আসিফ আরসালান

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে সম্প্রতি শুধু টানাপোড়েন সৃষ্টি নয়, রীতিমতো বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে। সম্পর্কের এমন অবনতি কোথায় গিয়ে ঠেকে সে সম্পর্কে কেউ সঠিক করে কিছু বলতে পারেন না। কিন্তু এ অবনতিশীল সম্পর্কের মাঝেও দিল্লীর একটি মহল সূক্ষ্মভাবে প্রচার করতে শুরু করেছে যে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের উন্নতি ঘটবে। এব্যাপারে দিল্লীর প্রথম সারির মিডিয়াসমূহ প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছে। তারা বলছে যে, গত বছরের জুলাই বিপ্লব শেষে অর্থাৎ ৫ অগাস্টের পর থেকে দু’দেশের সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়েছে। সম্পর্কের অবনতি ঠেকাতে নরেন্দ্র মোদির সরকার কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ তো গ্রহণ করেই নি, বরং তারা সম্পর্কের এ অবনতিতে ধোঁয়া দিয়েছে।

বিজেপি এবং হিন্দুত্ববাদীদের ধারণা ছিলো যে, যদি দু’দেশের সম্পর্কের অবনতি হয় তাহলে আখেরে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠতে পারবে না ড. ইউনূসের ইন্টারিম সরকার। তখন বাংলাদেশের ইন্টারিম সরকার নিজ থেকেই সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য ভারতের কাছে ধরনা দেবে। কিন্তু বাস্তবে ফলাফল হয়েছে উল্টো। সম্পর্কের অবনতিতে ভারত বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিতে দেখা দিয়েছে একের পর এক বিরূপ প্রতিক্রিয়া। বাংলাদেশের লক্ষাধিক লোক চিকিৎসার জন্য ভারতে যেতেন। এদের মধ্যে যারা স্বচ্ছল তারা দিল্লী বা চেন্নাই যেতেন। কিন্তু যারা মধ্য ও নিম্নবিত্ত তারা কলকাতা যেতেন। ভারত বাংলাদেশীদের জন্য ভিসা রেস্ট্রিকশন করায় স্বাভাবিকভাবেই ইন্ডিয়া যেতে পারছেন না। দিল্লী ও চেন্নাইয়ে বাংলাদেশী রোগীর সংখ্যা কমেছে। তবুও তারা কোনোমতে এ ধাক্কা সামলে উঠছে। কিন্তু কলকাতায় যারা যেতেন তারা অধিকাংশই মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত হওয়ায় তারা বাসে যেতেন এবং কলকাতার মধ্যম মানের হোটেলে উঠতেন। এখন বাংলাদেশী রোগীর সংখ্যা একেবারে শূন্যের পর্যায়ে যাওয়ার উপক্রম হওয়ায় একদিকে তাদের হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর ১২টা বাজার উপক্রম হয়েছে। অন্যদিকে তাদের হোটেলগুলোও খাঁ খাঁ করছে। যেসব বাস এসব যাত্রী পরিবহন করতো তারাও লোকসান গুনছে।

অসংখ্য পর্যটক বাংলাদেশ থেকে ভারতে যেতেন। তাদের সংখ্যা কমে গেছে। ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী পশ্চিমবঙ্গ যেতেন। সে সুবাদে অনেকে ত্রিপুরা ও আসামেও যেতেন। কলকাতা থেকে আমার মতো আপনারাও নিশ্চয়ই খবর পাচ্ছেন যে, কলকাতার নিউ মার্কেট এখন তীর্থের কাকের মতো পথ চেয়ে বসে আছে, কখন বাংলাদেশের খরিদ্দাররা পদধুলি দেন। এসব কারণে দু’দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য সংশ্লিষ্ট মহল থেকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং ভারত সরকারের ওপর অব্যাহত চাপ রয়েছে।

কট্টর হিন্দুত্ববাদী বিজেপির কেন্দ্রীয় সরকার, আসাম প্রাদেশিক সরকার সহ ভারতের যেসব প্রদেশে বিজেপি সরকার রয়েছে সেসব সরকার রাজনৈতিক কারণে বাংলা ভারত উত্তেজনা জিইয়ে রেখেছে। এমন উত্তেজনাকর সম্পর্কের মধ্যে ঘোষিত হয় গণহত্যার অভিযোগে রজু করা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলার রায়। মামলার রায়ে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হয়। বাংলাদেশ সরকার স্বাভাবিক আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুযায়ী মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী হাসিনাকে ফেরত চায়। মোদি সরকার হাসিনাকে ফেরত তো দিলোই না, উল্টো শেখ হাসিনা দিল্লীতে বসে ভারতে অবস্থানকারী এবং বাংলাদেশে ঘাপটি মেরে বসে থাকা আওয়ামী লীগারদের নির্দেশ দেন যে, বাংলাদেশে তারা যেনো পাল্টা প্রতিশোধ মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। আশ্চর্য্যরে ব্যাপার হলো, ভারতের মাটি ব্যবহার করে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ বিরোধী তৎপরতা চালাচ্ছেন। ভারত সরকার কোথায় সেটি বন্ধ করবে, তা না করে তারা হাসিনার এ রাষ্ট্রদ্রোহী কার্যে মদদ যোগাতে থাকে।

