বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় একটি সত্য ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, একটি রাষ্ট্রের পতন কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, এটি দীর্ঘদিনের নৈতিক অবক্ষয়ের ফল। যুদ্ধ, কর্তৃত্বপরায়ণতা, অর্থপাচার, গণতন্ত্রের মৃত্যু ও মানবাধিকার বিপর্যয়-এসবের কেন্দ্রে রয়েছে অসৎ, জবাবদিহিহীন ও ক্ষমতালোভী নেতৃত্ব। এ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট থেকে বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন কোনো উদাহরণ নয়; বরং এটি একটি পাঠ্য উদাহরণ (Textbook Example) কেননা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ধাপে ধাপে এই সম্ভাবনাময় দেশটিকে গভীর সংকটে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী সরকারের আমলে ক্ষমতার দীর্ঘস্থায়িত্ব সৎ নেতৃত্বে রূপ নেয়নি; বরং তা রূপ নিয়েছে কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনে। একাধিক জাতীয় নির্বাচন জনগণের রায় নয়, প্রহসনের আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে বহু দেশেই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। কোথাও যুদ্ধ টিকিয়ে রাখা হচ্ছে ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশল হিসেবে, কোথাও নির্বাচনকে পরিণত করা হয়েছে প্রহসনে, কোথাও বিচারব্যবস্থা শাসকের অস্ত্রে রূপ নিয়েছে। এসব দেশে রাষ্ট্র আর নাগরিকের নিরাপত্তার প্রতীক থাকে না; বরং ভয় ও নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রে পরিণত হয়। এ প্রবণতার মূল সূত্র একটাইÑসৎ নেতৃত্বের অনুপস্থিতি। অসৎ নেতৃত্ব প্রথমে গণতন্ত্রকে দুর্বল করে, এরপর প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় সম্পত্তিতে পরিণত করে এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনে ঠেলে দেয়। বাংলাদেশে গত দেড় দশকে এই পুরো প্রক্রিয়াটিই ধাপে ধাপে ঘটেছে।

গণতন্ত্রের মূল শর্ত হলো জনগণের ভোটে ক্ষমতার পরিবর্তন। কিন্তু যখন নির্বাচন জনগণের রায় নয়, বরং ক্ষমতাসীনদের পূর্বনির্ধারিত ফল ঘোষণার আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়, তখন গণতন্ত্র কার্যত মৃত হয়ে যায়। বাংলাদেশে একাধিক জাতীয় নির্বাচন সেই প্রহসনের উদাহরণ, যেখানে ভোটকেন্দ্র খালি থেকেছে, রাতের আঁধারে ব্যালট ভরা হয়েছে, আর ফলাফল আগে থেকেই জানা ছিল। এ ধরনের নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক বিরোধীদের নয়, পুরো রাষ্ট্রকেই অবৈধতার সংকটে ফেলে। কারণ জনগণের সম্মতি ছাড়া ক্ষমতায় থাকা সরকার শেষ পর্যন্ত শক্তি ও দমননীতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সে চিত্রই আমরা দেখেছি।

আওয়ামী সরকারের আমলে দুর্নীতি কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়; এটি শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। ব্যাংক খাত লুট, মেগা প্রকল্পে ব্যয়বৃদ্ধি, সরকারি ক্রয়ে কমিশন-এসবের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যাপকভাবে লুট হয়েছে। এর পরিণতি হিসেবে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশ থেকে পাচার হয়েছে। ‘বেগমপাড়া’ কেবল একটি এলাকা নয়; এটি বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থেরও একটি প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কানাডা, দুবাই, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পদের পাহাড় গড়ে ওঠা প্রমাণ করে-এ অর্থ জনগণের নয়, শাসকগোষ্ঠীর নিরাপদ আশ্রয়ের পুঁজি। যে রাষ্ট্রে শাসকের পরিবার ও অনুগতরা এভাবে দেশের সম্পদ পাচার করে বিদেশে সম্পদ গড়তে ব্যস্ত থাকে, সে রাষ্ট্রে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান অনিবার্যভাবে অবহেলিত হয়।

শুধু তাই নয়; অসৎ নেতৃত্ব যখন জনগণের সমর্থন হারায়, তখন সে ভয়কে শাসনের প্রধান অস্ত্র বানায়। বাংলাদেশে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও তথাকথিত ‘আয়নাঘর’ এ ভয়ভিত্তিক শাসনের বাস্তব চিত্র। বহু মানুষ বছরের পর বছর নিখোঁজ, কেউ কেউ লাশ হয়ে ফিরে এসেছে, কেউ আর কখনোই ফেরেনি। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় কিংবা কোনো ঘটনার অতিরঞ্জনও নয়। বরং এগুলোই একটি কর্তৃত্বপরায়ণ রাষ্ট্রের স্বাভাবিক পরিণতি। কারণ রাষ্ট্রের কোনো পর্যায়েই জবাবদিহিতা না থাকলে একটি পর্যায়ে গিয়ে ক্ষমতা সহিংস হয়ে ওঠে।

সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায় আসে যখন আদালত ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠান না থেকে বরং ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের যন্ত্রে পরিণত হয়। বাংলাদেশে বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা, দ্রুত বিচার, সাজা কার্যকরÑএসবের ফলে আদালতের ওপর জনগণের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ত্রুটিপূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিপক্ষ দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। বয়স্কা সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে দুর্বল অভিযোগে বছরের পর বছর কারাগারে ফেলে রাখা হয়েছে। আইন যখন শাসকের স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, তখন তা আর আইন থাকে না; তা হয়ে ওঠে দমননীতির বৈধ মুখোশ। আর এমনটা যখন হয়, তখন রাষ্ট্র নৈতিক বৈধতাও হারায়।

বিগত সাড়ে ১৫ বছরে বাংলাদেশের এসব অভিজ্ঞতা আজ বিশ্বব্যাপী দেখা কর্তৃত্বপরায়ণ রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভয়াবহভাবে মিলে যায়। প্রহসনের নির্বাচন, দুর্নীতি, অর্থপাচার, দমন-পীড়ন ও বিচারব্যবস্থার অপব্যবহারÑএ বৈশিষ্ট্যগুলো যেখানেই একত্র হয়, সেখানেই রাষ্ট্র সংকটে পড়ে। এ সংকট কোনো দলের নয়, এটি জাতির সংকট। কারণ রাষ্ট্র দুর্বল হলে তার মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ; বিশেষত দারিদ্র‍্য, বেকারত্ব, নিরাপত্তাহীনতা ও ভবিষ্যৎহীনতার মাধ্যমে। এই বাস্তবতায় জাতি গঠনের প্রশ্নে কোনো কৌশলী এড়ানোর সুযোগ নেই। সৎ নেতৃত্ব কোনো নৈতিক শ্লোগান নয়; বরং রাষ্ট্র টিকে থাকার মূল শর্তই হলো সৎ নেতৃত্ব। সৎ নেতৃত্ব মানেই জবাবদিহিতা, ক্ষমতার সীমা নির্ধারন, প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা এবং জনগণের রায়ের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা পোষণ করা।

বাংলাদেশ যদি প্রকৃতপক্ষেই জাতি হিসেবে দাঁড়াতে চায়, তাহলে সর্বাগ্রে অসৎ নেতৃত্বের এ চক্র ভাঙতেই হবে। অন্যথায় ইতিহাসের আদালতে এ সময়টুকু লেখা থাকবে-যখন সম্ভাবনাময় একটি দেশ সৎ নেতৃত্বের অভাবে নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই ধ্বংস করেছিল। একটি রাষ্ট্র ধ্বংস হতে খুব বেশি সময় লাগে না, কিন্তু একটি জাতি গড়ে উঠতে লাগে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

আর জাতি গঠনের এই দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে যে উপাদানটি সবচেয়ে বড়ো নিয়ামক হিসেবে কাজ করে তাই হলো নেতৃত্ব। নেতৃত্ব কেবল ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের নাম নয়; নেতৃত্ব হলো একটি নৈতিক কাঠামো, একটি দৃষ্টিভঙ্গি, যার ওপর রাষ্ট্রের আইন, প্রতিষ্ঠান ও ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। ইতিহাস ও সমকালীন বাস্তবতা প্রমাণ করে যেÑসৎ নেতৃত্ব ছাড়া কোনো জাতি টেকসইভাবে গড়ে উঠতে পারে না।

অনেক সময় নেতৃত্বকে ক্ষমতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু প্রকৃত নেতৃত্ব ক্ষমতা ভোগের বিষয় নয়, বরং দায়িত্ব বহনের নৈতিক সক্ষমতা। সৎ নেতৃত্ব মানে এমন এক অবস্থান, যেখানে শাসক নিজেকে রাষ্ট্রের মালিক নয়, জনগণের প্রতিনিধি ও খাদেম হিসেবে বিবেচনা করেন। নেতৃত্বের মূল উপাদান হলো-সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, সংযম, আত্মসংযম এবং জবাবদিহির মানসিক প্রস্তুতি। যে মুহূর্তে কোনো নেতা নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করে, সে মুহূর্তেই নেতৃত্ব নৈতিকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। ক্ষমতা তখন আর দায়িত্ব থাকে না; হয়ে ওঠে আত্মরক্ষার ও আধিপত্য বজায় রাখার হাতিয়ার।

