মু. শফিকুল ইসলাম
ভূমিকা : গাজা উপত্যকায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান যুদ্ধ, নির্বিচারে বোমাবর্ষণ, শিশু ও নারীর নির্মম মৃত্যু-এসব দৃশ্য এখন আর বিশ্বসভ্যতাকে তেমন নাড়া দেয় না। যেন মানবতার মৃত্যু এখন দৈনন্দিন সংবাদ, আর বেদনার আর্তনাদ একঘেয়ে সঙ্গীত। প্রশ্ন জাগে-ফিলিস্তিনীদের বোবা কান্না কি সত্যিই আরব দুনিয়ার ঘুম ভাঙাতে ব্যর্থ? বা বিশ্বশক্তির বিবেককে কি সত্যিই আর স্পর্শ করে না মানবতার এই বিপর্যয়?
এ প্রবন্ধে আমরা বিশ্লেষণ করবো-কেন গাজা যুদ্ধ বিশ্বকে নীরব করে ফেলেছে, কেন আরব রাষ্ট্রগুলো শক্ত ভূমিকা নিতে পারছে না, এবং কেন বৈশ্বিক বিবেক ক্রমেই অসাড় হয়ে যাচ্ছে।
গাজা : আগুনে পোড়া এক মানবিক ট্র্যাজেডির নাম : ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলের একটি। দীর্ঘ অবরোধের কারণে এখানকার মানুষ এমনিতেই খাদ্য, ওষুধ, বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে ছিল। যুদ্ধ যেন এই দুঃখকে শত গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রতিদিন গড়ে নিহত হচ্ছে অসংখ্য শিশু, ধসে যাচ্ছে হাসপাতাল, ভেঙে পড়ছে ঘরবাড়ি। এই ভয়াবহতা দেখে মনে হয়, গাজা আজ মানবতার সর্ববৃহৎ কবরস্থানে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু গাজার এ কান্না-এই আর্তচিৎকারÑবিশ্ব সভ্যতার কানে কি পৌঁছায়? প্রশ্নটি যত সহজ, তার উত্তর ততই কঠিন।
আরব বিশ্বের নীরবতা : ইতিহাস, রাজনীতি ও স্বার্থের জটিল সমীকরণ : আরব দেশগুলোর কাছে ফিলিস্তিন ইস্যু ঐতিহাসিকভাবে একটি আবেগের বিষয়। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন।
(ক) ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বিভাজন
আরব দুনিয়া আজ নিজস্ব সমস্যায় জর্জরিত-সিরিয়া যুদ্ধ, ইয়েমেন সংকট, লিবিয়া অস্থিতিশীলতা, লেবাননের অর্থনৈতিক বিপর্যয়। ফলে ফিলিস্তিন ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান তৈরি করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
(খ) কূটনৈতিক স্বার্থের টানাপোড়েন : বেশ কিছু আরব রাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে। নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার স্বার্থে তারা এই সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণে আগ্রহী। এক্ষেত্রে ফিলিস্তিনের পক্ষে কড়া ভূমিকা নেওয়া তাদের নিজস্ব স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বিবেচিত হয়।
(গ) নেতৃত্ব সংকট : আরব বিশ্বের একক নেতৃত্ব নেই। কেউ লড়াই করতে চায়, কেউ চায় শান্তি, কেউ চায় নিস্তব্ধতা। ফলে ফিলিস্তিন প্রশ্নে শক্ত, দৃশ্যমান ও প্রভাবশালী নির্দেশনা অনুপস্থিত। ফলাফল হিসেবে-ফিলিস্তিনীদের আর্তনাদ আরব দুনিয়ার বিবেকেও তেমন ঢেউ তোলে না।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির ঠান্ডা বাস্তবতা : বিশ্বশক্তি কথায় যতই মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও শান্তির কথা বলুক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক চলে স্বার্থের ভিত্তিতে।
(ক) ভেটো ক্ষমতার নির্দয় ব্যবহার : জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবসহ নানা উদ্যোগ ভেটো ক্ষমতায় আটকে যাচ্ছে। ফলে গাজার মানুষদের বাঁচানোর মতো বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারছে না আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো।
(খ) অস্ত্র ব্যবসার স্বার্থ : বড় শক্তিগুলোর অর্থনীতি অস্ত্র বিক্রির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। যুদ্ধ তাদের কাছে ট্র্যাজেডি নয়-অর্থনৈতিক সুযোগ।
(গ) মিডিয়ার পক্ষপাতী ভূমিকা : বৃহৎ আন্তর্জাতিক মিডিয়া নেটওয়ার্কগুলো অনেক সময়ই ফিলিস্তিনীদের ভুক্তভোগী হিসেবে নয় বরং সন্দেহভাজন হিসেবে উপস্থাপন করে। এতে মানবিক সংকটকে মানবিক সমস্যা হিসেবে নয়, বরং নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে তুলে ধরা হয়। ফলাফল-গাজার কান্না বিশ্ববিবেকের কাছে আর ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।
মানবিকতার মৃত্যু : কেন বিশ্ব এত অসাড়?
