জাফর আহমাদ
সাওয়াল আরবী বর্ষ পঞ্জিকার দশম মাস। শা’বান যেমন রমযানের আগমন বার্তাবাহক বরকতময় মাস, তেমনি সাওয়াল হলো রমযানের উপসংহারের মাস আবার হজে¦র প্রস্তুতির মাস। এ মাসের প্রথম দিনই বিশ্বমুসলিম একত্রিত হয়ে ঐক্যের মোহনায় ঈদ উদযাপন করে। একটি মাস সিয়াম সাধনার পর তারা নির্মল আনন্দে একজন অন্যজনের সাথে বুক মিলিয়ে, হাত মিলিয়ে ঐক্য ও সহাবস্থানের জানান দিয়েছে। ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে নবায়ন করে নেয় ঈদ সম্মিলন থেকে। মানবতার পারস্পরিক কল্যাণের এ মিলন মেলা থেকে সুদৃঢ় ভ্রাতৃত্বের শপথ নিয়ে বাড়ী ফিরে। বিশ্ব মুসলিমের মিলনের আরেক স্তম্ভ হচ্ছে হজ্জ, যা জিলহজ্জ মাসে মক্কায় অনুষ্ঠিত হয়। হজ্জের মৌসুম তিনটি মাসকে গণ্য করা হয় (সাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ) সাওয়াল হলো, তার প্রথম মাস। অর্থাৎ সাওয়াল থেকেই শুরু হয় হজ্জের প্রস্তুতি। তাই এ মাসটিও ইবাদাতের এক বিশেষ মৌসুম। তাছাড়া সাওয়াল শব্দটির আভিধানিক অর্থের দিকে লক্ষ করলে সহজেই অনুমান করা যায় যে, এ মাসের গুরুত্ব অনেক।
সাওয়াল অর্থ উঁচু করা, উন্নতকরণ, উন্নত ভূমি, পূর্ণতা, ফলবতী, পাল্লা ভারী হওয়া. গৌরব করা, বিজয়ী হওয়া, প্রার্থনায় হস্ত উত্তোলন করা বা ভিক্ষায় হস্ত প্রসারিত করা, পাত্রে অবশিষ্ট সামান্য পানি, ফুরফুরে ভাব, দায়ভারমুক্ত ব্যক্তি, ক্রোধ প্রশমন ও নীরবতা পালন, সিজন করা কাঠ। আরবী বছর বা হিজরী বছর অনুযায়ী রমযান মাসের পরের মাস হলো সাওয়াল মাস। এই মাসকে ‘সাওয়ালুল মুর্কারম’ বলা হয়। রমযানের পর এ মাসের উল্লেখিত শাব্দিক অর্থের প্রতিটিই ইসলামের আলোকে তাৎপর্যপূর্ণ।
সাওয়াল মাসে কোন মুসলমান যাতে রমযানের রোযা শেষে থেমে না যায়, বরং অল্প কিছু রোযা রেখে পুরো বছরের রোযা রাখার মর্যাদা লাভ করতে পারে তার এক মহাসুযোগ করে দিয়ে মহানবী (সা:) বলেছেন, “যে ব্যক্তি রমযান মাসে ফরয রোযা পালন করলো, অতপর সাওয়াল মাসে আরো ছয়দিন রোযা পালন করল সে যেনো সারা বছর রোযা রাখল।” (মুসলিম : ২৬৪৮, হাদীস একাডেমী, ইফা : ২৬২৫ম ই, সে: ২৬২৪ আবু আইয়ুব আল আনসারী (রা:) থেকে বর্ণিত) নবী (সা:) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমযানের সওম রাখার পরে পরেই সাওয়ালের মাসে ৬টি সওম রাখে, সে যেনো পূর্ণ এক বছর রোযা রাখার সমান সওয়াব লাভ করে। (আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ী ও ইবনে মাযাহ)
রমযানের পর সাওয়ালের রোযা রাখার অর্থ কাজের ধারাবাহিকতা এবং রমযানের রোযা কবুল হওয়ার আলামত। রমযানের পর যদি তাকওয়ার ধারাবাহিকতা না থাকে, তবে বুঝতে হবে তার রমযানের সারাদিনের ক্ষুধা, কিয়ামুল লাইল, রাত্রি জাগরণ, ইবাদাত কবুল হয়নি অর্থাৎ তার প্রশিক্ষণ ভেস্তে গেছে। একটি সাধারণ মৌলিক কথা হলো, যে কোন কাজ পূর্বের কাজের সঠিকতার উপর পরবর্তী কাজটি নির্ভর করে। আল্লাহর ইবাদাতের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। একটি