মোড়ল শব্দটি বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি, মাতব্বর বা গোষ্ঠীর প্রধান নেতা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিচার, সালিশ বা বড় কোনো দ্বন্দ্ব-সংঘাতে মোড়লের শরণাপন্ন হতে দেখা যায় সমাজের বঞ্চিতদের। আঞ্চলিক সংঘাত মেটাতে কোনো কোনো সময় মোড়লদের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়। মোড়লদের মোড়লীপনায় সাময়িক সময়ের জন্য কখনো স্বস্তি ফিরে এলেও এতে সংঘাত-রক্তপাত একেবারে বন্ধ হয়েছে এমন নজির কম। তবে ভূরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের মোড়লীপনা দিন দিন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ‘গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল’ এই বাংলা প্রবাদটি যেনো উপযুক্ত স্থান করে নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে মোড়ল হিসেবে নিজেকে বার বার প্রমাণ করতে চাচ্ছে। সবাই না মানলেও বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর অন্যতম বলে একধরনের ঘোষিত অঘোষিত ঘোষণা রয়েছে দেশটির। এই রাষ্ট্রটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজেদের আধিপত্য জাহির করতে প্রায়সই আগ বাড়িয়ে নাকগলায়। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিয়ে আধিপত্য বিস্তার করে থাকে। যেখানে মোড়লিপনার প্রয়োজন নেই সেখানেও গায়ে পড়ে বয়ান দিতে চায়। হস্তক্ষেপ করে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। দেশটির মোড়ল দাবি করার কিছু কারণও রয়েছে। অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র, মারণাস্ত্র, আধুনিক ও উন্নত যুদ্ধবিমান প্রযুক্তি, স্টেলথ ক্ষমতা, গতি এবং অস্ত্র ব্যবস্থারের দিক থেকে বিশ্বের সেরা হিসেবে বিবেচিত যুক্তরাষ্ট্র। যদিও চীন ও রাশিয়াও এ দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে বলে পৃথক দাবি রয়েছে। স্টেলথ (রাডারে কম ধরা পড়ে), সুপারক্রুজ (আফটারবার্নার ছাড়াই উচ্চ গতিতে উড়তে পারে) অত্যন্ত উন্নত সেন্সর ও অ্যাভিওনিক্স আকাশে অতিরিক্ত আধিপত্য রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। তাদের এই অহঙ্কার যে একসময় পতন ডেকে আনতে পারে তা হয়তো কতখানি ভেবে দেখেছে খ্রিস্টান ধর্মের আধিক্য থাকা দেশটি তা বোধ্যগম্য নয়। তবে চলমান ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে গায়ে পড়ে হামলা চালাতে গিয়ে দেশটি এখন অনেকটাই টের পাচ্ছে। না পারছে যুদ্ধ ধীর্ঘস্থায়ী করতে আর না পারছে পিছটান দিতে। ইরানের অনমনীয়তায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা এখন অনেকটাই -‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল অতর্কিতে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ভুখণ্ডে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে বিভিন্ন স্থানে হামলার মধ্য দিয়ে আগ্রাসন শুরু করে। শুরুতেই গোলাবর্ষণেই ইরানের শাসকগোষ্ঠীর কেন্দ্রবিন্দু, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করা হয়। হত্যা করা হয়, ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এর প্রধান, সেনা প্রধান, গোয়েন্দা প্রধানসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের। এর প্রতিশোধ হিসেবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাঠামোতে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও হাজার হাজার ড্রোন হামলা শুরু করে, যা অব্যাহত আছে। এই সংঘাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোতে বহু মানুষ নিহত হয় এবং এই অঞ্চলে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়, যার মধ্যে লেবাননের জনসংখ্যার এক-ষষ্ঠাংশের বেশি মানুষও অন্তর্ভুক্ত। উভয়পক্ষের গোলাগুলির ঝুঁকি এবং বিশেষ করে ইরানের পক্ষ থেকে আসা হুমকির কারণে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ তেল সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালীতে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, যার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির ঘাটতি দেখা দেয়। এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। ছয় সপ্তাহ ধরে লড়াইয়ের পর ৭-৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ইসরাইলকে অন্তর্ভুক্ত করে দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির অযুহাত, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে তার সামরিক প্রভাব নিয়ে বছরের পর বছর ধরে বাড়তে থাকা উত্তেজনার পর এই সংঘাতটি সংঘটিত হয়। বছরের পর বছর ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা, সাম্প্রতিক অস্থিতিশীল বিক্ষোভ, ২০২৫ সালের জুনে ইসরাইলের সাথে ১২ দিনের যুদ্ধে হওয়া ক্ষয়ক্ষতি এবং ইসরাইল-হামাস যুদ্ধের সময় ইরানের মিত্রদের অনেকটা নীরবতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র মনে করেছিল ইরানের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইরানের আগ বাড়িয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোতে হামলা না করা এবং সহনশীলতাকে দুর্বলতা মনে করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল হিসাব করে দেখে যে কূটনৈতিক উপায়ের চেয়ে সামরিক উপায়ে তাদের উদ্দেশ্য সাধনের সুযোগ বেশি। সুযোগবুঝে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনী ইরানের ওপর যৌথ হামলা শুরু করে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে অভিহিত। অভিযানের প্রথম ১২ ঘণ্টার মধ্যেই প্রায় ৯০০টি হামলা চালায়। এই হামলাগুলোর লক্ষ্য ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অন্যান্য সামরিক অবকাঠামো এবং ইরানি নেতৃত্বের পরিবর্তন করা। মার্কিন ও ইসরাইলি কর্মকর্তাদের মতে, প্রাথমিক হামলার সময় নির্ধারণের পেছনে আংশিকভাবে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের সক্ষমতা একটি কারণ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রাসন তাৎক্ষণিক চরম বিতর্কের জন্ম দেয় যখন মেয়েদের একটি বিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে প্রায় ১৭০ জন শিক্ষার্থীকে হত্যা করা হয়। এরপর মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের ইসলামিক রেভুল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর একটি নৌঘাঁটি সংলগ্ন ভবনগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে হামলা চালায়। ইরানের সরকার নেতৃত্বে শূন্যতা রোধ করতে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল। যা ক্রমে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে থকে।