গাজা সংকট কেবল যুদ্ধ নয়-এটি মানবতার বিপর্যয়। তবুও কেন বিশ্ব অসাড়?
(ক) ‘সংখ্যা’তে পরিণত মানুষের মৃত্যু : আজ শিশু নিহত হওয়ার সংখ্যা দেখে মানুষ দুঃখিত হয়, কিন্তু পরের দিন আবার অন্য খবর দেখে একই আগ্রহে। মৃত্যুর সংখ্যা মানুষের কাছে এখন আর হৃদয়ের আহ্বান নয়, বরং পরিসংখ্যানের অংক।
(খ) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের শোরগোল
এমন অনেক ঘটনা প্রতিদিন ঘটে যে মানুষের সংবেদনশীলতা কমে গেছে। কোনটি সত্যিকারের মানবিক ট্র্যাজেডি, কোনটি রাজনৈতিক প্রচারণা-এ বিভ্রান্তি মানুষের সহানুভূতি কমিয়ে দিচ্ছে।
(গ) ‘নিজেকে নিয়ে বেঁচে থাকার’ প্রবণতা
বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি, চাকরির অনিশ্চয়তাÑমানুষকে এমনভাবে ব্যস্ত রেখেছে যে অন্যের মানবিক সংকটে সহানুভূতি দেখানোর মতো সময় ও মানসিক শক্তি অনেকের নেই।
গাজা যুদ্ধ : নতুন প্রজন্মের চোখে ভিন্ন বাস্তবতা
যদিও বিশ্ব ও আরব রাজনীতি নীরব, কিন্তু বিশ্বজুড়ে তরুণরা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে গাজা ইস্যুতে সচেতন হচ্ছে।
তারা বলছে-“আপনি যুদ্ধের পক্ষে বা বিপক্ষে হতে পারেন, কিন্তু আপনি মানবতার বিপক্ষে হতে পারেন না।”
তরুণদের এ মানবিক অবস্থান ভবিষ্যৎ বিশ্বের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে-এটি নিশ্চিত।
এখন কী করণীয়? : গাজা সংকট সমাধান হবে না একদিনে, এবং কোনও একক রাষ্ট্রের পক্ষে এটি থামানোও সম্ভব নয়। তবে কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ জরুরি-
১. আরব রাষ্ট্রগুলোর ঐক্যবদ্ধ মানবিক উদ্যোগ : অন্তত যুদ্ধবিরতি, চিকিৎসা সহায়তা ও পুনর্গঠনে সবাই এক কণ্ঠে কথা বলতে হবে।
২. জাতিসংঘের সংস্কার : ভেটো ব্যবস্থার সংস্কার ছাড়া বৈশ্বিক ন্যায়বিচার সম্ভব নয়।
৩. বৈশ্বিক নাগরিক সমাজের সক্রিয় ভূমিকা : মানবিক সহায়তা, জনমত গঠন ও সংবাদ প্রচারে সাধারণ মানুষের ভূমিকা এখন আগের চেয়ে বেশি।
৪. মিডিয়ার নৈতিক দায়িত্ববোধ : নিরপেক্ষভাবে ফিলিস্তিনীদের মানবিক দুর্দশা তুলে ধরা জরুরি।
উপসংহার : গাজা আজ বিশ্বমানবতার পরীক্ষার ক্ষেত্র।
এ পরীক্ষায় বিশ্বের বড় বড় শক্তি, উন্নত সভ্যতার দাবিদার রাষ্ট্রগুলো, এমনকি আরব বিশ্বের বহু দেশও—ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ফিলিস্তিনীরা যখন রক্তাক্ত, তখন আরব শাসকেরা নীরব; যখন শিশু মরছে, তখন বিশ্ব শক্তি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ করছে।
তাই বলা যায়- গাজা যুদ্ধ আরবদের ঘুম ভাঙ্গাতে পারেনি, বিশ্ব বিবেককেও নাড়া দিতে পারেনি।
তবুও আশার জায়গা আছে-বিশ্বের সাধারণ মানুষ, তরুণ প্রজন্ম, আর মানবিক বিবেকসম্পন্ন মানুষরা নীরব নয়।
হয়তো রাষ্ট্র নয়, রাজনীতি নয়-
মানবতাই একদিন গাজাকে বাঁচাবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও ফিচার লেখক।