প্রফেসর আর. কে. শাব্বীর আহমদ
আজকের তরুণরা ‘৫২’র ভাষা আন্দোলন দেখেনি, ‘৬৯’র গণঅভ্যুত্থান দেখেনি, ‘৭১’র মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি। জেনেছে বাঙালি মুসলিম জাতিসত্তা নিজ ভাষা, স্বজাতি ও স্বাধীনতা প্রেমিক। তারা ন্যায়-ইনসাফ ও বাঁচার অধিকার আদায়ে বুকের তাজা রক্ত দিতে জানে, অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে জানে না। ‘৫২’র ভাষা আন্দোলনে আপামর ছাত্র-জনতা রাজপথে বুকের লাল টকটকে রক্ত ঝরিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করেছে। ‘৬৯’র গণঅভ্যুত্থানে মুক্তিকামী বাঙালি পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের বৈষম্যনীতি, অপশাসন ও মানবিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভে জীবন দিয়ে ‘৪৭ এর প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদন করতে চেয়েছে। পাকিস্তানি হানাদাররা একাত্তরের ২৫ মার্চের কালরাতে গণহত্যা চালিয়ে এদেশের ছাত্র-জনতা, বুদ্ধিজীবীদের নির্মূল করতে চেয়েছিল। হাজারো ছাত্র-জনতা ও বুদ্ধিজীবীর তাজা খুনের উপর দাঁড়িয়ে বীর মুসলিম বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়েছে হানাদারদের বিরুদ্ধে।
দীর্ঘ ন’মাস রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে লাখো জনতা আত্মাহুতি দিয়ে একাত্তরের ১৬. ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশের লাল সূর্যোদয় ঘটিয়েছে। সে ঐতিহ্যবাহী রক্তের প্রবহমানতায় আজকের তরুণরাও স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর বৈষম্যমুক্ত একটি স্বদেশভূমি গড়তে রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
আমাদের নতুন প্রজন্মের তরুণ ছাত্র জনতা সে ‘৫২-’৭১এর ঐতিহাসিক আত্মত্যাগের ইতিহাস-উপমাকে আত্মস্থ করে ‘৭১ সালের স্বাধীন বাংলাদেশকে শোষণ ও বৈষম্যমুক্ত করার জন্য স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের ১৭ বছরের দুঃশাসনের কবর রচনা করেছে ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানে অকাতরে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে। তারা স্বৈরাচারমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত, নৈতিকতায় সমৃদ্ধ একটি নতুন বাংলাদেশের সুবাতাস বইয়ে দিতে যাচ্ছে।
তাদের কর্ণকুহরে মহান স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালার সে বিপ্লবী বাণী পৌঁছে গেছে : “ তোমাদের কি হয়েছে? কেন তোমরা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করছো না, অথচ নির্যাতিত নারী পুরুষ শিশুরা চিৎকার করে বলছে, হে আমাদের রব আমাদেরকে এ নির্যাতিত নিপীড়িত জনপদ থেকে উদ্ধার কর এবং আমাদের জন্য তোমার পক্ষ থেকে একজন সাহায্যকারী বন্ধু পাঠাও! যারা ঈমানদার তারা লড়াই করে আল্লাহর পথে। আর যারা কাফির বা আল্লাহকে অস্বীকারকারী তারা লড়াই করে তাগুত বা আল্লাহদ্রোহীদের পথে। অতএব তোমরা শয়তানের দোসরদের হত্যা করো। নিশ্চয়ই শয়তানের কূট-চাল অত্যন্ত দুর্বল। “ -সূরা আন নিসা, আয়াত: ৭৫-৭৬
সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা’আলার এই ঐশীবাণীতে উজ্জীবিত এ তরুণরা তাওহীদবাদী, আদর্শবাদী, মানবিক গুণসম্পন্ন সূর্য সন্তান। তারা সর্বস্তরের ছাত্র-জনতার মধ্যে মানববান্ধব কর্মসম্পাদনের মাধ্যমে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবার মন জয় করে ডাকসু, জাকসু, রাকসু, চাকসু, গকসু নির্বাচনে ছাত্রছাত্রীদের প্রাণঢালা সমর্থন পেয়ে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছে। তারা দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে কারিগরি, গঠনমূলক শিক্ষা ও নৈতিকতার সমন্বয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে মৌলিক অধিকার আদায় সম্বলিত নিরাপদ জ্ঞান চর্চার ক্যাম্পাস হিসেবে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকরী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
