জাহিদ হাসান

ইসলামী বর্ষপঞ্জির অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ মাস হলো রজব। এই মাসটি চারটি হারাম মাসের একটি যে মাসগুলোকে আল্লাহ তা’আলা বিশেষ সম্মান দান করেছেন। এই মাসে নেক আমলের ফযীলত যেমন বহুগুণে বৃদ্ধি পায়, তেমনি গুনাহের পরিণতিও গুরুতর হয়ে ওঠে। তাই একজন মুমিনের উচিত-এই মাসে নেক আমলের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়া এবং যথাসম্ভব গুনাহ ও নাফরমানি থেকে বেঁচে থাকা।

রজব মাসের উত্তম ও মুস্তাহাব ইবাদতসমূহ :

১. রোযা রাখা : হারাম মাসগুলোতে নফল রোযা রাখা মুস্তাহাব। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: “হারাম মাসগুলোতে (কিছু দিন) রোযা রাখো এবং (কিছু দিন) ছেড়ে দাও।” (আবু দাউদ: ২৪২৮)

এই হাদীসের আলোকে রজবসহ সব হারাম মাসে রোযা রাখা ফযীলতপূর্ণ। তবে পুরো মাস রোযা রাখা জরুরি নয়। বরং সামর্থ্য অনুযায়ী রোযা রাখা উত্তম। বিশেষভাবে- সোমবার ও বৃহস্পতিবার, আইয়ামে বীযের দিন (১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ), মাসের শুরু ও শেষের কিছু দিন রোযা রাখলে অধিক সওয়াবের আশা করা যায়।

২. বেশি বেশি তওবা ও ইস্তিগফার করা : রজব যেহেতু হারাম মাসের অন্তর্ভুক্ত, তাই এ মাসে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার গুরুত্ব আরও বেশি। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন: “সুতরাং এই মাসগুলোতে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করো না।” (সূরা তাওবাহ: ৩৬)

হারাম মাসে কৃত ছোট গুনাহও বড় হয়ে যায়। তাই এই মাসে বেশি বেশি তওবা করা, গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প করা একান্ত জরুরি। বিশেষ করে সায়্যিদুল ইস্তিগফার ও অন্যান্য ইস্তিগফার অধিক হারে পাঠ করা উচিত।

৩. বেশি বেশি দান-সদকা করা : সালফে সালিহীন রজব মাসকে “শাহরুস সাদাকাহ” অর্থাৎ সদকার মাস বলে অভিহিত করতেন। এই মাসে দান-সদকা করলে তার প্রতিদান বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। তাই আশেপাশের গরিব, মিসকীন, এতিম, বিধবা, মাদরাসা, মসজিদ ও দ্বীনি খেদমতে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানসমূহে সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া উচিত।

৪. কুরআন তিলাওয়াত ও যিকর-আযকার : রজব মাসে হৃদয়কে নরম ও জীবন্ত রাখতে কুরআন ও যিকরের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া উচিত। নিয়মিত কুরআন থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ তিলাওয়াত, তাসবীহ-তাহলীল, ও দরূদ শরীফ পাঠ করা যেতে পারে।

যেসব কাজ থেকে বিরত থাকা জরুরি : ইসলামপূর্ব জাহিলী যুগে রজব মাসকে কেন্দ্র করে সমাজে বেশকিছু বিদআত ও কুসংস্কার প্রচলিত ছিল। বর্তমান সমাজেও এমন কিছু আমল পরিলক্ষিত হয় যার কোন ভিত্তি কুরআন হাদিসে নেই বরং সেগুলো ভিত্তিহীন ও মনগড়া। যেমন:

১. সালাতুর রাগায়িব : রজব মাস বিষয়ক অন্যতম ভিত্তিহীন আমল হলো ‘সালাতুর রাগায়িব’ বা আকাঙ্ক্ষা পূরণের নামায। বলা হয়, এই নামায পড়লে নাকি মনের সকল আশা পূরণ হয়। রজব মাসের ২৭ তারিখে মাগরিবের নামাজের পর ১২ রাকাত নফল নামাজ (ছয় সালামে) নির্দিষ্ট সূরার সাথে আদায় করা এবং তারপর একটি বিশেষ হাদিসে বর্ণিত দরূদ শরীফ নির্দিষ্ট শব্দসমূহের সাথে বারবার পড়াকে একটি মুস্তাহাব আমল বলে গণ্য করা হয়। কিন্তু মুহাক্কিক আলেমদের মতে এই বর্ণনাটি বানোয়াট এবং জাল।

