ধর্ষণ হলো এক ধরনের নৃশংস অপরাধ, যেখানে নারীর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তাকে লঙ্ঘন করা হয়। গণধর্ষণ আরও ভয়াবহ-যেখানে একাধিক ব্যক্তি পরিকল্পিতভাবে নারীর ওপর সহিংসতার হাত বাড়ায়। প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো প্রান্ত থেকে ধর্ষণ, গণধর্ষণ কিংবা ধর্ষণ পরবতী হত্যার মতো জঘন্যতম ঘটনার খবর ভেসে আসছে। কর্মজীবী নারী, স্কুল-কলেজের ছাত্রী, গৃহবধূ, শিশু, এমনকি বৃদ্ধাও রেহাই পাচ্ছেন না। পত্রিকার পাতা, টেলিভিশনের পর্দায় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-যেদিকে চোখ রাখা যায়, সেদিকেই নিষ্ঠুরতার নির্মম চিত্র। সম্প্রতি নরসিংদীর মাধবদীতে কিশোরী আমেনা বেগমের গণধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ড পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। ধর্ষণের বিচার না পেয়ে শিশুটি বাবার হাত ধরে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু সে পারেনি। ঘাতকেরা বাবার কাছ থেকে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এ ঘটনা কেবল একটি পরিবারের ওপর বর্বর আঘাত নয়; এটি রাষ্ট্রের আইনের শাসন ও সামাজিক বিবেকের ওপর এক গভীর আঘাত। শুধু কি তাই? এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই রাজধানীর হাজারীবাগে স্কুলছাত্রী শাহরিয়ার শারমিন বিন্তিকে ছুিরকাঘাতে হত্যা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী ধর্ষর্ণের শিকার হওয়া, ভোলায় বাকপ্রতিবন্ধী গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা- সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ বাস্তবতা সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। এই দেশ কি তবে নারী ও কিশোরীদের জন্য নিরাপদ নয়?
ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার বিতাড়িত হওয়ার পর দেশবাসী গুম-খুন-ধর্ষণমুক্ত এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু একের পর এক নৃশংসতা সেই স্বপ্নকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। কেবল শাসক পরিবর্তন করলেই সমাজ বদলায় না- সমাজ বদলাতে হলে আইনের শাসন ও নৈতিকতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ কিছু ‘সোনার মানুষ’ প্রয়োজন-যাদের পাশ দিয়ে সুন্দরী রমণী একাকী হেঁটে গেলেও তারা চোখ তুলে তাকাবে না, কে বা কারা যাচ্ছে তা দেখার আগ্রহ বোধ করবে না। এমন মানুষ গড়ে তুলতে পারলে সমাজ ধীরে ধীরে বিবেকহীনতার গহ্বর থেকে বেরিয়ে আসবে। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জিরো টলারেন্স নীতি, দ্রুত বিচার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা, সামাজিক সচেতনতা এবং নৈতিক শিক্ষার সমন্বয় ছাড়া এই বিভীষিকার অবসান সম্ভব নয়।
প্রতিটি ধর্ষণের ঘটনায় ধর্ষিতার চেয়ে রাষ্ট্রেরই বেশি লজ্জা পাওয়া উচিত। কারণ ধর্ষণ কেবল একটি ব্যক্তিগত অপরাধ নয়; এটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা, বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক নৈতিকতার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। যখন একটি মেয়ে, একটি শিশু বা একজন নারী নিরাপদ থাকতে পারে না তখন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- অন্যায় ও জুলুমের ওপর কোনো সভ্যতা স্থায়ী হয়নি। রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পেছনেও একটি ধর্ষণের ঘটনা জনরোষের আগুন জ¦ালিয়ে দিয়েছিল-লুক্রেশিয়ার কাহিনী। