বর্তমান সময়টাও ইতিহাসের অংশ হবে, যেমনি হয়েছে অতীতের দিনগুলো। তবে ভবিষ্যতের মানব সন্তানরা একজায়গায় এসে থমকে যাবে, ভাববে, মানব সমাজে এমন ঘটনাও সম্ভব! কী করে একটি জনপদ ছয় কোটি টন ধ্বংসস্তূপের নিচে চলে গেলো? আমরা গাজার কথা বলছি। অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজায় দু’বছরের বেশি সময় ধরে আগ্রাসন চালিয়ে আসছে ইসরাইল। গত ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি হলেও উপত্যকার বাসিন্দাদের লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী। দু’বছরের আগ্রাসনে পুরো অঞ্চলটাই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি ও সংস্থাটির প্রজেক্ট সার্ভিস অফিসের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর জর্জ মোরেইরা দ্য লিভা এক বিবৃতিতে বলেন, দু’বছরের আগ্রাসনে গাজায় ছয় কোটি টন ধ্বংসস্তূপ তৈরি হয়েছে। এ ধ্বংসস্তূপ অপসারণ করতে সাত বছরের বেশি সময় লাগবে। তিনি বলেন, আমি মাত্র গাজা থেকে ফিরেছি, সেখানে মানবিক সংকট গভীরতর হয়েছে। গাজাবাসী পুরোপুরি ক্লান্ত, আতঙ্কগ্রস্ত ও বিপুল চাপে নিমজ্জিত। এরমধ্যে তীব্র শীত ও ভারী বৃষ্টি মানুষের দুর্ভোগ ও হতাশাকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। দ্য সিলভা বলেন, ছয় কোটি টনেরও বেশি এ ধ্বংসস্তূপ ধারণ করতেই অন্তত তিনহাজার কনটেইনার জাহাজ প্রয়োজন। গাজায় প্রতি ব্যক্তিকে ঘিরে গড়ে ৩০ টন ধ্বংসস্তূপ ছড়িয়ে আছে। তা অপসারণ করতেই সময় লাগবে সাত বছরের বেশি। এমন চিত্র থেকে উপলব্ধি করা যায়, গাজার ধ্বংসজ্ঞ কতটা ভয়াবহ । এসবই হয়েছে বর্তমান সভ্যতায়, সভ্যতার শাসকদের অনুমোদক্রমে।
উল্লেখ্য, যুদ্ধবিরতির মধ্যেই গাজায় হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরাইলি সেনারা। শুক্রবার ইসলাইলি সেনাদের গুলিতে দাক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে এক বৃদ্ধা নিহত হয়েছেন। এছাড়া উত্তর গাজার বাইত লাহিয়ায় ইসরাইলি ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছে ১০ বছর বয়সিী এক মেয়ে শিশু। শুক্রবার ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, আগের ২৪ ঘণ্টায় ইসরাইলি হামলায় ১২ জন নিহত এবং ১৮ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ধ্বংসস্তূপ থেকে দু’জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয়ে যুদ্ধ বিরতির মধ্যে ইসরাইলি সোনাদের আক্রমণে ৪৬৩ জন নিহত, এক হাজার ২৬৯ জন আহত এবং ৭১২টি লাশ উদ্ধার করা হয়। সব মিলিয়ে দু’বছরের বেশি সময়ের আগ্রাসনে গাজায় ৭১ হাজার ৪৫৫ জন নিহত এবং এক লাখ ৭১ হাজার ৩৪৭ জন আহত হয়েছেন। আগ্রাসন ও নিষ্ঠুরতার এ মাত্রা সভ্যতার শাসকদের কুৎসিত চেহারাকেই স্পষ্ট করে।
প্রহসনের এমন বিশ্ব ব্যবস্থায় গাজায় শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ শুরুর ঘোষণা দিয়েছে আমেরিকা। বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধপরবর্তী গাজার পরিস্থিতি তদারক ও অঞ্চলটি শাসনে ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটিক কমিটির তত্ত্বাবধানের জন্য ‘বোর্ড অব পিস’ সদস্যদের নির্বাচন করা হয়েছে। তাদের নামও ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, ভিনদেশীয়দের দিয়ে এভাবে ‘বোর্ড অব পিস’ গঠিত হলেই কি শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে? একদিকে ইসরাইল হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাবে এবং তাদের জন্য অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত থাকবে; অপরদিকে হামাসকে বলা হবে নিরস্ত্র হতে-এভাবে কি কোথাও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে? এসব কর্মকাণ্ডের ইতিহাস একসময় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পড়বে এবং বলবে-মানব ইতিহাসে কি এমন এক সভ্যতাও ছিল? ন্যায়ভ্রষ্ট এমন সভ্যতাকে তারা হয়তো ধিক্কারই জানাবে।