অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার। আর নাগরিকের এসব অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের এরমধ্যে চিকিৎসা অন্যতম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, রাষ্ট্র সকল নাগরিকের জন্য উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে পারেনি। বস্তুত, আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা বৈশ্বিক মানে উন্নীত করা সম্ভব হয়নি। এমনকি শহর ও গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার মধ্যে ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে। ফলে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। আবার সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাবও আমাদের দেশের বড় সমস্যা। যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মোটেই ইতিবাচক নয়।
একথা অস্বীকার করা যাবে না যে, বৈশ্বিক দারিদ্র্য এখন একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। ফলে পুরো বিশ্বই এখন স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে। সর্বোপরি আবাসন সঙ্কট প্রকট এবং সুশিক্ষার ক্ষেত্রে সীমিত সুযোগ, কর্মসংস্থান সমস্যা, লিঙ্গ বৈষম্য, অনিরাপদ পরিবেশ, বিশুদ্ধ পানি, নির্মল বায়ু ও নিরাপদ খাদ্য সংকট এবং সংকটাপন্ন স্বাস্থ্য পরিষেবাও এখন বৈশ্বিক সমস্যা।
মূলত, স্বাস্থ্যসেবা কোন দেশ ও জাতিকেন্দ্রিক সমস্যা নয় বৈশ্যিক সমস্যা। তবে গোটা বিশ্বেই এখনও এ সেবাকে কাক্সিক্ষত পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ এবং প্রাক স্থিতিশীলতা বাড়ানোর জন্য সমসাময়িক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করা খুবই জরুরি হলেও এক্ষেত্রে রয়েছে সংশ্লিষ্টদের বড় ধরনের উদাসীনতা ও ব্যর্থতা। যা শুধু আমাদের দেশে নয় বরং বৈশ্বিক স্বাস্থ্যখাতকেই বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
সেবামূলক খাতের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা সম্ভবত চিকিৎসা খাতের। সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতেই এখানে চরম অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা রয়েছে। আমাদের সময়ের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, দেশে প্রতিবছর চিকিৎসার পেছনে রোগীদের যত অর্থ ব্যয় হয়, তার বড় অংশই যায় রোগ নির্ণয়ে। এসব রোগ নির্ণয়ের (ডায়াগনসিস) সিংহভাগই হয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে, যেখানে সরকারি হাসপাতালের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি অর্থ খরচ হয়। এ তথ্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের। এ অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে চিকিৎসকদের অনৈতিক সুবিধা গ্রহণকে। ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার পেছনে খরচের তুলনায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রোগীদের গুণতে হচ্ছে অন্তত পাঁচগুণ বেশি অর্থ। চিকিৎসকদের কমিশন দেওয়ায় খরচ বেড়ে যায়। রাজধানীর ধানমণ্ডির প্রথম সারির একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের তথ্য বলছে, থাইরয়েড হরমোন টিএসএইচ পরীক্ষার ক্ষেত্রে ৬০ টাকার রিএজেন্ট, ৫০ টাকার সহায়ক ম্যাটেরিয়াল, জনবল ও লজিস্টিক বাবদ ৫০ টাকাসহ সর্বোচ্চ খরচ হয় ১৬০ টাকা। একইভাবে লিপিড প্রোফাইলে ২৭৭ টাকা এবং হেপাটাইটিস নির্ণয়ে খরচ ১৯০ টাকা। অথচ এসব পরীক্ষায় ডায়াগনস্টিক সেন্টারভেদে টিএসএইচ পরীক্ষায় ১৬০ টাকার বিপরীতে ৬০০-১১০০ টাকা, লিপিড প্রোফাইলে ৭৫০-১৫০০ টাকা এবং হেপাটাইটিসে ৪৫০-১২০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। ফলে একেকটি রোগ নির্ণয়ে রোগীদের পরিশোধ করতে হচ্ছে খরচের পাঁচ থেকে দশগুণ বেশি অর্থ। তা ছাড়া সরকারি চিকিৎসকদের ওপরই নির্ভরশীল বেসরকারি চিকিৎসাবাণিজ্য। সরকারি চাকরি করে বাণিজ্যিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে সেবা দেওয়ার ফলে নিশ্চিতভাবেই এসব চিকিৎসক যে জনগণের করের পয়সায় বেতন নিচ্ছেন, তাদের প্রতি যথাযথ মনোযোগ দিতে পারছেন না। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় বিধিবিধান কার্যকর করা জরুরি বলে মনে করেন চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা। চিকিৎসাসেবার বাণিজ্যিকীকরণের রাশ টানায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন হলেও সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে কিছুটা হলেও উদাসীন।
