‘আশীর্বাদ’ ও ‘অভিশাপ’ আজ আলোচনার বিষয়। দু’টি অনুষঙ্গই মানবজীবনের সাথে খুবই ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। অবিচ্ছেদ্য অংশও বলা যেতে পারে। মানবজীবনে এর কোন একটির উপস্থিতি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বস্তুত, মানুষমাত্রই খানিকটা আত্মকেন্দ্রিক। তাই তারা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য সাধ্যমত সকল ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। এমনকি নিজেদের কল্যাণের জন্য প্রতিনিয়তই মানুষের কাছে দয়া, অনুগ্রহ, অনুকম্পা ও আশীর্বাদ প্রার্থনা করে। কখনো নিজের জন্য, কখনো পরিবার-পরিজন বা শুভাকাক্সক্ষীদের জন্য। বিশেষ করে আমরা নিজেদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তথা সন্তান-সন্ততিদের জন্য নিকট-পরিচিতজন বা মুরব্বীদের কাছে আশীর্বাদ চেয়ে থাকি। উদ্দেশ্য, ভবিষ্যৎ জীবন যেন প্রীতিময়, স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও কল্যাণময় হয়ে ওঠে। এ ধরনের আশীর্বাদ প্রার্থনার ঘটনা বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থসহ সকল সময়ের কাব্য-সাহিত্য ও উপখ্যানেও পাওয়া যায়। মধ্যযুগের কবি সরদার জয়েনুদ্দীন তাঁর ‘কেফায়াতুল মোসাল্লিন’ কাব্যের সূচনাতেই বিষয়টি খুবই প্রাণবন্ত করে তুলে ধরেছেন। কবির ভাষায়, ‘..মোমিনের অশির্বাদে পুণ্য হইবেক, অবশ্য গফুর আল্লাহ পাপ খেমিবেক’। বস্তুত সন্তুষ্টিই হচ্ছে প্রকৃত আশীর্বাদ; আর যৌক্তিক অসন্তুষ্টিই হচ্ছে অভিশাপ।

আশীর্বাদের জন্য আমরা নিকটজন, গুরুজনসহ ধর্মীয় নেতাদের দারস্থ হই। মানুষের মনে বদ্ধমূল ধারণা, আশীর্বাদই মানুষের জীবনে সর্বাঙ্গীন কল্যাণ বয়ে আনে; ফলপ্রসূ ও অর্থবহ করে তোলে। তাই মানবজীবনে আশীর্বাদের ইতিবাচক প্রভাবের কথা কোনভাবেই অস্বীকার করার সুযোগ নেই। পক্ষান্তরে অভিশাপ মানুষের জীবনে ধ্বংস ও লাঞ্ছনা বয়ে আনে; তবে সে অভিশাপটা যদি যৌক্তিক ও প্রাসঙ্গিক হয়। অহেতুক ও ভুল বোঝাবোঝির মাধ্যমে অসন্তুষ্টি অবশ্য ভিন্ন কথা। এটা ঠিক যে, যৌক্তিকভাবে অভিশপ্তরা বাস্তবজীবনে নানাভাবে ভাগ্যবিড়ম্বনার শিকার হোন। আশীর্বাদপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জীবন সুন্দর ও সাবলীয় হয়ে ওঠে, ঠিক তেমনিভাবে অভিশপ্তরা পদে পদে লাঞ্ছিত হয়। এমন কথাই প্রচলিত রয়েছে সর্বসাধারণের মধ্যে।