জুলাই বিপ্লবের পর শেখ হাসিনাকে ভারত যখন আশ্রয় দেয় তখন ড. ইউনূসের সরকার ভারতকে বলেছিলো, ভারত সরকারকে তাদের আশ্রয় দেয়া ঠিক হয়নি। কিন্তু যখন দিয়েছে তখন হাসিনা যেনো সেখানে চুপ থাকে। শেখ হাসিনা চুপ তো থাকেনইনি, বরং তিনি সেখানে অফিস খুলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করে দেন। বাংলাদেশ সরকার প্রতিবাদ জানায়। বলে যে, শেখ হাসিনা ভারতে মাটি ব্যবহার করে বাংলাদেশ বিরোধী তৎপরতা চালাচ্ছেন। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বাংলাদেশ সরকারের সেনাবাহিনীর সাবেক ক্যাপ্টেন মাজেদকে হাসিনার সুপ্রীমকোর্ট মুজিব হত্যার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলো। ক্যাপ্টেন মাজেদ ভারতে পালিয়ে গিয়ে ১৫ বছর নীরবে পরিবার নিয়ে বসবাস করছিলেন। তারপরেও তার খোঁজ পেয়ে ভারত সরকার হাসিনার অনুরোধ মতো তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়। বাংলাদেশ অতঃপর ক্যাপ্টেন মাজেদকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে।

গত ৫/৬ মাস থেকেই বাংলাদেশে নির্বাচনী তোড়জোড় চলছিলো। ভারত একাধিকবার বলে যে, ঐ নির্বাচন হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। অর্থাৎ নির্বাচনে আওয়ামী লীগেরও অংশগ্রহণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত সংগত কারণেই আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে এবং তাই আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। কিন্তু আওয়ামী লীগ ইলেকশনে না এলে ভারতের স্বার্থ রক্ষা করবে কে? অতএব তারা বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য আওয়ামী লীগের পক্ষে ইউরোপ আমেরিকায় দৌড়ঝাঁপ শুরু করে। দু’একটি ইউরোপীয় দেশ নাকি পর্দার অন্তরালে কূটনৈতিক পথে বাংলাদেশ সরকারকে সেই মর্মে অনুরোধও জানিয়েছিলো। সবশেষে আমেরিকার ৫ জন সিনেটরও নাকি ভারতের অনুরোধে আওয়ামী লীগের পক্ষে একটি চিঠি দিয়েছেন। কিন্তু ড. ইউনূস অন্তত এ ব্যাপারে অনড়। ড. ইউনূসের এ অনড় অবস্থান দেখে ভারত তার স্ট্র্যাটেজি বদলায়। ইতোমধ্যে প্রায় ১ লাখ আওয়ামী লীগের নেতা কর্মী ও সমর্থক ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন।

ভারতের পরিবর্তিত কৌশল হলো, বাংলাদেশের নির্বাচন বানচাল করা। সেজন্য বাংলাদেশে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালানো। সেই অন্তর্ঘাতী তৎপরতার প্রথম শিকার হয়েছেন শহীদ ওসমান হাদী। বাংলাদেশ সরকার প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও তাদের গোয়েন্দা তৎপরতা এবং প্রযুক্তি নির্ভর অনুসন্ধানের মাধ্যমে নাকি জানতে পেরেছেন যে, শরীফ ওসমান হাদীকে গুলী করার পর ঘাতক ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তার সহকারী শেখ আলমগীর ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছে। বাংলাদেশ সরকার প্রকাশ্যে এ কথা স্বীকার না করলেও কূটনৈতিক চ্যানেল নাকি তারা ওদেরকে ফেরত চেয়েছে।

