোচ্চ চারটি বিয়ের অনুমতি রয়েছে, সেখানে সাতটি বিয়ে করে তিনি কোনো অপরাধবোধই অনুভব করেন না। আরও ভয়ংকর হলো-সমাজও তাকে প্রশ্ন তো করেই না, বরং উৎসবে মেতে ওঠে। আজ প্রশ্ন উঠতেই পারে-আমরা কি ধর্মকে ধারণ করছি, না কি নিজেদের লালসা বৈধ করার হাতিয়ার বানাচ্ছি? মার মানতের নামে সাতটি বিয়ে যদি বৈধ হয়ে যায়, তাহলে আগামী দিনে এ সীমা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? এ বাস্তবতা স্পষ্ট করে বলে দেয়- আইন একা এই সমাজকে বাঁচাতে পারবে না। আইন শুধু শাস্তি দিতে পারে, কিন্তু চরিত্র গঠন করতে পারে না।
চরিত্র গঠন আসে পরিবার, সমাজ, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার মধ্যে দিয়ে। অতএব, আজ সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠছে-ধর্মীয় মূল্যবোধের সঠিক শিক্ষা ও তার বাস্তব প্রয়োগ। প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ, নৈতিকতার জাগরণ। তা না হলে আজ যেসব নারী বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে অনশন করছেন, আগামী দিনে তাদের অনেকেই হয়তো পরিণত হবে আরও একটি বিভক্ত লাশেÑ আর আমরা তখনও নীরব দর্শক হয়েই থাকব। সুতরাং শুধু আইন দিয়ে এ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন নৈতিকতা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সকলের সম্মিলিত উদ্যোগ, তা না হলে নৈতিকতার ভয়াবহ অধঃপতন কোনোভাবেই ঠেকানো সম্ভব হবে না।
লেখক : প্রাবন্ধিক।