॥ মুহাম্মদ খায়রুল বাশার ॥

মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এই অঞ্চলের দেশগুলোকে কেবল উত্তেজনা প্রশমনের জন্য ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক জোটের দিকেই নয়, বরং তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষিত করার জন্য গভীরতর সহযোগিতার দিকেও নিয়ে যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়াকে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। যার ফলে এমন বিকল্প অর্থনৈতিক করিডোর তৈরির প্রচেষ্টা জোরদার হয়েছে।

চলতি মাসে তুরস্ক, জর্দান এবং সিরিয়ার মধ্যে একটি রেল যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থনৈতিক করিডোর তৈরির চুক্তির পর সৌদি আরব এই ব্যবস্থাটিকে তার জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের সাথে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।

সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান সম্প্রতি আঙ্কারা সফর করেছেন। সেখানে তিনি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেব এরদোগান এবং তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সাথে সাক্ষাৎ করেন। উভয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৌদি-তুরস্ক সমন্বয় পরিষদের তৃতীয় বৈঠকে যৌথভাবে সভাপতিত্ব করেন। এর মাধ্যমে কার্যত রিয়াদ ও আঙ্কারার মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।

সৌদি-তুরস্ক সম্পর্কের ক্ষেত্রে উচ্চ পর্যায়ের সফর এবং বড় চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি প্রায়ই শিরোনাম হলেও এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের একটি ধীর প্রক্রিয়া ক্রমান্বয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই এ পদ্ধতির প্রক্রিয়াগুলো তুলে ধরা এবং সৌদি-তুরস্ক সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যগুলোর জন্য প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ কেন গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝা জরুরি।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ বলতে একটি কাঠামোগত সহযোগিতাকে বোঝায়, যার মধ্যে রয়েছে নিয়মিত কূটনৈতিক সমন্বয় এবং আনুষ্ঠানিক ও নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরি করা। সৌদি-তুরস্ক সমন্বয় পরিষদ সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটি বলিষ্ঠ উদাহরণ। ২০১৬ সালে গঠিত হওয়া এই পরিষদের লক্ষ্য ছিল কাঠামোগত সহযোগিতার প্রধান মঞ্চ হওয়া। বেশ কয়েক বছর এর কার্যকারিতা সীমিত থাকলেও গত বছর দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার পর এটি গতিশীল হয়। গত দুই বছরে পরিষদ রিয়াদ ও আঙ্কারার মধ্যেকার সম্পর্ক কে আন্তঃসরকারি সহযোগিতার আরো একটি কাঠামোগতরূপে রূপান্তরিত করেছে। এই পরিষদ শুধু একটি আনুষ্ঠানিক সংস্থা নয়। এটি বাণিজ্য থেকে শুরু করে নিরাপত্তা পর্যন্ত সম্পর্কের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা সহজ করে। সৌদি-তুরস্ক সংসদীয় বন্ধুত্ব কমিটি হলো আরেকটি ব্যবস্থা যা সৌদি শূরা পরিষদ এবং তুর্কি গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির মধ্যে সম্পর্ক শক্তিশালী করার জন্য কাজ করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে, এই ধরনের ব্যবস্থাগুলোকে প্রায়ই ‘প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিস্থাপকতা’তে অবদান রাখে বলে বর্ণনা করা হয়, যার অর্থ হলো রাজনৈতিক পরিবেশ পরিবর্তিত হলেও এগুলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।

প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের দিকে এই পরিবর্তন প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। সামরিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর, প্রতিরক্ষা শিল্প অংশীদারিত্বের সম্প্রসারণ এবং গোয়েন্দা সমন্বয় বৃদ্ধিÑ এসবই সৌদি-তুরস্ক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি অধিকতর সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত করে। বিশেষত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা তাদের সম্পর্কের অন্যতম শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে।

অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতার ক্ষেত্রেও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ সুস্পষ্ট। অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে প্রসারিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে উভয় দেশের অংশীজনদের একত্র করার জন্য সৌদি-তুরস্ক ব্যবসায়িক ফোরামের আয়োজন করা হয়েছে। গত বছর উভয়পক্ষ সৌদি-তুরস্ক অর্থনৈতিক সহযোগিতা শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করে। ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা সহযোগিতা ও বিনিয়োগের নতুন নতুন সুযোগ অনুসন্ধানের জন্য এই শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সম্প্রতি একই উদ্দেশে ফেব্রুয়ারিতে রিয়াদে সৌদি-তুরস্ক বিনিয়োগ ফোরামের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে সৌদি বিনিয়োগমন্ত্রী বলেন, এই বিনিয়োগ ফোরাম দুই দেশের মধ্যে অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমন্বয়ের প্রতিফলন এবং এটা দুই দেশের অংশীদারিত্বকে ‘নতুন কৌশলগত দিগন্তে’ প্রসারিত করতে উভয় নেতৃত্বের দৃঢ় সংকল্প প্রদর্শন করে।