একথা ঠিক যে, আমাদের দেশের চিকিৎসা সেবার মান এখনও বৈশ্বিক মানের হয়ে ওঠেনি। তবে আশার কথা হচ্ছে, এক্ষেত্রে আমাদের কিছু অর্জনও রয়েছে। বিশেষ করে দেশের বেসরকারি চিকিৎসা সেবা কিছুটা হলেও এগিয়ে গেছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, আমাদের দেশে ৬৫ শতাংশের বেশি রোগী চিকিৎসাসেবা নেয় বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক থেকে। এসব বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান তিন ধরনের। ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসায়িক হাসপাতাল বা ক্লিনিক বা ডায়গনস্টিক সেন্টার। বেসরকারি দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং দেশী বা বিদেশী এনজিওচালিত প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানই বেশি। চিকিৎসার পাশাপাশি মেডিকেল শিক্ষাতেও তারা বড় ভূমিকা রাখছে। এখন সরকারি মেডিকেল কলেজ যত রয়েছে, তার দ্বিগুণ বেসরকারি মেডিকেল কলেজ।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, স্বাস্থ্যসেবার প্রায় ৬৩ শতাংশ চিকিৎসা বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত প্রদান করছে। সরকারি হাসপাতালে শয্যাসঙ্কট, জনবলের অপ্রতুলতার কারণে মানুষের বেসরকারি হাসপাতালের প্রতি উৎসাহ বাড়ছে। সে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা। কিন্তু অনেকগুলো মানসম্মত নয়। একদিকে যেমন পাঁচ তারকাবিশিষ্ট বিলাসবহুল হাসপাতাল রয়েছে, তেমনই রয়েছে মেয়াদোত্তীর্ণ নিম্নমানের ক্লিনিকও। বাংলাদেশে সরকারি হাসপাতাল রয়েছে ৬৫৪টি এবং এসব হাসপাতালে মোট শয্যার সংখ্যা ৫১,৩১৬টি। বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে ৫,০৫৫টি, যেখানে মোট শয্যার সংখ্যা ১ লাখ ৫ হাজার ১৮৩। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট আইসিইউ শয্যা রয়েছে মাত্র ১,১৬৯টি। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে রয়েছে ৪৩২টি আর বেসরকারি হাসপাতালে রয়েছে ৭৩৭টি (ঢাকা মহানগরে ৪৯৪, ঢাকা জেলায় ২৬৭, অন্যান্য জেলায় ২৪৩)। প্রায়ই অপেশাদার ক্লিনিকগুলোয় অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার জেরে সাময়িকভাবে মানুষ এ দেশের বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতকে ভুল বুঝছে এবং অভিযোগ করছে। তবে আশার কথা হচ্ছে, উন্নত বিশ্বের প্রায় সব আধুনিক চিকিৎসাসেবা বাংলাদেশে বিদ্যমান। হৃদরোগ চিকিৎসায় বাংলাদেশ এখন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। একসময় একটা এনজিওগ্রাম করার জন্য রোগীকে বিদেশে, কমপক্ষে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে যেতে হতো। এখন দেশে ৫০টির বেশি কার্ডিয়াক সেন্টার রয়েছে এবং প্রতিবছর লাখ লাখ রোগী হৃদরোগের উন্নত ও সর্বাধুনিক চিকিৎসা দেশেই নিচ্ছেন। এসব পর্যাপ্ত ও পুরোপুরি সন্তোষজনক না হলেও দেশের স্বাস্থ্যখাত নিয়ে নতুন করে আশাবাদের সৃষ্টি হয়েছে।
আমাদের দেশে স্বাস্থ্যখাত আরও গতিশীল ও সময়োপযোগী করার জন্য দরকার সচেতনতা, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং গণমাধ্যমের ইতিবাচক সংবাদ প্রচার। দেশীয় চিকিৎসকরা এখন শুধু হৃদরোগের সফল চিকিৎসা করেই থেমে নেই। কিডনি প্রতিস্থাপন, বোন অ্যান্ড জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট, বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যানটেশন, ক্রিটিক্যাল কেয়ার ম্যানেজমেন্টে সমান পারদর্শিতার ছাপ রেখেছেন এ দেশের মেধাবী চিকিৎসক ও চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রচারণা ও গণসচেতনতার অভাবে সাধারণ মানুষ দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে এখনো কিছুটা হলেও অন্ধকারে রয়ে গেছেন। ফলে রুগীরা এখনো অনেকটাই বিদেশমুখী। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাওয়ায় প্রতিবছর প্রায় চার বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে। করোনা মহামারিতে দেশীয় চিকিৎসক, নার্স ও হাসপাতাল প্রমাণ করেছে, উন্নত চিকিৎসা প্রদান করতে বাংলাদেশ সক্ষম।