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে রোমের শেষ রাজা তারকুইনিয়াসের পুত্র লুক্রেশিয়াকে ধর্ষণ করে। লুক্রেসিয়া বিচার প্রার্থনা করেছিলেন; কিন্তু ন্যায়বিচার পাননি। অপমান ও অবিচারের ভার সইতে না পেরে তিনি নিজের বুকে ছুরি বসিয়ে আত্মহনন করেন। এই ঘটনা রোমের জনগণকে বারুদের মতো ক্ষুব্ধ করে তোলে। শুরু হয় রাজতন্ত্রবিরোধী বিদ্রোহ। রোমান সেনাবাহিনীর একটি অংশও জনগণের পক্ষে দাঁড়ায়। শেষ পর্যন্ত পতন ঘটে রাজতন্ত্রের, প্রতিষ্ঠিত হয় প্রজাতন্ত্র। একটি নারীর আর্তনাদ ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ধর্ষিতা নারীর কান্না কেবল মানবসমাজকেই নাড়িয়ে দেয় না- বিশ্বাসীদের কাছে তা আল্লাহতায়ালার আরশও কাঁপিয়ে তোলে।
দেশব্যাপী নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণ, হত্যা ও সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রায় বেড়েছে। নরসিংদীর ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ঈশ্বরদীতে দাদি ও নাতনিকে হত্যা এবং হত্যার পর নাতনিকে ধর্ষণের অভিযোগ-জাতিকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। এই ঘটনাগুলো আর বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা বলে মনে হয় না ; বরং এক ভয়াবহ ধারাবাহিকতার অংশ বলেই প্রতীয়মান হয়। নরসিংদীর ঘটনার প্রধান আসামি নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরা কিশোরীকে পরিকল্পিতভাবে নিয়ে গিয়ে সহযোগীদের সঙ্গে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। পরে তাকে হুমকি দেওয়া হয়-কাউকে কিছু জানালে পরিণতি ভয়াবহ হবে। কিন্তু ঘটনা প্রকাশ্যে এলে শুরু হয় আরেক নির্মম অধ্যায়। অভিযোগ ওঠে, স্থানীয় এক ইউপি সদস্য ও মহিষাশুড়া বিএনপির সহ-সভাপতির নাম-সালিসের মাধ্যমে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এখানে স্পষ্ট করে বলা জরুরি- ধর্ষণ একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ; এর বিচার কোনো সালিসে হতে পারে না। এটি সম্পূর্ণ অ- আপসযোগ্য অপরাধ, যেখানে আপস বা মীমাংসার কোনো সুযোগ নেই। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর ধারা ৯(৩) এ গণধর্ষণের বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। একাধিক ব্যক্তি যৌথভাবে common intention evcommon object নিয়ে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করলে প্রত্যেক অপরাধী মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে। এটি অ-আপসযোগ্য হড়হ-non-compoundable ও অজামিনযোগ্য non-bailable অপরাধ। সুতরাং সালিসের নামে এ ধররের বেআইনি তৎপরতা ফৌজদারি আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে আমেনা তার বাবার সঙ্গে খালার বাড়িতে যাওয়ার পথে কোতোয়ালিরচর বড়ইতলার তিন রাস্তার মোড় থেকে বাবার চোখের সামনে জোরপূর্বক তুলে নেওয়া হয়। একজন বাবার অসহায় চিৎকার রাতে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। পরদিন ২৬ ফেব্রুয়ারি সকালে দড়িকান্দি এলাকার একটি সরিষা ক্ষেত থেকে গলায় ওড়না পেঁচানো অবস্থার তার নিথর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আমেনার মৃত্যু শুধু একটি প্রাণহানি নয়; এটি বিচারহীনতা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সামাজিক নীরবতার বিরুদ্ধে এক রক্তাক্ত প্রশ্নচিহ্ন। কোনো রাষ্ট্রে বিচারপ্রার্থনা কখনো প্রাণসংহারী ঝুঁকি হতে পারে না। অথচ আমেনা আক্তারের জীবনের শেষ অধ্যায় যেন সেই নির্মম সত্যকেই নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে।
