মুহাম্মদ আবুল হুসাইন

পরিবার মানবসমাজের ক্ষুদ্রতম কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র-এ তিন স্তম্ভের ভিত্তি নির্মিত হয় পরিবারকে কেন্দ্র করে। ইসলাম পরিবারকে কেবল সামাজিক চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করে না; বরং এটি একটি নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও দায়িত্বপূর্ণ আমানত। এ আমানতের সুরক্ষা ও স্থায়িত্ব নির্ভর করে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ এবং আল্লাহভীতির ওপর। ইসলামের দৃষ্টিতে পারিবারিক শৃঙ্খলা শুধু পার্থিব শান্তির জন্য নয়; বরং দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার পূর্বশর্ত।

পরিবার : আল্লাহপ্রদত্ত একটি আমানত : পবিত্র আল-কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন: “হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা কর।”-সূরা আত-তাহরীম ৬। এ আয়াত পরিবারপ্রধানের ওপর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক তত্ত্বাবধানের গুরুদায়িত্ব অর্পণ করে। পরিবার কেবল ভরণ-পোষণের ক্ষেত্র নয়; বরং ঈমান, আমল ও চরিত্র গঠনের ক্ষেত্র। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “তোমাদের প্রত্যেকেই রক্ষক এবং প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।” এ হাদিস পরিবারকে একটি সুশৃঙ্খল দায়িত্বব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করে।

শৃঙ্খলা : পারিবারিক শান্তির পূর্বশর্ত : ইসলাম পারিবারিক সম্পর্ককে ভালোবাসা (মাওয়াদ্দাহ) ও দয়া (রহমাহ)-এর ভিত্তিতে স্থাপন করেছে: “তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও; এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।” সূরা আর-রূম ২১। ভালোবাসা টেকসই হয় তখনই, যখন তা শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। নিয়মহীন স্বাধীনতা পরিবারে স্থায়ী শান্তি আনতে পারে না; বরং ভারসাম্যপূর্ণ শৃঙ্খলাই স্থিতি আনে।

পরিবার : একটি সংগঠন : পরিবার সমাজের ক্ষুদ্রতম ইউনিট হলেও এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সংগঠন। আর যে কোনো সংগঠন টিকে থাকে শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের ওপর। নেতৃত্বে শৈথিল্য বা অনুপস্থিতি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। ইসলাম পারিবারিক নেতৃত্বের কাঠামো নির্ধারণ করেছে: “পুরুষরা নারীদের উপর অভিভাবক (কাওয়াম)ৃ”সূরা আন-নিসা ৩৪। এখানে ‘কাওয়াম’ মানে আধিপত্য নয়; বরং দায়িত্বপূর্ণ অভিভাবকত্ব। স্বামী বা পিতা পরিবারপ্রধান, কিন্তু তাদের নেতৃত্ব নৈতিক ও আদর্শভিত্তিক। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।” অতএব, পরিবারপ্রধানের শক্তি তার চরিত্রে, ন্যায়পরায়ণতায় ও দায়িত্ববোধে।

পারিবারিক নেতৃত্ব ও নারীর মর্যাদা : একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি : পরিবারে পুরুষকে প্রধান নির্ধারণ করায় কেউ কেউ মনে করতে পারেন নারীকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। কিন্তু ইসলামে নেতৃত্ব ও মর্যাদা এক বিষয় নয়। দায়িত্বের বণ্টন আলাদা হলেও মর্যাদা ও সম্মানের প্রশ্নে নারী অত্যন্ত উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত।

এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন আমার সদাচরণের সর্বাধিক অধিকারী কে? তিনি বললেন, “তোমার মা।” তিনবার একই উত্তর দিয়ে চতুর্থবার বললেন-“তোমার পিতা।” এছাড়া একটি সুপরিচিত বাণীতে বলা হয়েছে— “মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত।” অতএব, নারী কন্যা হিসেবে রহমত, স্ত্রী হিসেবে প্রশান্তির উৎস এবং মা হিসেবে জান্নাতের পথপ্রদর্শক।

মাতৃত্ব : চরিত্রগঠনের প্রথম বিদ্যালয় : সন্তান মায়ের কাছ থেকেই সবচেয়ে বেশি শেখে। ভাষা, আচরণ, আবেগপ্রকাশ-সবকিছুর প্রাথমিক শিক্ষা মায়ের মাধ্যমে হয়। তাই মায়ের শিক্ষা-দীক্ষা, আচার-আচরণ সন্তানের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। যদি মা স্বামীর প্রতি সম্মান দেখান, ভাষা কোমল হয়, আচরণ মার্জিত হয় তবে সন্তান স্বাভাবিকভাবেই শৃঙ্খলাবোধ ও আনুগত্য শেখে। পক্ষান্তরে, যদি স্বামী-স্ত্রীর পারস্পারকি সম্পর্কে প্রকাশ্য অবাধ্যতা, কর্কশ ভাষা বা অসম্মান থাকে, তবে তার নেতিবাচক প্রভাব সন্তানের ওপর পড়তে পারে। কারণ শিশু কথার চেয়ে আচরণ থেকে বেশি শেখে। তবে এখানে স্মরণীয় -স্বামীর আনুগত্য ইসলামে ন্যায় ও শরিয়তের সীমার মধ্যে। এটি অন্ধ অনুসরণ নয়; বরং পারিবারিক ভারসাম্য রক্ষার নৈতিক কাঠামো। একজন দায়িত্বশীল মা তার ব্যক্তিত্ব, ধৈর্য ও শালীনতার মাধ্যমে একটি প্রজন্মের চরিত্র নির্মাণে ভূমিকা রাখেন।

সন্তান প্রতিপালনে শৃঙ্খলার প্রয়োগ : রাসূল (সা.) বলেছেন: “তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও।” এ নির্দেশ প্রমাণ করে- নৈতিক ও দ্বীনি শিক্ষায় নিয়মতান্ত্রিক প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। শৃঙ্খলা ছাড়া আদর্শ প্রজন্ম গঠন অসম্ভব।

ইসলামের দৃষ্টিতে পরিবার একটি ইবাদতের ক্ষেত্র। এখানে নেতৃত্ব আছে, কিন্তু স্বৈরতন্ত্র নেই; আনুগত্য আছে, কিন্তু মর্যাদাহানি নেই; ভালোবাসা আছে, কিন্তু সীমালঙ্ঘন নেই। যখন পরিবারপ্রধান আদর্শ হন, মা সম্মানের সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত থাকেন, এবং সন্তানরা দায়িত্বশীল শৃঙ্খলায় বেড়ে ওঠে তখন পরিবার হয়ে ওঠে শান্তির নিবাস, সমাজের ভিত্তি এবং জান্নাতের এক ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি।

লেখক : সাংবাদিক।