মূলত, আমাদের দেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত খুবই সম্ভাবনাময়। সেগুলোকে যদি সুচিন্তিত ও পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো যায়, তাহলে এ দেশ থেকে রোগীদের আর বিদেশে চিকিৎসার জন্য যেতে হবে না। কিছু মানুষের বিদেশযাত্রা হয়তো কখনোই রোধ করা যাবে না। একসময় একজন ভালো ডাক্তারের চেম্বারে রোগী দেখালে মনে করা হতো, সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, কিংবা একটা হাসপাতালে ভর্তি হলেই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। বিষয়টি অনেকাংশেই ঠিক নয়। প্রায়ই দেখা যায়, দেশের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসক খুবই সাধারণ মানের ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা ক্লিনিকে রোগী ভর্তি করে চিকিৎসা দিচ্ছেন। রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটলে তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে উন্নত স্বাস্থ্যসেবার জন্য অন্য হাসপাতালে যেতে বলা হয়। রাস্তার তীব্র যানজট পেরিয়ে অ্যাম্বুলেন্স যখন হাসপাতালের গেটে আসে, অনেক সময় চিকিৎসক এসব রোগীকে মৃত পান অর্থাৎ রোগী সার্বক্ষণিক ক্রিটিক্যাল কেয়ারের চিকিৎসা না পেয়ে বিনা চিকিৎসায় পথেই মৃত্যুবরণ করছেন।
হতাশার বিষয় হচ্ছে, আমাদের দেশের চিকিৎসা সেবায় কোন শৃঙ্খলা নেই। যার যখন খুশি, একে অবজ্ঞা করে চলেছে। ফলে এ খাতে বিনিয়োগের উৎসাহ হারাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। এর থেকে সমাধানের অন্যতম উপায় হতে পারে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ অথরিটি (পিপিপিএ)। সরকারের পক্ষ এ প্রতিষ্ঠান বেসরকারি উদ্যোক্তা/প্রতিষ্ঠানকে চাহিদা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে যদি আর্থিক সহযোগিতা করে, তাহলে দ্রুত এসব প্রতিষ্ঠান স্বয়ংসম্পূর্ণরূপে (None Stop Service) জনগণের স্বাস্থ্যসেবায় আরও পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করতে পারবে।
স্বাস্থ্যখাতে সরকারি-বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রে অযাচিত ব্যক্তির এবং গোষ্ঠীর অনাকাক্সিক্ষত অনুপ্রবেশ ও চিকিৎসাকার্যে বিঘ্ন সৃষ্টির কারণে প্রায়ই অপ্রীতিকর ঘটনার পাশাপাশি মূল কাজ ব্যতিরেকে চিকিৎসক-নার্সসহ সেবাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অন্য কাজে সময় ব্যয় করতে হয়, যা অন্য কোনো পেশা বা খাতে তেমন নেই। তাই সেবা খাতে সেবাদানে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী ব্যক্তি/দল/গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আবশ্যকতা রয়েছে।
আমাদের দেশের স্বাস্থ্য খাতে উন্নতি সন্তোষজনক না হলেও বেশ আশাব্যঞ্জক বলা যায়। সরকারি বড় বড় হাসপাতাল স্থাপন, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংখ্যাবৃদ্ধিসহ বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের বিনিয়োগ, রোগ নির্ণয়কারী প্রতিষ্ঠান ও আধুনিক হাসপাতাল স্থাপনের উদ্যোগ এককথায় চমকপ্রদ। এ ধারাবাহিকতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহজ শর্তে অল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রদানসহ হেলথ ইনসুরেন্স সুনিশ্চিত করতে হবে।
আমাদের স্বাস্থ্যখাতের সবচেয়ে বেশি নিরাশার দিক হচ্ছে লাগামহীন দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআইবি)-এর গবেষণায় সে সত্যই উঠে এসেছে। যদিও এ গবেষণার অভিসন্দর্ভ করোনাকালের। প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের লাগামহীন দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে করোনাকেন্দ্রিক দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সংক্রমনের দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও পরিকল্পনা অনুযায়ী আইসিইউ, ভেন্টিলেটর ইত্যাদি চিকিৎসাসুবিধার সম্প্রসারণ করতে না পারা, বাজেট ও যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও সব জেলায় ১০টি করে আইসিইউ শয্যা প্রস্তুতের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করা, অনেক যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করে ফেলে রাখা এবং ১৩ লাখের বেশি টিকাগ্রহীতাকে দ্বিতীয় ডোজ সরবরাহ করতে না পারা। ভ্যাকসিন সংগ্রহ ও কেনার ক্ষেত্রে পরিকল্পনা, সমন্বয় ও চুক্তিতে স্বচ্ছতার ঘাটতি ছিল বলে মন্তব্য করে টিআইবি। দুদকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা দুর্নীতির উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছেÑস্বাস্থ্য খাতে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়ম, রোগীদের স্বজনদের কাছে বেআইনিভাবে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রয় কমিটিতে অসৎ কর্মকর্তা থাকায় অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতি, দক্ষ জনবল নিয়োগ না দিয়ে যন্ত্রপাতি কেনা ও মেরামতের নামে অর্থ আত্মসাৎ করা, সরকারি হাসপাতালগুলোতে দালালচক্র রোগীদের প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করায়, সরকারি ওষুধ রোগীদের না দিয়ে বাইরে বিক্রি করা, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক-কর্মচারীদের প্রভাবিত করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোগীদের বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপন করে শিক্ষার্থী ভর্তির নামে অনিয়ম ও দুর্নীতি করা, নিম্নমানের ও অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা যন্ত্রপাতি কেনা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন সিএমএসডিতে প্রকিউরমেন্টে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া এবং চিকিৎসকদের প্রভাবিত করে নকল ওষুধ প্রেসক্রাইব করানো।
এসব দুর্নীতির প্রতিরোধে দুদক ২৫ দফা সুপারিশও করেছে। সুপারিশের মধ্যে কয়েকটি হলোÑপ্রতিটি সরকারি হাসপাতালে উন্মুক্ত স্থানে সিটিজেন চার্টার প্রদর্শন, ওষুধ ও মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধে ক্রয় কমিটিতে বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্ত করা, হাসপাতালে যন্ত্রপাতি গ্রহণ কমিটিতে বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি রাখা, দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়া, হাসপাতালগুলোতে সরকার নির্ধারিত ওষুধের তালিকা ও রোগ নির্ণয় পরীক্ষার মূল্যতালিকা প্রদর্শনের ব্যবস্থা রাখা, দালালের দৌরাত্ম্য রোধে কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করা, অনুমোদনহীন বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ করা, বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক স্থাপন ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে স্থায়ী চিকিৎসক-কর্মচারীর বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া, স্বাস্থ্যবিষয়ক শিক্ষা কার্যক্রমে জেলা-উপজেলা প্রশাসনসহ অন্যান্য নির্বাহী দপ্তরকে অবহিত রাখা ও বিল ভাউচার সিভিল সার্জনসহ কমপক্ষে দুজন কর্মকর্তা কর্তৃক যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করা, নকল ওষুধ কারখানা বন্ধে সার্ভেইলেন্স টিম করা, চিকিৎসকদের জন্য বদলি নীতিমালা প্রণয়ন করা, হাসপাতালের রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান নিশ্চিত করা, চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিসের ফি নির্ধারণ করা, রোগীর স্বাস্থ্যবীমা চালু করা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে পৃথক করে স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরে রূপান্তর করা, বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ, নার্সিং ইনস্টিটিউট, প্যারামেডিকস ইনস্টিটিউটের মানোন্নয়ন করা, ইন্টার্নশিপ দু’বছর করা এবং এক বছর গ্রামে থাকা বাধ্যতামূলক করা।
রাষ্ট্রের একটি অতিউল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ খাত হচ্ছে স্বাস্থ্যখাত। যেহেতু এই খাত জনস্বাস্থ্যের সাথে জড়িত, তাই এ বিষয়ে উদাসীনতার কোন সুযোগ নেই। তাই দেশের স্বাস্থ্যখাতকে আরও গতিশীল ও জনগণের সর্বাধুনিক চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য এখাতের দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতার মূল্যোৎপাটন করতে হবে। বিশ্বস্বাস্থ্য দিবসে সে প্রত্যয়ই গ্রহণ করা দরকার।
www.syedmasud.com