ইউরোপীয় রেনেসাঁর পর পৃথিবীতে যেন এক গোলক ধাঁধার সৃষ্টি হলো। ১৪শ’ শতাব্দী থেকে ১৭শ’ শতাব্দী পর্যন্ত এই ধাঁধাটা বেশ বেগবান ছিল। এরপর ১৮০০ শতাব্দী থেকে ১৯০০ শতাব্দী পর্যন্ত সময়টা ছিল শিল্পবিপ্লবের স্বর্ণযুগ। শিল্পবিপ্লবে অবশ্য নেতৃত্ব দিয়েছিল যুক্তরাজ্য। শিল্পবিপ্লবের পর লক্ষ্য করা গেল আরেক ধাঁধা, সেটা বিশ্বযুদ্ধের ধাঁধা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কালটা ছিল ১৯১৪-১৯১৮ সাল। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালটা ছিল ১৯৩৯-১৯৪৫ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমরা আণবিক বোমার বিস্ফোরণ লক্ষ্য করলাম জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি নগরিতে। ‘লিটল বয়’ ও ‘ফ্যাটম্যান’ নামের বোমা দু’টির বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। আণবিক বোমার আঘাতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছিল জাপানে। বীভৎস মৃত্যুর চিত্র দেখে মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল আতংক। এরকম বাস্তবতায় তখন বিশ্বনেতারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘জাতিসংঘ’, যেন আর কোনো বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত না হয় পৃথিবীতে। শান্তি ও ইনসাফের বাতিঘর হিসেবে কাজ করবে ‘জাতিসংঘ’। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, যারা জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা করেছিল, তারাই এই সংস্থাটিকে একটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করলো। আর সময়ের ব্যবধানে ‘আণবিক বোমার’ স্থলে এখন তৈরি হচ্ছে আরো ভয়ানক ‘পারমাণবিক বোমা’। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যেন কড়া নাড়ছে।
উপলব্ধি করা যায়, মহান স্রষ্টাকে ভুলে মানষ যখন নিজেই প্রভু হয়ে ওঠে; তখন বিদায় নেয় নীতি, নৈতিকতা ও ইনসাফ। ফলে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় পাশ্চাত্যের দেশগুলোর মধ্যে বিভেদের সুর পরিলক্ষিত হচ্ছে। এতদিন তো তারা মিলেমিশেই আগ্রাসনের নীতি অবলম্বন করেছেন। এর বড় উদাহরণ ফিলিস্তিন। আগ্রাসনের ছোঁয়া নিজের গায়ে লাগায় এখন হয়তো ইউরোপ উপলব্ধি করতে পারছে, আগ্রাসন খুব মন্দ বিষয়। প্রশ্ন জাগে, সঠিক উপলব্ধিতে এতোটা বিলম্ব ঘটলো কেন? কোন বিষয়টা তাদের আটকে রেখেছিলো? পাশ্চাত্যের দ্বন্দ্বের বিষয়টা স্পষ্ট করতে গেলে বলতে হয়, এটা ইউরোপ এবং আমেরিকার স্বার্থের দ্বন্দ্ব। বিবিসি জানায়, ইউরোপ গ্রিনল্যান্ড হস্তান্তর না করলে ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর বড় অঙ্কের শুল্ক আরোপের যে হুমকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দিয়েছেন, তার তীব্র সমালোচনা করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। তিনি বলেছেন, ভয়ভীতি বা দাদাগিরির কাছে ইউরোপ কখনোই মাথা নত করবে না। আটলান্টিকের দুই পাড়ের মধ্যে উত্তেজনা এড়াতে ইউরোপের অনেক নেতা সতর্ক ভাষায় কথা বলছেন, সেখানে ম্যাক্রোঁ নিয়েছেন কড়া অবস্থান। দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ^ অর্থনৈতিক ফোরামে ম্যাক্রোঁ বলেন, ফ্রান্স ও ইউরোপ কোনোভাবেই ‘শক্তির জোরে চাপিয়ে দেওয়া নিয়ম’ মেনে নেবে না। তা করলে ইউরোপ ধীরে ধীরে পরাধীন হয়ে পড়বে বলে তিনি সতর্ক করেন। ম্যাক্রোঁ আরো বলেন, বিশ^ রাজনীতি যদি নীতিহীনতার দিকে এগোয়ও, ইউরোপ ভূখ-গত অখ-তা ও আইনের শাসনের প্রশ্নে আপস করবে না। তার ভাষায়, গু-ামির বদলে সম্মান এবং বর্বরতার বদলে আইনের শাসনই ইউরোপের পছন্দ।