২. নির্দিষ্ট দিনের রোজা : রজবের কোনো নির্দিষ্ট দিনে-যেমন ১ তারিখ বা ২৭ তারিখ- বিশেষ রোযাকে সুন্নত বা ফযীলতপূর্ণ মনে করা এবং সে উদ্দেশ্যে রোযা রাখা বর্জনীয়। মুহাদ্দিসগণ বলেন, রজব মাসের বিশেষ কোনো দিনে সিয়াম পালনের উৎসাহ জ্ঞাপক সকল হাদিসই ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীদের থেকে কোনো কথাই নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণিত হয় নি।

৩. মাজারে মাজারে ওরশ ও নাচ গানের আয়োজন করা : রজব মাসকে কেন্দ্র করে মাজারে মাজারে ওরশের নামে গাঁজার আসর বসানো হয়। মাজারগুলোকে আলোকসজ্জিত করা হয়। লালসালু পরে ফকীরেরা উপস্থিত হয়। সেখানে মাদক সেবনসহ নানা অবৈধ কাজ, ঢোল-তবলা, নাচ, গান ইত্যাদির ব্যবস্থা করা হয়। খাবার-দাবার, তবারক, ফিরনি পায়েস ও মিলাদ-কিয়ামের আয়োজন করা হয়।

অথচ কবরকে কেন্দ্র করে ইবাদত করতে ও আমোদ-প্রমোদের আসর বসাতে নবীজি কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “তোমাদের পূর্ববর্তীরা তাদের নবি ও নেককারদের কবরসমূহকে ইবাদতখানা বানিয়ে নিয়েছিল। খুব ভাল করে শুনে রাখ! তোমরা কবরসমূহকে ইবাদতখানা বানাবে না। আমি তোমাদের এ থেকে নিষেধ করছি।” (মুসলিম ৫৩২)।

তিনি আরও বলেন- “ইয়াহুদি ও নাসারাদের উপর আল্লাহর লানত! তারা তাদের নবিদের কবরসমূহকে ইবাদতখানায় পরিণত করেছে।” (বুখারি-৪৩৫)। এজন্য মাজার বা কবরকে কেন্দ্র করে ওরশ করা, লোকসমাগম করা, অনুষ্ঠান করা ইসলাম কোনভাবেই সমর্থন করে না। এ ধরনের ওরশে উপস্থিত হওয়া বৈধ নয়।

রজব মাসে উল্লিখিত বদ রুসম ছাড়াও মধ্য রজবে ‘সালাতু উম্মে দাউদ’ নামে বিশেষ নামায আদায় করা, মৃত ব্যক্তির নামে এ মাসে বিশেষ সদকা করা, কবর যিয়ারতসহ রজব মাসের নানান কুসংস্কার সমাজে প্রচলিত রয়েছে। এই সবগুলোই শরীয়ত গর্হিত কাজ। তাই আমাদেরকে এসব কাজ বর্জন করতে হবে।

শেষকথা : রজব মাস মূলত আত্মসংযম, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এক মহামূল্যবান সুযোগ। তাই এ মাসে আমাদের কাজ হলো, বেশি বেশি নেক আমলের মাধ্যমে এই সম্মানিত মাসের যথাযথ মূল্যায়ন করা। পাশাপাশি সবধরনের গোনাহ থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখা। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে রজব মাসের গুরুত্ব বুঝে এ মাসের করণীয় কাজগুলো করার এবং বর্জনীয় কাজগুলো বর্জন করার তাওফীক দান করুন। আমীন! ইয়া রাব্বাল আলামীন।

লেখক: শিক্ষার্থী, উচ্চতর ইসলামী আইন বিভাগ, জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা।