তানিয়া আক্তার

একসময় ছিল যখন বাংলাদেশের বহু গ্রাম পরিচিত ছিল শুধুমাত্র রেশম চাষের জন্য। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, ঝিনাইদহ, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ-এই অঞ্চনগুলোর নাম উচ্চারণ করলেই মনে পড়তো তুত সারি, বাঁশের মাচায় রেশম পোকার চাষ এবং উঠোনে বসে কোকুন শুকানোর দৃশ্য। রেশম শুধুমাত্র একটি অর্থকরী ফসল ছিল না বরং এটি ছিল গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি ঐতিহ্য। কিন্তু আজ সেই রেশম চাষ প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে। গ্রামবাংলার বাস্তবতা বদলেছে আর সেই বদলের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে এক সম্ভাবনাময় শিল্প।

রেশম দুইভাবে বিক্রি করা যায় কাঁচা রেশম ও বস্ত্রবয়ন। এর উৎপাদন ব্যবস্থা একাধারে কৃষি ও কুটিরশিল্প। একসময় কৃষক মাঠে, রাস্তায় তুত গাছের চাষ করতেন এবং কৃষকবধূ রেশম পোকা পালতেন। সম্ভাবনার এক সময়কার জনপ্রিয় এই পেশা এখন বিলুপ্তির পথে। বাংলাদেশের গ্রামগুলো থেকে রেশম চাষের উৎপাদন কমে যাওয়ার অনেকগুলো উল্লেখযোগ্য কারণ রয়েছে। প্রধান কারণগুলো হলো কম দামী বিদেশী সুতার সাথে প্রতিযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে রোগবালাই বৃদ্ধি, তুত গাছ লাগানোর জন্য জমির অভাব, সরকারের নীতিগত দুর্বলতা এবং চাষিদের ন্যায্যমূল্য ও বাজারের অনিশ্চয়তা, যা তাদের এই পেশায় আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে।

রেশম চাষের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ার একটি প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ন্যায্যমূল্যের অভাব। রেশম চাষ দীর্ঘ ও অনেকবেশী শ্রমসাধ্য একটি পেশা। এখানে দীর্ঘদিন ধরে লেগে থাকতে হয়। তুতগাছ লাগানো থেকে শুরু করে রেশম পোকার ডিম সংগ্রহ, পরিচর্যা, রোগ প্রতিরোধ ও কোকুন উৎপাদন, প্রতিটি ধাপেই একজন কৃষককে সময়, শ্রম ও অভিজ্ঞতা বিনিয়োগ করতে হয়। অথচ উৎপাদন শেষে এসে কোকুনের মূল্য নির্ণয়ে কৃষকের কোনো মতামতের দাম থাকে না, কৃষকের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

বাজারের মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য দীর্ঘদিনের সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে চাষিরা বাধ্য হন কম দামে কোকুন বিক্রি করতে এবং সরকারি ক্রয়কেন্দ্রগুলো পর্যাপ্তভাবে সক্রিয় নয়। ফলে বছরের পর বছর এসব তিক্ত অভিজ্ঞতা রেশম চাষিদের এ পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করছে।

তাছাড়া রেশম চাষ থেকে চাষিদের মুখ ফিরিয়ে নেয়ার আরো একটি কারণ হলো রেশম চাষে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার দিক। রেশম চাষে কৃষক নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না যে মৌসুম শেষে লাভ হবে। রেশম পোকার রোগ হলে পুরো উৎপাদন নষ্ট হয়ে যায়। আবহাওয়া অনুকূলে না হলে সুতা মানসম্মত হয় না।

ফলে অনেক সময় শ্রম ও খরচের তুলনায় আয় খুবই কম হয়। রেশম সুতা ও গুটির দাম স্থায়ী নয় যার কারণে এক মৌসুমে দাম ভালো পেলেও পরের মৌসুমে নাও পেতে পারে এমন আশংকা থেকেই যায়। কৃষকরা আগেই দাম জানতে না পারায় ক্ষতির ঝুঁকি থাকে। এই অনিশ্চিয়তা থেকে কৃষকের এই ক্ষেত্রে আগ্রহ কমে যাচ্ছে। উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় দরিদ্র কৃষকের কাছে এটা অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়। এজন্য তারা এর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে রেশম চাষের উন্নয়নের জন্য একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। “বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড” নানা প্রকল্প হাতে নিলেও সেগুলোর বাস্তব প্রতিফলন প্রায়ই গ্রামীণ কৃষকদের দোরগোড়ায় পৌঁছায় না। মানসম্মত রেশম পোকার ডিমের সংগ্রহ, আধুনিক প্রশিক্ষণ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা-এসব ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই ঘাটতি রয়েছে। অনেক সময় দেখা যায় যে, প্রকল্প শেষে হলেও চাষিদের দক্ষতা ও আয়ের স্থায়ী উন্নতি ঘটে না। নীতিগত সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের মধ্যকার এই ফাঁক রেশম চাষের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করছে।

বর্তমানে আমাদের তরুণপ্রজন্ম অল্প পরিশ্রমে কাজকে বেশি প্রেফার করে থাকে। অল্প পরিশ্রমে বেশি ইনকাম কোথায় করা যায় তারা থাকে সেই সন্ধানে। রেশম চাষ একটি যথেষ্ট শ্রমসাধ্য কাজ। এইখানে দরকার অনেক বেশি ধৈর্য। এটি দেয়না রাতারাতি লাভ। গ্রামে বসে রেশম চাষ করার বদলে তারা হচ্ছে শহরমুখী গার্মেন্টস শিল্প, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা কিংবা বিদেশ শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে। এর ফলে গ্রামে অভিজ্ঞ রেশম চাষিদের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্ম এই পেশায় আগ্রহী না হওয়ায় কারণে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতাও ভেঙে পড়ছে।