দেশে সরকার আসে, সরকার যায় ; ক্ষমতার পালাবদল হয়। কিন্তু নারীর প্রতি নিষ্ঠুরতা থামে না। ধর্ষণের মতো নৃশংস ঘটনা একের পর এক সংঘটিত হচ্ছে, অথচ কার্যকর প্রতিকার মিলছে না। ইতিহাসের দিকে তাকালেই দেখা যায়-বছর বদলায়, শাসক বদলায়, কিন্তু অপরাধের চেহারা খুব বেশি বদলায় না। ১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট দিনাজপুরে পুলিশ হেফাজতে ইয়াসমিন ধর্ষণেল শিকার হন-ঘটনাটি সারা দেশে তীব্র প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছিল। ১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতা জসিম উদ্দিন মানিকের ধারাবাহিক ধর্ষণ এবং তথাকথিত ‘সেঞ্চুরি উদযাপন’ জাতিকে স্তম্ভিত করেছিল। ২০১৫ সালের ২১ মে কুড়িল বিশ্বরোডে এক গারো তরুণী গণধর্ষণের শিকার হন। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ড পরবর্তী ধর্ষণের অভিযোগে দেশজুড়ে আন্দোলন হয়। ২০১৭ সালের আগস্টে বগুড়া থেকে ময়মনসিংহগামী একটি চলন্ত বাসে জাকিয়া সুলতানা রূপাকে গণধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। একই বছরের ২৮ শে মার্চ বনানীর রেইনট্রি হোটেলে জন্মদিনের পার্টির নামে দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। ২০১৭ সালের ২৯ এপ্রিল গাজীপুরের শ্রীপুর রেল স্টেশনের কাছে চলন্ত ট্রেনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন হজরত আলী ও তাঁর মেয়ে আয়েশা আক্তার। ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় বিচার না পাওয়ার ক্ষোভে ও হতাশা তাদের এই মর্মান্তিক পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু সেই ট্র্যাজেডিও ধর্ষণের লাগাম টানতে পারেনি; বরং প্রমাণ করেছে-বিচারহীনতা অপরাধকে থামায় না, তাকে আরও বেপরোয়া করে তোলে। ২০১৮ সালে নির্বাচনী সহিংসতার প্রেক্ষাপটে নোয়খালীর সুবর্ণচরে ভোট সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এক নারী গণধর্ষণের শিকার হন-যা দেখিয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসাও কখনো কখনো শরীরকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। ২০২৫ সালের মার্চে মাগুরায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে আট বছরের এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। যে ঘর নিরাপত্তার প্রতীক হওয়ার কথা, সেই ঘরেই যদি নৃশংসতা লুকিয়ে থাকে, তবে আমাদের সামাজিক কাঠামোর ভঙ্গুরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আরও লজ্জাজনক এই পাশবিকতার অভিযোগ ওঠে নিকট আত্মীয়ের বিরুদ্ধে। বিশ্বাস ও সম্পর্কের ভেতরেই যখন ভয় জন্ম নেয় তখন সমাজের নৈতিক ভিত যে কতটা নড়বড়ে হয় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, মানসিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন ও আত্মহত্যার মতো ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে। এসব কেবল বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এগুলো আমাদের সামাজিক কাঠামো, রাষ্ট্রীয় তৎপরতা এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার ওপর এক ভয়াবহ প্রশ্নচিহ্ন তোলে। মনে রাখতে হবে, আমেনার নিথর দেহ কেবল একটি পরিবারের শোক নয়; এটি রাষ্ট্রের আয়নায় ভেসে ওঠা নির্মম সত্য। যে দেশে একটি শিশু বিচার চাইতে গিয়ে প্রাণ হারায়, সে দেশে উন্নয়ন, অগ্রগতি কিংবা গণতন্ত্রের বড় বড় বুলি অর্থহীন হয়ে পড়ে। অন্যায়কে প্রশ্রয় দিলে তার আগুন একদিন সিংহাসনকেও স্পর্শ করে। আজ যদি ধর্ষকের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর না হয়, তবে আগামীকাল সেই ব্যর্থতার দায় কোনো দেয়াল, কোনো ক্ষমতা, কোনো অজুহাত ঢাকতে পারবে না। প্রশ্ন একটাই- আমরা কি আরেকটি আমেনার জন্য অপেক্ষা করব, নাকি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করব।