ড: মিহির কুমার রায়
জাতিসঙ্ঘের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন (কপ-৩০) ব্রাজিলের বেলেম শহরে গত শনিবার ২২ নভেম্বর শেষ হলো। সম্মেলনের মূল বিতর্ক ছিল কয়লা, তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাধ্যতামূলকভাবে কমানো (ফেইজ আউট) নিয়ে। ১৯৪টি দেশ প্যারিস চুক্তির অধীনে একত্রিত হয়ে বিশ্ব উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্যে পদক্ষেপ নিতে সম্মত হলেও প্রভাবশালী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কারণে তেল উৎপাদনকারী সৌদি আরব ও রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশ এ প্রস্তাবকে বাধ্যতামূলক না রেখে ‘স্বেচ্ছামূলক’ করার পক্ষে অবস্থান নেয়। কপ৩০-এর আলোচ্যসূচি মূলত প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য বাস্তবায়নের ওপর কেন্দ্রিত ছিল। প্যারিস চুক্তি ২০১৫ সালে গৃহীত হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ১. বিশ্ব উষ্ণতা সীমাবদ্ধ রাখা, ২. গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমানো এবং ৩. উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অভিযোজন সহায়তা নিশ্চিত করা। লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিলের সঠিক স্বীকৃতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য পূর্ণাঙ্গ এবং কার্যকর ক্ষতিপূরণ কাঠামো তৈরিও কপ-৩০-এর আরেকটি বড় লক্ষ্য।
এবারের সম্মেলনেও আশাবাদি হওয়ার মতো ফল পাওয়া গেল না। বিশ্বনেতারা বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধের বিষয়ে একমত হতে পারেননি। অথচ এটিই ছিল সম্মেলনের মূল ফোকাস। পরিবর্তে নেতারা যে বিষয়ে চুক্তিতে পৌঁছেছেন তা হলো-বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাব মোকাবেলায় গরিব দেশগুলোকে অর্থ সহায়তা দেয়া। জাতিসঙ্ঘের জলবায়ু পরিবর্তন-বিষয়ক নির্বাহী সচিব সাইমন স্টিল বলেছেন, ‘জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে অগ্রগতি অব্যাহত, তবে প্রতিটি দেশের বাস্তব প্রয়াস আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর নির্ভর করবে।’ ফলে কার্যত বৈশ্বিক উষ্ণতা সীমিত রাখা অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। কারণ, কোনো দেশ প্রয়োজনীয় পরিমাণে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এমন পর্যায়ে সীমিত করবে না, যাতে বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির মধ্যে সীমিত থাকে। প্রতিটি দেশ শিল্পোৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক লাভ পেতে গুরুত্ব দেবে।
কপ-৩০ থেকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ, বিশ্বের কোটি কোটি হেক্টর বন ও ভূমি সংরক্ষণ এবং ৪০ কোটির বেশি মানুষের সহনশীলতা বৃদ্ধির পদক্ষেপের আভাস পাওয়া গেছে। তবে এ পদক্ষেপগুলো কার্যকর হবে ২০২৬ সাল থেকে। এ বছর ১২০ বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক তহবিল কার্যকর হবে। তহবিল থেকে অনেক দেশকে জলবায়ু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সীমিত সহায়তা দেয়া হবে। বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশ, যেখানে নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, চরম বন্যা ও কৃষিক্ষতির ঝুঁকি ক্রমবর্ধমান, সেখানে পরিবর্তনের সাথে অভিযোজন প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক এই সহযোগিতা এবং অর্থায়ন বিশেষভাবে উপকারী ও কার্যকর হতে পারে।
সম্মেলনে ধনী দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অভিযোজন তহবিল তিনগুণ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এ ১২০ বিলিয়ন ডলার বার্ষিক তহবিল ২০৩৫ সালে প্রদান করা হবে এবং উক্ত তহবিলের কার্যকারিতা ২০২৬ সাল থেকে শুরু হবে। ফলে এটি অনেক দেশকেই তাদের আজকের জলবায়ু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যথেষ্ট সহায়তা দিতে পারবে না। তবে এবারের সম্মেলনের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো Just Transition Mechanism গ্রহণ, যা সর্বস্তরের মানুষ, শ্রমিক, নারী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা করে সবুজ অর্থনীতিতে স্থানান্তর নিশ্চিত করবে। তবে এ মেকানিজমের জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন চূড়ান্ত চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি। এবারের চূড়ান্ত চুক্তিতে জীবাশ্ম জ্বালানি সম্পর্কিত কোনো বিষয়বস্তুর সরাসরি উল্লেখ নেই।
জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উত্তরণের রোডম্যাপকে জাতিসংঘের কার্যক্রমের বাইরে রাখা হয়েছে এবং কলম্বিয়া ও অন্যান্য দেশসমূহের নিজস্ব নেতৃত্বে এ রোডম্যাপ বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে বলে জানানো হয়েছে। তবে ব্রাজিল আলাদাভাবে রোডম্যাপ প্রকাশ করতে পারে। আরও একটি হতাশাজনক বিষয় হল, মূল চুক্তিতে বনসংরক্ষণের রোডম্যাপও অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অথচ কপ৩০ আয়োজিত হয়েছিল আমাজনের কোল ঘেঁষে এবং বনগুলো সর্বদাই বৈশ্বিক জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে ব্রাজিল নতুন “ট্রপিক্যাল ফরেস্ট ফোরএভার ফ্যাসিলিটি” নামে একটি তহবিল চালু করেছে, যা দেশগুলোকে গাছ সংরক্ষণে অর্থ সহায়তা করবে। যদিও কপ৩০-এ ছোট এবং সীমিত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণায়ন সীমিত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় দৃঢ়, বাধ্যতামূলক এবং সমন্বিত পদক্ষেপ এখনও গ্রহণ করা হয়নি।
