বেগম খালেদা জিয়া। বছরের শেষ দিন নশ্বর পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে মিশে গেলেন মাটির গভীরে। আদর্শ আর সত্য ন্যায়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এ আপনাার শেষ ঠিকানা হলো জাতীয় সংসদের পাশে স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পাশে। মানিক মিয়া এভিনিউ’র জানাযাতে মানুষের বাঁধভাঙা স্রোত প্রমাণ করে আপনি কতটা জনপ্রিয় ছিলেন। মানুষের হৃদয়ের গভীরে স্থান করে নিয়েছিলেন কতটুকু। জানাযায় এতো মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে কেন আপনি বাংলাদেশের মানুষের অন্তরে আপসহীন নেত্রীর মর্যাদা পেয়েছিলেন। আপনার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।
আপনার বিদায়ে আজকের দিনে বার বার বলতে চাই- আপনি বেঁচে থাকুন দেশনেত্রী কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে। বেঁচে থাকুক আপনার আদর্শ ‘আপসহীনতা’। মানুষ শিক্ষা নিক আপনার আপসহীনতার আদর্শ থেকে। মাটি ও মানুষকে কিভাবে ভালোবাসতে হয় তাও শিখুক আপনার কাছ থেকেই। দেশের জন্য আপনার অপরিমেয় ত্যাগ ও দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইয়ে অবিচল থাকার দীক্ষা পাওয়া যায় আপনার সংগ্রামী জীবন থেকে। আপনার বক্তব্যে বার বার ফুটে উঠেছে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার কবজ। দেশপ্রেমের কথা। আপসকামীতার জন্য অত্যাচার নির্যাতন করা হলেও দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি অবিচল আস্তা থেকে টলানো যায়নি আপনাকে। এজন্য আপনাকে কলিজার টুকরো সন্তানকে হারাতে হয়েছে। হারাতে হয়েছে নিজের বাড়িঘর। টানতে হয়েছে দীর্ঘ জেলের ঘানি। কিন্তু আপনি দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থে সবকিছু সহ্য করেছেন চোখবুজে।
এই সময়ে এসে একটি কথা বার বার মনে পড়ছে ওয়ান ইলিভেনের সময় মঈন উদ্দিন ফখরুদ্দিনের আমলের শেষ দিকে আপনার ওপর প্রচ- চাপ ছিল দেশের বাইরে চলে যাওয়ার। কিন্তু আপনি রাজি হননি। আপনি সাংবাদিকদের সামনে বলেছিলেন “এ দেশেই আমি থাকবো এই দেশ-ই আমার জন্মস্থান। এ দেশেই আমার মৃত্যু হবে। এই দেশের মানুষের মধ্যেই বেঁচে থাকতে চাই। সেজন্যই আমি দেশের বাইরে যাইনি। দেশের বাইরে আমি যাবো না। কারণ দেশের বাইরে আমার কোন ঠিকানা নেই। দেশের বাইরে আমি যাবো না। সেজন্য আমার ছেলে দুইটাকে নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। নানারকম নির্যাতন”। যা এখনো ভাইরাল হচ্ছে, বার বার সামাজিক মাধ্যমে সামনে আসছে।
ফ্যাসিবাদী হাসিনার শাসনামলে অত্যাচারের খড়গ নেমে আসে আপনার ওপর। মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়। বার বার ভয় দেখিয়ে দমন করার চেষ্টা করা হয়। তাতে কাজ হয়নি। একইসাথে হয়রানির খরগ নেমে আসে অন্যান্য বিরোধী দল ও নেতাকর্মীদের ওপর। ধরে নিয়ে গুম খুন করা হয়। অকথ্য নির্যাতন করা হয়। আপনি জনগণের ওপর নির্যাতনের তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদ করেছেন। বলেছেন, মানুষের ওপর অত্যাচার করে দমন করা যাবে না আন্দোলন। আপনি না থাকলেও আপনার সেই বক্তব্য মানুষের সামনে ঘুরে ফিরে আসছে।