রেশম চাষের জন্য তুতগাছ অপরিহার্য। কিন্তু গ্রামীণ জমির ব্যবহার দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এখন কৃষকের ধান, ভুট্টা, সবজি কিংবা লাভজনক বাণিজ্যিক ফসলে কৃষকের ঝোঁক বাড়ছে। ফলে রেশম চাষ একদম সীমিত পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় যেখানে রেশম চাষ হতো সেখানে আবাসন, রাস্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে তুতগাছ উধাও হয়ে যাচ্ছে। একসময় যেখানে তুতগাছ ছিল সেখানে এখন বহুতল ভবন বা হাইব্রিড ফসলের চাষ হচ্ছে। অর্থনৈতিক বাস্তবতায় স্বাভাবিকভাবেই কৃষক সেই ফসলকেই বেছে নিচ্ছে জীবিকা নির্ধারণের জন্য যেটা তুলনামূলক লাভ বেশি ও নিশ্চয়তা রয়েছে।

বিশ্ববাজারে প্রাকৃতিক রেশমের চাহিদা থাকলেও কৃত্রিম তন্তুর আধিপত্যের কারণে রেশম চাষ কমে যাচ্ছে। চীন থেকে কম দামে সস্তা রেশম সুতা আমদানি হওয়ার কারণে স্থানীয় চাষিরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। নকল ও নিম্নমানের পণ্যের কারণে আসল দেশী রেশমের বাজার বিপুল ক্ষতিগ্রস্থ। সিনথেটিক কাপড় সস্তা, সহজলভ্য ও ব্যাপক উৎপাদন যোগ্য। এই প্রতিযোগিতায় দেশীয় রেশম পিছিয়ে পড়ছে। রেশম সুতা ও কাপড় উৎপাদনে আধুনিকায়নের অভাব, নকশায় বৈচিত্র্যের সংকট এবং বিপণনের দুর্বলতা এই খাতকে আর কোণঠাসা করে দিচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও রোগবালাইও এর ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় রেশম পোকার রোগ বাড়ছে, যা উৎপাদন কমিয়ে দেয়। পুষ্টিহীন তুতগাছের তুত পাতা থেকে পোকা পর্যাপ্ত এন্টি ব্যাকটেরিয়াল উৎপাদন তৈরি করতে পারছে না, ফলে রোগ বাড়ছে।

রেশম চাষ হারিয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে গ্রামীণ নারীরা। কারণ রেশম পোকার পরিচর্যা, সুতা কাটা ও প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণে নারীদের ভূমিকা অপরিসীম। এটি ছিল তাদের জন্য ঘরে বসে নিরাপদে আয় করার একটি মাধ্যম। রেশম চাষ কমে যাওয়ায় সেইসব নারীদের কর্মসংস্থানও হারিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে শুধু একটি শিল্প নয়, গ্রামীণ অর্থনীতির একটু একটু ভারসাম্যপূর্ণ ও পরিবেশবান্ধব আয়ের উৎস ও বিলুপ্ত হচ্ছে।

রেশম চাষ শুধু বাংলাদেশের অর্থনীতির বিষয় নয়; এটি আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অংশ। বাংলার রেশমের সুনাম এক সময় দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আজ এই ঐতিহ্য রক্ষায় আমরা অনেকটাই উদাসীন। উন্নয়নের নামে যদি আমরা আমাদের টেকসই ও ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলোকে বিসর্জন দেই তবে তার মূল্য জোগাতে হবে আমাদের অদূর ভবিষ্যতে।

রেশম চাষের পুনরুজ্জীবন অসম্ভব নয়। এরজন্য দরকার সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমত ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ ও কার্যকর সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আধুনিক প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও প্রযুক্তি সহায়তা বাড়াতে হবে। তরুণদের আকৃষ্ট করতে প্রণোদনা ও উদ্যোগ উন্নয়ন কর্মসূচি নিতে হবে। একই সঙ্গে রেশমভিত্তিক শিল্প যেমন হস্তশিল্প, ফ্যাশন, রপ্তানি এই খাতগুলোর সঙ্গে রেশম চাষকে যুক্ত করতে পারলে এর চাহিদা বাড়বে।

রেশমের সুতো অনেক বেশি সূক্ষ্ম; কিন্তু সেই সূক্ষ্ম সুতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য, আমাদের ইতিহাস,গ্রামের দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী নারীদের সংগ্রাম ও নিত্যদিনকার জীবন কাহিনী। জড়িয়ে আছে গ্রামবাংলার জীবিকা, নারীর ক্ষমতায়ন ও পরিবেশবান্ধব কৃষি। এই সুতো ছিঁড়ে যাওয়া মানে শুধুমাত্র একটি শিল্প হারানো নয়; এটি আমাদের উন্নয়ন ভাবনার এক বড় ব্যর্থতা। প্রশ্ন এখন একটাই-আমরা কি আমাদের এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে ইতিহাসের পাতায় রেখে দিব নাকি সময় থাকতে এই সম্ভাবনাময় শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারসহ মূল পর্যায়ের মানুষেরা উদ্যোগ গ্রহণ করবো?

লেখক : শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।