আরিফুল ইসলাম রাফি

রমযান সংযম, সহমর্মিতা ও আত্মশুদ্ধির সময়। কিন্তু এ পবিত্র মাস প্রায়ই পরিণত হয় মূল্যবৃদ্ধি, অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মাসে। প্রতিবছরই দেখা যায়, রমযান শুরু হওয়ার আগেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। খেজুর, চিনি, ছোলা, সয়াবিন তেল, পেঁয়াজ, মাংসÑসবকিছুর বাজারে যেন হঠাৎ উত্তাপ। প্রশ্ন জাগে: এটি কি স্বাভাবিক চাহিদা-যোগানের ফল, নাকি সুপরিকল্পিত ব্যবসায়িক কৌশল? সাধারণ মানুষের মুখে তখন একটি শব্দই ঘুরপাক খায় ‘দৌরাত্ম্য’। কিন্তু এ দৌরাত্ম্য আসলে কী? এটি কি কেবল কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর লোভ, নাকি বৃহত্তর অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি জটিল উপসর্গ?

প্রথমে অর্থনীতির সরল সূত্রটি দেখা যাক, চাহিদা ও জোগান। রমযানে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। ইফতার ও সেহরিকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। খেজুর, ছোলা, ডাল, চিনি, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, মাংসÑএসব পণ্যের বাজার হঠাৎ চাঙা হয়ে ওঠে। চাহিদা বাড়লে দাম বাড়তে পারে, এটি বাজারের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু সমস্যা তখনই দেখা দেয়, যখন এ বৃদ্ধি স্বাভাবিক সীমা অতিক্রম করে অযৌক্তিক হয়ে ওঠে।

এখানে সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি স্তর বিশ্লেষণ জরুরি। বাংলাদেশে অনেক নিত্যপণ্য আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের বিনিময় হার, আমদানি শুল্ক, পরিবহন ব্যয়Ñএসব উপাদান স্থানীয় বাজারে প্রভাব ফেলে। ব্যবসায়ীরা প্রায়ই এই যুক্তি তুলে ধরেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য পরিবর্তন হলেও স্থানীয় খুচরা বাজারে তার প্রতিফলন কেন বহুগুণ বেশি? কেন পাইকারি বাজারে ২% বৃদ্ধি খুচরা বাজারে ২০% হয়ে যায়?

এর উত্তর খুঁজতে গেলে বাজার কাঠামোর দুর্বলতা সামনে আসে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বহু ক্রেতা ও বিক্রেতা থাকলে মূল্য স্বাভাবিক ভারসাম্যে থাকে। কিন্তু যদি আমদানি বা পাইকারি পর্যায়ে কয়েকজন বড় ব্যবসায়ী প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন, তখন তারা মূল্য নির্ধারণে অঘোষিত সমন্বয় করতে পারেন। এ ‘সিন্ডিকেট’ সংস্কৃতি বাজারের স্বচ্ছতা নষ্ট করে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, গুদামে পণ্য আটকে রাখা, বাজারে সরবরাহ কম দেখানোÑএসব কৌশল নতুন নয়। রমযানের মতো উচ্চ চাহিদার সময়ে এই কৌশল কার্যকর হয়ে ওঠে। কারণ, ভোক্তার বিকল্প সীমিত থাকে।

ভোক্তার মনস্তত্ত্বও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। রমযানকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে একধরনের উদ্বেগ কাজ করেÑ‘পরে হয়তো দাম আরও বাড়বে’। ফলে তারা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিনে রাখেন। এই আচরণ স্বল্প মেয়াদে সরবরাহের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে এবং দাম বাড়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। অর্থাৎ বাজারে আতঙ্ক নিজেই একধরনের জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। ব্যবসায়ী এই মনস্তত্ত্ব বোঝেন এবং তা কাজে লাগান।

রাষ্ট্রীয় ভূমিকার প্রশ্নে আসে নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি। বাংলাদেশে বাজার তদারকির দায়িত্বে রয়েছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। রমযান এলে তাদের অভিযান বাড়ে, জরিমানা হয়, সংবাদ শিরোনাম তৈরি হয়। একই সঙ্গে স্বল্পমূল্যে পণ্য সরবরাহের জন্য কাজ করে ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ, যা নির্দিষ্ট পণ্য ভর্তুকি মূল্যে বিক্রি করে। এ উদ্যোগগুলো তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিলেও প্রশ্ন থেকে যায়, এগুলো কি স্থায়ী সমাধান, নাকি অস্থায়ী ব্যান্ডেজ?

প্রশাসনিক অভিযানের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অভিযান অনেক সময় নির্দিষ্ট কয়েকটি বাজারে সীমাবদ্ধ থাকে; বড় গুদাম বা প্রভাবশালী পাইকারদের নাগাল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তদারকির ধারাবাহিকতা না থাকলে ব্যবসায়ীরা জানেন, কিছুদিন কঠোরতা থাকবে, তারপর আবার আগের নিয়মে ফিরে যাওয়া যাবে। ফলে আইন প্রয়োগের অনিশ্চয়তা বাজারে একধরনের ঝুঁকি তৈরি করে, কতটা বাড়ালে ধরা পড়ার সম্ভাবনা কম?

রমযানের বাজারকে কেবল অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উপেক্ষিত হয়, ‘ নৈতিকতা’। ইসলাম ধর্মে রমযান সংযম ও সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়; অথচ এ মাসেই যদি দরিদ্র মানুষের জীবন আরও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে, তবে তা ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ব্যবসা অবশ্যই মুনাফার জন্য; কিন্তু সমাজের সঙ্গে ব্যবসার একটি নৈতিক চুক্তিও রয়েছে। বিশেষত খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে এই নৈতিকতা আরও সংবেদনশীল। তবে সব ব্যবসায়ীকে একই রঙে রাঙানো অন্যায়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি খুচরা ব্যবসায়ীরা অনেক সময় নিজেরা পাইকারি পর্যায়ের মূল্যবৃদ্ধির শিকার হন। তাঁরা বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি করলে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফলে প্রকৃত দায় নির্ধারণ জটিল। সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা না থাকলে খুচরা পর্যায়ে দায় চাপানো সহজ হলেও সমাধান অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তথ্যের অসমতা। ভোক্তা জানেন না প্রকৃত আমদানি মূল্য কত, পাইকারি মূল্য কত, পরিবহন ব্যয় কত। এ তথ্য অস্বচ্ছ থাকলে অতিরিক্ত মূল্য আরোপ করা সহজ হয়। উন্নত অর্থনীতিতে ডিজিটাল বাজার তথ্য ব্যবস্থা থাকে, যেখানে প্রতিদিনের পাইকারি ও খুচরা মূল্য প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশেও যদি এ স্বচ্ছতা জোরদার করা যায়, তাহলে বাজার কারসাজির সুযোগ কমবে।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিবেচ্য। প্রথমত, আমদানিনির্ভর পণ্যের ক্ষেত্রে সরবরাহ বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে, যাতে এক বা দুই উৎসের ওপর নির্ভরতা কমে। দ্বিতীয়ত, গুদামজাত ব্যবস্থায় নজরদারি জোরদার করতে হবে, কে কত পণ্য মজুত করছে, তার ডিজিটাল রেকর্ড থাকা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, প্রতিযোগিতা আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, যাতে অঘোষিত মূল্য সমন্বয় রোধ করা যায়। চতুর্থত, ভোক্তা শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবেÑ অতিরিক্ত মজুত না করা, ন্যায্যমূল্য যাচাই করা, অভিযোগ জানানো।

সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও পরিবর্তন প্রয়োজন। রমযানকে যদি সত্যিকার অর্থে সহমর্মিতার মাস হিসেবে দেখতে চাই, তবে ব্যবসায়ী সমাজের ভেতর থেকেই নৈতিক চর্চা জোরদার হতে হবে। ব্যবসায়ী সমিতিগুলো স্বেচ্ছায় ন্যায্যমূল্য নির্ধারণের উদ্যোগ নিতে পারে। মসজিদ, সামাজিক সংগঠন, স্থানীয় প্রশাসনÑসবাই মিলে একটি সামাজিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যাতে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি নিরুৎসাহিত হয়।

রমযানে ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য কেবল বাজারের সমস্যা নয়; এটি আস্থার সংকট। যখন ভোক্তা বিশ্বাস হারায় যে বাজার ন্যায্য থাকবে, তখন সামাজিক সম্পর্কও দুর্বল হয়। অর্থনীতি কেবল সংখ্যার খেলা নয়; এটি আস্থা ও ন্যায্যতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি ব্যবস্থা। রমযান যদি আত্মশুদ্ধির মাস হয়, তবে বাজারকেও শুদ্ধ হওয়ার সুযোগ নিতে হবে।

প্রতিবছর একই অভিযোগ, একই অভিযান, একই অস্থিরতাÑএ চক্র ভাঙতে হলে প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার, নৈতিক পুনর্জাগরণ এবং সচেতন নাগরিক আচরণ। নইলে রমযান এলেই বাজারে আবারও একই প্রশ্ন ভেসে উঠবে, সংযমের মাসে কেন বাড়ে অস্থিরতার দাম?

লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।