একটি নীতি-নৈতিকতাসমৃদ্ধ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মৌলিক অধিকারসম্পন্ন, বৈষম্যহীন, মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যেও এই তরুণ প্রজন্মগোষ্ঠী আত্মনিবেদিত হচ্ছে। ধর্মভিত্তিক শিক্ষা ও সুস্থ ধারার রাজনীতি প্রবর্তনে তারা ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক সচেতন গোষ্ঠীর সাথে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে।
২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে তারা মানবতার মুক্তির বিধান আল কুরআনের আলোকে সৎ, যোগ্য, আল্লাহভীরু নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মদিনার সনদের আদলে একটি কল্যাণধর্মী স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর হয়ে গ্রাম-শহরের সর্বপ্রান্তে নিঃস্বার্থভাবে জনসমর্থন আদায়ের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
আল্লাহ তা’আলার ঘোষণা : “নিশ্চয়ই এ জমিনের শাসন-কর্তৃত্ব আল্লাহর আনুগত্যশীল বান্দাহদের হাতেই থাকবে।” -সূরা আল আম্বিয়া : ১০৫ । এ নির্দেশে উজ্জীবিত হয়ে চরিত্রবান ও আল্লাহভীরু নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। সূরা আলহাজ্ব এর ৪১ নং আয়াতে আল্লাহ তা’আলা পৃথিবীর শাসন কর্তৃত্ব পরিচালনাকারীদের মধ্যে যে গুণাবলির কথা বলেছেন, তারা আল্লাহর সেই নির্দেশকে বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশে একটি সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক মানবতার সমাজ বিনির্মাণ করে নিরাপদ ও জান্নাতি সুবাতাস বইয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এ কাজের সফলতার জন্য তারা তাদের মেধা মনন জীবন ও সম্পদকে অকাতরে উৎসর্গ করার দৃপ্ত শপথ গ্রহণ করেছে। যুগে যুগে আল্লাহ তা’আলা এ ধরনের আল্লাহ প্রেমিক ও মানবতার কল্যাণে আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে উৎসর্গকারী বান্দাহদেরকে নবী-সাহাবাদের মতো বিজয় দান করেছেন।
সূরা আলহাজ্বে আল্লাহ তা’আলার ঘোষণা : “যদি আল্লাহ তা’আলা সৎ, যোগ্য, ঈমানদার বান্দাহদের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রদান করেন, তাহলে তারা অবশ্যই চারটি কাজ সম্পাদন করবে।
এক. তারা সালাত বা নামাজ কায়েম করবে। (এ সালাত মানুষকে অন্যায় অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখবে। সালাত ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা একটি সুস্থ সমাজ ব্যবস্থার মৌল উপাদান।) আল্লাহ তাআলার ঘোষণা : “নিশ্চয়ই নামাজ মানুষকে অন্যায় অশ্লীল কাজ থেকে দূরে রাখে। “ -সূরা আল আনকাবুত : ৪৫
দুই. যাকাত ভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। (যাকাত ভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থায় একটা অর্থনৈতিক ভারসাম্য তৈরি হবে। দুঃস্থ মানুষের সংখ্যা কমে যাবে। সমাজ থেকে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীভূত হবে। গরিবরা ধনীদের অর্থ-সম্পদ থেকে নির্ধারিত হক পেয়ে দারিদ্র্যমুক্ত হবে।)
তিন. সর্বস্তরে ন্যায় ও ইনসাফকে প্রতিষ্ঠা করবে। (এতে করে কোন মানুষ তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না। অন্যায় বা নির্যাতনের শিকার হবে না। সমাজ থেকে অন্যায় জুলুমের মূলোৎপাটন হবে।)
চার. অন্যায়, অশ্লীল, জুলুম, সন্ত্রাস, পাপাচার, দুরাচার থেকে জনগোষ্ঠীকে বিরত থাকার নির্দেশ দিবে। “রাষ্ট্রীয় নির্দেশে জনগোষ্ঠীকে অন্যায় অশ্লীল কাজ থেকে বাধা প্রদান করলে বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর করলে সমাজে আর কেউ অন্যায় কাজ করার সাহস পাবে না। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে সমাজে একটি সুশৃংখল পরিস্থিতি নিশ্চিত হলে সব শ্রেণি- পেশার মানুষ সামাজিক নিরাপত্তা লাভ করতে সক্ষম হবে। -সূরা আলহাজ্ব : ৪১
আমরা দৃঢ় আশা পোষণ করি, আজকের তরুণদের মধ্যে আল্লাহ তা’আলা ঘোষিত উপর্যুক্ত নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জিত হলে তারা সুনিশ্চিতভাবে বাংলাদেশকে একটি সুখী-সমৃদ্ধ ও স্বাধীনতা- সার্বভৌমত্বপূর্ণ ভূ-খণ্ডে পরিণত করার পরিবেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। যেখানে থাকবে না কোনো আধিপত্যবাদ, শোষণ ও স্বৈরাচারী আচরণ। যেখানে মানুষ ঘুমাবে সবুজ অরণ্যাণীর হৃদয় জুড়ানো শীতল হাওয়া ও মহামহিমের অমীয় সুবাতাসে।
আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, স্বৈরাচার মুক্ত বাংলাদেশের দিক-দিগন্তে বর্তমানে নতুন একটি জাগরণ শুরু হয়েছে। তরুণদের বিশাল একটি অংশ একটি শাশ্বত, চিরন্তন মুক্তির আদর্শের দিকে গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করতে শুরু করেছে। তাদের প্রাত্যহিক জীবনাচরণে একটি নিষ্কলুষ সভ্যতার বাস্তবায়ন আমরা লক্ষ্য করছি।
কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মানের পাশাপাশি ছাত্র-ছাত্রীদের চারিত্রিক মানের দিকে তারা বাস্তবধর্মী কর্মসূচি গ্রহণ করছে। নারী ছাত্রীদের সর্বত্র মর্যাদা রক্ষার জন্য তারা কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যার ফলে উন্নত চরিত্রের পরিবেশবান্ধব শিক্ষার একটি প্রসারিত দার উন্মুক্ত হচ্ছে।
তরুণরাই আমাদের আগামী দিনের প্রত্যাশিত স্বপ্ন-সুন্দর জীবন গড়ার কারিগর। এ তরুণরাই তো আমাদের শক্তি। কাঁটা বিছানোর পথ মাড়িয়ে আমাদের তরুণরা যত বেশি জীবনের সঠিক গন্তব্যের দিকে ফিরে আসবে ততই এ উম্মাহর দোজাহানের সাফল্য দ্রুততর হবে। সমস্ত পরাশক্তি পদানত হবে তরুণদের উন্নত সভ্যতার দ্ব্যর্থহীন ভূমিকার প্রভাবে।
তরুণরা যদি তাদের জীবনের শুরু এবং শেষ উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তোষ ও মানবতার কল্যাণকে হৃদয়ে ধারণ করতে শেখে, তাদের জন্মভূমি বাংলাদেশের ইতিহাস ঐতিহ্য, দেশপ্রেমিকের আত্মত্যাগ ও স্বাধীনতা-সংগ্রামের দৃপ্ত চেতনাকে ধারণ করতে পারে-সর্বোপরি এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ঈমান আকিদাকে অনুধাবন করে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী যদি তারা সমাজ জীবনকে গড়ে তুলতে পারে তাহলে খোলাফায়ে রাশেদার মত একটি উন্নত জীবন ব্যবস্থা তারা গড়ে তুলতে পারবে এবং মানবতার কল্যাণে নিজেদেরকে আত্মনিয়োগ করে আল্লাহর বিধান মোতাবেক বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে চির অক্ষুন্ন রাখতে সক্ষম হবে-এটা বর্তমান সময়ের অনিবার্য বাস্তবতা। তরুণদের জীবন যখন আল্লাহর উপর ভরসায় পরিপূর্ণ হয়ে যাবে তখন তারা আল্লাহর উপর নির্ভর করে বলে উঠবে : “হে আমার রব, আমি তো কখনো তোমাকে ডেকে ব্যর্থ হয়নি।” -সূরা মারইয়াম : ৪
আমরা প্রত্যক্ষ করছি আজকের নব জাগ্রত তরুণরা মানবিক সুশাসন ও সুদিনের সুবাতাস বইয়ে দেওয়ার জন্য আন্তরিক প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের এ প্রয়াস সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাবে। এ আশাবাদ ব্যক্ত করি!
লেখক : প্রাবন্ধিক, কবি ও গীতিকার