মনে রাখা দরকার যে, নেতৃত্ব একদিনেই অসৎ হয়ে ওঠে না। এটি একটি ধাপে ধাপে ঘটতে থাকা অবক্ষয়ের প্রক্রিয়া। প্রথম ধাপ হলো ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণÑযখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ সীমিত হাতে চলে যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এমনটা হয়েছে কেননা এখানে প্রধানমন্ত্রী অনেক বেশি ক্ষমতার অধিকারী। কাগজে-কলমে রাষ্ট্রের অন্যান্য বিভাগগুলো স্বাধীন ও সার্বভৌম থাকলেও কার্যত নির্বাহী বিভাগের প্রধান তথা প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছের বাইরে এখানে কিছু হওয়া কঠিন। দ্বিতীয় ধাপ হলো সমালোচনা অসহনীয় হয়ে ওঠাÑভিন্নমতকে রাষ্ট্রবিরোধিতা হিসেবে দেখা শুরু হয়। তৃতীয় ধাপে আসে আইন ও প্রতিষ্ঠানকে দলীয় বা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার। আর চূড়ান্ত ধাপে শাসক নিজেকে জনগণের রায় না পাওয়ার আশঙ্কায় শক্তি ও ভয় দিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখতে চায়। এ পর্যায়ে পৌঁছালে নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হয়, দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়, আর রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ‘শৃঙ্খলা রক্ষা’র নামে বৈধতা পায়। আর এমনটাই আমরা গত সাড়ে ১৫ বছরের আওয়ামী শাসনে দেখেছি।

বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, অর্থপাচার, শরণার্থী সংকট ও কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের পেছনে একটি সাধারণ সূত্র রয়েছেÑনৈতিকতাবিবর্জিত নেতৃত্ব। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, পূর্ব ইউরোপ বা লাতিন আমেরিকাÑযেখানেই অসৎ নেতৃত্ব ক্ষমতায় দীর্ঘদিন থাকে, সেখানেই রাষ্ট্র দুর্বল হয়, সমাজ বিভক্ত হয় এবং মানুষ নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে। অসৎ নেতৃত্ব শান্তিকে ভয় পায়, কারণ শান্তি মানে প্রশ্ন। তাই যুদ্ধ, সংকট ও শত্রুর ধারণা টিকিয়ে রাখাই তাদের রাজনৈতিক কৌশল হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, সৎ নেতৃত্ব কোনো ব্যক্তিগত গুণের ওপর এককভাবে নির্ভর করে না; এটি একটি সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির ফল।

প্রথম শর্ত হলো নৈতিকতাবোধসম্পন্ন জনপ্রতিনিধি নির্বাচন। জনগণ যদি স্বল্পমেয়াদি সুবিধা বা ভয়ভীতির কারণে অসৎ নেতৃত্বকে মেনে নেয়, তবে সেই মূল্য পুরো জাতিকেই দিতে হয়। দ্বিতীয় শর্ত হলো স্বচ্ছতা। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, ব্যয় ও নিয়োগÑসবকিছু জনগণের সামনে জবাবদিহির আওতায় থাকতে হবে। গোপনীয়তা যত বাড়ে, দুর্নীতির সুযোগ তত প্রসারিত হয়। আর তৃতীয় শর্ত হলো জবাবদিহিতা। স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, কার্যকর সংসদ, মুক্ত গণমাধ্যম ও শক্তিশালী নাগরিক সমাজ ছাড়া সৎ নেতৃত্ব টিকে থাকতে পারে না। কারণ সৎ মানুষকেও ক্ষমতার লোভ থেকে রক্ষা করতে হয় প্রতিষ্ঠান দিয়ে। নেতৃত্বকে সৎ রাখতে হলে ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ অপরিহার্য। মেয়াদ সীমা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং শক্তিশালী বিরোধী রাজনীতি না থাকলে নেতৃত্ব অবধারিতভাবে স্বৈরতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় সৎ নেতৃত্ব কোনো আদর্শবাদী কল্পনা নয়; এটি এ মুহুর্তের সবচেয়ে বড়ো অপরিহার্যতা। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ দেশকে যেভাবে পতনের দ্বারপ্রান্তে রেখে গিয়েছে তা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সুব্যবস্থা প্রয়োজন। অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, সিস্টেম লসের অবসান এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য সৎ নেতৃত্বই সবচেয়ে কার্যকর ও কম খরচের পথ। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকটের বড় অংশ সৃষ্টি হয়েছে নীতিগত ব্যর্থতা ও দুর্নীতির কারণে। সৎ নেতৃত্ব প্রথমেই যে কাজটি করতে পারে, তা হলো আস্থা ফিরিয়ে আনা। দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কর ছাড় বা প্রণোদনা নয়; বরং নীতির ধারাবাহিকতা, আইনের শাসন ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন।