সকল ধর্মেই আশীর্বাদকে ইতিবাচক এবং অভিশাপকে নেতিবাচক হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ইসলামের পরিভাষায় আশীর্বাদকে ‘দোয়া’ বলে অভিহিত করা হয়। দোয়ার মাধ্যমে মানুষের জাগতিক ও পরলৌকিক কল্যাণ সাধিত হয়। ইসলামী আকিদা অনুযায়ী দোয়া বা আশীবাদের মাধ্যমে মানুষের কল্যাণ বা ভাগ্যেরও পরিবর্তন হতে পারে। আর দোয়া হলো ইবাদতের মূল এবং আল্লাহকে ডাকার মাধ্যমে সাহায্য ও কল্যাণ প্রার্থনার খুবই ক্রিয়াশীল ও ফলপ্রসূ মাধ্যম। অন্যদিকে অভিশাপ মানুষের ধ্বংস ও জিল্লতির অনুষঙ্গ হয়ে দেখা দেয়, যদিও ইসলামে অভিশাপ বা অন্যের অনিষ্ঠ কামনা করা সম্পূর্ণ গর্হিত কাজ বা হারাম হিসাবে বিবেচিত। তাই কাউকে অভিশাপ দিতে ইসলাম কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। তবে কেউ যদি কারো হক নষ্ট করে, অন্যায়ভাবে কাউকে কষ্ট দেয় তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির আহাজারী, আর্তনাদ ও মর্মপীড়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য অভিশাপ হয়ে দেখা দেয় বা দিতে পারে। প্রকৃতিবাদীরা এটিকে প্রকৃতির প্রতিশোধ বলতে পুলকবোধ করেন। আর আধ্যাত্ম্যবাদীদের বিবেচনা শ্রষ্টা বা আল্লাহর বিধান।

একথা ঠিক যে, দোয়া বা আশীর্বাদ সব সময় মানুষের জন্য কল্যাণকর হয়। হাদিসে রাসূল (সা.)-এর বর্ণনায় এসেছে, হযরত সালমান ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘দোয়া ব্যতীত অন্য কোনো বস্তু তাকদিরের লিখনকে ফেরাতে পারে না এবং নেক আমল ছাড়া অন্য কোনো বস্তু হায়াত বৃদ্ধি করতে পারে না।’ (তিরমিজি, হাদিস-২১৩৯)। অপর বর্ণনায় পাওয়া যায়, ‘তাকদিরের ফয়সালাকে কেবল দোয়াই পরিবর্তন করতে পারে।’ হাদিসের বর্ণনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আশীর্বাদ বা দোয়া মানুষের জন্য কল্যাণকর হয়; যা মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনেও সহায়ক।

বস্তুত, অভিশাপ অর্থ হলো অন্যের অনিষ্ঠ কামনা করা বা কাউকে অভিসম্পাত দেওয়া, যার মাধ্যমে কারও ক্ষতি হোক বলে প্রার্থনা করা হয় তথা সংশ্লিষ্টের ধ্বংস কামনা করা হয়। এটি একটি তীব্র নেতিবাচক ইচ্ছা, যা কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা স্থানের ওপর খারাপ কিছু ঘটার জন্য প্রকাশ করা হয়। হিন্দু ধর্মে আশীর্বাদ ও অভিশাপ উভয়ই আধ্যাত্মিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়, যা কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আশীর্বাদ হলো অনুগ্রহ বা ঐশ্বরিক ইচ্ছার প্রকাশ, যা ইতিবাচক ফল বয়ে আনে। অন্যদিকে, অভিশাপ হলো কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর প্রতি প্রদত্ত মন্দ ইচ্ছা, যা সাধারণত ক্রোধ বা হতাশা থেকে আসে এবং এর মারাত্মক পরিণতি হতে পারে। উভয়ই ঋষি, দেবতা বা এমনকি সাধারণ মানুষও দিতে পারেন এবং এগুলো অনেক সময় ভাগ্য পরিবর্তন করতে সক্ষম।

মানুষের কোন কাজ দ্বারা যদি অপর মানুষ প্রীত হোন বা সন্তোষপূর্ণ অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন তখন তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেয়। এজন্য হাত তুলে বা আনুষ্ঠানিকভাবে আশীর্বাদ বিষয়ক বাক্য উচ্চারণ করতে হয় না। এ সন্তুষ্টি বৈষয়িক ও পারলৌকিক জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। সন্তুষ্টি অর্জনকারী ব্যক্তি সকল কাজেই প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠেন। ভালো কাজের প্রতি আকাক্সক্ষা ও স্পৃহা বাড়ে এবং জীবনের সকল কাজে সফল হতে থাকেন।

