রিয়াদ হোসেন

সাংবাদিকতাকে সাধারণত রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে অভিহিত করা হয়। কারণ রাষ্ট্রের সাথে সাংবাদিকতা অনেকটা ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। যেকোন রাষ্ট্রে সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করা যেমন সাংবাদিকতার ইতিবাচক অংশ তেমনি সরকারের ভুলত্রুটি বা জনগণের জন্য যা মঙ্গলজনক নয় তার গঠনমূলক সমালোচনা করাও সাংবাদিকতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। একটি রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে সকল কাজের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বিশেষ করে জনগনের সমস্যা, সম্ভাবনা তুলে ধরতে এবং রাষ্ট্রকে সঠিক পথে পরিচালিত হতে সাংবাদিকরা কাজ করে থাকে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিবর্গের কাছ থেকে তথ্য বের করে আনাসহ রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে জনমতের প্রতিফলন ঘটান তারা। এক্ষেত্রে অনেক সময় সাংবাদিকরা তাদের পেশাদারিত্ব ভুলে গিয়ে সাংবাদিকতার মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হন। ক্ষমতাসীন সরকারের সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষকে তুষ্ট করতে অনেকে তেলবাজি করে থাকেন; যা সাংবাদিকতার বস্তুনিষ্ঠতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। দিনের পর দিন এই জায়গা থেকে আমাদের সাংবাদিক সমাজ বের হতে পারছে না। ব্যক্তিগত সম্পর্ক জোড়ালো করতে গিয়ে তারা তাদের পেশাগত দায়বদ্ধতাকে জলাঞ্জলি দিচ্ছে। আমরা দেখেছি, গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত আ. লীগ সরকারের আমলে এমন অনেক সাংবাদিক ক্ষমতার আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ার চেষ্টা করেছেন। অনেকে হয়েছিলেন আবার অনেকে হওয়ার চেষ্টা অব্যহত রেখেছিলেন। সবশেষ দেখা গেছে, এই চাটুকারিতা আ’লীগ সরকারকে জনগণের মুখোমুখি এনে এক ভয়াবহ সংঘাতের দিকে ধাবিত করে। এজন্য আমাদের মনে রাখা উচিত, সাংবাদিকতায় প্রশ্ন করা কেবল পেশাগত দায়িত্ব নয়, বরং ক্ষমতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান উপায়।

আমরা দেখেছি, অনেক সাংবাদিক সরকার দলের কাছে নিজেকে আরও প্রিয় করে তুলতে বিভিন্ন সময় চাটুকারিতা করে থাকে। সরকার দলের প্রধান কিংবা অনান্য মন্ত্রী, এমপিদের মতবিনিময় সভায় ক্ষমতাসীনদের গুণগানে মত্ত থাকেন। বিভিন্ন উপমা দিয়ে, মিষ্টি কথা বলে অনেক সাংবাদিক নিজের বিবেককে জলাঞ্জলি দিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থোদ্ধারে চেষ্টা করেন। তাদের প্রশ্ন করার বা প্রশংসা করার ধরণ দেখে অনেক সময় মনে হয়, তারা সরকারের জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়মিত কাজ করে থাকেন। সাম্প্রতিক সময়ে এমন একটি ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন জায়গায় ভাসছে। দেশের খ্যাতিমান সাংবাদিক খালেদ মহিউদ্দীন নির্বাচন পরবর্তী বিএনপির চেয়ারম্যান এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক সংবাদ সম্মেলনে একটি প্রশ্ন করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি প্রশ্ন করার আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদেশ্য করে বলেন ‘আপনি যদি অভয় দেন, তাহলে আমি একটি প্রশ্ন করতে চাই’। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এবং কথা বলার ধরন নিজেকে একজন সাংবাদিক হিসেবে প্রশ্নকারীর চেয়ে বেশি অনুগত প্রমাণের চেষ্টা ছিল বলে অনেকে মন্তব্য করছেন। এমন ঘটনা বিগত আ’লীগ সরকারের আমলে বার বার দেখা গেছে বলেও সমালোচনা হচ্ছে। আবার অনেকে খালেদ মহিউদ্দিনের এই বাক্যকে বিনয় বা ভদ্রতা হিসেবে দেখছেন। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে, একজন প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিকের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করার আগে এভাবে ‘অভয়’ জাতীয় শব্দ দ্বারা প্রার্থনা করা স্পষ্টতই রাজনৈতিক তোষামোদির শামিল। আর প্রশ্নের শেষে অকারণে বোকার মতো হেসে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করাটাও ছিল তার চরম অপেশাদারিত্বের বহি:প্রকাশ। এই জায়গা থেকে সাংবাদিকদের বের হয়ে আসতে হবে। ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে ক্ষমতার আশীর্বাদপুষ্ট হওয়া যাবে না। এটা সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য নয়। এতে সংবাদপত্র, সাংবাদিক এবং সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবাদিকরা নির্ভয়ে কাজ করবে। দেশের নীতিনির্ধারণী মহলে যারা থাকবেন তাদের সাথে আলাপ-আলোচনা করবেন। স্বাধীন মতো কাজ করবেন। দেশের উন্নয়ন এবং অগ্রগতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সরকারি দলের সাথে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। আবার অন্যদিকে সরকারের ভুলত্রুটি বা সীমাবদ্ধতাগুলো বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরবে। আর এগুলোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষমতাসীন দলের গঠনমূলক সমালোচনা করার সুযোগ দিতে হবে। তা নাহলে গণতন্ত্র তার প্রাণশক্তি হারাবে। সাধারণ মানুষের সমস্যা, অভিযোগগুলো উঠে আসবে না। আর সাধারণ মানুষের কন্ঠস্বর হিসেবে সংবাদপত্র কাজ না করলে ক্ষমতাসীন সরকার জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন বাঁধাগ্রস্ত হবে। এছাড়া সংবাদপত্রের ওপর থেকে দেশের সাধারণ মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলবে। এজন্য আশা রাখি, প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল যে সরকার গঠন করেছে তারা সাংবাদিকদের সার্বিকভাবে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিবে। পাশাপাশি একটি অবাধ, নিরপেক্ষ এবং ভীতিহীন পরিবেশ নিশ্চিত করবে; যেখানে সাংবাদিকরা নির্ভয়ে সত্য প্রকাশ করতে পারে। বিশেষ করে গণমাধ্যমের জন্য যে কালো আইন রয়েছে সেগুলো সংস্কার করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা তৈরি করে দিবে। একই সাথে সাংবাদিকদের নিজেদের পেশাদারিত্বের জায়গাটা আরও সুদৃঢ় করতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশের যেকোন মন্ত্রণালয়, সংবাদ সম্মেলন বা ক্ষমতাসীন সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তির সামনে গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে নিজেকে গুটিয়ে না রেখে; যৌক্তিক এবং তথ্যনির্ভর প্রশ্ন করাটা সাংবাদিকতায় অত্যন্ত জরুরি। এ জায়গাটা তোষামোদিতে পর্যবসিত হলে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হুমকির মুখে পড়বে।

লেখক : শিক্ষার্থী, সরকারি বিএল কলেজ, খুলনা।