প্রশ্ন হলো, গু-ামি ও বর্বরতা কি শুধু ইউরোপেরই অপছন্দের বিষয়? বিশে^র কোনো মানুষেরই গু-ামি ও বর্বরতা পছন্দ নয়। অথচ যুগের পর যুগ এসবের নির্মম শিকার হয়েছে বিশে^র দরিদ্র ও পিছিয়েপড়া দেশগুলোর নাগরিকরা। তাদের আর্তনাদ শুনেনি পাশ্চাত্য। এই ‘পাশ্চাত্য’ শুধু আমেরিকা নয়, এরমধ্যে সামিল ছিল ইউরোপও। নিজের গায়ে আঘাত লাগার পর আজ ভিন্ন সুরে কথা বলছে ইউরোপ। এদিকে গ্রিনল্যান্ড দখলের পরিকল্পনা নিয়ে নিজের অবস্থানে এখনো অনড় মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, এই সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটার কোনো সুযোগ নেই এবং এটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। গ্রিনল্যা- ইস্যুতে বিরোধিতার জেরে আটটি ইউরোপীয় দেশের ওপর আগামী পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। এর জবাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নও পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্যচুক্তি স্থগিতের কথা ভাবছে।
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ এখন মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনকে তারা গু-ামি ও বর্বরতা হিসেবে অভিহিত করছেন। ইউরোপ এখন স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের কথা বলছে। এটা কি শুধু গ্রিনল্যান্ডের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য? ফিলিস্তিন-এর বাইরে থাকবে কেন? ইউরোপ যদি আসলেই আগ্রাসন, গুণ্ডামি ও বর্বরতার বিরুদ্ধে নীতিগত অবস্থান নেওয়ার সাহস রাখে, তাহলে ভূমিপুত্র ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার পক্ষেও তাদের একই ভাষায় কথা বলতে হবে। কারণ, ফিলিস্তিনের বর্তমান দুর্দশার জন্য ইউরোপেরও দায় আছে। সেই পাপ মোচনের এখনই সময়। শুদ্ধির পথে ইউরোপ এগিয়ে আসে কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়। দেখার আরও বিষয় আছে। বিশ্ব পর্যায়ে যেমন দাদাগিরি আছে, তেমন আঞ্চলিক পর্যায়েও লক্ষ্য করা যাচ্ছে দাদাগিরির প্রবণতা। ভারতের মোদি সরকার এই ভুল পথের পথিক। তারা প্রতিবেশী মুসলিম প্রধান দেশকে হুমকি দেন এবং স্বদেশের মুসলমানদের চান দাবিয়ে রাখতে।
“ভারতে ‘ভালো মুসলিম’ হওয়ার বোঝা” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন মুদ্রিত হয়েছে পত্রিকান্তরে। ২৪ জানুয়ারি মুদ্রিত প্রতিবেদনটি আসলে ‘স্ক্রল ডট ইন’-এর একটি বিশ্লেষণ। বিশ্লেষণে বলা হয়, বিশে^র সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে মুসলিম নাগরিকদের হেনস্তা ও নির্যাতনের মাত্রা। সেখানকার মুসলমানদের প্রায়ই বলা হয়, ভারতে থাকতে হলে তাদের ‘ব্যতিক্রম’ হতে হবে। সে ব্যতিক্রম অর্জন বা অবদানের ক্ষেত্রে নয়; বরং রাজনৈতিক নীরবতার ক্ষেত্রে। নীরবতার মাধ্যমে তাদের বারবার প্রমাণ করতে হবে, তারা বিশ্বের অন্য মুসলিমদের চেয়ে আলাদা। দেশের কাছে তাদের দাবি-দাওয়া কম হবে, তারা সর্বক্ষেত্রে কম দৃশ্যমান হবে, রাষ্ট্রে তাদের অধিকারও থাকবে কম। উল্লেখ্য, ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ভারতীয় মুসলমানরা গণতান্ত্রিক জীবন, নির্বাচনি রাজনীতি এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় উৎসাহের সাথে অংশগ্রহণ করেছে। কিন্তু বর্তমানে একটি সূক্ষ্ম ও ক্ষয়িষ্ণু প্রক্রিয়া সামনে চলে এসেছে। ভারতীয় মুসলমানদের জন্য বৈধভাবে রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের সুযোগ ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে আসছে। মুসলমানদের নিরাপদ জীবন-যাপনের জন্য শুধু আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা নয়, বরং রাজনৈতিকভাবেও তাদের নীরব থাকতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে ধারণা তৈরি হচ্ছে, রাজনৈতিকভাবে মুসলমানদের কণ্ঠস্বর কখনোই বলিষ্ঠ হতে পারবে না।
রাজনৈতিক তাত্ত্বিক মাহমুদ সামদানি তার ‘গুড মুসলিম, ব্যাড মুসলিম’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, আধুনিক ক্ষমতা প্রায়ই মুসলমানদের বিভক্ত করে দেয়। এদের মধ্যে অরাজনৈতিক ব্যক্তিরা গ্রহণযোগ্য এবং নিজস্ব দাবি-দাওয়ার ভিত্তিতে আওয়াজ তোলা ব্যক্তিরা সন্দেহভাজন। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হিলাল আহমেদ দেখিয়েছেন, ভারতে মুসলমানদের স্বাভাবিক নাগরিক হিসেবে না দেখে দেশের জন্য সমস্যা বা বোঝা হিসেবে দেখা হচ্ছে। রজানীতিতে তাদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আসার বদলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা হয়। মুসলমানদের রাজনীতিকে স্বার্থের ভিত্তিতে অংশগ্রহণের পরিবর্তে ব্যাখ্যাতীত অসংগতি হিসেবে বেশি বিবেচনা করা হয়। এ ধরনের ফ্রেমিংয়ের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। মুসলমানরো যখন কোন দাবিতে সংঘবদ্ধ হন, তা সংবিধানের আলোকে কমই বিবেচনা করা হয়। এর বদলে তাদের উদ্দেশ্য ও আনুগত্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলা হয়। স্বাভাবিক আন্দোলন, বিক্ষোভ ও সমাবেশকে মুসলমানদের ক্ষেত্রে ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করা হয়।
ভারতে মুসলমানদের ক্ষেত্রে ‘ব্যতিক্রমবাদ’ বিষয়টি এখন গুরুতর প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। বৈষম্যমূলক এই দৃষ্টিভঙ্গি মুসলমানদের সাংবিধানিক ও সাধারণ নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। ভয়ানক ব্যাপার হলো, গণমাধ্যমের মধ্য দিয়ে এই অস্বাভাবিক বিষয়টিকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। মুসলমানরা যখন কোথাও ভুক্তভোগী হন, তখন তাদের ‘সংখ্যালঘু’ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। তারা যখন সংঘবদ্ধ হন, তখন তাদের ‘সাম্প্রদায়িক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যখন তারা বিক্ষোভ করেন, তখন তাদের ‘ক্রুদ্ধ’, ‘মৌলবাদী’ বা ‘উসকানিদাতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয় গণমাধ্যমে। আর যখন তারা চুপ থাকেন, তখন তাদের ‘সহনশীল’, ‘বিচক্ষণ’ বা ‘ঐক্যপন্থী’ হিসেবে প্রশংসা করা হয়। এমন বাস্তবতায় ভারতের মুসলমানরা ‘ভালো মুসলিম’ হওয়ার এক বৈষম্যমূলক চ্যালেঞ্জের মধ্যে জীবন-যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। ভারতের সংবিধানের ‘বৈচিত্র্যের ঐক্য’ নামে যে বার্তা রয়েছে তা নরেন্দ্র মোদির শাসনে পালিত হচ্ছে না। বরং মুসলমানদের এখন ‘ব্যতিক্রম’ হতে বলা হচ্ছে-যেখানে তারা সাংবিধানিক ও সাধারণ নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন। কোনো সভ্য ও গণতান্ত্রিক দেশে এমন আচরণ কি চলতে পারে? ভারত এখন কেমন দেশ, তাদের রাষ্ট্রীয় নীতি বা কেমন-সে বিষয়টি মোদি সরকার স্পষ্ট করতে পারেন। তাহলে অন্যদের সুবিধা হয়, ভারত সম্পর্কে নীতি ও কৌশল অবলম্বনে।