শরীফ ওসমান হাদীর নারকীয় হত্যাকাণ্ড নিয়ে বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যেকার সম্পর্ক পুনরায় দারুনভাবে উত্তেজনাকর হয়েছে। গত ১২ ডিসেম্বর শুক্রবার ফয়সাল করিম মাসুদ ওসমান হাদীকে গুলী করে। সে রাতেই সে ভারতে পালিয়ে যায়। ৪৮ ঘন্টার মধ্যেই সরকার খবর পায় যে, ফয়সাল করিম ভারতে পালিয়ে গেছে। এ খবর বাংলাদেশের গনমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত হওয়ার পর বাংলাদেশের মানুষ আধিপত্যবাদ বিরোধী বিক্ষোভ করে।

বাংলাদেশের বিক্ষোভ ছিলো অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ। পুলিশ মাঝ পথেই বিক্ষোভকারীদেরকে আটকে দেয়। কিন্তু ভারত সেই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকে পুঁজি করে তাদের চট্টগ্রাম শহর ভিসা আবেদন কেন্দ্রের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করে। তার আগের সপ্তাহে নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে ঢাকা, খুলনা ও রাজশাহীর ভিসা কেন্দ্রের আংশিক কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছিল। গত ২১ অক্টোবর নয়াদিল্লীতে বাংলাদেশ হাই কমিশনের সামনে অখণ্ড ভারত সেনা নামে একটি চরমপন্থী হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী ভায়োলেন্ট প্রটেস্ট করে। ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাস নামক এক হিন্দু পোশাক শ্রমিকের হত্যার প্রতিবাদে দিল্লীস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে একদল যুবক হাইকমিশনের নিরাপত্তা বেষ্টনী ভাঙার চেষ্টা করে। দীপু চন্দ্র দাসের হত্যাকে ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তর বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নিধন বলে প্রচার করে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা অভিযোগ করেন যে, দিল্লীতে বিক্ষোভকারী চরমপন্থী হিন্দুরা বাংলাদেশ হাইকমিশনারকে হত্যার হুমকি দেয়। শহীদ ওসমান হাদীর ঘাতকরা ভারতে পালিয়ে গেছে, অর্থাৎ তারা ভারতে আশ্রয় পেয়েছে। এ অভিযোগ ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু দৈনিক ‘প্রথম আলো’ গত ২৫ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার তাদের প্রথম পৃষ্ঠায় যে ডাবল কলাম খবর ছেপেছে তার শিরোনাম হলো, “হাদী হত্যাকাণ্ড: খুনিকে পালানোর ব্যবস্থা করেন যুবলীগের তাইজুল”।

খবরে বলা হয়, “ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদী হত্যার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তাঁর সহযোগী আলমগীর শেখকে ভারতে পালিয়ে যেতে সহায়তাকারী দু’ব্যক্তিকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। তাঁদের একজনকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি যুবলীগ নেতার ভগ্নিপতি আমিনুল ইসলাম। এ নিয়ে হাদী হত্যার ঘটনায় ১১ জনকে গ্রেফতার করল পুলিশ ও র‌্যাব।

শুটার ফয়সাল ও তাঁকে বহনকারী মোটরসাইকেল চালক আলমগীরকে সীমান্ত পার করার ব্যবস্থা কে বা কারা করেছে, সে তথ্যও পাওয়া গেছে”। ঐ খবর মোতাবেক, ১২ ডিসেম্বর দিবাগত ভোর রাত্রে বাংলা ভারত মানব পারাপারের দালাল ফিলিপস স্নালের মাধ্যমে তাদেরকে হালুয়াঘাট বর্ডার দিয়ে ভারতে পার করে দেয়। এখন ফিলিপস স্নালও পলাতক।

এমন একটি পটভূমিকায় বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কূটচাল হিসাবে নরেন্দ্র মোদি ইউরোপের দু’টি রাষ্ট্র এবং আমেরিকাকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের সমস্ত বিপ্লবী শক্তি এবং ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী বিশাল জনগোষ্ঠী মনে করেন যে, শেখ হাসিনার মতো গণহত্যাকারী এবং ফয়সাল করিমের মতো টার্গেট কিলারকে ভারতে রেখে বাংলাদেশের হাতে সোপর্দ না করে বাংলা ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে পারে না। ভারত সরকার তার জিও স্ট্র্যাটেজিক কারণে অকস্মাৎ এ ধরনের ডিগবাজি মারতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ ভারতের এমন চালাকির ফাঁদে পা দেবে না বলেই জনগনের বিশ্বাস। তবে ভারত বুঝতে পেরেছে যে, যতক্ষণ ড. ইউনূস ক্ষমতায় আছেন ততক্ষণ ভারত বাংলাদেশকে রক্তচক্ষু দেখিয়ে যেমন ভয় দেখাতে পারবে না, তেমনি সুগার কোটেড কূটনৈতিক পরিভাষা প্রয়োগ করেও এ সরকারকে ভুলাতে পারবে না।