সৎ নেতৃত্ব থাকলে ব্যাংক খাতের লুটপাট বন্ধ হয়, খেলাপি ঋণ রাজনৈতিক আশ্রয় পায় না, এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধ করা সম্ভব হয়। শুধু এ জায়গাগুলোতেই শৃঙ্খলা ফিরলে অর্থনীতিতে বিপুল পরিমাণ সম্পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। অভিজ্ঞতায় দেখা যায় যে, বাংলাদেশে সিস্টেম লস কেবল কারিগরি সমস্যা নয়; এটি দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশ। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবহন, রাজস্ব ও সরকারি ক্রয়Ñপ্রতিটি খাতে অপচয় ও লুটপাট রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। সৎ নেতৃত্ব এখানে নির্ণায়ক ভূমিকা রাখতে পারে; কারণ নেতৃত্ব সৎ হলে নিচের স্তরে অসততার জন্য রাজনৈতিক ছাতা থাকে না।

একটি সৎ নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রে নিয়ম ভাঙা ব্যতিক্রম হয়, নিয়ম মানাই বরং স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। এতে সিস্টেম লস কমে, সেবার মান বাড়ে এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আসে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে দলীয় আনুগত্য পেশাগত যোগ্যতার জায়গা দখল করেছে। সৎ নেতৃত্ব এ প্রবণতা উল্টে দিতে পারেÑমেধা, পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতাকে পুরস্কৃত করে। প্রশাসন যখন জেনে যায় যে, আইন সবার জন্য সমান, তখন ফাইল আটকে রেখে ঘুষ আদায়ের সুযোগ থাকে না, সিদ্ধান্ত গ্রহণে গতি আসে এবং নাগরিক সেবা কার্যকর হয়। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা মানেই রাষ্ট্রের কার্যকারিতা।

জাতি হিসেবে বাংলাদেশ এখন একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বাংলাদেশের সামনে বিকল্প দুটি পথ খোলাÑএকটি হলো অসৎ নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় ধীরে ধীরে দেউলিয়া রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া, অন্যটি হলো সৎ নেতৃত্বের মাধ্যমে কঠিন কিন্তু টেকসই পুনরুদ্ধারের পথে হাঁটা। ইতিহাস বলে, দ্বিতীয় পথটি লম্বা কিন্তু এর পরিণতি উত্তম। আরেকটি নির্মম বাস্তবতা হলো, রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে গণতন্ত্র, স্বচ্ছ অর্থায়ন ও নৈতিক প্রশিক্ষণ ছাড়া সৎ নেতৃত্ব জন্ম নেয় না। সৎ নেতৃত্ব আকস্মিকভাবে আসে না; এটি গড়ে তুলতে হয়। তাই সৎ নেতৃত্ব যে দলের অভ্যন্তরে চর্চিত হয়; এর বাইরে হুট করে অন্য কোথাও থেকে সততা বা সৎ নেতৃত্ব নিয়ে আসা কঠিন।

ইতিহাস এক নির্মম শিক্ষক। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে-অসৎ নেতৃত্ব রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে, আর সৎ নেতৃত্বই জাতিকে গড়ে তোলে। যে জাতি অসৎ নেতৃত্বকে দীর্ঘদিন মেনে নিয়েছে, তার করুণ পরিণতি ইতিহাস আমাদের জানিয়েছে। বাংলাদেশ আজ সে পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে। সৎ নেতৃত্ব কোনো বিলাসিতা নয়, এটি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের টিকে থাকার মূল শর্ত। এ সত্য যত দেরিতে উপলব্ধি হবে, ক্ষতিও তত গভীর হবে। বাংলাদেশ আজ সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আশা করি, আসন্ন নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ সৎ নেতৃত্ব বাছাই করার ক্ষেত্রে ভুল করবে না।