মূলত, কাজের মাধ্যমে সন্তুষ্টি অর্জনকারী ব্যক্তি শ্রষ্টা বা আল্লাহর অভিপ্রায় অনুযায়ীই অতিশয় সম্মানের পাত্রে পরিণত হোন। তাদের জীবন হয় খুবই স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ। প্রকৃতিবাদীরা অবশ্য প্রকৃতির কৃপা ও প্রতিদান বলতেই অধিক পুলকবোধ করেন। তারা মনে করেন, সৎকর্মের জন্য প্রকৃতিই তাকে নানাভাবে পুরস্কৃত করে। মানুষের কোন কাজ, আচরণ, পরোপকারিতা, শুভেচ্ছা, উপদেশ ও ইতিবাচক কথায় মানুষ প্রীত হলে তখন তা সন্তুষ্টি হিসাবে বিবেচিত হয়। মানুষের প্রাপ্তি পরিশোধের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়াও সন্তুষ্টি। বস্তুত, সন্তুষ্টি অর্থ হলো তৃপ্তি; পরিতৃপ্তি। এটি এমন একটি অনুভূতি যখন কোনো চাহিদা বা আকাক্সক্ষা পূরণ হয় এবং মানুষ খুশি বা আনন্দিত হয়। সহজ কথায়, যখন কোনো কাজ বা ঘটনার পর মনে হয় যে সবকিছু ঠিকঠাক হয়েছে, তখন সে অনুভূতিটিই সন্তুষ্টি। পরিতৃপ্তি এমন এক অবস্থা যখন কোনো কিছুর অভাব বা অতৃপ্তি থাকে না, যেমন-তৃষ্ণার্ত অবস্থায় পানি পান করার পর যে তৃপ্তি আসে। সন্তুষ্টি সাধারণত এক ধরনের মানসিক আনন্দ বা খুশিকে বোঝায়। একজন সন্তুষ্ট গ্রাহক বলতে বোঝায় এমন একজন যিনি পণ্যের গুণগত মান বা সেবায় খুশি। তাই বস্তুর ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যেও সন্তুষ্টি থাকা দরকার। যাতে পরস্পর পরষ্পরের প্রতি প্রীতির সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মূলত, সন্তুষ্টিই হলো প্রকৃত আশীর্বাদ।

একথা অনস্বীকার্য যে, মানুষ বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ও বুদ্ধিমান জীব। সৃষ্টির সেরা জীব বলা হয় মানুষকে। মানুষ অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন এবং ভারী সরঞ্জাম ব্যবহারে সক্ষমতা; অন্যান্য প্রাণির চেয়ে যোগাযোগের ক্ষেত্রে জটিলতর ভাষার ব্যবহার, আকারে বৃহত্তর ও জটিল মস্তিষ্ক এবং খুবই উন্নত ও সংঘবদ্ধ প্রাণী। সঙ্গত কারণেই মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই মানুষ অন্যান্য প্রাণী বা জীবের চেয়ে ভিন্নতর বৈশিষ্ট্যের। সঙ্গত কারণেই মানুষের কর্তব্য অন্যান্য জীবের চেয়ে অধিকতর দায়িত্বশীল এবং আলাদা।

বস্তুত, মানুষ হিসাবে আমাদেরকে দৈনন্দিন জীবনে নানা কাজ করতে হয়। আমাদের কোন কাজে অন্য মানুষ সন্তুষ্ট হোন, আবার কোন কাজে অসন্তষ্ট হয়ে থাকেন। এ সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির বিষয়টি সাধারণত দু’ভাবে হয়ে থাকে। মানুষ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষের জন্য নেতিবাচক, ক্ষতিকর, পীড়াদায়ক ও অসন্তুষ্টিমূলক কাজ করে থাকেন এতে যেমন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অসন্তষ্ট হোন, ঠিক তেমনিভাবে ব্যক্তি মনের অজান্তেই এমন কিছু কাজ করে থাকেন যা অন্যদের জন্য অসন্তুষ্টির কারণ হয়। একইভাবে কোন মানুষের ধ্যান-জ্ঞান যদি মানুষের জন্য কল্যাণকর হয়, তাহলে অবশ্যই সংশ্লিষ্টদের সন্তুষ্টির কারণ হয়ে দেখা দেয়। ক্ষেত্র বিশেষে স্বাভাবিক কাজ বা দায়িত্ব পালন করার কারণে মানুষের সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব হয়। যেভাবেই হোক মানুষের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারলেই তা আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেয়। আর প্রকৃতির নিয়মেই আশীর্বাদপ্রাপ্ত নানাভাবে পুরস্কৃত হয়ে থাকেন। আধ্যাত্ম্যবাদীরা যেটিকে শ্রষ্টা কর্তৃক পুরুস্কার হিসাবে বিবেচনা করেন।

রাজনীতি একটি সেবামূলক কাজ। মানুষের কল্যাণ ও জনতুষ্টিই এর প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। বিশেষ করে নির্বাচন এলেই তারা মানুষের কাছে নানাবিধ অতি আকর্ষণীয় ও চটকদার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনমতকে নিজেদের অনুকূলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। যারা এ কাজে অধিকরতর করিৎকর্মা ও সাফল্য দেখাতে পারেন, তারাই নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় যান। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্টরা যদি জনগণের সাথে তাদের কৃত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেন বা গণমানুষের কল্যাণে কাজ করেন বা ওয়াদা যথাযথভাবে প্রতিপালন করেন, তাহলে জনগণ তাদের কাজ ও সেবার প্রতি সন্তুষ্ট হোন। এ জনতুষ্টিই তাদের জন্য অশির্বাদ হয়ে দেখা দেয়। কিন্তু যারা নির্বাচিত হওয়ার পর জনগণের কাছে কৃত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হোন বা ইচ্ছাকৃতভাবে শঠতার আশ্রয় গ্রহণ করেন বা জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের কথা বলে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করে নেন, তবে তা জনঅসন্তুষ্টির কারণ হয়ে দেখা দেয় বা ক্ষমতার দম্ভে মানুষের ওপর জুলুম-নির্যাতন করেন আর এ অসন্তুষ্টিই সংশ্লিষ্টদের জন্য অভিশাপ হয়ে দেখা দেয়। জনগণের সাথে বিশ্বাসভঙ্গ করার জন্য তাদেরকে কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে হয়। যেমনটি হয়েছে পতিত আওয়ামী ফ্যাসিবাদীদের পক্ষে। তারা দেশে প্রায় ১৬ বছর অপশাসন-দুঃশাসন চালিয়েছে। হত্যা, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, গুম, অপহরণ, গুপ্ত হত্যার মাধ্যমে পুরো দেশকে নরকে পরিণত করেছিলো। কিন্তু মজলুম মানুষের অভিশাপে তারা নিজেরাই এখন ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। ফাঁসি ফাঁসি খেলতে গিয়ে এখন নিজেরাই ফাঁসির রশিকে বরণ করে নিয়েছেন।

বস্তুত, মানুষ সামাজিক জীব। তাই মানুষকে সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করতে হয়। সমাজের একজন সভ্য হিসাবে আমাদের প্রত্যেককেই করতে হয় দায়িত্বশীল আচরণ। আর সামাজিক দায়িত্ব বলতে সমাজে বসবাসকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তাদের পারস্পরিক সহযোগিতামূলক আচরণ ও সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করাকে বোঝায়। এর মধ্যে রয়েছে পরিবেশ রক্ষা, নৈতিক আচরণ এবং সমাজকে উন্নত করার জন্য অবদান রাখা। এটি একটি নৈতিক ও সামাজিক বাধ্যবাধকতা যা ব্যক্তিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আর সমাজের একজন সভ্য হিসাবে আমরা এ দায়দায়িত্ব কোনভাবেই এড়াতে পারি না। আর এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতার দায় অবশ্যই আমাদেরকে বহন করতে হবে।