সৌদি আরব রেলওয়েজ এবং তুর্কি রাষ্ট্রীয় রেলওয়েজের মধ্যে চুক্তির পর মাসে দুই দেশে একটি রেল প্রকল্পের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যা জর্দান ও সিরিয়ার মধ্য দিয়ে সৌদি আরবকে তুরস্কের সাথে সংযুক্ত করবে এবং বছরের শেষ নাগাদ এটি সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই উদ্যোগটি পরিবহন সহযোগিতায় ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের প্রতিফলন ঘটায়, কারণ রিয়াদ এবং আঙ্কারা উভয়ই একটি কৌশলগত উত্তর-দক্ষিণ করিডোর বরাবর আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য সহজতর করতে চায়। সৌদি-তুরস্ক সমন্বয় পরিষদের তৃতীয় বৈঠকে উভয়পক্ষ কূটনৈতিক এবং বিশেষ পাসপোর্টধারীদের জন্য পারস্পরিক ভিসা ছাড়ের একটি চুক্তিতেও স্বাক্ষর করেছে। এটি কেবল সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার ক্ষেত্রে একটি পদক্ষেপই নয়, বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইচ্ছারও একটি সুস্পষ্ট প্রকাশ।

সৌদি আরব এবং তুরস্ক এই দুটি মাধ্যম শক্তির আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায়, বিশেষ করে বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থায় ও অর্থনেতিক বাজারে, গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। উভয় দেশই ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) এবং জি-২০ এর প্রভাবশালী সদস্য। একই সাথে দেশ দুটি পশ্চিমা রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর সাথে দৃঢ় সম্পর্ক বজায় রাখে এবং রাশিয়া ও চীনের সাথে বাস্তবসম্মত সম্পর্ক রক্ষা করে। সুতরাং উভয় দেশই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জোটের সংযোগস্থলে অবস্থান করছে।

সৌদি আরব ও তুরস্ক ক্রমবর্ধমানভাবে স্বীকার করেছে যে, আঞ্চলিক ব্যবস্থা বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে, তারা তাদের সম্পর্ককে ক্রমবর্ধমানভাবে নতুন রূপ দিচ্ছে এবং এটি তাদের মধ্যে গড়ে ওঠা কৌশলগত জোটেরই একটি প্রতিফলন।

এই জোটটি এই অঞ্চলে একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের রূপ পাচ্ছে। গাজা যুদ্ধ, সিরীয় সরকারের পতন, ইরানের সাথে মার্কিন-ইসরাইল সঙ্ঘাত এবং এই ঘটনাগুলোর ফলে উদ্ভূত অনিশ্চিত নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্মিলিতভাবে রিয়াদ ও আঙ্কারাকে অস্থিতিশীলতা প্রশমনের উপায় হিসেবে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সৌদি আরব এবং তুরস্কের আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমশ একীভূত হচ্ছে। উভয় দেশই এই অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা নিরসনের সর্বোত্তম উপায় হিসেবে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে প্রাধান্য দেয়। উদাহরণস্বরূপ, সিরিয়ায় আসাদ শাসনের পতনের পর থেকে রিয়াদ এবং আঙ্কারা উভয়ই একটি শক্তিশালী, কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রের ধারণাকে জোরদার করেছে। সিরিয়ায় আসাদ পরবর্তী রূপান্তর নতুন আঞ্চলিক সংযোগ উদ্যোগের পথ খুলে দিয়েছে। সৌদি আরব এবং তুরস্ক দুদেশই সিরিয়ায় একটি কার্যকরী কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ অত্যাবশ্যক বলে মনে করেন। কারণ কেবল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সংযোগ উদ্যোগকে এগিয়ে নেয়ার জন্যও এটি অপরিহার্য বলে মনে করে দুদেশ।

প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ শুধুমাত্র সহযোগিতার একটি প্রক্রিয়া হিসেবেই কাজ করে না বরং এটি কৌশলগত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার একটি হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করে। রিয়াদ এবং আঙ্কারা উভয়ের জন্যই তাদের অভিন্ন আঞ্চলিক লক্ষ্য অর্জন এবং একটি টেকসই ভিত্তির ওপর তাদের সহযোগিতা গড়ে তোলার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের দিকে মোড় নেওয়া অপরিহার্য।

রিয়াদ-আঙ্কারা সম্পর্ক শুধু পরিবহন, বাণিজ্য বা সংযোগের বিষয় নয়। এটি একটি রাজনৈতিক জোট, ভূরাজনৈতিক প্রভাব এবং আঞ্চলিক একত্রীকরণের একটি মাধ্যম। ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বর্তমান পরিস্থিতিতে তুরস্ক-সৌদি আরব তথা উপসাগরীয় অর্থনৈতিক করিডোর খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, বিএফইউজে।