আমরা আমাদের পারিবারিক জীবনের সব কাজ নিজেরা করতে পারি না। ইচ্ছে থাকলেও তা সব সময় সম্ভব হয়ে উঠে না। ফলে বাধ্য হয়ে আমরা অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ি। বিশেষ করে সাংসারিক কাজে সহযোগিতা করার জন্য আমরা গৃহকর্মী নিয়োগ দিই। সাধারণত এ নিয়োগ দু’ধরনের হয়ে থাকে। একজন থাকেন- যিনি নির্দিষ্ট সময় এসে কাজ শেষ করে চলে যান। আবার অন্যজন থাকেন পূর্ণকালীন-যিনি সব সময় বাসায় থাকেন। খণ্ডকালীন গৃহকর্মী সকালে বা বিকেলে নির্দিষ্ট সময় কাজ করে চলে যান। আর পূর্ণকালীন গৃহকর্মী আমাদের বাসায়ই থাকেন, আমাদের সঙ্গেই থাকেন। ফলে তারা ধীরে ধীরে পরিবারের অংশ হয়ে ওঠেন। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মতো তারাও বাসার ভেতর সারাক্ষণ থাকেন। রান্নাঘর থেকে শুরু করে শোবার ঘর পর্যন্ত। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও তাদের সাথে এক ধরনের আত্মিক বন্ধন গড়ে ওঠে। একসঙ্গে বসবাসের ফলে বিশ্বাসের জায়গাটি দৃঢ় হয়, পারস্পরিক সম্পর্ক ও বোঝাপড়া বৃদ্ধি পায়, বিশ্বাস, সমঝোতা ও ভরসার জায়গাটি বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠতো। কিন্তু ইদানিং কিছু গৃহকর্মী সে বিশ্বাসের জায়গাটিকে গলা টিপে হত্যা করছে, হত্যার মতো জঘন্যতম অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, যা নিঃসন্দেহে বেদনাদায়ক। একসময় গৃহকর্মী নির্যাতনের খবরই বেশ আলোচিত ছিল। নামী-দামি পরিবারে গৃহকর্মী নির্যাতনের খবর পত্রিকার পাতায় নিয়মিত স্থান পেত।
সময়ের সাথে সাথে চিত্র অনেকটাই পাল্টে গেছে। এখন গৃহকর্মী নির্যাতন নয়, গৃহকর্মী দ্বারা মালিক হত্যার খবর সংবাদের শিরোনাম। সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও এসব ঘটনা জনমনে গভীর উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার সৃষ্টি করেছে। গত ৮ ডিসেম্বর রাজধানীর মোহাম্মদপুরে একটি বাসা থেকে পুলিশ মা-মেয়ের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করেছে। নিহতরা হলেন গৃহকর্মী লায়লা আফরোজ এবং তার মেয়ে নাফিসা নাওয়াল বিনতে আজিয়া। পুলিশের ভাষ্য থেকে জানা যায় যে, গৃহকর্মী আয়েশা আক্তার স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য মালামাল চুরি করে পালানোর সময় গৃহকত্রী ও তার মেয়ের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে গৃহকর্মী আয়েশা ছুরি দিয়ে দু’জনকেই কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। পুলিশ একাধিক স্থানে অভিযান চালানোর পর ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার চরকায়া গ্রাম থেকে ঘাতক আয়েশা ও তার স্বামীকে গ্রেফতার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আয়েশা আক্তার এ হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন এমনটিই জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শহীদুল ইসলাম। ঘাতক আয়েশা আক্তার নরসিংদীর সলিমগঞ্জ এলাকার রবিউল ইসলামের মেয়ে। এ ঘটনায় নিহত লায়লা আফরোজের স্বামী আজিজুল ইসলাম মোহাম্মদপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