‘ক্ষমতা’ শব্দটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, যার সাধারণ অর্থ হলো শক্তি, সামর্থ্য, বা কোনো কিছু করার যোগ্যতা। এটি শারীরিক, মানসিক, বা প্রযুক্তিগত হতে পারে। সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি অন্যদের আচরণকে প্রভাবিত বা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাকে বোঝায়। কিন্তু কেউ কেউ ক্ষমতাকে উপভোগ্য মনে করলেও আসলে এটি কোন উপভোগ্য অনুষঙ্গ নয় বরং একটি অতিপবিত্র দায়িত্ব। তাই ক্ষমতাবান ব্যক্তিকে অতিসন্তর্পণে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হয়, যাতে তার ক্ষমতা চর্চা কোন স্বেচ্ছাচারিতার আওতায় না পরে। কারণ, এর মধ্যে মানুষের অধিকারের প্রশ্ন বিদ্যমান থাকে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে মানুষের অধিকারের নিশ্চয়তা বিধানের জন্য। তাই ক্ষমতার দম্ভ ও অহমিকা প্রকাশ করতে গিয়ে যদি মানুষ অধিকার বঞ্চিত হয় বা কষ্ট পায়; ক্ষমতার দাপট প্রদর্শন করতে গিয়ে মানুষ যদি অসন্তষ্ট হোন, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির আর্তনাদ-আহাজারী ক্ষমতাশালী ব্যক্তির জন্য অভিশাপের অনুষঙ্গ হবে এবং তা তার ধ্বংসের কারণ হয়ে দেখা দেবে।

একশ্রেণির লোক আছেন যারা অধীনস্তদের সাথে সব সময় অন্যায় আচরণ করেন। তারা এমনটা ভাবেন যে, অধঃস্তনরা তাদের পুরোপুরি অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বাস্তব কথা হচ্ছে, তারা কারো ওপরই নির্ভরশীল নয় বরং নিজদের নিজের মেধা, শ্রম, প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা, কর্মতৎপরতার বিনিময় গ্রহণ করেন। আর এটি তার নায্য পাওয়া। তাই অধিনস্তদের পাওনা পরিশোধের বিষয়ে কোনভাবেই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করাও রীতিমত গর্হিত কাজ। তাই উর্ধ্বতনদের সব সময় অধঃস্তনদের ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি, যাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কোনভাবেই তার নায্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত না হোন। যাকে যে কাজে নিয়োজিত করেছেন তাকে অবশ্যই সে সম্মান ও মর্যাদা দিতে হবে। অযোগ্যদের অহেতুক মূল্যায়ন বঞ্চিতদের অভিশাপের কারণ হতে পারে।

মূলত, সামাজিকভাবে আমরা যে মর্যাদারই অধিকারী হই না কেন আমরা কোন না কোনভাবে প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। এ দায়িত্ব যদি কোন ব্যক্তির স্বার্থ সংশ্লিষ্ট হয়, তাহলে একটা অহমিকা কারো কারো মধ্যে পেয়ে বসে। তারা নিজেদেরকে ক্ষমতার আধার মনে করতে শুরু করেন। ফলে এদের মাধ্যমে মানুষের অধিকার হরণ বা ক্ষুণ্নের ঘটনা ঘটে। এমনকি তা একেবারে জুলুম-নির্যাতনের পর্যায়েও চলে যায়। এমনটা হতে পারে রাজনৈতিক ক্ষমতা, রাষ্ট্রীয়, সমাজিক ও পারিবারিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে। তবে একথা সংশ্লিষ্টদের মনে রাখতে হবে অধিকার কোনভাবেই অনুগ্রহ নয় বরং এটা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রাপ্তি। আর ক্ষমতা কোনভাবেই উপভোগ্য নয় বরং দায়িত্ব। তাই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি মানুষের প্রতি অবিচার করা হয় বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যদি নায্য পাওয়া থেকে কোনভাবে বঞ্চিত হোন, আর তা যদি কারো অসন্তুষ্টির কারণ হয়, তাহলে তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য অভিশাপ হিসাবে দেখা দিতে পারে। মনে রাখতে হবে মানুষের সন্তুষ্টিই আশীর্বাদ আর যৌক্তিক অসন্তুষ্টিই অভিশাপ।

www.syedmasud.com