ভালো কাজ কবুল হওয়ার লক্ষণ হলো, ভালো কাজের পর আরেকটি ভালো কাজ করা। একটি ভালো কাজ করার পর আবার ভালো কাজ করা মানে প্রথমটি কবুল হওয়ার আলামত। ধারাবাহিকতা বজায় রাখা আল্লাহর কাছে অতি প্রিয়। বুখারীর একটি হাদীস থেকে তাই জানা যায়। আয়েশা (রা:) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, “যে কাজ কেউ সর্বদা (নিয়মিত) করে, সেটিই আল্লাহর নিকট প্রিয়তম।” (বুখারীঃ ৪৩, কিতাবুল ঈমান, বাব আহাব্বুদ দ্বীন, সংক্ষেপিত) এ হাদীসের ব্যাখ্যায় একজন ইসলামী স্কলার বলেছেন, ‘মুমিনের সমস্ত কাজই একটা নিয়ম-শৃংখলার অধীন হওয়া উচিত। আল্লাহর দ্বীনের সমস্ত কাজই বেশ সাজানো গুছানো। আল্লাহর নিজের সমস্ত কাজের মধ্যেও পরিপূর্ণ নিয়ম-শৃংখলা বিরাজমান। দ্বীনের কাজ কখনো খুব বেশী করা কখনো খুব কম করা অথবা না করা আল্লাহ পছন্দ করেন না। অল্প হলেও সব কাজ সাজিয়ে গুছিয়ে রুটিন অনুযায়ী সর্বদা নিয়মিতভাবে করা আল্লাহ পছন্দ করেন। এতে তিনি বরকত দেন। আর এভাবে বাস্তব জীবন সুশৃংখল ও সুনিয়ন্ত্রিত হয়।’ আল্লাহ তা’আলা বলেন, “অবধারিত মৃত্যু আসা পর্যন্ত নিজের রবের বন্দেগী করে যেতে থাকো।” (হিজর : ৯৯)
উহুদ যুদ্ধের ফলাফল সম্পর্কে অল্পবিস্তর জ্ঞান আমাদের সকলেরই আছে। যুদ্ধে মদীনার এমন কোন পরিবার ছিল না যাদের একজন শহীদ হননি অথবা মারাত্মকভাবে আহত হননি। কোন পরিবারে একের অধিক শহীদ হয়েছিলেন। স্বয়ং রাসুলুল্লাহও (সা:) সে যুদ্ধে আহত হয়েছিলেন। যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী প্রত্যক মুজাহিদ আহত হয়েছিলেন। সন্ধ্যার আগেই নবীজী (সা:) এতকিছুর পরও কুফফারদের পিছু নেয়ার জন্য আহত মুসলিম মুজাহিদদেরকে আদেশ দিলেন। ফলে উহুদে অংশগ্রহণকারী মুজাহিদরাই কাফের সৈন্যদের পিছু নিয়েছিলেন। উহুদ থেকে ফিরে মক্কার কুরাইশরা ‘আকিক’ উপত্যকায় পৌঁছে পুনরায় মদিনা আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। এমন সংবাদে নবী (সা:) রাতে বিশিষ্ট সাহাবাগণের সঙ্গে পরামর্শ করে পরদিন ১৬ শাওয়াল রোববার ফযরের নামাযান্তে ঘোষণা করলেন, ‘কুরাইশদের পুনরাক্রমণ প্রতিহত করতে শুধু ওহুদে অংশগ্রহণকারী সাহাবিরা প্রস্তুত হও।’ এদিকে কুরাইশরা ‘মাবাদ’ নামক এক মদিনাবাসীর মারফত মুসলমানদের পাল্টা অভিযাত্রার খবর জানতে পেরে পিছু হটে মক্কা অভিমুখে পালিয়ে গেল। এটি মুসলমানদের সাহসিকতা ও দৃঢ়তার পরিচয় বহন করে। পক্ষান্তরে শয়তান ও তার অনুসারীদের দুর্বলতা ও ভিরুতার বহি:প্রকাশ। রমযানের পর সাওয়ালের রোযা মানে তাকওয়ার ওপর অবিচলতার এক বিশেষ বহি:প্রকাশ।
রমযানের সিয়াম সাধনার একমাস ট্রেনিংয়ের পর সাওয়ালের সওমের মাধ্যমে মুসলমানগণ শয়তানকে এ জানান দেয় যে, শয়তান বা তাগুতের সাথে মুসলমানদের কোন আপোসকামিতা নেই। সাওয়ালের সওমের মাধ্যমে মুসলিমগণ যে হতোদ্যম হয় না সেই কথারই জানান দিয়ে থাকে। শয়তানের বিরুদ্ধে মুসমানদের চিরন্তন সংগ্রাম চলছেই চলবে। যে কাজে তাগুত অসন্তুষ্ট হয় সে কাজ আমরা একটার পর আরেকটা করে যেতে থাকবো। আমরা সেদিন হবো শান্ত, যেদিন দুনিয়ার জীবন ছেড়ে আখিরাতে পৌঁছে যাবো। তাই সকল মু’মিন ভাই-বোনদের কাছে আবেদন ভালো কাজের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখুন। দুনিয়ার এ কটা দিনের জন্য দুর্বলতা প্রকাশ করবেন না। অবসর নিবেন ওপারে অন্তহীন সুখের জীবনে।
আগেই বলা হয়েছে যে, কোন কাজ পূর্বের কাজের সঠিকতার উপর পরবর্তী কাজটি নির্ভর করে। আল্লাহর ইবাদাতের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। একটি ভালো কাজ কবুল হওয়ার লক্ষণ হলো, ভালো কাজের পর আরেকটি ভালো কাজ করা। তাই রমযানের পর সাওয়ালের সওম রাখা রমযানের সওম কবুল হওয়ার আলামত স্বরূপ। কেননা আল্লাহ তা’আলা কোন বান্দার আমল কবুল করলে, তাকে পরেও অনুরূপ আমল করার মানসিকতা ও সক্ষমতা দান করেন। এটিই ভালো কাজের সবচেয়ে বড় প্রতিদান। একটা ভাল কাজের পর পুনরায় ভালো কাজ করা পরম সৌভাগ্যের বিষয়। তাই সালাত, সওম ও অন্যান্য ইবাদাত বাকি এগারো মাস অব্যাহত রাখতে হবে। কেননা যিনি রমযানের সওমের হুকুম দিয়েছেন তিনি বাকি এগারো মাস বসে বসে ফসল খাওয়ার জন্য বলেননি। বরং সর্বাবস্থায় তাকওয়ার নীতি অব্যাহত রাখার হুকুম দিয়েছেন এবং এমন নীতি অবলম্বনকারীদের জন্যই তিনি আসমান-জমিনের বরকতের ভাণ্ডার খুলে দেয়ারও ওয়াদা করেছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “জনপদসমূহের অধিবাসীরা যদি ঈমান আনতো এবং তাকওয়ার নীতি অনুসরণ করতো তাহলে আমি তাদের জন্য আসমান ও যমীনের বরকতের দরজাসমূহ খুলে দিতাম।”(সুরা আরাফ:৯৬)
সাওয়াল হলো, আরেকটি ফরয ইবাদাতের প্রস্তুতির মাস। সেটি হলো, হজ্জ। রজব ও শা’বান মাস যেমন রমযানের প্রস্তুতির মাস তেমনি সাওয়াল ও জিলক্বদ হলো হজ্জ নামক মহাসম্মেলনের প্রস্তুতির মাস। এ দু’মাস মুসলমানদের মানসিক, শারীরিক ও আর্থিক সকল প্রকার প্রস্তুতি চলে মহাসমারোহে। দু’মাস পরেই হজ্জ উপলক্ষে বিশ্ব মুসলিম মিলন হবে মক্কার সুবিশাল আরাফাতের ময়দানে। সেখানে সমবেত কণ্ঠে উচ্চরিত হবে,‘আমি হাজির হে আল্লাহ আমি হাজির! আমি হাজির! তোমার কোন অংশীদার নেই, আমি হাজির। নিশ্চয় সমস্ত প্রশংসা ও নিয়মতরাজি তোমারই, রাজত্ব তোমারই, তোমার কোন শরীক নেই।’ হজ্জের মৌসুম তিনটি মাসকে গণ্য করা হয় (সাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ) সাওয়াল হলো, তার প্রথম মাস। অর্থাৎ সাওয়াল থেকেই শুরু হয় হজ্জের প্রস্তুতি। তাই এ মাসটিও ইবাদাতের এক বিশেষ মৌসুম। তাছাড়া সাওয়াল শব্দটির আভিধানিক অর্থের দিকে লক্ষ করলে সহজেই অনুমান করা যায় যে এ মাসের গুরুত্ব অনেক। সেই মহাসম্মেলন থেকে বিশেষ দীক্ষা নিয়ে মুসলিমগণ ছড়িয়ে পড়বেন পৃথিবীর আনাচে কানাচে শিরকের মূলোচ্ছেদ করবেন এবং লোকদেরকে অসংখ্য খোদার নাগপাশ থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর বান্দায় পরিণত করবেন।
লেখক : ব্যাংকার।