আমাদের দেশে গৃহকর্মীর উপর যেমন নিপীড়ন চালানোর ঘটনা আছে, তেমনি চরম আদোর-যত্ন করে রাখারও ঘটনা আছে। প্রসঙ্গক্রমে আমার দেখা একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। আমার পরিচিত একজন গৃহকর্মী মালিকের চেয়েও ভালো খাটে থাকেনÑশুনতে অনেকের কাছে হয়ত অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে! কিন্তু আমি নিজে দেখেছি, যে খাটে মালিক থাকতেন, তার চেয়েও ভালো খাট গৃহকর্মীকে দিয়েছেন। শুধু কী তাই! অধিকাংশ পরিবারে গৃহকর্মীদের স্থান হয় রান্নাঘরের কোণায় অথবা পরিত্যক্ত কোনো জায়গায়। কিন্তু আমি যে মালিকের কথা বলছি তিনি তার গৃহকর্মীর জন্য নিজের চাইতেও বড় রুম গৃহকর্মীকে থাকার জন্য দিয়েছেন। তার বাসায় নতুন কেউ গেলে গৃহকর্মী কে তা বলতেই পারতো না। তিনি গৃহকর্মীকে কখনো বুয়া বলে সম্বোধন করতেন না। সস্মানসূচক শব্দ ব্যবহার করে ডাকতেন। গৃহকর্মীও ছিলেন অত্যন্ত বিশ্বস্ত। গৃহকর্মীর কাজের চাপ কমাতে তিনি খন্ডকালীন আরেকজন গৃহকর্মী নিয়োগ দিয়েছিলেন। গৃহকর্মীর ওপর এমন আচরণ সতিই প্রশংসার দাবি রাখে। সবার ভাগ্যে এমন মালিক জোটে না। আবার আমাদের সমাজে উল্টো চিত্রও আছে। অনেক পরিবারে গৃহকর্মীর ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়- যার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। সে প্রসঙ্গে এখানে বিস্তারিত যাচ্ছি না। গৃহকর্মী নির্যাতন বিষয়ে পরে লেখার ইচ্ছা রইল। এ লেখায় মূলত গৃহকর্মীর হাতে মালিক বা মালিকপক্ষের সদস্য হত্যার বিষয়টিই আলোচ্য।
আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ নিজের কাজ নিজেই করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। বিশেষ করে গ্রামের পরিবারগুলোতে দেখা যায় নারীরাই সবকিছু করছেন। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে কৃষিকাজ পর্যন্ত তারাই সামলাচ্ছেন। এখন সময় পাল্টেছে। শহরের হাওয়া গ্রামেও লেগেছে। যারা একসময় গাছের পাতা দিয়ে রান্না করতেন তারা এখন এলপি গ্যাস দিয়ে রান্না করেন। একসময় গ্রামের কাজের লোকের অভাব ছিল না। যাদের জমিজমা কম ছিল তারা অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন। পুরো গ্রামজুড়েই কৃষিকাজ ছিল প্রধান জীবিকা। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই গোয়াল ভরা গরু ছিল। এখন সে গ্রামীণ চিত্র অনেকটাই পাল্টে গেছে। অধিকাংশ পরিবার আর কৃষিকাজে যুক্ত নয়। গ্রামের কাজের লোকও পাওয়া যায় না। মানুষ এখন শহরমুখী। শহরে এসে কেউ অটো চালান, কেউ গার্মেন্টসে চাকুরী করেন। নারীদের বড় একটি অংশ গার্মেন্টসে এবং বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন। এ গৃহকর্মীদের মধ্যেও কেউ কেউ লোভের বশবর্তী হয়ে মালিক হত্যার মতো ভয়ংকর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। পুলিশ সদর দপ্তরের বার্ষিক অপরাধ প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে বর্তমানে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ গৃহকর্মী কর্মরত আছেন। এ বিপুল সংখ্যা গৃহকমীর হাতে এ পর্যন্ত কতজন হত্যা কিংবা খুনের শিকার হয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে এ বিপুল সংখ্যার তুলনায় নথিভুক্ত হত্যার ঘটনার সংখ্যা খুবই সীমিত। তবুও প্রতিটি ঘটনা সমাজে উদ্বেগের জন্ম দেয়। বিশেষ করে রাজধানী শহরে, যেখানে গৃহকর্মীর ওপর নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি সেখানে এসব হত্যাকাণ্ড পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে। ফলে অনেকে গৃহকর্মীকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। নিশ্চিন্তে বাসায় বসবাস করতেও ভয় পাচ্ছেন।
মানবিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাবে মানুষের ভেতর আর্থিক লোভ বাড়ছে। যেনতেন উপায়ে বড় লোক হওয়ার মনোবাসায় মানুষ অন্যায় পথে পা বাড়াচ্ছে। গৃহকর্মীর হাতে মালিক খুন হওয়ার ঘটনা বাড়ছে। তার মধ্যে অন্যতম কারণগুলো হচ্ছে- আর্থিক লোভ, টাকা বা মূল্যবান গয়না চুরির উদ্দেশ্য, মালিকপক্ষের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি, ব্যক্তিগত ক্ষোভ, পূর্বের নির্যাতনের অভিজ্ঞতা, মানসিক চাপ, শারীরিক মারধর, মানসিক নির্যাতন, গালিগালাজ বা অপমান করা, বিশ্রামহীন কাজ, ছুটি না দেওয়া, হঠাৎ ঝগড়া, অপ্রাপ্তবয়স্ক কর্মী নিয়োগ ইত্যাদি। কিছু ক্ষেত্রে চুরি বা ডাকাতির উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হচ্ছে, যেখানে গৃহকর্মী কেবল সহায়তকারী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ নিষ্ঠুরতার হাত থেকে বাঁচতে হলে আমাদেরকে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যেমন ঃ গৃহকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রথমে তার পরিচয় যাচাই-বাছাই করা, তাড়াহুড়ো করে নিয়োগ না দেওয়া, পূর্বে কোথাও কাজ করে থাকলে সেখানকার গৃহকর্তার সাথে কথা বলা, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধ কপি নেয়া, তার নামে রেজিস্ট্রিকৃত মোবাইল নাম্বার নেওয়া, স্থায়ী ঠিকানা ও পারিবারিক তথ্য যাচাই এবং সংরক্ষণ করা, পরিবারের সদস্য সংখ্যা জানা, অভিভাবকের যোগাযোগ নম্বর সংগ্রহ করা, নির্যাতন ও অবেহলা বন্ধ করা, সময়মতো বেতন পরিশোধ করা, কাজ ছাড়লে প্রাপ্য টাকা পরিশোধ করে দেওয়া, মানবিক ও সম্মানজনক আচরণ করা, রাষ্ট্রীয় বা স্থানীয় পর্যায়ে ডাটাবেস তৈরি করা, প্রথম কয়েক মাস গৃহকর্মীর আচরণ ও কাজের প্রতি বিশেষ নজর রাখা, পরিচয়পত্র ও পুলিশ ভেরিফিকেশন অথবা হেল্পলাইন চালু করা, ঝগড়া বা অস্বাভাবিক আচরণ দেখা দিলে দ্রুত কাজ বন্ধ করে অভিভাবকের কাছে হস্তান্তর করা। সব গৃহকর্মী খারাপ তা আমরা বলছি না। কিন্তু ঢালাও ভাবে সবাইকে অন্ধ বিশ্বাস করাও ঠিক না। নিরাপদ জীবনযাপনের জন্য আস্থা ও সতর্কতার মধ্যে ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। নিজের ঘরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রত্যেক পরিবারের দায়িত্ব। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গৃহকর্মীদের নিবন্ধন, পরিচয়পত্র বা কার্ড প্রদানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। গৃহকর্মীদের একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করে সেখানে তাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষণ করা জরুরি। কার্ডবিহীন কোনো ব্যক্তি যেন বাসা বা অফিসে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে না পানে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি থাকা দরকার। একই সঙ্গে কার্ডবিহীন গৃহকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের দায় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
গৃহকর্মীর হাতে মালিক বা গৃহকর্ত্রী হত্যার ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক অপরাধ নয়; এটি আমাদের সামাজিক উদাসীনতা, রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা ও পারিবারিক অসচেতনার সম্মিলিত ফসল। যে সমাজে কোনো যাচাই বাছাই ছাড়াই গৃহকর্মী নিয়োগ হয়, যেখানে নিরাপত্তা ও মানবিক আচরণ দুটিই অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলে সেখানে রক্তপাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। সুতরাং জরুরি ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিবন্ধন, পরিচয়পত্র, প্রশিক্ষণ ও কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা কার্যকর করা প্রয়োজন। যেন আর কোন গৃহকর্তা বা গৃহকর্ত্রীর জীবন এভাবে বিপন্ন না হয়। লেখক : প্রাবন্ধিক