এদিকে, ইরানের প্রতিশোধমূলক অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অঞ্চলটিকে সংঘাতে জড়িয়ে ফেলে। ইরানের হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ইরাক, ওমান এবং জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস ও সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল চলাচল করে তা দখলে নিয়ে নেয় ইরান।

ট্রাম্পের বাগাড়ম্বর : মার্চ মাসে হরমুজ প্রণালী ক্রমশ যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ট্রাম্প হুমকি দেন যে, ইরান যদি কোনো বাধা ছাড়াই হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে দিতে রাজি না হয়, তবে তিনি ইরানের বেসামরিক জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালাবেন। এরপর তিনি এই হুমকিকে খার্গ দ্বীপ পর্যন্ত প্রসারিত করেন, যা ইরানের প্রায় সমস্ত তেল রপ্তানির টার্মিনাল এবং লবণাক্ত পানি পরিশোধন কেন্দ্রগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু বানান। এর কয়েকদিন পর তিনি ইরানের জন্য ৭ এপ্রিলের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একের পর এক ক্রমবর্ধমান উগ্র পোস্ট করতে থাকেন। ৭ এপ্রিল সকালে তিনি এই ধরনের একটি পোস্টে লেখেন যে, “আজ রাতে একটি গোটা সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে, যা আর কখনো ফিরে আসবে না।” কিন্তু এরপর কি হলো? দৃশ্যপট অনেকটাই বদলে যেতে থাকলো। ইরানকে হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়া নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেয়া নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি ইরানকে নতুন করে হুঁশিয়ারি দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প ইরানকে হুমকি দিয়ে লিখেন, ‘আজ রাতে একটি গোটা সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে, যা আর কখনো ফিরে আসবে না।’ ট্রাম্প বলেন, আমি এটা চাই না এমনটা ঘটুক, কিন্তু সম্ভবত এমনটাই হবে। পরদিন নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে তেহরান হরমুজ প্রণালী খুলতে কোনো চুক্তিতে উপনীত হতে ব্যর্থ হলে ইরানকে ‘এক রাতেই’ নিশ্চিহ্ন করার হুমকি দিয়ে ট্রাম্প বলেন, আর সেই রাতটি হতে পারে মঙ্গলবার রাত। এরপর কি হলো? গুঞ্জন রয়েছে- এই হুমকির পরই তিনি দ্রুত যোগাযোগ করেন মিত্রদের সাথে। দ্রুত যুদ্ধবিরতির একটি প্রস্তাব তৈরি করতে বলা হয়-ঘনিষ্ঠ মিত্র পাকিস্তানকে। পরে তাই করলো পাকিস্তান।

ইরানের ওপরে অসংখ্যবার নিষেধাজ্ঞা এবং যুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে এবং বর্তমানেও ঘটছে। যুদ্ধের প্রকৃত কারণ বিশ্লেষণে দেখা যাবে এটি আসলে কর্তৃত্ব এবং আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই। বিশ্বের এক নম্বর শক্তি কে হবে-তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠার।

নতুন পরাশক্তির উত্থান : শেষ মুহূর্তে চরম হুমকি দিয়েও যুক্তরাষ্ট্র বিনা আনুষ্ঠানিকতায় পিছু হটেছে, আর ইরান ঘোষণা দিয়েছে ‘ঐতিহাসিক বিজয়ের’। এর মাধ্যমে নিজেদের নতুন বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি তুললো তেহরান। ব্যাপক সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেও প্রতিপক্ষ শেষ পর্যন্ত ইরানের ১০ দফা প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। এই প্রস্তাবে রয়েছে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেওয়া। প্রস্তাবে আরও রয়েছে হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, যা এক মাস ধরে বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহকে স্থবির করে রেখেছিল। যে যুদ্ধ কখনোই হওয়া উচিত ছিল না, তার ৪০ দিন পর আক্রমণকারীরা তাদের একটি লক্ষ্যও পূরণ করতে পারেনি। ট্রাম্প নিজের তৈরি করা এই চোরাবালি থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছিলেন। পরবর্তীতে বিশ্ব এক অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী হয়: এক অপরাজেয় জাতির কাছে একটি পরাশক্তির পরাজয়। ৪০ দিন পর যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের ১০ দফা প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য হয়। এর মধ্যে রয়েছে: স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের স্বীকৃতি, সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জাতিসংঘের সব নেতিবাচক প্রস্তাব বাতিল, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং লেবাননের হিজবুল্লাহসহ সব ফ্রন্টে লড়াই বন্ধ করা। এটি কোনো ড্র বা অমীমাংসিত যুদ্ধ নয়। এটি একটি ঐতিহাসিক, অনস্বীকার্য এবং চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়া পরাজয়। পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্যের যুগ শেষ হয়েছে। আর এর মধ্য দিয়ে ইরান একটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

লেখক : সাংবাদিক

ই-মেইল : [email protected]