কপ-৩০ বাংলাদেশের জন্য বৈশ্বিক পর্যায়ে জলবায়ু ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকার শীর্ষে থাকা বাংলাদেশ প্রতিবছর বড় ধরনের বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং কৃষি উৎপাদন হ্রাসের মতো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার বৃদ্ধি হলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ স্থায়ীভাবে পানির নিচে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কপ৩০-এর আলোচ্য পাঠ্য ও অ্যাকশন এজেন্ডা বাংলাদেশের জলবায়ু নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে। তবে এর সঠিক বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় ও স্থানীয় নীতি সমন্বয় অপরিহার্য। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কপ৩০-এর ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশে আগামী ২০ বছরে নদীভাঙন, চরম বৃষ্টিপাত এবং ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে। কপ৩০-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আন্তর্জাতিকভাবে অভিযোজন অর্থায়ন বৃদ্ধি, বন ও ভূমি পুনরুদ্ধার এবং পরিচ্ছন্ন শক্তিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের ঝুঁকি হ্রাসে সহায়তা পাওয়া সম্ভব। এটি বিশেষভাবে কৃষি, মৎস্য, পানি ব্যবস্থাপনা এবং নগর পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। এক ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ, কোটি কোটি হেক্টর সংরক্ষিত বন ও ভূমি এবং ৪০ কোটিরও বেশি মানুষের সহনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন অর্থায়ন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারী দেশগুলো নিশ্চিত করেছে, তাদের জাতীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একযোগে কাজ করা হবে। তবে এ পদক্ষেপগুলো কার্যকর করতে ২০২৬ সাল থেকে ১২০ বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক তহবিল কার্যকর হবে, যা অনেক দেশকে তাদের বর্তমান জলবায়ু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সীমিত সহায়তা দেবে।
কপ৩০-এ প্রায় ৯০টি দেশ স্বেচ্ছাস্বীকৃত চুক্তিতে সই করেছে, যেন তারা জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উত্তরণের রোডম্যাপ তৈরি করতে পারে। তবে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘ কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি। প্রধান অধিবেশন চলাকালীন বিতর্কের কারণে বৈঠক স্থগিত হয়, পরে কপ সভাপতি আন্দ্রে কোরেয়া দো লাগো সকলের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। জাতিসংঘের প্রধান জলবায়ু দূত সাইমন স্টিয়েল বলেছেন, “আমরা ক্লাইমেট যুদ্ধ জিতছি না, তবে আমরা এখনও এতে রয়েছি এবং প্রতিরোধ করছি”।
কপ৩০-এ আদিবাসী অধিকার ও ন্যায্য রূপান্তরের অগ্রগতি স্বীকৃত হলেও, আদিবাসী জনগণকে এখনও হুমকিস্বরূপ দেখার মনোভাব রয়েই গেছে। ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনকে “আদিবাসী কপ” ও “আমাজনিয়ান কপ” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল, যেখানে প্রায় ২,৫০০ জন আদিবাসী অংশগ্রহণ করেছিলেন। বৈশ্বিক জলবায়ু পদক্ষেপকে বাধাগ্রস্ত করায় এবারের ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্কের বার্ষিক “কোলসাল ফসিল” দেওয়া হয়েছে পুরস্কার সৌদি আরব ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে। তেল-ভিত্তিক দেশগুলো ও শিল্প লবিস্টদের চাপের কারণে চূড়ান্ত চুক্তিতে জীবাশ্ম জ্বালানির ফেজ আউটের বাধ্যতামূলক পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি।৭০টিরও বেশি দেশ জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) জমা দেয়নি এবং জমা দেওয়া এনডিসিগুলোও পর্যাপ্ত নয়, যা বিশ্বকে ২.৬ ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধির দিকে ঠেলে দিতে পারে। এনডিসিগুলো অপর্যাপ্ত হওয়ায় একটি “অ্যাক্সেলরেটর” প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছে, যা আগামী কপ৩১ সম্মেলনে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করবে।
পরিশেষে, এবারের কপ৩০ সম্মেলনকে “আশানুরূপ ছোট পদক্ষেপ” বলা যায়। এই সম্মেলনের একমাত্র প্রাপ্তি জাস্ট ট্রানজিশনের স্বীকৃতি জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্প থেকে ক্লিন এনার্জিতে স্থানান্তরিত হওয়া শ্রমিকদেরকে সহায়তা করবে।
লেখক : অধ্যাপক (অর্থনীতি), সাবেক পরিচালক, বার্ড (কুমিল্লা), সাবেক ডিন (ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ) ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।