মুঃ শফিকুল ইসলাম
ডিজিটাল অর্থনীতি যত বিস্তৃত হচ্ছে, সাইবার ঝুঁকিও তত বহুগুণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তথ্য এখন কেবল যোগাযোগের উপকরণ নয়-এটি অর্থনৈতিক সম্পদ, রাজনৈতিক শক্তি এবং কৌশলগত প্রাধান্যের উৎস। ফলে সাইবার নিরাপত্তা আর প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নীতি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নাগরিক অধিকারের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট : ক্রমবর্ধমান সাইবার অর্থনীতি ও অপরাধ : আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদনগুলো দেখায়, বিশ্বব্যাপী সাইবার অপরাধজনিত আর্থিক ক্ষতি প্রতিবছর ট্রিলিয়ন ডলারের ঘরে পৌঁছেছে এবং আগামী বছরগুলোতে তা আরও বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে। রমযানসমওয়্যার আক্রমণ, ডেটা চুরি এবং আর্থিক প্রতারণা-এসব এখন সুসংগঠিত অপরাধচক্র দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।
একটি বহুজাতিক সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের জরিপ অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে র্যানসমওয়্যার আক্রমণের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে ডেটা ব্রিচের ঘটনায় গড়ে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি কয়েক মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সাম্প্রতিক ঝুঁকি বিশ্লেষণে সাইবার হুমকিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম শীর্ষ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশ : দ্রুত ডিজিটালাইজেশন, বাড়তি ঝুঁকি : বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখন কয়েক কোটি। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, অনলাইন ব্যাংকিং, ই-কমার্স ও সরকারি ডিজিটাল সেবা দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনের পরিমাণ প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে-যা ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তারকে নির্দেশ করে।
কিন্তু লেনদেন যত বাড়ছে, সাইবার প্রতারণার ঘটনাও তত বাড়ছে। ফিশিং, ভুয়া লটারি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রতারণা এবং ব্যাংকিং ম্যালওয়্যার -এসবের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, অনলাইন প্রতারণা ও তথ্যপ্রযুক্তি-সংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা নিবন্ধিত ঘটনার তুলনায় অনেক বেশি।
সাইবার আক্রমণের অর্থনৈতিক প্রভাব : সাইবার আক্রমণের প্রভাব তিন স্তরে বিশ্লেষণ করা যায়-
১. প্রত্যক্ষ আর্থিক ক্ষতি : ব্যাংক জালিয়াতি, অনলাইন প্রতারণা, রমযানসমওয়্যার মুক্তিপণ-এসব সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ।
২. পরোক্ষ ক্ষতি : গ্রাহক আস্থা হ্রাস, ব্র্যান্ড ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, আইনি ব্যয় বৃদ্ধি।
৩. কাঠামোগত ঝুঁকি : বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, নির্বাচন ব্যবস্থা বা সরকারি ডেটাবেস আক্রান্ত হলে জাতীয় স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হতে পারে।
ডিজিটাল অর্থনীতিতে আস্থাই মূল পুঁজি। যদি নাগরিকরা অনলাইন লেনদেনে নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করেন, তবে ডিজিটাল রূপান্তরের গতি মন্থর হবে।
মানবিক দুর্বলতা : প্রযুক্তির চেয়ে বড় ঝুঁকি : গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ সাইবার আক্রমণের সূচনা ঘটে মানবিক ভুলের মাধ্যমে-দুর্বল পাসওয়ার্ড, অজানা লিংকে ক্লিক, বা যাচাইবিহীন অ্যাপ ইনস্টল করা। অর্থাৎ প্রযুক্তিগত প্রতিরক্ষা থাকলেও ব্যবহারকারীর অসচেতনতা পুরো ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
এই বাস্তবতায় সাইবার নিরাপত্তা কেবল আইটি বিভাগের দায়িত্ব নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের আচরণগত দায়িত্ব।
নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা : বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি-সংক্রান্ত আইন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো বিদ্যমান থাকলেও বাস্তব প্রয়োগ, দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা যে বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন-
জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত সাইবার প্রতিরক্ষা নীতি
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব
সাইবার ফরেনসিক দক্ষতা বৃদ্ধি
শিক্ষা ব্যবস্থায় সাইবার নিরাপত্তা পাঠ অন্তর্ভুক্তি
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার
কৌশলগত বাস্তবতা : সাইবার যুদ্ধের যুগ
আধুনিক ভূরাজনীতিতে সাইবার আক্রমণ এক নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। রাষ্ট্রসমূহ এখন সাইবার সক্ষমতাকে সামরিক ও কৌশলগত শক্তির অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। ফলে সাইবার নিরাপত্তা প্রশ্নটি কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।
উপসংহার : নিরাপত্তা ছাড়া ডিজিটাল অগ্রগতি অসম্ভব : বাংলাদেশ দ্রুত ডিজিটাল অর্থনীতির পথে এগোচ্ছে। কিন্তু সেই অগ্রযাত্রা টেকসই হবে কেবল তখনই, যখন সাইবার নিরাপত্তা হবে উন্নয়ন নীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সাইবার নিরাপত্তা এখন বিলাসিতা নয়-এটি কৌশলগত রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার। সচেতন নাগরিক, দক্ষ প্রতিষ্ঠান ও দূরদর্শী নীতিনির্ধারণ-এই ত্রিভুজ সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে নিরাপদ ডিজিটাল ভবিষ্যৎ।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।