॥ জসিম উদ্দিন মনছুরি ॥
বহুল কাক্সিক্ষত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রথম অধিবেশন গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বেলা ১১-৫ মিনিটে শুরু হয়েছে। রীতি অনুযায়ী সংসদ অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন বিগত সংসদের স্পিকার অথবা ডেপুটি স্পিকার। কিন্তু ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করলে স্পিকারের পদটি শূন্য থাকে। ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু হত্যা মামলায় কারাগারে থাকায় স্পিকারের আসন শূন্য রেখেই ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের অধিবেশন শুরু হয়। পরবর্তীতে সংসদ নেতা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রস্তাবক্রমে ড.খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে সভাপতি করার প্রস্তাব দেন মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিরোধীদলের পক্ষ থেকে বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা.আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বিরোধী দলের পক্ষ থেকে প্রস্তাবকে সমর্থন জানান। এ অধিবেশনে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন। স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
এছাড়া শোক প্রস্তাবের মধ্যে ছিল একটি ব্যতিক্রমধর্মী প্রস্তাবনা। শোক প্রস্তাবে সরকারি দলের চীফহুইপ নুরুল ইসলাম মনি বিএনপি জামায়াত জোট সরকারের আমলের মন্ত্রী জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নেজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং ইসলামি স্কলার মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম তাদের নাম শোক প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করেন। এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ডা. আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের তাদের দলের বেশ কয়েকজন এবং জুলাই যুদ্ধাসহ আরো কতিপয় ব্যক্তিকে প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আবেদন জানান। বিরোধী দলীয় হুইপ নাহিদ ইসলাম জুলাই অভ্যুত্থানের শহিদ মীর মুগ্ধ আবু সাঈদ, ওয়াসিম এবং হাদীসহ আরো কতিপয়কে শোক প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রাখেন। সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ প্রস্তাবিত সবাইকে শোক প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি আরো বলেন যারা অসাবধানতাবশত শোক প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি তাদেরকে সংসদ সচিবালয়ে জীবন বৃত্তান্তসহ প্রেরণ করার জন্য অনুরোধ করা হয়।
প্রথম অধিবেশনের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল রাষ্ট্রপতির ভাষণ। রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে বিগত আওয়ামী সরকারকে ফ্যাসিজম সরকার আখ্যা দিয়ে আওয়ামী সরকারের জুলুম নির্যাতন এবং স্বৈরাচারী মনোভাবের কথা তুলে ধরে আওয়ামী লীগের এসব কর্মকা-ের নিন্দা জানান। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের শহিদ ও আহতদের রুহের মাগফেরাত কামনা করে আওয়ামী লীগের এসব হত্যাকা-ের নিন্দা জানান। বিরোধী দল সংসদে যোগদান করার আগে থেকে বলে আসছিল তারা রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জন করবেন। সংসদে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করলেও রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। পরবর্তীতে নাহিদ ইসলাম ও হাসনাত আব্দুল্লাহ রাষ্ট্রপতিকে স্বৈরাচারের দোসর বলে স্লোগান দিতে দেখা যায়। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে স্বৈরাচার ও গণতন্ত্র একসাথে চলতে পারে না বলেও স্লোগান দিতে দেখা যায়। পরবর্তীতে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্রপতির বক্তব্য দেওয়ার সময় বিরোধী দল সংসদ থেকে ওয়াক আউট করেন। এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন ওয়াক আউট করা বিরোধী দলের সাংবিধানিক অধিকার। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রথম অধিবেশনে এ একটি কারণ ছাড়া সকল সদস্যদের প্রাণবন্ত এবং প্রাণোচ্ছ্বল দেখা গেছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে ঐক্যের সুর পরিলক্ষিত হয়েছে। জনগণ আশা করে জুলাই পরবর্তী এই প্রথম সংসদ অধিবেশন যেন হয় জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। অন্যান্য সময়ে সংসদ ছিল সরকারি দল ও বিরোধীদল একে অপরের বিষদগার করার একটি কেন্দ্রবিন্দু। পরিবর্তিত রাজনীতিতে এরকম যেন না হয় জনগণ সে আশা প্রকাশ করেছেন। এছাড়া জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়েও আলোচনা প্রস্তাবে রাখা হয়েছে। এবারের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট দুই তৃতীয়াংশেরও বেশি ভোট পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে সরকার গঠন করে। সরকারের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিরোধী দলও প্রায় ৭৭ টি আসন লাভ করে শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। ওয়াক আউটের পর বিরোধী দলীয় নেতাকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন তিনটি কারণে বর্তমান রাষ্ট্রপতি স্বৈরাচারের দোসর হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন, তিনি ২০২৪ সালের গণহত্যার সময় নীরব ভূমিকা পালন করে তা সমর্থন দিয়ে গেছেন। তাছাড়া তিনি স্বৈরাচারের প্রতিটি কর্মকান্ডের সহযোগিতা দানকারী হিসেবে তার সংসদে বক্তব্য দেওয়ার কোন অধিকার নেই। বিরোধীদল পরবর্তী সংসদে ফিরবেন কিনা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন আমরা অবশ্যই সংসদে ফিরব এবং জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য সোচ্চার থাকব।
বহুল কাক্সিক্ষত ও প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রথম অধিবেশনের যাত্রা শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। বিএনপি জয়লাভ করে সরকার গঠন করলে ব্যাপক সংস্কার এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা দিয়েছিল। কিন্তু জুলাই সনদ বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য হিসেবে বিরোধী দল শপথ গ্রহণ করলেও সরকারি দল শপথ নেননি। ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। যদিও সরকারি দল বলে আসছে সংসদ অধিবেশনের পর তারা নতুনভাবে সংস্কারের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। জনগণের প্রত্যাশা ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন যেন না হয় চিরাচরিত, প্রথাগত এবং বিষদগারের। বিরোধীতার জন্য একে অপরের বিরোধিতা না করে বরং বিরোধিতা যেন হয় গঠনমূলক ও উন্নয়নের লক্ষ্যে। আশা করি সরকারি দল ও বিরোধী দল এ বিষয়টি মাথায় রেখে জনস্বার্থে জনগণের পক্ষে কাজ করার জন্য সংসদকে কার্যকর রাখবেন। একদল অপর দলের প্রতি বিরোধিতা করার জন্য বিরোধিতা না করে বরং জনগণের জন্য একসাথে কাজ করে যাবেন এই আশা দেশের ১৮ কোটি জনগণের।
এবার দেখার বিষয় তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করার পর তারা জনগণের জন্য কি কাজ করেন এবং বিরোধীদল সরকারের বিরোধিতা করে কতটুকু অধিকার আদায় করতে পারেন। তাছাড়া বিরোধীদলের পক্ষ থেকে দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনেরও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। ইতোমধ্যে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের কাজও অনেকদূর এগিয়ে গেছে। বিরোধী দলের ঘোষণা অনুযায়ী টেক্সমুক্ত গাড়ি ও সরকারি ফ্লট গ্রহণ করবেন না মর্মে ঘোষণাটিকে সরকারি দলও এইভাবে বিরোধীদলের পথ অনুসরণ করে তারাও সরকারের টেক্সমুক্ত গাড়ি এবং ফ্লট গ্রহণ করবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। এদিক থেকেই নতুন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়ছে বলে মনে করেন দেশের জনগণ। আশা করি আগামীতেও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পরবর্তী অধিবেশনগুলি প্রাণবন্ত হবে এবং সংসদ হবে জনগণের জন্য এবং জন প্রত্যাশার ও জনগণের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধীদল এগিয়ে যাবে। তাহলে কেবল জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।