আপনি নির্দ্বিধায় বলেছেন, জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের ওপর যেভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে, সেটার আমি নিন্দা করি। এবং তাদের একটা ইয়াং ছেলে শিবিরের সভাপতির ওপর যেভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে, এর তীব্র নিন্দা করি আমি। তীব্র নিন্দা করে প্রতিবাদ জানাই। কোন মানুষের সঙ্গে এমন কাজ হতে পারে না।
ফ্যাসীবাদ টিকিয়ে রাখার জন্য আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর একটি অংশ জড়িয়ে পড়ে আন্দোলন দমনে। শেখ হাসিনার মসনদ টিকিয়ে রাখতে রক্ষা জনগণের ওপর তীব্র অত্যাচারে লিপ্ত হয়। বিশেষ করে বিরোধী মতের রাজনীতিকদের ওপর অত্যাচারের স্টিমরোলার চালাতে শুরু করে হাসিনার নির্দেশে। বেপরোয়া অত্যাচার শুরু করে। আন্দোলন দমনে বেআইনিভাবে জীবনের ওপর আঘাত করে। সে অন্যায় অত্যাচারের প্রতিবাদ করেন আপনি। এসব কথাগুলো বার বার কানে বাজছে আজ।
সেদিন আইন শৃঙ্খলাবাহিনীতে থাকা ফ্যাসিবাদী হাসিনার দোসরদের উদ্দেশ্যে আপনি বলেছিলেন, “ গণতন্ত্রও চাইবেন না, দেশ রক্ষা করতে চাইবেন না গোলামি করবেন ? এ গোলামি তো রাখবে না। লেন্দুপ দর্জির ইতিহাসটা পড়ে দেখেন। সেও কিন্তু টিকে নেই বেশি দিন! তাকেও বিদায় দিয়েছে এতো দালালি করে। দেশ বিক্রি করে। কাজেই এ দেশ বিক্রি চলবে না হাসিনার। দেশ রক্ষা হবেই ইনশা আল্লাহ। দালালি বন্ধ করতে বলেন। হাসিনার দালালি করে লাভ হবে না। বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে থাকেন, জনগণের সঙ্গে থাকেন। দেশের মানুষের সঙ্গে থাকেন। তবেই কাজে দিবে”।
“দেশ বাঁচবে, মানুষ বাঁচবে। আজকে সকলের দায়িত্ব হয়ে গেছে দেশ বাঁচানো, মানুষ বাঁচানো। আর আপনারা ঘরে ঢুকে ঢুকে মানুষ হত্যা করছেন। মনে করেন যে এগুলোর হিসাব নেই? এ মা-বোনের কান্না, আলেম এতিমের কান্না এ বিডিআর অফিসারদের ওয়াইফদের কান্না এগুলো কি বৃথা যাবে ? এগুলো কোনদিনও বৃথা যাবে না। আজকে যারা জুলুম নির্যাতন করছেন, তাদেরও একদিন চোখের পানি ফেলতে ফেলতে, পানি মুছতে মুছতে চোখ অন্ধ হয়ে যাবে।”
আজ সম্ভবত তাই হয়েছে। যারা সে সময় অত্যাচার করেছে তাদের বিচারের দিন ঘনিয়ে এসেছে। তাদের বিচার হবে এ বাংলার মাটিতে। যারা স্বাধীনতার পক্ষের মানুষের ওপর চরম অন্যায় করেছিল। আপনার এবং আপনার সন্তানের ওপর অত্যাচারের খরগ চালিয়েছিল। তারা আজ ইতিহাসের কাঠগড়ায়। বিচারের কাঠগড়া। সেদিন আপনার আপসহীন ভূমিকা আজ বাংলার আকাশ-বাতাসে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। মুক্তির স্বাদ ভোগ করছে ১ কোটি জনগণ। তাই আপনার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলতে চাই। এ দেশে বেচে থাকুক আপনার আপসহীনতা। বেঁচে থাকুক আপনার দেশপ্রেমের আদর্শ।
লেখক : সিনিয়র রিপোর্টার দৈনিক সংগ্রাম।