হাসনা হেনা
বিপরীত স্রোতেই মানবজীবন বহমান। আর এ বিপরীত অভিঘাতেই চলে যাপিত জীবনের হিসাব নিকাশ। যেখানে আছে শ্রেণি-বিন্যাস, শ্রেণি-বিভক্তি, আছে ধনী, গরীব, আছে সুখ দুঃখ। যারফলে মানবজীবন প্রবাহিত হয় বৈপরীত্যর স্রোতে। সৃষ্টি হয় শোষক ও শোষিত, অত্যাচারী ও অত্যাচারিত শ্রেণির। এজন্য ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা, কিংবা এ আনন্দকে গতিশীল করার জন্য প্রয়োজন আমাদের বোধ কিংবা উপলব্ধির জায়গা পরিশোধিত করা। এক্ষেত্রে ঈদ বিশেষ ভূমিকা রাখতে সহায়তা করে। ঈদ হচ্ছে বিশ্বে মুসলিমদের একটি বার্ষিক সম্মেলন ও উৎসবের দিন। এ বিশেষ দিন মুসলমানদের জীবনে দু’বার আসে। একটা হচ্ছে ঈদুল ফিতর আরেকটি হচ্ছে ঈদুল আজহার মাধ্যমে।
ইসলাম সাম্যের ধর্ম। ইসলাম অর্থ শান্তি। এ শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যত ধরনের দায়বদ্ধতা আছে যেমন সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় সব দায়বদ্ধতার মূলে রয়েছে একটা শক্তি যারনাম মানবতা।
ঈদ হলো সে বিশেষ দিন, যেদিন বিশেষ বার্তা নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়। যেমন ঈদের দিন সকালে মায়া,মমতা নিয়ে ঈদগায়ে সমবেত হওয়া, এক কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করা, এক দিনের জন্য হলেও হিংসা, বিদ্বেষ ভুলে যাওয়া, কোলাকুলি করা।
৩০ দিন সিয়াম সাধনার পর মানুষ শাওয়ালের চাঁদ দেখে এবং ঈদ উদযাপনে প্রস্তুতি গ্রহন করে । কাজেই বুঝা যাচ্ছে ঈদ অর্থ উদযাপন। যার পারিভাষিক অর্থ আনন্দ। শাব্দিক অর্থ ‘ বার বার ফিরে আসা’। ফিতর শব্দটি ‘আওদ’ শব্দ মূল থেকে উদ্বৃত। এর আভিধানিক অর্থ হলো ফিরে আসা, প্রত্যাবর্তন করা । ‘ফিতর’ শব্দের অর্থ হলো ভেঙে ফেলা, বিদীর্ণ করা। কাজেই ঈদুল ফিতর অর্থ দাঁড়ায় উপোস কিংবা রোজা ভাঙার আনন্দ।
এ রমযান, ফিতর এবং ঈদ এক সূত্রে গাঁথা যা ইসলামি অনুশাসনের এক অনন্য নিদর্শন। ফিতরা গরীব, দুঃখীর ন্যায্য পাওনা। রোজা ছাড়ার কারনে আদায় করতে হয়।যার মাধ্যমে মানুষ তার যাবতীয় রোজার খত গুলি থেকে মুক্ত হতে পারে। ভুল ত্রুটির কাফফারা হিসাবে কাজ করে ‘সাদাকাতুল ফিতর’ আরেকভাবেও বলা যায় -’সাদাকা ইফাক ফী সাবিলিল্লাহ’অর্থাত আল্লাহর রাস্তায় ব্যায় করা যার মানবিক দিক খবই তাৎপর্যপূর্ণ ও চমৎকার ও স্পষ্ট। কারণ ফিতরার মাধ্যমে মানুষের হাতে যে টাকা পয়সা আসে তার মাধ্যমে গরীব মানুষ আনন্দ, বিনোদন করতে পারে। ঈদে খাবার ও পোশাক ক্রয় করতে পারে। ঈদে মানবিক দিক বিবেচনায় জাকাতের গুরুত্বও অপরিসীম।
জাকাত একটি নির্ধারিত ফরজ ইবাদত। এ জাকাত আধুনিক রাস্ট্র ব্যাবস্হায় কোন আয়কর না।গরীবের প্রতি দয়াও নয়, দানও নয়। এটা সরাসরি ধনীর সম্পদের প্রতি গরীবের অধিকার। আল্লাহর হুকুম। ফরজ ইবাদত। জাকাত দিলে দাতার অর্থ সম্পদ এবং তার নিজের আত্মা পবিত্র ও পরিছন্ন হয়। জাকাতের অর্থ দিয়ে বঞ্চিত মানুষের সমস্যার সমাধান হয়। জাকাত হচ্ছে মানবিক সমাজ গড়ার হাতিয়ার। মানবকল্যাণই যার মূলমন্ত্র। পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা ৩২ বার জাকাতের কথা বলেছেন। কাজেই জাকাতের গুরুত্ব সহজেই অনুধাবনযোগ্য। জাকাতের মাধ্যমে মানুষের হাতে টাকা আসে।এতে অর্থনীতির চাকা সচল হয়।সমাজে ধনী গরীবের ব্যাবধান কমে আসে। মানুষ মনে করে জাকাত দিলে টাকা কমে যায়। আসলে তা নয় জাকাত দিলে সম্পদে আরও রহমত ও বরকত বৃদ্ধি হয়। আল্লাহ বলেন- ‘তোমরা সালাত আদায় করো, জাকাত দাও এবং আল্লাহকে দাও উত্তম ঋণ।’ (মুজাম্মিল -২০)।
ইসলামের প্রতিটা বিধানের তাৎপর্য আছে। প্রতিটা নিয়মের আছে যৌক্তিকতা।সেদিক থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সিয়াম সাধনা আমাদের পাপ মুক্ত করে।সমাজে মানুষের মধ্যে সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করে, দেয় ঐক্য ও সংহতির শিক্ষা। এ শিক্ষার ফলশ্রুতিতে ঈদের দিন মানুষের উচিত বাস্তুহারা, অনাথ, দুঃখী, শরনার্থীদের স্মরণ করা। দুঃখী মুসলিম, অমুসলিমকে মনে রাখা। কিছু করতে না পারলেও ভালো ব্যাবহার বজায় রাখা। তখনই ঈদুল ফিতরের আনন্দ হবে তাৎপর্যপূর্ন এবং সমাজে আসবে অনাবিল শান্তি। সম্প্রসারিত হবে ঈদুল ফিতরের মানবিক দিকগুলির উৎকর্ষতা।
লেখিকা : অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজ।